দীর্ঘ কবিতায় দীপশেখর দালাল

ভালোবাসব বলে এত আয়োজন
। ১।
পায়ের তলায় শিকড়, সর্ষে নেই, শিকড়
এক প্রসারিত শিকড় পায়ের তলায়, বাধে এবং বাঁধে
পৃথিবীকে ফুটো করে বিপরীত দিকে আরও এক মানুষ
জন্মেছে শিকড় থেকে, দেখি কতকাল যেন
আমি তাকে চিনি, আমি তাকে চিনিনা
অরণ্যের মধ্যে এক মানুষ, ন্যুব্জ মূর্তির মতো
দাঁড়িয়েছে, একটি শিকড় তার
একদিকে আমি, আর অন্যদিকে সে দাঁড়িয়েছে
মাঝে আকাশ ঘোরে, সময় ঘোরে, বয়স ঘোরে, পৃথিবী ঘোরে
আর ঘুরে যায় প্রিয় নক্ষত্রটি
। ২।
বেলাগাম ভালোবাসব বলে ঘর ছাড়লাম, ষড় করলাম খরস্রোতের সাথে
এবং কালে কালে মহাদেশটিকে চিরে ফেললাম, পতঙ্গ ঘর পেল
প্রেতসকল, পক্ষীকুল, সরীসৃপ সব্বাইকে আশ্রয় দিলাম
মানুষে নাম দিল বৈতরণী, সর্বরোগহর স্রোত আহা
ভালোবাসবার হাতটি একবার করপুটে জল নিল, পা ডোবালো একবার
আর তারপরে বাসিফুল ভেসে আসে দূরবর্তী দেহাতি গ্রাম থেকে
ভেসে আসে পুরাতন উপন্যাসের পাতাগুলি
লোভী শৃগাল মধ্যরাতে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেল লাশ
তারপরেও আমি কী এখনও বইব শরীরসুবাস?
এখনও শীতের রাতে আগুন জ্বালব গুহার সমুখে?
গৃহহীনকে কে আর ঘরে এনে শুতে দেয়?
। ৩।
একটি বিরহক্ষেত, একটি ঠোঁটচাপা ক্রন্দন, একটি পুষ্পকবর
এইসব দেখি, হেঁটে চলে যাই
এইসব দেখি আর মেপে মেপে দেখি নিজের অস্থিভস্ম
কোনটা ওজনে বেশি, কোনটি স্থায়ীপুকুরে ভাসে, কোনটি ডুবতে ডুবতে
ডুবতে ডুবতে আমার চোখের দৃষ্টি খেল
আমি আর কিছু দেখতে পেলাম না মহাদেশে
অথচ লেখার সময় লিখেছি যেন সাবলীল শাকপাতা
। ৪।
মোহনশক্তি তো আমার জানার কথা নয়
তান্ত্রিক যখন এই বিদ্যে শেখাবে বলেছিল
তখন আমি নিজের বুকের ওপর দেখছিলাম স্নেহবর্তুল গলেছে কেমন
কেমন চাঁদের আলোয় ভীষণ তাপ, পুড়ে যায় পুণ্যতোয়া ওষ্ঠ
এই তো শিখেছি সাকুল্যে
সবাই কেন ভেবে নিল আমিও ডাকিনীসিদ্ধ তান্ত্রিক?
ক্লান্তি নেই আমার?
শান্তি নেই?
। ৫।
অনবদ্য গণৎকার হে তুমি
আগামী জন্মের কুঁড়েঘরটিতে বেড়া বাঁধছো
লাউডগার ওপরে মেঘ এনে রাখছো দুপুরবেলা
আমার শিরায় বাঁধছো বিস্মৃতিহরণ তাবিচ
কফিনের গায়ে রাখলে সুবাসধূপ
অথচ এইমূহুর্তে আমি ভাবছি তোমায় নিয়ে এজন্মকাল জুড়ে ছিনিমিনি খেলি
তাবৎ কবিতা অনুরাগী ঢলুনি মেয়ে
আমার গায়ে চকমকি ঘষছে
ঘষছে এবং ঘষছেই
তুমি গণনা করে বলতে পারো না এইসব পৌনপুনিক ছেনালি
কবে থামবে আমার?
। ৬।
অপার্থিব রাত যেন কেটে গেছে
কেটে গেছে, বেশ বুঝি
কেটেই গেছে বুঝি?
সন্ধের চুলের মুঠি ধরে, নিয়ন নিংড়ে
শান্ত দিঘির মতো রাতে একদিন আমি
হস্তীযূথ নামিয়েছি ফসলের মাঠে
লণ্ডভণ্ড করেছি পূজার উপাচার
পৈতে রেখেছি বালিশের তলায়
শাস্ত্রমতে অথচ ফুল সাজিয়েছি ভুলে যাওয়া গুহামানব গানে
কমণ্ডলুতে বন্দী করেছি প্রিয়নদীর জল
তঞ্চকতা করে জিতেছি পাশা, এবং বেশ মনে পড়ে
এমত রত্নাকর আঙুলছাপ খোদাই করে গেছি যেখানে যেখানে ডেকেছিলে
এখন রাত হ’লে আমি ফুলের মালা গেঁথে বিক্রি করি প্রাসাদের পাশে
রাত বাড়ে, বাবুরা ফুল কিনে নিয়ে বোকা সাজতে যান
ফুল, ফুলের কীট, আহা হুল বসালো সঙ্গম শেষে
আমার রাত কেটে গেছে
আমার রাত কেটে গেছে আহ্লাদে আহ্লাদে একদিন