T3 || ঘুড়ি || সংখ্যায় গৌতম বাড়ই

ভোঁ-কাট্টার সেই যে ঘুড়িবেলা

এই কথাটা ভীষণভাবে ভাবায়, আমরা কি আদৌ বড় হয়ে উঠেছি? না কি একটু চুলে পাক, বয়সের ছাপ চোখে- মুখে। চলার গতি শ্লথ আর হাজারটা চাপ মাথার মধ্যে, অফিস আর সংসারে। কিন্তু খুঁজে বেড়াই সেই যে আমার অমূল্য ছেলেবেলা। ছেলেবেলা বলতে সেই যে নিষেধমানা গার্জেনিদের আড়াল নিয়ে সময়বেলা। তা হয়ত কিশোরবেলা টপকে যৌবনে পড়বার পড়েও কিছুটা সময়। তবে তারমধ্যেই পোরা আছে ঘুড়িবেলা বলেও একটা সময়খন্ড, আমাদের স্মৃতির গোলাপমহলে আজও টাটকা হয়ে আছে তা।

এখন যেমন দেগে দেওয়া হয় ঘুড়ি ওড়ানো ও তো বাউন্ডুলে আর বখাটে, পড়াশোনা না করা, ছেলেদের জন্য। আমাদের সেই সময় এমনটা ছিল না মোটেও। আমরা ক্লাসের এ্যানুয়াল পরীক্ষার পর শীতের রোদ গায়ে মেখে দেদার ঘুড়ি ওড়াতাম। তার জন্য কত না প্রস্তুতি! মনে পড়ে ছেলেবেলার একটা বিরাট অংশ জুড়ে ওই ঘুড়িবেলাও ছিল। আমরা আকাশের বুকে পৃথিবীর সবুজ মাঠে লাটাই হাতে দাঁড়িয়ে রঙ-বেরঙের নানান প্রজাপতি ছড়িয়ে দিতাম, তারা ডানা মেলে উড়তে উড়তে পাক খেতো অনেক ওপরে।

দুটো টাকা কোনরকমে পেলেই বিন্দাস জমে যেত আমাদের ঘুড়ি ওড়ানো ঐ সময়ে। ত্রিশ পয়সার করে ষাট পয়সার মোট যোগে, চিত্তরঞ্জন সুতোর দুটো রিল, চৌরঙ্গী ঘুড়ি, লাট্টুমার্কা ঘুড়ি, দোভাঁজ ঘুড়ি, দশ থেকে কুড়ি পয়সার মধ্যে প্রতিটি। আর লাটাই তো একবার বাবা- মামা- মেশোকে পটিয়ে বাগিয়ে নিলে বছর কে বছর, সেটাও না পেলে, পন্ডস পাউডারের লম্বা কৌটো দু- পাশে দুটো ফুটো করে , একটা বাঁশের কঞ্চি চেঁছে গোল করে বা একটি গোলাকার লাঠি পেলেই সুচারু ভাবে লাটাইয়ের বিকল্প হোমমেড সংস্করণ তৈরি। আর পায় কে! বন্ধু এবার চল মাঠে।

 

না, আরও একটু আছে, ভোঁ- কাট্টার মাস্টার পিস হতেই হবে, তাই সুতোয় মাঞ্জা দেওয়া পর্ব। আর এই মাঞ্জার গুপীমন্ত্র শিখতে ও জানতে মনে আছে জনাদার পেছন পেছন ঘুরঘুর করতাম অনেকদিন। জনাদার তখন বিরাট খ্যাতি নিজের পাড়া আর আশপাশের পাড়াতেও, জনাদা একের পর এক অন্যের ঘুড়ি ভোঁ- কাট্টা করেও আকাশে তার গরবিনী ঘুড়ির পতাকা ওড়াতেই থাকে। একদিন কানে- কানে আমাকে আর ট্যাঁপাকে সেই গুপীমন্ত্র দিয়েই দিল। আর কাটবি তো কাট, প্রথমেই ভোঁ- কাট্টা করলাম জনাদার ঘুড়ি। একেই বলে বোধহয় গুরুমারা বিদ্যে। সব্বাই হেব্বী জয়ধ্বনি দিল। নিজেকে বেশ হিরো- হিরো লাগছিল। এখন ওই যাকে বলে সেলিব্রেটি ক্রেডিট নেওয়া। তাই নিচ্ছিলাম তখন।

জনাদার মাঞ্জায় ডিম থাকত। আমি ব্যবহার করেছিলাম সাবুর সাথে তোকমা আর মায়ের আলতা। বেশ আলাদা হয়েছিল লালরঙা সুতো। আর জনাদার কথা মতন বাল্বের কাচ মিহি করে গুঁড়ো করেছিলাম শানের ওপর পাথর দিয়ে। ব্যাস তাতেই কেল্লা ফতে। তবে এও বলে রাখছি, এখনকার চিনাসুতোর মতন কিন্তু প্রাণঘাতী ছিল না সেই মাঞ্জাসুতো।
তবে বেশিদিন স্থায়ী হয়নি, জনাদার গোপন ঐ মাঞ্জারহস্য। পেটপাতলা ট্যাঁপা জানিয়ে দিল সবাইকে জনা’স স্পেশ্যাল মাঞ্জা। তারপর, একই আকাশ, পুরোটাই একই মাঞ্জা দেওয়া ঘুড়ি। কেউ কোনদিন বেশি কাটে, আবার কেউ বা নিজেই দু- চারবার ভোঁ- কাট্টা হয়ে কেটে পড়ে গগণ থেকে। হাতে ফাঁকা হয়ে ঝুলতে থাকে লাটাই। তবে তারপরেও আমি জনাদাকে হারিয়ে হয়ে গেলাম সুপারস্টার কাটার। কেন? তা নিজের উদ্ভাবনী মাঞ্জা ফর্মুলা দিয়ে। তা বলছি পরে।

কলকাতা মহানগরের ঘুড়ি উৎসব বা কাইট- ডে বিশ্বকর্মা পুজোর দিন, সাধারণত বাংলা ভাদ্র- সংক্রান্তি ৩১শে ভাদ্র, ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১৭ই সেপ্টেম্বর বা কোনও বছর ১৮ই সেপ্টেম্বরে পড়ে। কলকাতার আশেপাশে অনেক শহর বা শহরতলীতে সরস্বতী পুজোর দিনেও মানা হয় এই ঘুড়ি ওড়ানোর উৎসব অর্থাৎ কাইট- ডে। একবার উত্তর কলকাতার দেশবন্ধু পার্কে বিশ্বকর্মা পুজোর দিনে বেশ কয়েকটি ভোঁ- কাট্টা ঘুড়ি লুটেছিলাম। স্মৃতিতে তা এখনও মলিন হয়ে যায়নি। বড় হয়েই জেনেছি, পৃথিবীর নানা দেশে, নানান শহরে এইরকম কাইট- ডে আছে। চিন ও জাপানের ঘুড়ি তো বিশ্বখ্যাত।

আমার শৈশব থেকে ছোটবেলা হয়ে তরুণদলে যখন পড়েছি, কেটেছে উত্তরবঙ্গের তরাইয়ের শিলিগুড়ি শহরে। তখনকার সেই ছোটশহরে কোনো কাইট- ডে ছিল না। কিন্তু ঐ যে বললাম, প্রচুর ঘুড়ির ওড়াউড়ি ছিল শীতের সময় আকাশ জুড়ে।তবে শহর ছাড়িয়ে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরে ছিল, আমাদের নিশ্চিন্তপুর। আমাদের দেওয়া নাম ( সুনীল গাঙ্গুলী কে পড়ে)। পোড়াঝাড় বলে আসল নামের একটি গ্রাম। পৌষ সংক্রান্তির দিনে ওখানে ঘুড়ি ওড়ানো হত। আমাদের ঘুড়িবেলার অনেক পরে খোঁজ পেয়ে তাই দেখতে গিয়েছিলাম একবার। শহর থেকে অনেকে ঘুড়ি আর লাটাই নিয়ে সাইকেলে চেপে চলে এসেছেন পোড়াঝাড় গ্রামে ঘুড়ি ওড়াতে। নদীর পাড়ের জমিতে ঘুড়ি ওড়াচ্ছেন তারা। হঠাৎ করে ফিরে গিয়েছিলাম যেন সেই ছেলেবেলায়।
মনে পড়ে গেল স্মৃতি- বিস্মৃতির ঘুড়িবেলা। আজ মনে পড়ছে, তখনের সেই ঘুড়ি ওড়ানোর সাথীদের হাত নেড়ে ডাকলেও চট করে কাছে পাব না। কেউ- কেউ নিজেরাই ঘুড়ি হয়ে ভোঁ- কাট্টা হয়ে গিয়েছে। সেই দলে জনাদাও আছেন। সেই তারা হয়ত খুব বেশি নয়, আর কিছু কে কোথায় আছে? কিছুই জানি না। আজ ঘুড়ি নিয়ে স্মৃতির ঝাঁপি হাতড়াতে গিয়ে তাদের মনে হল।

পরিশেষে, আমার সেই উদ্ভাবনী মাঞ্জা যা নিয়ে রীতিমতন পাকা খেলুড়ে আমি তখন। সেইসময় ঘটা করে সূর্য ডোবার আগেই হ্যারিকেন আর ডিম- লাইটের চিমনি মায়েরা ঝেড়েপুঁছে সাফা করে রাখতেন। রাতের জন্য। লোডশেডিং বলে একটা শব্দ ছিল প্রতিদিনের অভ্যস্ত জীবনযাত্রায় জড়িয়ে । ল্যাম্পে কেরোসিন তেল ভরে তাতে চিমনি পরিষ্কার করে লাগিয়ে রাখতে হত, আরও উজ্জ্বল আলো পাওয়ার জন্য। রাতের পড়াশোনা আর খাওয়া- দাওয়া ওতেই হত বেশিরভাগ রাতে। একদিন সন্ধ্যার মুখে মা ডিমলাইটের চিমনি পরিষ্কার করতে গিয়ে দেখল ভাঙা টুকরো নিয়ে পড়ে আছে ওইটি। ভাই- বোন- আমাকে জিগ্গেস করলেন, আমরা কেউ ভেঙেছি কিনা? সবাই মাথা নাড়ালাম। আমি ঐ সন্ধের মুখে পাড়ার মুদিখানা থেকে চিমনি কিনে আনলাম, বাবা হাতে পয়সা দিয়ে বললেন নিয়ে আসতে। মা বললেন বাবাকে – “ভারী আশ্চর্য! চিমনি তো আমার হাতে ভাঙেনি আর ওরাও ভাঙেনি, তবে ভাঙলো কী করে? নিশ্চয় পাশের বাড়ির হুলোটা ওর ওপর ঝাঁপিয়ে ছিল।”

আমি তো জানি, হুলোটা কে? এক লাঠির বাড়ি দিয়ে আমি ঐ চিমনি ভাঙি। তারপর সেই ভাঙা চিমনি মায়ের আড়ালে, ফেলে দেওয়া স্তূপ থেকে সংগ্রহ করে , মিহি করে বেটে নিয়ে চিত্তরঞ্জন থ্রেডের রিলে ভালোবাসার পরশে মাখিয়ে দেই, তাতেই বাজিমাত , আমি সেই ভোঁ- কাট্টার সুপারস্টার হয়েছিলাম এতে। তবে বাউন্ডুলে হয়ত বা একটু আধটু হলাম, বখাটে কিন্তু হইনি।

এটাই আমার ঘুড়ির কাছে গ্রেট কনফেসড।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।