ছোটগল্পে দেবদাস কুণ্ডু

সাক্ষাৎকার

‘তোমার গল্পে সেক্স নেই কেন?’
সংগীতার অকপট প্রশ্নে অনির্বাণ স্তব্ধ। সে সংগীতার মুখের দিকে তাকায়। সংগীতা ছিল তার ছাত্রী। বারো ক্লাস এব‍ং বি.এ. তার কাছেই বাংলা পড়েছে। ওর সঙ্গে পড়ত আরও তিনটে মেয়ে। তুলিকা, অঙ্কিতা ও রত্না। ওরা ভিন্ন শাখায় চলে গেছে। ওরা কোনদিন তাকে স্যার সম্বোধন করেনি। খোলামেলা ও বন্ধুর মতো মেলামেশা করেছে। নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হত। একমাত্র সংগীতাই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা নিয়ে পড়ছে। সংগীতা শ্যামলা, মুখশ্রী সুন্দর। চোখ দু’টো জল ছবির মতো উজ্জ্বল। মেদহীন বাইশ বছরের শরীর। এখন হাতে কফির মগ। চুমুক দিয়ে বলল, ‘তুমি বুঝি ভাবতে পারো নি আমি এমন একটা প্রশ্ন করবো?’
কথাটা মিথ্যে বলেনি সংগীতা। অনির্বাণ সংগীতাকে দেখে। ওর মুখে কয়েকটা কালো দাগ।
‘কি হল কিছু বলছো না কেন?’ সংগীতার ঠোঁটের ফাঁকে দুষ্ট হাসি।
অনির্বাণ এবারও নির্বাক। সিটি সেন্টারেরর কফিশপের দোতলায় বসেছে তারা। এখন সন্ধ্যা। অন্যান্য টেবিলগুলিতে যুবক যুবতী গভীর আলোচনায় বা প্রেমালাপে মগ্ন। এক কোনার টেবিলে এক বয়স্ক দম্পতি কফি খাচ্ছে আর গল্প করছে। অনির্বাণ সেসব দেখছে, ভাবছে, অনেক বছর সে লেখালেখি করছে। তা প্রায় পঁচিশ বছর হবে। যে বন্ধুটি তার ভিতর এই বিষ নেশাটি ধরিয়েছিল, সে আজ পৃথিবীতে নেই। অনিমেষ মারা গেছে ফুসফুসের অসুখে। তার প্রায় চল্লিশটা গল্প কিছু জনপ্রিয় দৈনিক সংবাদপত্রে, কিছু বাণিজ্যিক ম্যাগাজিনে, বাকি লিটিল ম্যাগাজিনে ছাপা হয়েছে। এক সময় লেখা ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু প্রতিদিনের সূর্য উদয়ের মতো লেখার অভ্যাস ফিরে আসে। লেখা আসলে জঠরের গর্ভযন্ত্রণার মতো। একদিন কলেজ স্ট্রিটে দেখা এক লেখক বন্ধুর সঙ্গে। তারই অনুপ্রেরণায় ‘গল্প পঁচিশ’ প্রকাশ পেল। একটা কপি সংগীতাকে দিয়ে সে বলেছিল, ‘কেমন লাগল জানাস।’
সংগীতা বইটা নিয়ে দেখছিল, ওর বস্তিবাড়ির সামনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে। অনির্বাণও দাঁড়িয়ে ছিল কাছে। গাড়ির হর্ন, পাশে শনি মন্দিরের ঘণ্টা, অনির্বাণ বলেছিল, ‘এদিকে সরে আয়।’
মনিকাঞ্চন সোনার দোকানটা বাঁ দিকে রেখে ওরা একটা সরু গলির মুখে গিয়ে দাঁড়াল। বইটা দেখছিল সংগীতা, মনোযোগ গভীর। মুখ তুলে বলে, ‘এত গল্প লিখলে কবে?’
‘অনেক বছর ধরে।’
‘কত দিতে হবে?’
‘কিছু দিতে হবে না। পড়ে তোর মতামতটা দিস।’
‘দাম না দিয়ে আমি নেব না। নিজেই আবার পাতা উল্টে দেখে নিয়ে বলল, ‘১৭৫ টাকা! ব্যাগ থেকে ১৫০ টাকা বের করে বলল, ‘এটা তুমি রাখো। আমাকে পনের দিন সময় দাও।’
কথা রেখেছে সংগীতা, ঠিক পনের দিনের মাথায়, আজ দুপুরে ফোন করেছিল। স্ক্রিনে সংগীতা সাহা দেখে অনির্বাণ উৎসাহ নিয়ে বলেছিল,
‘বইটা পড়েছিস?’
‘পড়েছি।’
‘কেমন লাগল বল?’
‘ফোনে বলা যাবে না। দেখা করে বলবো।’
অনির্বাণের উৎসাহ তখন দ্বিগুণ, ‘তোর বাড়ি যাব, কখন থাকবি বল?’
‘আমার বাড়ি? আমার বাড়িতে জায়গা কোথায়? তুমি তো এসেছো কতবার।’
কথাটা মিথ্যে নয়। সে কয়েকবার সংগীতার বাড়ি গেছে। বস্তিবাড়ি। একটা ছোট্ট ঘরে ছ’টা প্রাণী থাকে। সংগীতার দাদু ঠাকুমা মা বাবা বোন, সে নিজে যেন একটা ছোট্ট খাঁচায় কতগুলো গিনিপিগ। এই বস্তি অঞ্চলটার প্রায় ঘরেই তাই। এই বাড়িতে ১৫-২০টা ঘর হবে। তাদের হৈচৈ, স্নান, বাথরুম, কারো ঘরে টেপ বাজছে, কারো ঘরে টিভি চলছে, কারো ঘরে দাম্পত্যের চিরকালের ঝগড়া, জমজমাট একটা হাট, এই হাটের মাঝে সংগীতা এম.এ. পড়ছে, এটা একটা সাধনা।
‘হ্যালো।’ সংগীতা বলে, ‘তুমি ঠিক সন্ধ্যা ছ’টার সল্টলেকের সিটি সেন্টারে দোতলায় কফিশপে অপেক্ষা করবে। আমার একটু দেরি হলেও দাঁড়াবে।’
‘সিটি সেন্টারের নাম শুনেছি।’ অনির্বাণ বলেছিল, ‘কোথায় নামতে হবে?’
‘তুমি বাগুইআটি থেকে হার্ডকো মোড়ে নামবে। অটো ধরবে। বলবে সিটি সেন্টার।’
সংগীতা দেরি করেনি। ইউনিভার্সিটি থেকে সোজা চলে এসেছে। ছ’টা পাঁচে।
‘কফিটা তো ঠান্ডা হয়ে গেল? তুমি খাচ্ছো না কেন?’ সংগীতা নিজের কফি শেষ করেছে অর্ধেকে।
অনির্বাণ আত্মমগ্নতা ভেঙে কফিতে চুমুক দেয়। সত্যিই কফিটা ঠান্ডা হয়ে গেছে। এক সময় ব্ল্যাক কফি আর লেখক বন্ধুদের টানে প্রতি শনিবার তাড়াতাড়ি কোচিং সেরে ছুটতো কফি হাউসে। ফিরত আড্ডা দিয়ে রাত ন’টা। সেই সব স্বপ্নময় উষ্ণস্বর্ণ দিনগুলি ফুরিয়ে গেছে দশ বছর আগে। ঠান্ডা কফি নিয়েই চুপচাপ বসে থাকে। সংগীতার প্রশ্নের উপযুক্ত জবার এখনও পাচ্ছে না।
তুমি নিশ্চয় জানো, সংগীতা বলে, ‘রবি ঠাকুরের অনেক লেখায় যৌনতা আছে, ল্যাবরেটরি, রবিবার। আচ্ছা রবি ঠাকুরের কথা ছাড়ো। বুদ্ধদেব বসু, সমরেশ বসুর গল্পে যৌনতা আছে। আরও যদি পিছনের দিকে যাও, মহাভারত আর তুমি এই সময়ের লেখক। তোমার কোন গল্পে যৌনতা থাকবে না?
সংগীতার প্রশ্নের জবাব তাকে দিতেই হবে। একজন লেখক হিসেবে সে চুপচাপ কফি নিয়ে বসে থাকতে পারে না। শিরদাঁড়া সোজা করে ঠান্ডা কফির মগটা টেবিলে রাখে। বুক পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরায়।
‘আমাকে একটা দাও।’ সংগীতা হাত বাড়ায়।
‘কবে থেকে খাচ্ছিস?’
‘ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে অভ্যাসটা ধরলাম।’
একটা সিগারেট বাড়িয়ে দিয়ে অনির্বাণ বলে, ‘লেখায় যৌনতা থাকেতই হবে।’
অনির্বাণকে অভিভাবকের সুরে থামিয়ে দিয়ে সংগীতা বলে, ‘তোমার লেখায় মানবিক সম্পর্ক আছে। মনের জটিলতা আছে, বিপন্নতা, অসহয়তা সবই আছে। কিন্তু আমি মনে করি মানুষের সব সম্পর্কের কেন্দ্র বিন্দুতে যৌনতা কাজ করে।’
অনির্বাণ মূক মানুষের মতো সংগীতাকে দেখে। সুন্দর ফেমের চশমার আড়ালে ওর চোখ দু’টো বড্ড মর্মভেদী। অনির্বাণ বলে, ‘আমি মনে করি সব সম্পর্ক টিকে থাকে প্রেমে।’
সংগীতা পাকা নেশারুর মতো সিগারেট টানছে। ‘হ্যাঁ প্রেম আছে। কিন্তু তোমার গল্পে শরীর ছাড়া প্রেম। হয় নাকি? তুমি একটা গাড়ি কিনলে, তাতে তেল ভরলে না। গাড়ি চলবে? শরীর ছাড়া প্রেম, অন্ধকার ছাড়া আলো, তুমি কি করে ব্যাখ্যা করবে?’
অনির্বাণ পাল্টা যুক্তি দেয়, ‘আমি মনে করি শরীর ছাড়া প্রেম হয়।’
সংগীতা সুতীক্ষ্ন কণ্ঠে বলে, ‘এই সভ্যতা দাঁড়িয়ে আছে যৌনতার ওপর। এই যে সারাদিন মানুষ ছুটছে, কাজ করছে, লড়াই করছে, তার প্রেরণা বলো, উৎস বলো সবই যৌনতা।’
অনির্বাণ বিভ্রান্ত। তার চিন্তা ভাবনায় ভাঙন ধরছে। তবু সে গলায় লেখকের আত্মপ্রত্যয় রেখে বলে, ‘তুই কি দাম্পত্য যৌনতার কথা বলছিস? সে তো আছেই। তাকে লেখায় আনতে যাবো কেন?’
‘কিছু খাবরেরর অর্ডার দাও। বড্ড খিদে পেয়েছে।’
খাবারের অর্ডার দিয়ে অনির্বাণ বলে, ‘বল এবার।’
‘তুমি জানো রবীন্দ্রনাথের বাবা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের কতগুলি সন্তান?’
‘১৫টা, তার জন্য আমরা রবীন্দ্রনাথকে পেয়েছি।’
তা ঠিক। উনি মহর্ষি। বার বার ছুটে গেছেন হিমালয়ের কাছে। আবার তিনি স্ত্রীর কাছেও ছুটে এসেছেন। যৌনতা ছাড়া তার হিমালয় দর্শন পূর্ণ হতো না। হিমালয়ের অপার সৌন্দর্য যৌনতার কাছে নতজানু হলো।’ সংগীতা থামল, চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলল, ‘তুমি নিজে বলেছো, তোমারা পাঁচ ভাই তিন বোন। তোমার বাবা পূর্ববঙ্গ থেকে ১৯৪১-এ এসেছেন। অনেক লড়াই করেছেন। ওনার এই লড়াই-এর পিছনেও কাজ করেছে যৌনতা। যদি উনি একক জীবন যাপন করতেন, তখন এই তীব্র লড়াইটা করতেন না। যৌনতাই সব সম্পর্ক ধরে রাখে। আজকের অনেক দাম্পত্য সম্পর্ক পাতলা কাঁচের মতো ভেঙে যাচ্ছে।’
অনির্বাণের অস্বস্তি হয়। বলে, ‘সব সম্পর্ক ভেঙে যাবার পিছনে কি যৌনতা দায়ী?’
সংগীতা সিগারেট শেষ করে ফেলেছে। চুলের লাক সরিয়ে বলে, ‘বেশির ভাগ। এই যে এত ধর্ষণ হচ্ছে, বলা হচ্ছে বিকৃত মানসিকতা। না, এতটুকু না। একটা সুস্থ মানুষও ধর্ষণ করছে। কেন? না, তার মানসিক শক্তির থেকে তাকে বেশি নিয়ন্ত্রণ করছে যৌনতা। যৌনতা একটা সাংঘাতিক বিভৎস মাদক। মানুষকে তুমি সব নেশা থেকে সরাতে পারবে যৌনতা থেকে নয়, সেই যৌনতার কোন ছায়া থাকবে না তোমার কোন লেখায়?’
আলো ঝলমলে কফিশপে বসে অনির্বাণের চোখ দু’টো বোঁ বোঁ করে ঘুরতে থাকে। সংগীতা এসব কি বলছে! অবশ্য মিথ্যে কিছু বলছে না। দিন দিন ধর্ষণ বিভৎস রূপ নিয়ে দেখা দিচ্ছে কাগজে সংবাদে।
‘কি গো খাবার তো এলো না? সেই কোন সকালে ইউনিভার্সিটিতে গেছি, এখন আটটা বাজতে চলল, খিদেয় আমার পেট ফেটে যাচ্ছে।’
অনির্বাণ উঠতে যাচ্ছিল, তখনই বয়টি খাবার সার্ভ করল।
সংগীতা ক্ষুধার্ত মানুষের মতো খাওয়া শেষ করে বলল, ‘একি তুমি তো খেলে না?’
‘খাবো। দেখছিলাম, প্রচণ্ড খিদে পেলে কেমন করে খায় মানুষ!’
‘তোমাকে আরও অনেক কিছু দেখতে হবে। এবার একটা কফি বলো। তোমার কাছে আর একটা সিগারেট হবে?
‘তুই তো বেশ সিগারেট খাস।’ অনিচ্ছা সত্ত্বেও একটা সিগারেট এগিয়ে দিল অনির্বাণ।
সংগীতা একটু মৃদু হাসে, সিগারেট ধরায়। তারপর মুহূর্তে গলার স্বর পালটে বলে, ‘আমি মনে করি মানুষ মূলত বাঁচে যৌনতার জন্য। বিশেষ করে পুরুষ মানুষ। আচ্ছা একটা সত্যি কথা বলবে? তোমার জীবনে কী কোন যৌন অভিজ্ঞতা হয়নি? জানি তুমি বিয়ে করোনি।’
‘কেন একথা বলছিস?’
‘পঁচিশটা গন্ধ। এতটুকু যৌনতা নেই কোথাও। হয় তোমার যৌন অভিজ্ঞতা হয়নি। না হলে বিষয়টা তুমি এড়িয়ে গেছো। এটা কিন্তু জীবন থেকে পালানোর মতো।’
‘তোর তো বয়ফ্রেন্ড আছে। আমি যদি জানতে চাই তোর এই অভিজ্ঞতা হয়েছে কি না?’
‘আমার কথা ছাড়ো। আমি তো লিখছি না। তোমার কথা বলো।’
অনির্বাণ আজ এক কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াল। সে একজন শিক্ষক, তারই ছাত্রী তাকে প্রশ্নটা করছে। কিন্তু কফিশপে তারা এখন লেখক পাঠক। লেখক তার উত্তর দেবে কি না সেটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু সত্যটা কি এড়িয়ে যেতে পারে?
তখন তার বয়স উনিশ বা কুড়ি হবে। কো-এড কলেজে পড়ছে। বাংলাটা ভালো লিখতো ম্যাডাম তার খাতা দেখে ক্লাসে নোটস দিত। সেই সূত্রে অনেক মেয়ের সঙ্গেই তার বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। স্বপ্নার সঙ্গে অন্তরঙ্গতা ছিল বেশি। একবার টানা সাতদিন কলেজ গেল না। অসুস্থ। সে ঠাকুমার কাছে থাকত। তার বাবা মা ভাই বোনেরা থাকত ফ্ল্যাট বাড়িতে। বছরে একবার করে তার জ্বর হত। জ্বর হলে সে ফ্ল্যাট বাড়িতে চলে যেত। সেবার যায়নি। ঠাকুমা গেছে রাধা গোবিন্দর মন্দিরে, তার সুস্থতার জন্য পুজো দিতে। সে ঘরে একা। দুপুর বেলা। হঠাৎ ভূত দেখার মতো চমকে ওঠে সে। স্বপ্না তার সামনে দাঁড়িয়ে। স্বপ্না তার ঠিকানা জানত। কিন্তু এভাবে চলে আসবে, ভাবেত পারেনি। অর্নিবাণ তপ্ত গলায় সে বলেছিল, ‘তুই!’
‘থাকতে পারলাম না তোকে না দেখে, চলে এলাম।’
সেদিন কথাটা শুনে তার খুব ভাল লেগেছিল। একটা মেয়ে অন্তত তার অনুপস্থিতি সহ্য করতে না পেরে চলে এসেছে। একেই কি ভালবাসা বলে? কিংবা প্রেম? প্রেম আর ভালবাসা কি এক, না আলাদা? যাই হোক সে স্বপ্নাকে নিয়ে কফি হাউসে গেছে, সিনেমায় গেছে, আউটট্রামঘাট গেছে, দক্ষিণেশ্বরে নৌকাবিহার করেছে। এগুলো প্রেমের চিহ্ন কিনা তা নিয়ে সে কোনদিন ভাবেনি।
‘অসুখ বাধিয়েছিস নিশ্চয়?’
‘জ্বর।’
‘দেখি। স্বপ্না তার হাত রাখল আমার বুকে। জ্বর দেখে মানুষ কপালে হাত দিয়ে।
স্বপ্না কেন বুকে হাত দিল! ওর হাতটাও আগুন আগুন। বলেছিলাম, ‘স্বপ্না তোরও কি জ্বর হয়েছে?’
‘ধ্যাৎ। আমার জ্বর হতে যাবে কেন? জ্বর হলে আসতে পারতাম?’
‘দেখি তোর বুকে হাত রেখে?’
‘জ্বর কেউ বুকে হাত দিয়ে দেখে নাকি?’
‘এই যে তুই আমার বুকে হাত দিলি? আমি কেন তোর বুকে হাত দিতে পারবো না? মেয়েরা ছেলেদের বুকে হাত দিলে কোন দোষ নেই, ছেলেরা মেয়েদের বুকে…’
স্বপ্না বলেছিল, ‘অত কথা বলতে হবে না। নে দেখ।’
দু’টো বুকেই তখন আগুন জ্বলছিল। দাউ দাউ করে। সেই আগুন পোষক পুড়িয়ে নিরাভরণ করল দু’টো শরীরকে। সেই বহ্নি উৎসব চলল দশ কি বারো মিনিট। তারপর শ্মশানের মতো সব শান্ত। বাড়ির উঠোনে তিনটে কাক তখন ডাকছে। যেন তারা এই বহ্নি উৎসবকে স্বাগত জানাচ্ছে।
স্বপ্না শাড়ি, ব্লাউজ, চুল সব আগের স্থানে ফিরিয়ে নিয়ে ঠোঁটে পলাশ রং লাগাতে লাগাতে বলেছিল, ‘আমার কিছু টাকার দরকার। দে তো।’
‘তুই কি টাকার জন্য এসেছিস?’
স্বপ্না কোন উত্তর দেয়নি সেদিন। প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়েছিল সে। স্বপ্না টাকার জন্য শরীর দিল? তাহলে, প্রেম নয়, ভালবাসা নয়। খুব কষ্ট হয়েছিল তার। টাকা সে দিয়েছিল। তারপর স্বপ্না আর আসেনি। অনেক অনুরোধ উপরোধ করেছিল সে। স্বপ্না কর্ণপাত করেনি। সেই একদিনের আগুন তাকে পুড়িয়েছে প্রতিদিন।
‘কি এতো ভাবছো বলো তো?’ নতুন কফিতে চুমুক দিয়ে সংগীতা বলে, ‘কোন সত্য কি লুকানোর চেষ্টা করছো? তুমি নিশ্চয় জানো অনেক লেখকের প্রথম লেখায় তাদের জীবনের কথা অকপটে এসেছে। যেমন সুনীলের ‘আত্মপ্রকাশ।’
সংগীতার কথা ঠিক। সাহিত্যের ছাত্রী। পাঠ্য বিষয়ে বাইরে পড়াশুনা আছে। কখন এতো সময় পায় মেয়েটা? অনির্বাণ ভাবল যখন সে লেখালেখি শুরু করল, তখন তার কোচিং-এর নাম ছড়িয়ে পড়েছে। বাপীদার কোচিং। তার ডাক নাম বাপী। ব্যাচের পর ব্যাচ পড়ায়। আদর্শ শিক্ষকের জীবন যাপন করে। তার আসে পাশে যা দেখে, অনুভবে যা ধরা পড়ে, কিংবা কল্পনায় যা আসে তাকে শব্দের শরীর দিয়ে গল্প তৈরি করে। তার জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, বিশেষ করে যৌনতা নিয়ে সে কোনদিন একটি শব্দও খরচ করেনি। কেন করল না? যৌন অভিজ্ঞতা তো তার জীবনে ছিল। সেই দিনের পর স্বপ্নার জন্য তার অসহ্য যন্ত্রণার মধ্যে দিন গেছে। কই কখনও মনে হয়নি এটা নিয়ে গল্প লেখা যায়? সে কি সাহসের অভাব? নাকি আদর্শ শিক্ষকের পদস্খলন ঘটবে এই ভয়ে!
অনির্বাণকে গাছের মতো নির্বাক বসে থাকতে দেখে, দ্বিতীয় সিগারেটটা শেষ করে সংগীতা বলে, ‘তুমি তো আমাদের কাছে অনেক খোলামেলা। আমার প্রশ্নে তুমি একটু অস্বস্তিতে পড়েছে না?’
অনির্বাণ প্রবলভাবে মাথা নাড়াতে গিয়েও পারে না, আমতা আমতা করে বলে, ‘সেভাবে কোনদিন বিষয়টা নিয়ে ভাবিনি?’
‘তবে তোমার গল্পে পজিটিভ দিক আছে।’ সংগীতা বলে, ‘শুরুটা তোমার খুব ভালো। পাঠককে টেনে ধরেত পারো। গল্পের গতি খুব সাবলীল। একটা ফিলজফি এস্টাবিলিশ করার চেষ্টা কর, সেটা বেশ ভালো। কিন্তু সব মানুষের জীবনে কি ফিলজফি থাকে? মানুষের জীবন তো কতগুলি ঘটনার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা বৃতান্ত?’
‘নিছক বৃতান্ত তো সাহিত্য নয়। ফিলজফি থাকবেই। সেটা প্রচ্ছন্নভাবে থাকলেই ভালো।’
‘তোমার গল্পে মানুষের স্বার্থপরতা, হিংস্রতা, বিপন্নতা দারুণ এসেছে। এই বিষয়গুলি কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করে যৌনতা। তার এতটুকু ইঙ্গিত নেই গল্পে।’
অনির্বাণের মেরুদণ্ড বেয়ে একটা যন্ত্রণা উঠে আসছে। কিসের যন্ত্রণা সে বুঝতে পারল না। তবু বলল, তা ঠিক। সেই কারণেই তো তোকে পড়তে দিয়েছিলাম।’
সংগীতা হাসে, উঠে দাঁড়ায়, টি শার্ট ঠিক করে। হাত ঘড়ির দিকে তাকায়, ‘বাড়ি ফিরতে হবে। দেরি হলে মা চিন্তা করবে। তুমি একটা ট্যাক্সি ডাকো। আমাকে উল্টোডাঙ্গা নামিয়ে দিয়ে তুমি চলে যাবে বাগুইআটি।’
।।দুই।।
অনির্বাণ ট্যাক্সির সামনের সিটে বসতে যাচ্ছিল। সংগীতা নরম গলায় বলল, ‘সামনে কেন, পিছনে এসো।’
‘এখানেই ঠিক আছি।’
‘পিছনের সিটে একা বসলে মনে হবে বিলাসিতা করছি। আমি কখনও একা ট্যাক্সিতে উঠি না। ভয়ে নয়। সামর্থ নেই। ভাড়াটা তুমি দেবে। তাই পিছনে এসে বসো।’
সংগীতার অদ্ভুত যুক্তি মন্ত্রে দুর্বল হয়ে দরজা খুলে পিছনের সিটে চলে এলো অনির্বাণ। দু’জনের মাঝে সামান্য দূরত্ব থাকল। গাড়ি চলছে। সংগীতা চুল ঠিক করছে। গরম লাগছে বোধহয়, টি শার্টের একটা বোতাম নির্দ্ধিয়ায় খুলে ফেলল, স্তন উপত্যকা সামান্য উকিঁ দিল। ব্যাগ থেকে কি একটা বের করে খুলে দিল।
‘কি খেলি?’
‘চুইন্‌গাম। মুখে সিগারেটের গন্ধ পেলে মা বলবে, আবার নেশা করছিস।’
‘ঠিকই তো বলে। ইউনিভার্সিটি গিয়ে কি মাথাটা ঘুরে গেল?’
‘না, না। কলেজ লাইফেই নেশা শুরু হয়। এখন বেড়েছে।’
‘কেন?’
‘আসলে আমার যখন যন্ত্রণা হয় তখন খুব সিগারেট খেতে ইচ্ছে করে। ইদানীং ব্যাগেও রাখি দু’চারটে। আজই নেই।’
‘সেই যে মাথার যন্ত্রণা। পিজিতে তো অনেকদিন চিকিৎসা করালি। কমেনি?’
‘কমেছে। এটা মাথার নয়, বুকের যন্ত্রণা।’
‘অনির্বাণ একটু অবাক হয়। বলে, ‘কিসের যন্ত্রণা তোর? দেখে তো কোনদিন মনে হয়নি। বলিসও নি। তোর বয়ফ্রেন্ড কেমন আছে? ও কি কলেজে পড়াচ্ছে?’
সংগীতা নির্মোহ গলায় বলে, ‘পড়াচ্ছে।আমিও একটা কোচিং-এ অনার্সের ক্লাস নিচ্ছি। নিজের টিউশন, ইউনিভার্সিটির ক্লাস, সময় দিতে পারছি না।’
‘কিন্তু প্রেমের জন্য তো সময় দিতেই হবে। প্রেম শরীর মন সব ঠিক রাখে।’
তবে তুমি স্বীকার করছো প্রেমের পিছনে শরীর আছে?’
শরীর মানে কিন্তু যৌনতা নয়।
সংগীতা জোর দিয়ে বলে, ‘শরীর ছাড়া যৌনতা হয়ও না।’
‘ছাড় ওসব কথা। তোর বয়ফ্রেন্ডের নাম তো বাবাই। তার সঙ্গে সম্পর্ক আছে তো?’
সরাসরি সে কথার জবাব না দিয়ে সংগীতা বলে, ‘ও আমার সমবয়সী। আমার একটু এজেড পুরুষ পছন্দ।’
অনির্বাণ চমকে গিয়ে বলে, ‘বুড়োকে বিয়ে করবি নাকি?’
‘এজেড মানে কি বুড়ো?’
অনির্বাণ বলে, ‘তুই একটু ব্যাখ্যা করতো ব্যাপারটা।’
ট্যাক্সির হালকা অন্ধকারে সংগীতা একটা রহস্যময় হেসে উঠলো, ‘আমার থেকে ১০।১২ বছরের বড় পুরুষ আমার পছন্দ।’
‘কেন?’
‘সে আমাকে খুব খুব ভালোবাসবে। আমিও তার উপর নির্ভর করতে পারবো। একটা নিশ্চিত আশ্রয় পাবো। সে আমার কথা শুনে চলবে। আমার শ্বাসপ্রশ্বাসে তার বাঁচামরা ওঠা নামা করবে। তবেই না বুঝবো আমার মেয়ে জীবনের কোথাও একটা মূল্য আছে।’
‘সমবয়সী হলে বুঝি এমনটা হবে না?’
হচ্ছে কই, দেখলাম তো কয়েক বছরের সম্পর্কে। পরস্পরের বোঝাপড়াটাই হয় না। মাঝখান থেকে যন্ত্রণা উঠে আসে।
অনির্বাণ বুঝতে পারছে সংগীতার ভিতর সত্যিই একটা যন্ত্রণা আছে। বাইরে থেকে এতটুকু আঁচ পাওয়া যায়নি।
ট্যাক্সি বাইপাসের রাস্তা ধরে ছুটছে। আগে পিছনে অগুণিত গাড়ি। তাদের গাড়ির ভিতর স্বল্প আলোয় সংগীতাকে অন্য মেয়ে মনে হচ্ছে। বিশ্বাস হচ্ছে না এই সংগীতাকে সে পাঁচ বছর পড়িয়েছে!
সংগীতা ব্যাগ থেকে রং বের করে টিয়া পাখির মতো লাল করে ঠোঁট। যেন ঠোঁট বিপ্লবের রং। বলে, ‘আমি নিছক যৌনতা বা যাকে পর্ণগ্রাফি বলে তার কথা বলতে চাইনি। যে যৌনতা মানুষের জীবনচক্রে সক্রিয়। মানুষ যৌনতার জন্য লড়াই করে। হিংস্র হয়, বিপন্ন হয়, মৃত্যুকে পর্যন্ত তুচ্ছ করে। আবার জীবনকে কাঙালের মতো ভালোবাসতে শেখায়। এক কথা মানুষের অস্বস্তিকে জড়িয়ে যে যৌনতা তাকে তুমি গল্পে আনো।’
অনির্বাণকে কোন কথা বলতে না দিয়ে পিয়ারলেস ব্রিজের কাছে ট্যাক্সি থামায় সংগীতা। নেমে বলে, ‘আসি।’
একটা ঘোরের মধ্যে অনির্বাণ বলে, ‘আয়।’
ট্যাক্সি ব্রিজের ওপর ওঠে।
অনির্বাণ সোজা হয়ে বসে। বুকের ভিতর একটা নিঃশ্বাস চেপে ছিল। সেটা বের করে দিয়েও স্বস্তি পাচ্ছে না। সংগীতা তো কথাগুলো মিথ্যে বলেনি। স্বপ্না তো তাকে বিপন্ন করে চলে গিয়েছিল। রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। একদিন সে একটু ভয়, একটু সাহস নিয়ে চলে গেল। যৌনপল্লিতে। বার বার মনে হয়েছে, এভাবে বাঁচাটা তীব্র যন্ত্রণার। বিয়ে করলেই হয়। কিন্তু দাদা বিয়ে করেনি। বোনের বিয়ে হয়নি। ঘরের প্রবলেম। সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা টিউশন পেশাটি নিয়ে। বেশ কয়েক দিন যৌনপল্লিতে গিয়ে ফিরে এসে স্নান করত। ঠাকুমা বলত, ‘এত রাতে চান করিস ক্যান বাপী। জ্বর হইবো। হলো জ্বর। এরপর এলো রুমা। সে শরীরের উপরের অংশ দিয়ে যৌনতার অর্ধেক পর্দা খুলত। তখন যৌনতার চেয়ে বেশি ভালোবাসার কাঙাল হয়ে পড়েছিল সে। সে জানত ভালোবাসা থাকলে শরীর একদিন যৌনসুখের বৃষ্টি দেবেই। কেন যে রুমা এক বছরের সম্পর্কের ইতি টেনে এক হাইকোর্টের উকিলকে বিয়ে করে উত্তরবঙ্গ চলে গেল। তখন তার মনে হয়েছিল, তার বাঁচা মরা নারীর হাতের পুতুল। কই এসব নিয়ে তো সে লেখার কথা ভাবেনি? কেন? অশ্লীলতা প্রকট হয়ে উঠবে? জীবনে ঘটতে পারলে লেখায় আসবে না কেন? ভয়, অস্বস্তি নাকি শিক্ষকের মুখোসটা খুলে যাবে এই আতঙ্ক!
বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছে অনির্বাণ। সংগীতাই তাকে বিভ্রান্ত করে গেল। বাঙুর এ্যাভিনিউ পেরিয়ে ট্যাক্সি ছুটছে। অনির্বাণ একটা সিগারেট ধরায়। রাস্তার দিকে তাকায়। আগের থেকে বেশি আলো ঝলমলে পরিবেশ। লন্ডন ঘড়ি একটু আগে পেরলো। কলকাতার লন্ডন হবে। কবে হবে জানে না অনির্বাণ। এই মুহূর্তে সিগারেটের ধোঁয়ার ভিতর স্পষ্ট হয়ে উঠল রূপা বৌদির মুখ। কোন লাবণ্য নেই মুখে। মাংস নেই শরীরে। এক ছেলের মা। সেই ছেলেকে পড়ায় অনির্বাণ। বেঙ্গল বোর্ড মিলের ফ্যাক্টরিতে চাকরি করেন রূপা বৌদির বর। ফ্যাক্টরি কোয়াটারে তারা থাকে। ছেলেকে পড়ার শেষে গল্প। হাত ছোঁয়াছুয়ি। তারপর একদিন শরীর বিনিময়। এরপর নিয়মিত। যখন তখন ডেকে পাঠাত। ছেলেকে দিয়ে। স্বামী ঘরে প্রায় থাকতই না। ইউনিয়নের লিডারও বটে। তার কত ব্যস্ততা। একদিন অনির্বাণের ঘেন্না ধরে গেল। সে পড়াতে যাওয়া বন্ধ করে দিল।
রূপা বৌদি এসে হাজির তার ঘরে। ‘তুমি পড়াতে যাচ্ছো না কেন?’
‘আমার সময় হচ্ছে না।’
‘নাকি সম্পর্ক রাখতে চাইছো না?’
অনির্বাণ সাহস নিয়ে সত্যি কথাটাই বলেছিল, ‘ঠিক তাই।’
রূপা বৌদির গলায় দৃঢ়তা, ‘এখন তা হবে না। প্রথম দিকে তোমার ভাবা উচিত ছিল। আমার স্বামী লোকাল কমিটির মেম্বার। তাকে বলে দিলে তুমি কিভাবে এখানে থাকবে, কোচিং করবে ভেবে দেখেছো একবার?’
‘তুমি বলতে পারবে এসব কথা তোমার স্বামীকে?’ খুব বিপন্ন আহত কোন প্রাণীর মতো কথাটা বলেছিল অনির্বাণ।
‘কিভাবে কতটা কি বলতে হবে আমি জানি।’
ট্যাক্সির ভিতর বিশুদ্ধ হাওয়া আসছে। আজ এখন অনির্বাণের মনে হচ্ছে, রূপা বৌদির হুমকি, কর্তৃত্ব, মিথ্যে বলা সবই তো যৌনতার জন্য। কেন সে তার গল্পে নিয়ে এলো না এসব? কি সব বানিয়ে বানিয়ে সে এতদিন গল্প লিখল? অবশ্য গল্প বানাতে হয়। সব লেখকই বানায়। তা হলেও নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা, ঘটনাকে তো একটু এদিক ওদিক করে লেখায় আনা উচিত ছিল!
কেন যেন ট্যাক্সির ভিতর ঘামতে থাকে অনির্বাণ। অস্থির লাগে। সিগারেট ফেলে দেয়। বুক পকেটে হাত দেয়। কলমটা হাতে নিয়ে ভাবতে থাকে কিছু গল্প তো এই কলম দিয়ে লিখেছে। আর কি দরকার আছে এই কলমটার?
ফোনটা বেজে ওঠে হঠাৎ।
অনির্বাণ স্ক্রিনে দেখে সংগীতা।
‘হ্যাঁ বল। তুই বাড়ি পৌঁছে গেছিস?’
‘কখন। খাওয়াও হয়ে গেছে। এখন বিছানায় শুয়ে তোমাকে ফোন করছি। মন দিয়ে শোন। আমাদের ছোট্ট ঘরটা তুমি দেখেছো? চৌকিতে আমি দাদু, ঠাকুমা আর বোন শুই ঠাসাঠাসি করে। মেঝেতে মা বাবা। একদিন হঠাৎ একটা চাপা কান্নার শব্দে আমার ঘুমটা ভেঙে গেল। কে কাঁদছে এত রাতে? আলোটা জ্বালিয়ে দেখলে হতো। তার আগে আমি স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, মা কাঁদছে। মা কাঁদছে কেন? তখনই বাবার গলার শব্দ শোনা গেল, ‘ঐ ডাক্তার সাহাই আমার সর্বনাশ করেছে।’ মা কাঁদতে কাঁদতে বলছে, ‘তখন থেকে তোমাকে বোঝাতে চেষ্টা করছি, ডা. সাহা আমাকে বাঁচিয়েছে। সর্বনাশটা কোথায় করল?’ বাবা বলল, ‘কেন শুধু টিউমারটা বাদ দিলেই তো হতো। উনি জরায়ু বাদ দিতে গেল কেন?’ মা জানাল, ‘জরায়ু বাদ না দিলে ক্যানসার হতে পারে। আমার ক্যানসার হলে তুমি খুশি হতে?’ বাবা রেগে গেল, আমার সুখটা কে দেখবে? এই যে তোমার ইচ্ছে করছে না। মাত্র চল্লিশ বছর বয়সে এমনটা তো হতো না যদি জরায়ু থাকত, আমি কতদিন এভাবে উপোষ করে চলব? মা বিপন্ন গলায় বলে, ‘তোমার কাছে আমি ক্যানসারের যন্ত্রণা নিয়ে তিল তিল করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাই, তবু তোমার সুখ চাই। এতদিন যে সুখ দিলাম, দু’টো সন্তান দিলাম, সংসার করলাম, এগুলোর কোন মূল্য নেই?’
বাবা চাপা গলায় ক্ষোভ প্রকাশ করে, ‘এসব ন্যাকা ন্যাকা কথা রাখ। এখন বলো আমি কি করবো?’
মার কান্না হঠাৎ থেমে গেল, ‘আমি তোমার যৌন সঙ্গী শুধু? তুমি আমায় এতটুকু ভালোবাসোনি?’
বাবা বলল, ‘তুমি সুখ দিতে পারবে না, ভালবাসা চাইবে তা হয় নাকি!’
তুমি আমার কথা পরিষ্কার শুনতে পারছো তো?
সংগীতার কথায় অনির্বাণ বিস্মিত গলায় বলে, ‘শুধু স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি নয়, ছবিটা দেখতেও পাচ্ছি। তারপর?’
‘তারপর আবার কি? আজকাল বাবা আগের মতো সংসারে টাকা দেয় না। দাদু এখনও বাজারে সবজি বেচে। দাদু টাকা দিচ্ছে। বাবা, মায়ের সঙ্গে তেমন কথা বলে না। আমরা দু’চারটে আবদার করলে মুখ করে। যেন আমরা ওনার মেয়ে নয়। রাতে ক্লাবে গিয়ে শোয়।’
‘আর মা?’ অর্নিবাণ প্রশ্ন করে।
‘মা শুধু গোপনে কাঁদে। আমি তো আর জিগ্যেস করতে পারি না, তুমি কেন কাঁদছো মা? সব তো বুঝি। মার তো কোন দোষ নেই। অসুখ হলে একটা মানুষ সুস্থ হবার জন্য যা করে মা তাই করেছে। অন্যায়টা কোথায়? একটা পুরুষের (হোক স্বামী) সারা জীবনের যৌন ক্ষুধা মেটাতে ক্যানসারের মতো মারণ ব্যাধি ধারণ করবে জঠরে?
অনির্বাণ চুপ করে থাকে।
‘হ্যালো তুমি শুনতে পারছো?’ সংগীতা বলে।
‘আমি শুনে স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছি।‘
‘একটু রাত হয়েছে। তবু তোমাকে ফোন করছি। নিজের ঘরে শুলে করতে পারতাম না। রুকিনীদির ঘরে শুয়ে। ওর মা গেছেন বৃন্দাবন। রুকিনীদি ওর বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে কথা বলছে। যে কথা বলছিলাম, জানো মা এখন কি করে?
অনির্বাণ শব্দ করে না।
‘শুনছো তো; মা এখন সংসারের সব কাজ করে যখনই পারে পাড়ার রাধা গোবিন্দ মন্দিরে চলে যায়। কি করবে বল? এতদিন স্বামীই ছিল তার আশ্রয়। এখন কৃষ্ণকে আঁকড়ে ধরে নিজের যন্ত্রণা, কষ্ট আর বিপন্নতা ভুলতে চাইছে। তাই তোমাকে বলছিলাম, লেখায় যৌনতা নেই কেন?’
অনির্বাণ বলে, ‘আমি তো এই জীবন দেখি নি। এই মানুষদের সঙ্গে পরিচয় হয়নি।
‘তুমি আমার বয়ফ্রেন্ডের কথা বলছিলে না? ওর সঙ্গে এখন আমার কোন সম্পর্ক নেই।’
‘কেন? কি হয়েছে? অনির্বাণ বুঝতে পারছে সে আজ এক গোপন ভুবনে ঢুকে পড়ছে।
‘ও লিভ টুগেদার চাইছিল।’
‘আজকাল অনেকেই এই সিস্টেমে থাকছে।’
‘জানি। কিন্তু আমি এতে বিশ্বাসী নই। আমি বস্তির মেয়ে। খুব সাধারণ আমাদের পরিবারে কাছে বিয়ে মানে একটা পবিত্র বন্ধন। রিচুয়েরিতে আমি বিশ্বাস করি।
‘তা তুই বিয়ের কথা বলিস নি?’
‘বলেছি তো! ও বলল, তুমি তো জানো আমার চাকরিটা অস্থায়ী। কোন নিশ্চয়তায় আমি সংসার গড়বো। আমি বলেছিলাম, লিভ টুগেদার তো একটা অস্থায়ী সম্পর্ক। কোন ওবলিগেশন নেই। ইচ্ছে হলে থাকো, না হলে চলে যাও। ও বলল, হ্যাঁ ঠিক তাই। আমি বললাম, তাহলে ভালোবাসা? ও বলল, ভালবাসা হল এই শরীরটা আর যে কঙ্কালের ওপর এই শরীরটা দাঁড়িয়ে আছে সেটা আসলে যৌনতা। তাই ভালবাসা যৌনতা ছাড়া হয় না।
কান থেকে মোবাইলটা নামিয়ে সিটের পাশে রেখে স্পিকার অন করল অনির্বাণ। এতক্ষণ কানে ধরে রেখে হাতে ব্যাথা হচ্ছে। শুধু ব্যাথা, আর যন্ত্রণা, গাড়ি চলছে। জানালা দিয়ে হাওয়া আসছে। আকাশ দেখছে। অন্ধকারে বিন্দু বিন্দু তারারা জ্বলছে নিভছে, নিঃসঙ্গ চাঁদ একা একা সরে যাচ্ছে। পৃথিবী ঠিক আছে। যেমনটা আগে ছিল, শুধু মানুষের সম্পর্কগুলোর রং পালটে যাচ্ছে। সে বুঝতে পারছে তার কপালে ঘাম হচ্ছে। সত্যি জীবনের এই দিকগুলো তার দেখা হয়নি। কিন্তু নিজের যৌন সম্পর্ক সে রক্তে অনুভব করেছে। অস্তিত্বের বিপন্নতা অনুভব করেছে শিরায় শিরায়। তবু কেন তার গল্পে সে কাহিনি স্থান পায়নি? এও এক ধরনের কাপুরুষতা, ভণ্ডামি।
‘হ্যালো? ফোনটা ছেড়ে দিলে নাকি?’
ফোনটা হাতে তুলে অনির্বাণ বলে, ‘ছাড়িনি’।
‘রাস্তায় কি জ্যাম ছিল নাকি?’
‘তা ছিল একটু। একটা পাম্পে আবার তেল নিল। হিসি করতে গেল ড্রাইভার।
সংগীতা হাসল, ‘বলছি গল্প লেখার হাত আছে তোমার। তুমি এসব বিষয় নিয়ে লেখ। তুমি কোচিং করো আর ঘরে বসে বসে বানিয়ে গল্প লেখ।’
গল্প বানাতে হয়। সবাই বানাই। তবে গল্পের পা থাকে মাটিতে। অর্থাৎ অল্প হলেও আমি চরিত্রগুলো কিছু মাত্র দেখেছি।’
‘আরও আরও মানুষকে দেখতে হবে তোমায়! বেরিয়ে পড়। তুমি তো একা মানুষ। মুশাফির হও। একটা কথার জবাব দেবে? আচ্ছা বলতো এই পৃথিবীতে বিপন্ন কোন প্রাণী?’
‘তুই বল।’
মেয়েরা। শুধু বিপন্ন নয়, সংখ্যায় তারা কমে যাচ্ছে। প্রতিদিন কন্যাভ্রুণ হত্যা হচ্ছে। যে যৌনতার জন্য পুরুষ বেঁচে আছে। একদিন দেখবে যৌনতার মুঠি রুখাসুখা। তখন বুঝবে তার লড়াই, বেঁচে থাকা সব অর্থহীন।
অনির্বাণের ভাবনায় এসব এসেছে। সেভাবে গল্পে আনে নি কেন সে?
‘হ্যালো বাগুইআটি পৌঁছে গেছো?’
‘বাড়িতে ঢুকে পড়েছি।’
‘এখন ঘুম আসছে না, তাই তোমাকে আরও একটা ঘটনার কথা বলবো, তুমি এখন শুয়ে পড়বে? প্লিজ একটু জেগে থাকো!’
অনির্বাণ বলে, ‘খাওয়া ঘুম এগুলো পুরনো হয়ে গেছে। তুই তো নতুন কিছু বলবি? সংগীতা বলে, জানি না, এগুলো নতুন কি না? আমাকে যন্ত্রণা দিচ্ছে। তাই তোমাকে বললাম।’
লেখার টেবিলে এসে বসে অনির্বাণ। মোবাইলটার স্পীকার অন করে রেখে একটা সিগারেট ধরায়।
‘এখন আমার ইউনিভার্সিটির এক দাদার সঙ্গে সম্পর্ক। ওর নাম কৃত্তিবাস। ও কবিতা লেখে। একটা কাব্যগ্রন্থ আছে। তার নাম ‘আত্মারা কথা বলে।’ কবিতাগুলি ভালো। বেশির ভাগে কবিতায় আত্মার কথা আমি একদিন প্রশ্ন করি, ‘তুমি আত্মায় বিশ্বাসী?’ ও বলল, অবশ্যই, আমি বুদ্ধ নই, কৃত্তিবাস, শরীরটা তো একটা খোলস। একদিন পুড়ে ছাইভষ্ম হবে। কিন্তু আত্ম! সে কোনদিন মরে না। সে বেঁচে থাকে। ঘোরাফেরা করে। কথা বলে। তা একদিন দেখলাম, একজন কবি যা লেখে তার নাইটি ডিগ্রি বিপরীতে সে অবস্থান করে। সবাই করে কি না জানি না।
‘কি রকম?’ অনির্বাণ জিগ্যেস করে।
‘একদিন একটা রেস্টুরেন্টে আমরা বসেছি। ও কিছু নতুন কবিতা শোনাচ্ছিল, তার মধ্যে একটা কবিতা খুব ভালো লাগল, নাম, ‘আত্মারা উড়ে বেড়ায়।’ কবিতা পাঠ চলছে। হঠাৎ কবিতা থামিয়ে কোন প্রস্তুতি সম্মতি ছাড়াই ওর ডান হাতটা আমার টি শার্টের ভিতর ঢুকিয়ে দিল।’
আমি তীব্র ঘৃণায় বলে উঠি, ‘একি করছো তুমি? তুমি তো শরীরে বিশ্বাসী নও। আত্মায় বিশ্বাসী।’
কৃত্তিবাস অম্লান হাসল, বলল, হ্যাঁ, ‘আমি সত্যিই আত্মায় বিশ্বাসী।’
‘আমি তীব্র বিতৃষ্ণায় বলি, তাহলে এটা কি করছো? হাতটা সরিয়ে নাও।’ কৃত্তিবাস কি বলল জানো, বলল, আত্মা বুকে থাকে। আমি সেটা ছুঁয়ে দেখতে চাইছে।’
হঠাৎ লাইন কেটে যায়। টাওয়ারের গণ্ডগোলে সংগীতাকে আর ছোঁয়া যায় না।
অনির্বাণ চুপচাপ বসে থাকে লেখার টেবিলে। সারাদিনের ক্লান্তিতে তার ঘুমিয়ে পড়ার কথা। কিন্তু রক্তের ভিতর সংগীতার যন্ত্রণা, পুরুষের যৌনতার কাছে তার মায়ের বিপণ্ণতা কবির ভণ্ডামি লেখকের কাপুরুষতা সব মিলেমিশে একটা উত্তজনার ঢেউ লাফিয়ে লাফিয়ে ছুটছে। আজ সারারাত ছুটবে। আরও অনেকদিন ছুটবে। যতদিন না এরা শব্দের শরীরে জায়গা পাচ্ছে।
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!