দেবাশিস মুখোপাধ্যায়ের আফসার আহমেদের প্রথম প্রয়াণ বার্ষিকীতে শ্রদ্ধা

আফসার আমেদের ছোটগল্পের সামান্য রূপ

বাগনানে চাকরি করতে আসার বছর চারেক বাদে গল্পকার আফসার আমেদের সঙ্গে আমার আলাপ হয় । তিনি হয়ে যান আমার বন্ধু এবং প্রতিবেশী । আগেই জেনেছিলাম তিনি আমার বিদ্যালয়
বাইনান বামনদাসের ছাত্র আর কড়িয়া অঞ্চলে এক দরিদ্র কিন্তু অভিজাত পরিবারে তার জন্ম । ধীরে ধীরে বাংলা একাডেমির তার
ঘরটিতে আমার যাতায়াত শুরু হয় । তারপর তার বাড়িতেও । তার ছেলে ও মেয়ের ইংরেজি শিক্ষার
ভার আমার উপর বর্তায় । আর আমার সকালের হাঁটার বন্ধু হয়ে যান আফসারদার বাবা । আফসারদার সাহিত্য চর্চার পিছনে
বাগনানের ছোট ছোট সাহিত্য আড্ডা প্রথম দিকে তাকে অসম্ভব
সাহায্য করেছে । তার প্রথম গল্প মনের মানুষ  প্রকাশিত হয় বাগনানের ময়দান পত্রিকায় ১৯৭৫ সালে ।
বাংলা ছোটগল্পে আফসার আমেদ এক প্রতিষ্ঠিত নাম । তার ভাবনা এবং ভাষার বিশিষ্টতা তাকে একটা
আলাদা সিগনেচার দিয়েছে যা তার একান্ত নিজস্ব শৈলী । গল্পে তার বড়
সম্পদ তার চরিত্রগুলো আর তাদের শরীরে ছড়িয়ে থাকা গল্প ।
আফসার আমেদের ‘খরা’  গল্পের শুরুতেই দেখান বাস্তবতার বিপরীতে তার যাত্রা যেন আধিভৌতিকতার পথে । কলেনপুরের মতো একটি ছোটো গ্রাম এবং তার তিন চারটি ঘর -গেরস্থির প্রেক্ষিতে লেখক তার কাহিনীটিকে সাজিয়েছেন ।
আকাশে জল নেই ,ক্ষেতে কাজ নেই- মৃত্যুর জন্যই প্রেমা আর তরুবালার প্রস্তুতি । পেটের দায়ে প্রেমা পূর্বপুরুষের তেঁতুলগাছটা বিক্রি করে দেয় নন্দ সাঁইকে । তারপর প্রেমা , রতন , রাখহরি মিলে সেই গাছ কাটে । গাছের নীচের কালির থান উপড়ে আসে
গাছের সঙ্গে । শুরু হয় বিপদ । রতন মারা যায় । তরুবালার ছেলে মনা মৃত্যুর দিন গোনে । উলি পিসি উঠোনে মুখ থুবড়ে মারা যায় । রাখহরি রাতদিন গাছপালায় বন
বাদাড়ে শ্মশানে ঘুরে বেড়ায় । কাহিনী ব্যপ্তি পাবার সঙ্গে সঙ্গে সংস্কারগুলিকেও আরো বেশি লালন করে যান গল্পকার । অমাবস্যার রাতে রাখহরি শ্মশানকালীর পুজো করে । দুদিন আগে কলেরায় মারা গিয়েছিল ভোলার কচি মেয়েটা । সেই গলা
শরীরটা মাটির নিচের থেকে তুলে আনে প্রেমা আর রাখহরি । রাখহরি
মন্ত্র পড়ে ।আকাশে মেঘ জমে ভোলার মেয়েকে আবার মাটি চাপা
দেয় দু জনে ।
আফসার সম্পর্কে বলতে গিয়ে অমলেন্দু চক্রবর্তী বলেছেন , ” আফসার সর্বাংশে গ্রামের ছেলে । বর্ষার কাদায় শীত গ্রীষ্মের ধুলোয়
পা ডুবিয়েহাঁটা তার আজন্ম অভ্যাস ।.. অন্যদের সেখানে গিয়ে পৌঁছতে হয় , আফসার আমেদ সেখানে আজন্ম বর্ধিত হয়ে উঠেছে উদ্ভিদ বা বৃক্ষের আদলে । যে মানুষগুলি তার রচনার চরিত্র ,ব্যক্তিগত জীবনাচরণে তাদের হয়তো স্বজন
প্রতিবেশী ।”
এই অঞ্চলের শিক্ষক হওয়ায় অল্পবিস্তর আফসারদার চরিত্রগুলো
আমারও নজরে পড়ে । শিহরিত হই ।
আফসার আমেদ যখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম. এ পড়ছেন তখন তো তিনি লেখক হিসেবে বিশিষ্ট সব পত্র পত্রিকার লেখক ,তার লেখালেখি সম্পর্কে
মনোযোগ তৈরি হয়েছে , তার লেখকবন্ধুদের সাথে মিশে তিনি
কলকাতার নাগরিক জীবন সম্পর্কে
ওয়াকিবহাল , যদিও তিনি গল্প ও উপন্যাস লিখছেন বাগনান ও সন্নিহিত অঞ্চলের মুসলমান মানুষজনের পারিবারিক জীবন নিয়ে ।
এবারের আলোচনা ‘ডিপ টিউবলের
দাম কত ?’ এখানে ধরা পড়েছে কৃষিজীবী মানুষের নিরাপত্তাহীনতার কাহিনী । ‘ ডিপটিকলে  জমিতে সোনা ফলবে । সেই সোনার সম্ভাবনায় শাকুকে উচ্ছেদ দেবে নাকি ?’ আড়াইবিঘের চাষি শাকু । এক পা সরু নসিবার স্বামী , মুক্তার , লাইলি আর খুকির
বাপ শাকু নিরাপত্তার প্ৰশ্নে আশংকিত   কিন্তু উচ্ছেদ দেওয়া কিমবা না হওয়ার ঘটনাতে কাহিনীকে ঠেলে দেন না আফসার । সারা গল্প জুড়ে তিনি শাকুর কাজকাম এবং তার ভিতরের টালমাটাল অবস্হাকে প্রকাশ করেন । এইভাবে গল্পকার পাঠককে পৌঁছে দেন কৃষি সম্পর্কের সংকটে ,সংকটের বাস্তবে এবং কল্পনায় ।
‘গোনাহ ‘ গল্পটি একান্তই মুসলিম সমাজের গল্প থাকে না , এর শিকড় দাঁড়িয়ে আছে ভারতীয় সমাজব্যবস্থার সামগ্রিক বাস্তবতার ভেতর । “জয়নুদ্দিন কাজীর বাড়ি মিলাদ-মাহফিল । কলকাতা থেকে মৌলানা আসছেন ।” গল্পের প্রথম অনুচ্ছেদের এ দুটি বাক্যে আফসারদা গল্পের প্রেক্ষিত নির্দিষ্ট করে দেন । এই প্রেক্ষিতের সঙ্গে কাজির বাড়ির কাজের মেয়ে ষোল বছরের ফরিদার সম্পর্কটি কী – পরিপূরক , দ্বান্দ্বিক নাকি সমান্তরাল – তা স্পষ্ট করে তোলেন না আফসারদা । তিনি শুধু ফরিদাকে দেখান – তার কর্মে , কল্পনায় । রসিদ , অনুচ্চারিত কোনো ইঙ্গিতে , ফরিদার কাছে এক গেলাস জল চায় , কাজি গিন্নি সোচ্চারে ফরিদাকে বাসনমাজা সেরে বাকি কাজ সারতে বলে আর ফরিদা এসবের ভেতর কারো বউ হওয়ার স্বপ্ন দেখে । ফরিদা সূঁচের কাজ জানে । সে রুমালে তার কল্পিত বরের নাম লেখে – আবদুল খালেক । জয়নুদ্দিন কাজির বড়ো ছেলের নাম আবদুল মালেক । ফরিদা ভাবতে বসে খালেক আর মালেক একই । ফরিদাকে ঘটে ডাকতে যায়
মালেক  । ফেরার পথে হোঁচট খেয়ে ফরিদার গায়ে পড়ে । ফরিদার শরীরে অনুরণন ওঠে । ঘরে ফিরে ফরিদা মৌলনাকে শরবত দিতে যায় । ফিরে ঘামে ভিজতে ভিজতে আন্ডা ভাজে ,আলু ভাজে , নাস্তা বানায় । ওদিকে মাহফিলের সব তৈরি । কাহিনীর এই অংশে এসে আফসার দেখান ফরিদা এই মাহফিলের বারোয়ারি সম্পত্তি হয়ে উঠেছে । ওদিকে ছটা বালিশের মাঝে অবস্থান করে মৌলানা পাপ পুণ্যের হিসেব শোনায় । কর্ম বিধ্বস্ত ফরিদার কাছে কিছু পরে দেশলাই চাইতে আসে মালেক । এক সময় অন্ধকারে তারা মিথুন -মূর্তি হয়ে যায় ।তখনই হৈ হল্লা ভেসে আসে । বালিশে সুঁচ ছিল । মৌলানা বুকে ঢুকে গেছে । মালেক দৌড়ে ।ফরিদা নিথর দাঁড়িয়ে থাকে ।কাজি সাহেব
চিৎকার করে – ‘ এটা কার কাজ ? ওরা ঠিক চিনে নেবে । অন্ধকারে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে ফরিদা ।
আফসারের এই গল্পে দেহ ও মন ,বাস্তবতা ও কল্পনা , পাপ ও পুণ্য – এরকম বিপরীত গোত্রের শব্দ আমদানি করেছেন । গল্পের শেষে সুঁচ দিয়ে মাহফিলের সুরকে
কেটে দিয়েছেন ।
আফসারের ‘ভয় ‘ গল্পটি সফুকে নিয়ে ,তার শরীরকে নিয়ে । সফুর
আতঙ্কের মন এবং ভয়ের শরীর নিয়ে এই আখ্যান ।
আফসারের গল্পে দুটি স্বতন্ত্র পরিবেশ চেতনা আছে । এর একটি হল মুসলমান সমাজ কেন্দ্রিকতা , অপরটি হল মুসলমান সমাজ নিরপেক্ষতা । বাস্তবিক জীবনে তিনি কিন্তু হিন্দু মুসলিমের ভেদরেখা মানতেন না । আমার বাড়িতে বসে খেতে তার সংকোচ ছিল না । আফসার প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মকে সামন্ততান্ত্রিকতার একটি উপাদান হিসেবে দেখেন । গল্পের চরিত্ররা দেহ মন নিয়ে হাজির পাঠকের কাছে । গদ্যের এক নিজস্ব আবহ তিনি গড়ে তুলেছিলেন তার কিসসায় । উপন্যাসের মতো ছোট গল্পকার হিসেবে তিনি অমর হয়ে থাকবেন বাংলা সাহিত্যে । তার সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল ভাবতে গর্ব অনুভব করি । এ মাসে তার মৃত্যুর প্রথম বছর পূর্ণ
হল।

কবি দেবাশিস মুখোপাধ্যায় এর জন্ম কুলটিতে এবং বর্তমান তিনি হাওড়ার বাগনানে বাস করেন । তার কবি জীবন শিশুকাল থেকে । কলকাতার ইন্দ্রাণী পত্রিকায় যখন কবিতা প্রকাশ হয় তখন কবি দশম শ্রেণি 1983. এরপর প্রথম কবিতার বই 1997ক” কবিতার একখন্ড মুখ” । এরপর কর্মসূত্রে বাগনানে এবং দ্বিতীয় কবিতার বই “আজকাল পরশুর গল্প “, এরপর এখন বাংলা কবিতার কাগজ প্রকাশ করে ” শূন্য কিন্তু শূন্য নয় ” , পত্রলেখা থেকে ” ভূমিকা প্রেমের কবিতার ” , কবিতা ক্যাম্পাস থেকে ” বিষন্ন রেখার পারে ” এবং সুতরাং থেকে ” ভেনাস বিউটি পার্লার ” এবং নতুন পাতার গন্ধ ” । কবি কবিতায় বাঁচতে চান।

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!