গদ্যের পোডিয়ামে দীপাঞ্জন দাস

শিল্পকলায় মহাপ্রভুর প্রভাব 

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রভাব বাংলার শিল্পকলাতেও লক্ষণীয়। চৈতন্যদেবের জীবিতকালেই তার দারুমূর্তি প্রতিষ্ঠা শুরু হয়েছে। হরিদাস উল্লেখ করেছেন ৪৪টি মূর্তির। শ্রীচৈতন্যের সন্ন্যাস গ্রহণের তেইশ বছরের মধ্যেই প্রভুর আদিমূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়। যেভাবে দেবদেবীর মন্দির মূর্তি প্রতিষ্ঠা হয়, সেভাবেই চৈতন্যদেবের দারুমূর্তির প্রতিষ্ঠা করা হয়। গৌরী দাস এর আগ্রহে কাঠের মূর্তি নির্মাণের আদেশ পাই ‘ভক্তিরত্নাকরে’-
‘প্রভু কহে গৌরী দাস ছাড়হ এমন আশ
প্রতিমূর্তি সেবা করি দেখ।
তাহারে আছয়ে আমি নিশ্চয় জানিহ তুমি
সত্য মোর এই বাক্য রাখ।’
কুলাই গ্রামের যাদব কবিরাজকেও মহাপ্রভু বলেন-
‘এই নিম্নবৃক্ষে বিগ্রহ করহ নির্মাণ।
মনুষ্যরূপে বিশ্বকর্মা করিবে বিধান।।
ছোট বড় মাধ্যম তিন ঠাকুর বানাইলা।
সেইকালে সরকারে বিগ্রহ সমর্পিলা।’
শ্রীচৈতন্যের জীবিতকালে নির্মিত বেশিরভাগ মূর্তিই ছিল নিম কাঠের। বাংলার সকল বর্ণের শিল্পীরাই এগিয়ে এলেন ভাস্কর্যে, কারুকার্যে, চৈতন্যপট অঙ্কনে। টেরাকোটাতেও তার প্রভাব দেখা দিল। প্রচলিত কৃষ্ণকথার প্রভাব তার মূর্তি তৈরিতেও পাওয়া যায়। প্রথম গৌরাঙ্গ মূর্তির সঙ্গে পরবর্তী গৌরাঙ্গ মূর্তিগুলির মিল পাওয়া গেল না। গৌড় বিষ্ণুপ্রিয়ার যুগলমূর্তি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে হরিদাস গোস্বামী বললেন-
‘গৌরবিষ্ণুপ্রিয়া যুগল ভজন প্রণালী বিধিবদ্ধ হইতে লাগিল, শ্রী গৌড় বিষ্ণুপ্রিয়া মূর্তি প্রতিষ্ঠা হইতে লাগিল, শ্রী গৌরাঙ্গের নটবর নাগর মূর্তির পূজা, নবভাবে সংস্থাপিত হইল…’
খেতুরী উৎসবে বিভিন্ন বিশিষ্ট বৈষ্ণববর্গের উপস্থিতিতে শ্রী গৌরাঙ্গ বিষ্ণুপ্রিয়া যুগল বিগ্রহ প্রতিষ্ঠিত হয়। শিল্পী হিসেবে নয়ন ভাস্কর, বংশীদাস ভাস্করের নাম উল্লেখযোগ্য। নিত্যানন্দের মৃত্যুর পর বীরচন্দ্র, বংশীদাস ভাস্করকে দিয়ে রাধাবল্লভ, শ্যামসুন্দর ও নন্দদুলাল বিগ্রহ নির্মাণ করান। নবদ্বীপের সোনার গৌরাঙ্গ তৈরি করেন ব্রজলাল দাস। টেরাকোটায় শ্রীচৈতন্যের ষড়ভূজ মূর্তিও উন্নত শিল্পকলার নিদর্শন। শুধুমাত্র চৈতন্য মূর্তিই নয়, বিভিন্ন বৈষ্ণব মঠ-মন্দিরে চৈতন্য পারিকরদের মূর্তিও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। চৈতন্যমূর্তিতে বহুলাংশে কৃষ্ণমূর্তির ভাব ফুটে উঠেছে। এছাড়া চৈতন্যদেবের ষড়ভূজ মূর্তি প্রথম দেখা যায় বিষ্ণুপুরে। পরবর্তীতে কাঠের ষড়ভূজ মূর্তি দেখা যায় খড়দহ, চুঁচুড়া, শান্তিপুর ও পাঁচরোলে।
ষোড়শ শতক থেকে বাংলায় মূর্তি শিল্প, মন্দির স্থাপত্যের সূচনা আসলে চৈতন্যদেবের ভক্তি আন্দোলনেরই ফসল। সাধারণ মানুষ থেকে ছোট বড় ব্যবসায়ী, বণিক, চাষী তথা সমাজের সর্বস্তরের মানুষ প্রতিষ্ঠা করলেন নিতাই-গৌরের, রাধা-কৃষ্ণের। চৈতন্যপরবর্তী কালে শিল্পীরা মূর্তি রচনা করেছেন পদাবলী সাহিত্য থেকে প্রাপ্ত চৈতন্য এবং কৃষ্ণের রূপের বর্ণনা ও কল্পনার মিশেলে।
শ্রী হরিদাস সাতটি প্রাচীন চৈতন্য এবং বৈষ্ণব চিত্রের উল্লেখ করেছেন-
১. শ্রী বিশাখা দেবীকৃত শ্রীমন-মদনগোপালের চিত্রপট।
২. রাধাকুণ্ডে মা জাহ্নবার ঘাটে শ্রীমন-মহাপ্রভুর চিত্রপট।
৩. কুঞ্জঘাটার রাজবাড়ীতে সপার্ষদ মহাপ্রভুর চিত্রপট।
৪. পুরীর রাজবাড়ীতে পূর্ণাকৃতির চৈতন্যদেব।
৫. বোম্বে ভোঁসলা হাউসে।
৬. শ্রী রাধাকুণ্ডে শ্রীমৎদাস গোস্বামীর ভজন কুটিরে রসরাজ মহাভাব চিত্র।
৭. শ্রীচৈতন্য সংকীর্তন চিত্র।
এঁড়েদহে চৈতন্য সংকীর্তন চিত্র সপ্তদশ শতকে অঙ্কিত হয়। অষ্টাদশ শতকে চৈতন্যদেব, রঘুনাথ পন্ডিত এবং উৎকল রাজ প্রতাপরুদ্রকে নিয়ে অঙ্কিত হয় বিখ্যাত তৈলচিত্র। কলকাতার জাতীয় সংগ্রহশালা রাজপুত শৈলীর অপূর্ব চিত্র রয়েছে চৈতন্য দেবের।
উত্তর ২৪ পরগনার বসু পরিবারের শ্যামসুন্দর মন্দিরে ও বেশকিছু দেওয়াল চিত্র পাওয়া যায়, যা বাংলা চিত্রশৈলীর অসাধারণ পরিচয় বহন করে। সম্পূর্ণ দেশীয় রীতিতে তৈরী কালীঘাটের পটও বঙ্গীয় চিত্র ধারার একটি অংশ হিসেবেই দেখার কথা বলেছেন অঞ্জন সেন। আঠারো ও উনিশ শতকে অঙ্কিত অনেকগুলি চৈতন্যদেব সংক্রান্ত তৈলচিত্র পাওয়া গিয়েছে যেগুলি নাম এবং স্বাক্ষরবিহীন।
২০০১ সালে CIMA গ্যালারিতে ‘ART OF BENGAL PAST AND PRESENT’ নামে একটি প্রদর্শনী হয়েছিল। যেখানে দুটি তৈলচিত্র সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে-
১. ষড়গোস্বামী
২. গদাধরের পাদপদ্মে পিন্ডদান।
দক্ষিণ কলকাতার চৈতন্য রিসার্চ ইনস্টিটিউট-এর পাঠাগারে ‘৬৪ মহান্ত পঞ্চতত্ত্ব দ্বাদশ গোপাল ষড় গোস্বামী’-এর একটি চিত্র এখনও দেখতে পাওয়া যায়। কেবলমাত্র দেওয়ালচিত্রই নয়, বেশকিছু পুঁথিচিত্রেও চৈতন্যলীলা অঙ্কিত হয়েছে। চৈতন্যদেবের পাটা চিত্রের বিষয়ে বিষ্ণুপুর যোগেশচন্দ্র পুরাকৃতি ভবনের সংগ্রহ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শ্রীকৃষ্ণলীলা যেমন রাসলীলার প্রাধান্য থাকে, চৈতন্য লীলার পাটাচিত্র তেমন সংকীর্তন এর প্রাধান্য রয়েছে অনেক বেশি। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, বিষ্ণুপুর শাখা, আশুতোষ সংগ্রহশালা এবং গুরুসদয় মিউজিয়ামের পাটা সংগ্রহে দেখা যায় শ্রীচৈতন্যের ভাবসমাধি বিষয়ক নানা চিত্র। টেরাকোটার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখা যায় হুগলি জেলায়, বর্ধমানে বনপাশের শিব মন্দিরে, কালনার প্রতাপেশ্বর মন্দিরে, বীরভূমের সুপুরে ও ইলামবাজারের লক্ষ্মীজনার্দন মন্দিরে। এছাড়া বাঁকুড়া জেলার হদলনারায়নপুরে ভাবাবিষ্ট চৈতন্য দৃশ্যমান হয়েছেন টেরাকোটা ফলকে। প্রস্তরখণ্ডে চৈতন্যলীলা প্রকাশ পেলেও তার উদাহরণ খুবই সামান্য। কোনও কোনও স্থানে দেশীয় শিল্পীরা পিতল এবং কাঠের মূর্তির মাধ্যমে যেমন এই শিল্পকে ফুটিয়ে তুলেছেন তেমনই রথের মধ্যেও খোদাই করেছেন।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।