সাপ্তাহিক রম্য সাহিত্যে ইন্দ্রাণী ঘোষ (পর্ব – ১১)

খন্ডহারে বসন্ত
আমার ইস্কুলটি ভবানীপুরের পুরনো পাড়ায়। আসা, যাওয়ার পথে অনেক পুরনো অট্টালিকার ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাওয়া যায় । ঝঁা চকচকে পাড়ার আনাচ কানাচে এখনো এরা দাঁড়িয়ে আছে । ভাবখানা এমন, পৃথিবী যত ছোটে ছুটুক, আমি আমার নিজের অস্তিত্ব বাঁচিয়ে, নিজের কাজ ঠিক করে যাব । দুই বছর ইস্কুল বন্ধ, কাজকর্ম বন্ধ থাকার ফলে এদের জরাজীর্ণ শরীরে যেন স্বাস্থ্যের ছোঁয়া লেগেছে । সূর্য্যের আলো মেখে, সবুজ লতাগুল্মের সাজে সেজে তাঁরা দিব্যি দাঁড়িয়ে থাকে । এমনি এক খন্ডহারের সাথে আমার রোজ দেখা হয়। তাঁর মাথায় মাধবীর ঝার, সারা গায়ে ল্যান্টানা ফুলের আগুনের ফুলকি, ইতিউতি উঁকি মারে সন্ধ্যামালতীরা, সারা গায়ে তাঁর ফুলের আভরণ । এ তো একদিন মানুষের আশ্রয় ছিল । মানুষকে দুহাতে আগলেছিল । এই খন্ডহারকে দেখে বহুকালের পরিচিত অপরাজিতা দির কথা মনে পড়ে আমার । অপরাজিতা দি নার্স ছিলেন । দেশভাগের পর এ দেশে এসেছিলেন । বৃদ্ধ বাপ, মা আর অনেকগুলি ভাইবোনের দায়িত্ব ছিল তাঁর উপর । বিজয়গড়ের দরমার বেড়া দেওয়া ঘরে থেকে দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করে ভদ্রমহিলা নার্সিং ট্রেনিং নিয়েছিলেন, তিন বোন, দুই ভাইকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, তাদের লেখাপড়া শিখিয়েছিলেন, বিয়ে দিয়েছিলেন , দরমার ঘর পাকা করেছিলেন। এরপর অপরাজিতা দি পঞ্চাশ বছরের দোরগোড়ায় এসে বিয়ে করেন এক বিপত্নীক ডাক্তারবাবুকে । সকলে বঁাকা হাসি হেসেছিল, ভাইবোনেরা ভেবেছিল বুড়ো বয়েসে ভীমরতি। চারিদিক থেকে ছুটে এসেছিল আঁশটে গন্ধযুক্ত মন্তব্য । অপরাজিতা দির সম্পত্তি বলতে নিজের হাতে তৈরি ভিটে বাড়ীখানা, হাতে দুগাছি সোনার চূড়ি, বাগানের বেলফুল আর কামিনী ফুলের গাছ । অপরাজিতা দি সে বাড়ী থেকে যাবার সময় খুব কেঁদেছিল । তারপর মেরুন বেনারসি, ফুলের গয়না পড়ে নতুন বরের গাড়ীতে উঠে চলে যাবার সময় গোধুলির আলো মেখে অপরাজিতা দি কে কি সুন্দর দেখাচ্ছিল, অশ্রু আর আলো মিলেমিশে একাকার। কয়েকদিন ধরে ওই পুরনো দেয়ালে ফুলের সাজ দেখে অপরাজিতা দির মুখখানা খালি চোখে ভাসছে । অপরাজিতা দির সাথে পরেও দেখা হয়েছে, ডাক্তার বরের সাথে ভালোই আছে । বাপ, মা মারা যেতে ভাইবোনেরা ছড়িয়ে, ছিটিয়ে যেতে অপরাজিতা দি আবার সেই ভিটেবাড়ীতেই এসে আছে। স্বামী, স্ত্রী বাগান করেন, অবসরপ্রাপ্ত, নি:সন্তান, এই ডাক্তার ও নার্স দম্পতি গরীব, গুর্বোর সেবা করেন ।
পাড়ার সকলে তাদের বেজায় ভক্তি করে । খন্ডহারে বসন্ত আসার মতই অপরাজিতা দি কেও কি সুন্দর দেখায় ।