সাপ্তাহিক রম্য সাহিত্যে ইন্দ্রাণী ঘোষ (পর্ব – ১১)

অষ্টমী পরিক্রমা ও দাশু

থিমের ঠাকুর দেখার অভ্যেস কোনকালেই নেই আমার । পাড়ায় পরপর তিনটে পুজো হয়.। সেখানে প্রতিমাদের ঘামতেল মাখা মুখ। দেখলে মনে হয়, এই বুঝি সংসারের সব কাজ সামলে উঠে মহাভারতখানা নিয়ে বসে, একটু উল্টিয়ে দেখবেন । এই পুজোর সামনে কখনো ভোগের খিচুড়ি, কখনো লুচি, সুজি এসব জুটে যায় । ভিন্ন ধর্মের মানুষও এখানে এক পুজোর উল্টোদিকের কবরখানার পাঁচিলে বসে ভোগ খেয়ে থাকেন ।
অষ্টমীর দিন আমি হাঁটতে বেড়িয়ে বেশ খানিকটা গরম সুজি, লুচি, পটল ভাজা প্রসাদ পেয়েছিলাম। প্যান্ডালের পাশে এক ঝাপড়ানো শিউলি গাছ, তাঁর নীচে চেয়ারে বসে পড়েছি প্রসাদ নিয়ে । পাড়ার মা দুর্গারা আরতি দেখতে, সন্ধি পুজোর প্রদীপ জ্বালতে এসেছেন. পরনে তাঁতের শাড়ি, সিঁথিতে সিঁদূর, হাতে নোয়া। এমন সময় হঠাৎ দাশু হাজির। সে বেগুনি জোব্বা পড়েছে, মাথায় ইয়া বড় পাগড়ী।
আমি ছাড়া দাশুকে কেউ দেখতে পায় না। দাশুকে দেখে আমি মানে মানে শিউলি তলা থেকে উঠে হাঁটা দিলাম। হাঁটতে হাঁটতে দুজনে পুকুরপাড়ে এসে বসলে দাশু আমার প্রসাদের থালা থেকে খাবলা দিয়ে লুচি, সুজি তুলে নিয়ে নিজের মুখে চালান করলে । আমি বললাম ‘হ্যঁা রে দাশু আমাদের পেট তো ভরে যায়, পুজোর দিনে সব গরীব গুর্বো মানুষদের পেট পুজো হয়েছে রে?’
দাশু বললে ‘পেট পুজো তোর মতন পেটুকদের হয়। .’ আমি বললেম ‘ইস নিজের নোলা যেন কম’। দাশু বললে ‘তুই যে এই সব সময় চিন্তা করিস সবাই খেতে পেল কিনা, এটা কিন্তু বিলাসিতা’।
আমি রেগে বললেম ‘আবার বাজে কথা, নিজে আমার লুচি, সুজি মেরে দিলি আবার ফালতু কথা বলছিস’. ।
এবার দাশু ফ্যঁাচফ্যঁাচ করে সেই বিশ্রী হাসিটা হেসে বললে ‘ অনেকক্ষণ ধরে রাগ করছিলি না, এবার রাগিয়ে দিয়েছি’. । আমি বললাম ‘তুই আমার প্রান্তিক মানুষদের জন্য ভাবনাকে বিলাসিতা বললি কিসের জন্য?’
দাশু উত্তর দিলে ‘ভেবে তুই কিছু করতে পারবি না, তাই বেশি ভেবে মন খারাপ করিস না.। তবে হ্যঁা ভাবনা যখন তোর আসে তখন বলে রাখি ,এইসব ভাবনা তোর আসে মানে তুই প্রতিদানে কিছু আশা করিস. । সেটা করিস না কিন্তু, তাহলে তোর ভাবনার কোন মূল্য থাকবে না.। আশা করলেই কষ্ট বাড়বে’. । এই বলে দাশু তারার আলোর পথ বেয়ে হাঁটা দিলে.।
আমিও বাড়ী ফিরতে ফিরতে ভাবলাম, দাশু পাগল ঠিকই তবে যা বলে একদম খাঁটি কথা বলে যায়।

সেই থেকে ভেবে যাচ্ছি পাগলেরাই কি শুধু তবে সত্যিটা দেখতে পায়?

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।