সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় (পর্ব – ৮৬)

সোনা ধানের সিঁড়ি
১২৩
মান্না দে যখন মারা যান তখন আমি লিখেছিলাম, মান্না দে না জন্মালে বাঙালির প্রেমে কোনো রঙ ধরতো না। আসলে আমি বলতে চেয়েছিলাম, মান্না দে -র জন্যে বাঙালির প্রেম অনেক গভীর হয়েছে। এত সব কিছু বলার পরেও আমার মনে হয়েছিল আমি মান্না সম্পর্কে কোনো কিছুই বলতে পারলাম না। বলাই বাহুল্য আমি মান্না দে-র অন্ধ ভক্ত। আসলে এঁরা এমনই হন। এঁরা শুধু একজন গায়কই নন, একটা যুগের পরিচয়। কোনো বাঙালি কি অস্বীকার করতে পারবেন যে তিনি তাঁর মনের মানুষের সঙ্গে দেখা করে এসে পরে রাতের বেলা ঘর অন্ধকার করে সেই মেয়েটির মুখ ভাবতে ভাবতে মান্না দে শোনেন নি। অবশ্যই আমি সেই সময়ের কথা বলছি যখন আমাদের প্রাত্যহিকতায় মোবাইল ফোন আসে নি। দেখা করে আসার পর শুধুমাত্র ভাবনায় তার মুখকে নিয়ে আসা ছাড়া অন্য কোনো উপায় যখন খোলা ছিল না।
কয়েকদিন আগে লতা মঙ্গেশকর মারা গেলেন। তাঁর সম্পর্কেও ওই একই কথা প্রযোজ্য। একটা মানুষ সত্তর বছর ধরে গান গাইছেন —– এটা ভেবেই কোনো কুল-কিনারা পাওয়া যায় না। তিনি শুধু বাঙালিকে নন, সমগ্র পৃথিবীর অগণন মানুষ তাঁর গানের সাগরে অবগাহন করেছেন। শুধু তাই নয়, একটা গানের সঙ্গে প্রতিটি মানুষের জীবনে কত কত ঘটনা জড়িয়ে থাকে। আমি আমার ব্যক্তি জীবনের কথা বলতে পারি —– কত আনন্দ, কত যন্ত্রণা এক একটি গানের সঙ্গে মিশে আছে। শুধুমাত্র ভাষায় তার অসাধারণত্বকে প্রকাশ করা যাবে না। বিভিন্ন জায়গায় কত কত সন্ধ্যে লতা তাঁর গান দিয়ে আমাকে ভরিয়ে দিয়েছেন। সেই গান বেশিরভাগই ভেসে এসেছে চায়ের দোকান থেকে। মনে পড়ে বিবিধ ভারতীতে তখন রাত সাড়ে দশটা থেকে ছায়াগীত হতো। তখন গ্রামের বাড়ির চারপাশে নিশুতি পড়ে গেছে। যদিও আমাদের তখন সন্ধ্যে, কিন্তু সে অন্য প্রসঙ্গ। ছায়াগীত-এর যিনি সঞ্চালক ছিলেন তাঁর কন্ঠমাধুর্যই রাত গভীর করে দিতো। এক এক রাতে লতার এক একটা গান অনেক রাত পর্যন্ত জাগিয়ে রাখতো। ঘুম আসতো না। আমার আবার এক অদ্ভুত স্বভাব ছিল, হঠাৎ যদি কোনো গান খুব ভালো লেগে যেত তাহলে হয় রেডিওটা বন্ধ করে দিতাম আর নয়তো পরের গানগুলো খুব ভালো করে শুনতাম না। পরে ওই একটি গানই গুনগুন করে আমি ভরে থাকতাম।
এই প্রসঙ্গে আমার এখন আরও একটা অতিরিক্ত প্রাপ্তি ঘটে। আজও যখনই কোনো পুরানো দিনের গান শুনি তখনই মুহূর্তে আমি আমার কৈশোর বা যৌবনে গিয়ে হাজির হই। আর দেখি আমার বাবা মা বেঁচে আছেন। শুধু তাই নয় তাঁদের সঙ্গে কথাবার্তাও চলছে। তাই কি মান্না কি লতা, কেউই আমার কাছে অতীত নয় —– সম্পূর্ণ জীবিত। ঠিক যেমন বাবা মাকে সচল দেখতে পেয়ে মন আনন্দে ভরে ওঠে।