- 7
- 0
করছে,এতেই মোটামুটি বাড়িতে দেড়শো টাকা অর্থাৎ কলেজের প্রায় সব টাকাটাই বাড়িতে দিয়ে,ঐ ট্যুইশানির টাকায়,নিজের পড়াশোনার খরচ ও সহোদর-সহোদরাদের আবদার মেটানো চলছে।আবার,সেই বন্ধুর দোকানঘরে,বেলা দশটার পর দুপুর দেড়টা পর্যন্ত পড়াশোনা। বন্ধু তো,এনসেন্ট(Ancient History, হিস্টরিতে MAকরেছে;আধুনিক হিস্ট্রিতে এম এ না হলে ভালো স্কুলে মাস্টারি পাওয়া দুষ্কর,তাই সে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক র্ইতিহাসে (modern history) ক্লাস করছে;ঘরের তালারএকটা চাবি তো আগে থেকেই রাজীবের কাছে আছে।ভোর বেলা বাড়ি থেকে বেড়িয়ে, দুটো বাড়িতে ট্যুইশান করে, নটা-সাড়ে নটা নাগাদ,অঞ্চলের সরকার স্টোর্সের ভিতর বসে চা খায়। চা'র দোকানে,অনেক সময় স্থানীয় ছাত্ররাও চা খেতে আসে;পাছে,কেউই কোনো অস্বস্তিতে না ভোগে,তাই,ঐ সরকার স্টোর্সের মালিকের দোকানের ভিতর, আরো দু'জনের সঙ্গে বসে চা খায়।দোকানের মালিক,সরকারদা,মনু সরকার,স্থানীয় গার্লস স্কুলের ছাত্রীদের কাছে,তিন পুরুষের মনুদা; ছাত্রীদের,দিদিমা/ ঠাকুমা বলেছে মনুদা,ওদের মা'রা বলেছে মনুদা,আবার ওরাও বলছে মনুদা;স্কুলের সময় পেরিয়ে গেলে, খদ্দের আসার সম্ভাবনা কম,হাতে অফুরন্ত অবসর;হাসতে হাসতে বলে,''আমার বউও কখনও কখনও মনুদা বলে ফেলে ; কে, কে,চা খাবে বলে ,"কেটলিটা হাতে নিয়ে ভিতরে বসা লোকেদের মুখের দিকে চায়;কেউ না কেউ,মনুদার হাতে টাকা গুঁজে দেয়; মনুদাও অমনি কেটলি হাতে সাইকেলে চেপে,স্থানীয় নামকরা চা'র দোকান,পচু'র চা'র দোকান, অভিমুখী হয়। চা এনে,সকলের হাতে চা'র ভাড় দিয়ে, নিজের গ্লাসে চা ঢেলে,এবার গল্পের ঝাঁপি খুলে বসে। না,রাজীবের এত সময় নেই,চা খেয়ে,সে ঐ পড়ার দোকানের তালা খুলে ,পড়ায় মনোযোগ দেয়;অবশ্য,কখনও কখনও,মনুদার গল্পের ঝাঁপিতেও অংশ গ্রহন করে ।
নৈশ বিভাগের ইন-চার্জ,কলেজের ভাইস-প্রিন্সিপাল মশাই; শরীর খারাপ হওয়ায়,হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। কলেজের গভর্নিং বডি,বিভাগের সিনিয়র অধ্যাপক,রমাকান্তমশাইকে দায়িত্ব নেবার জন্য অনুরোধ করে চিঠি দিয়েছে। দিনের বেলার অনেক অধ্যাপকমশাইরা,নৈশ বিভাগেরর পার্ট-টাইম অধ্যাপক।বর্তমান অস্থায়ী ইন-চার্জ,অধ্যাপক,রমাকান্ত মশাই স্থানীয়;রাজীব ও উনি একসঙ্গে সাইকেল চালিয়ে কলেজে ঢোকেন;রাজীবের বাড়ি থেকে কলেজ, সাইকেলে মিনিট পঁচিশের পথ; তাই,কলেজ আসার পথে,একটা নির্দিষ্ট জায়গায় দুজনের কেউ অপেক্ষা করে;তারপর,দু'জনে,একসঙ্গে কলেজে ঢোকে। অঞ্চলের একটা রেয়ন শিল্পের কোম্পানির ফিনানসিয়াল কন্ট্রোলার সাহেবও,কলেজে ক্লাস নিয়ে থাকেন,তবে খুবই অনিয়মত।ক্লাসের রুটিনে তো তাঁর নামে ক্লাস দেখানো আছে;ফল হয়,তাঁর নামে রুটিনে
দেওয়া বিষয়গুলো তো রেগুলার রুটিনে পড়ানো যায় না;আবার,ছাত্রদের তো না পড়িয়ে পরীক্ষায় বসতে বলা অন্যায়; রাজীব,এটাকে সমর্থন করতে পারে না,আবার ঐ সাহেবকে ক্লাস না নেওয়ার কথা বলাও অভদ্রতা ও অশোভন, তিনি নিজে থেকেই আগ্রহী হয়ে ক্লাস নেবার কথা বলেছেন।প্রিন্সিপাল মশাই'র স্ত্রী, ঐ কোম্পানির মেডিক্যাল অফিসার। প্রিন্সিপাল মশাইকে বলে,রাজীব, পুজোর ছুটি ও গ্রীষ্মের ছুটিতে,দুপুর দুটো থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত,টানা তিনঘন্টার ক্লাস নিয়ে অপঠিত বিষয়গুলো পড়িয়ে,ছাত্রদের তৈরি করে দেয়।ছাত্ররা তো ওর চাইতে বয়সে বড়; স্পেশাল ক্লাস চলা কালের মাঝে, দশমিনিটের ব্রেকে,নিজেরা কলেজের সামনে থাকা চা'র দোকানে,চা, বিড়ি খায়। রাজীবের জন্য বাড়ি থেকে ফ্লাক্সে করে চা-বিস্কুট নিয়ে আসে;কলেজের গ্যালারি-রুম ছাত্রে ভরে যায়, অনেকে দেওয়ালে খাতা রেখে অঙ্ক কষে;অন্য কলেজের ছাত্ররাও ক্লাস করতে আসে। কয়েকদিনের মধ্যেই রাজীব,ছাত্রদের কাছে অতি প্রিয় অধ্যাপক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে।
কলেজের ভাইস-প্রিন্সিপাল মশাই,সুস্থ হয়ে আবার কলেজে যোগ দিয়েছেন;আবার নৈশ বিভাগের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন;কেউই কলেজের আইনগত অবস্থার পরিবর্তন করতে আগ্রহী নন:নৈশ বিভাগের শিক্ষকদের মধ্যে দুজনকে সিভিল-ডিফেন্সের অফিসারদের-টেনিং'র জন্য জেলা থেকে সরকারের কাছে সুপারিশ করেছে;রাজীব আর ওর ঐ স্থানীয় সহকর্মী রমাকান্তবাবুর কাছে এ একটা বিরাট সুযোগ; কোলকাতার পুলিশ লাইনে ট্রেনিং'র ফাঁকে, লাল বাড়ি-রাইটার্সে গিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর সংগে যোগাযোগ করার চেষ্টা চালায়, লালবাড়ির কয়েকজন অফিসারও ওদের সংঙ্গে ট্রেনিং নিচ্ছে;রাজীবের সাথে বেশ মিশে গেছে;ওরাই বলে,"আরে,এই ট্রেনিং'র থিয়োরিটিক্যাল ক্লাস গুলোতে,চোখে গগলস লাগিয়ে দিব্যি এসি-ঘরের ঠাণ্ডায় দাও ঘুম;এই জন্যই তো আসা।"
ওরাই মন্ত্রীর সংগে যোগাযোগের মাধ্যম বললেও অত্যুক্তি হয় না। দু-একদিন ঘোরা-ঘুরির পর, একদিন শিক্ষামন্ত্রী সাক্ষাৎ করলেন;সব শুনে বলেন,'এ তো ডিপি আই'র ব্যাপার,উনিই সমস্যার সমাধান করতে পারবেন বলে,রাজীবদের আবেদনপত্রে,'see DPI' লিখে দিলেন।এবার,বুক ফুলিয়ে এডিপিআই'র ঘরে সব জানাতে,তিনি বলেন,"আপনারা,প্রিন্সিপাল মশাইকে নিয়ে আসুন,সব ঠিক হয়ে যাবে।"
ট্রেনিং শেষে কলেজের প্রিন্সিপাল মশাইকে নিয়ে যেতেই,কী করতে হবে,তা ডিপিআই মশাই,বুঝিয়ে বলায়,অবস্থার জট খুলতে চলেছে।
স্পনসর্ড কলেজের গভনিংবডি,নৈশ বিভাগকে,কলেজের এক্সটেণ্ডেড(সংযোজিত অংশ)সেকসন বলে উল্লেখ করে প্রস্তাব পাস করে সরকারের কাছে পাঠালে,তা অনুমোদিত হবার পর,বেতনের অনিশ্চয়তা দূর হল।ইতিমধ্যে,ভাইস-প্রিন্সিপাল মশাই,এ কলেজ ছেড়ে,অন্য কলেজে প্রিন্সিপালের পদে যোগ দিতে চলেছেন। সুতরাং,নৈশ বিভাগের ইন-চার্জের পোস্টে,প্রিন্সিপাল মশাই,ঐ স্থানীয় অধ্যাপক, রমাকান্ত বাবু,যিনি আগে অস্থায়ীরূপে কাজ করেছিলেন,তাকে না করে, দূর অঞ্চল থেকে আসা অন্য একজনকে ইন-চার্জ করেছেন;রাজীব তো এ অন্যায় সহ্য করবে না।প্রিন্সিপালমশাই'র সঙ্গে দেখা করে,এ অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে,তিনি বলেন,"তুমি যদি হও,আমি সিদ্ধান্ত পাল্টাবো;"রাজীব বলে,"স্যার ,এই ১৬৭ টাকা আট আনার জন্য,রাজীবের জন্ম হয়নি;আমি প্রফেশনাল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কোম্পানিতে জয়েন করবো: আপনি দিনের বেলার বেশ কয়েকজন বামপন্থী নেতা অধ্যাপকদের কথায় যে এটা করতে বাধ্য হয়েছেন, তা বুঝতে আমার অসুবিধা হচ্ছে না;তবু বলবো,কলেজের ছাত্রদের জিজ্ঞেস করলেই সব জানতে পারবেন ; সাতটা-সাড়ে সাতটার পর ,আর ঐ দূরের অধ্যাপকদের টিকিটিও কলেজের চৌহদ্দির মধ্যে দেখা যায় না;আপনিই নিজেকে প্রশ্ন করুন;কলেজের বাহাদুরও এ কথার সায় দেবে ;আর একবার ভাবুন;আমি কিন্ত আপনার এ সিদ্ধান্ত মন থেকে মানছি না।"
প্রিন্সিপাল মশাই,খুব ভালো করেই জানেন,রাজীব,ইচ্ছা করলেই এ বিষয় নিয়ে কলেজে ছাত্র ধর্মঘট ঘটিয়ে দিতে পারে;বললেন,"আচ্ছা,আগুরির গোঁ তো!তুমি যেন এ সবের মধ্যে জড়িয়ে যেও না।"
চলবে
0 Comments.