T3 || রবি আলোয় একাই ১০০ || সংখ্যায় চন্দ্রশেখর ভট্টাচার্য

একাকী অতৃপ্ত পুরুষ

রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য নিয়ে লেখা আমার পক্ষে অসম্ভব, সেটা প্রতিবার বৈশাখ এলেই বুঝতে পারি। আমার কাছে তাঁর সাহিত্য সুন্দ্র, তবে ভয়ঙ্কর সুন্দর। বিস্তৃত সবুজ মনের সেই সাহিত্যিক, যার সাহিত্যের প্রশস্ত মহাকাশে পা রাখার যোগ্যতাও নেই। দূর থেকে দাঁড়িয়ে ‘চৌধুরী বাড়ির রাস উৎসবের’ মতো বিস্মিত প্রত্যাশায় অবলোকন করা।
কেবলই মনে হয়েছে, তিনি এক ‘একাকী অতৃপ্ত’ মানুষ, যিনি নিজেই অনেক কিছু সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে নতুন পথ দেখানোর পাশাপাশি নিজের দর্শনকে রূপায়িত করে গেছেন। সৃজন করেছেন। সকলেই মানেন, সৃজনশীলতাই নারীবাদ। রবীন্দ্রনাথ সেই অর্থে নারীবাদের উজ্জ্বল উদাহরণ, বলা যেতে পারে ‘ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর’।
ভারতে সমবায় ভাবনা আসার আগেই পতিসরে কৃষি সমবায় গড়লেন! কৃষকদের জন্য ব্যাঙ্ক, যেখানে বিনা সুদে ঋণ পাওয়া যায়। জমিদারির টাকা চাষের জন্য বিনা সুদে কৃষকদের ঋণ দিলেন! জমিদাররা তখন কোঁড়া চালিয়ে গরিব কৃষকদের থেকে কর আদায় করে। সেই সময় তিনি বিকল্প পথ দেখালেন। এদিকে সুদখোর মহাজনদের ব্যবসা লাটে উঠছে দেখে ইংরেজ কিছুদিন পর সেই ব্যাঙ্কের সব টাকা বাজেয়াপ্ত করল।
মানবাধিকার শব্দটির সঙ্গে দেশবাসীর পরিচয়ের আগেই তিনি মানবাধিকারের কথা বললেন। তিনিই প্রথম যিনি প্রকৃতিকে ঈশ্বরের জায়গায় স্থান দিয়েছেন। তাঁর নৃত্যধারায় আবাহনে কোনও গণেশ, রাধাকৃষ্ণ বা কোনও দেবতার পূজা হয় না। হয়, প্রকৃতির আরাধনা। তিনি রাধাকৃষ্ণ বা চৈতন্যের দোল উৎসবকে ঠাঁই দেননি, আদিবাসীদের বসন্ত উৎসব প্রচলণ করেছেন। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়া রবীন্দ্রনাথের উঁচু ক্লাসের বিজ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্কও ছিল না। অথচ, তিনিই লিখলেন মহাকাশ পরিচয়।
তিনি কোনও দেশের জাতীয় সঙ্গীত লেখেননি, তবু তাঁর লেখা গান তিনটি দেশের জাতীয় সঙ্গীত। এক দেশের নাগরিকের লেখা অন্য দেশের জাতীয় সঙ্গীত হতেই পারে। পাকিস্তানের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা হাফিজ জলন্ধরী ভারতের নাগরিক ছিলেন। তাঁর আগের জাতীয় সঙ্গীতটি লেখক ছিলেন ভারতের বিশিষ্ট উর্দু কবি জগন্নাথ আজাদ। রবীন্দ্রনাথ কোনও দেশের জাতীয় সঙ্গীত না লিখলেও তাঁর মৃত্যুর পর তারই লেখা তিনটি গান তিন দেশের জাতীয় সঙ্গীত। এতেও তিনি বিশ্বে একাকী।
শ্রীলঙ্কার জাতীয় সঙ্গীত হয়েছে যে সিংহলী গানটি, সেটি অনেক আগে বিশ্বভারতীর ছাত্র আনন্দ সমরাকুনের অনুরোধে লিখেছিলেন বাংলায়, শ্রীলঙ্কা মাতৃকাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আনন্দ সেটি সিংহলি ভাষায় অনুবাদ করে রাবীন্দ্রিক সুরেই গেয়ে জমা দেন। অনেক গানের মধ্যে থেকে সেটিই বিবেচিত হয়।
নেতাজী সুভাষচন্দ্রকেও ‘দেশনায়ক’ বলে তাঁর কাঁধেই সঁপেছিলেন দেশমাতৃকার মুক্তির দায়িত্ব। গান্ধীজিকে ‘মহাত্মা’ বলেছিলেন তিনিই। জালিয়ানওয়ালা বাগের ঘটনায় মহাত্মা গান্ধী থেকে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ যখন প্রতিবাদে বিমুখ, তখন তিনিই একা প্রতিবাদ জানান, সভা ডেকে নাইট উপাধি ত্যাগ করে গণ আন্দোলনের পথ খুলে দেন। তারও দেড় দশক আগে, হিন্দু আর মুসলমানের বিরোধ বাঁধাতে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে তিনিই শুরু করছিলেন বাংলার রাখিবন্ধন। অথচ, এই কাজগুলি তো রাজনৈতিক নেতৃত্বের, করেছিলেন তিনি! তাও একাই।
রাজনৈতিক নেতৃত্ব যখন দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রয়াসী, তখন তিনি প্রথম উপলন্ধি করেন, স্বাধীন দেশের উন্নয়নের জন্য একটা পরিকল্পনা রচয়িতা সংস্থা দরকার। তরুণ বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহার সঙ্গে আলোচনার পর চিঠি লিখে সেকথা জানান জওহরলাল নেহরুকে। অনুরোধ করেন, সেই পরিকল্পনা কমিটির নেতৃত্ব দিন নেহরু নিজে। তাঁর সেই চিঠিই কংগ্রেস সভাপতি সুভাষচন্দ্র বোসকে উদ্বুদ্ধ করে কংগ্রেসের পরিকল্পনা কমিটি গঠনে। সুভাষচন্দ্র নেতৃত্বে দেন নেহরুকেই। দেশ স্বাধীন হলে সেই কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান করা হয়ে রবীন্দ্রনাথের প্রাক্তন সচিব প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশকে। তাদের তৈরি দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, যা নেহরু-মহলানবীশ মডেল বলে পরিচিত, স্বাধীন দেশে সবচেয়ে উন্নয়নমুখী ও সফল পরিকল্পনা বলে স্বীকৃত।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘দেশ স্বাধীন করা সহজ, কিন্তু স্বাধীনতা ধরে রাখা কঠিন’। সেই স্বাধীনতা ধরে রাখতে হলে দরকার ছোট ছোট স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম। ছোট ছোট পুকুর, ডোবা, খাল-বিলে ধরে রাখা বৃষ্টির জল যেমন গ্রীষ্মেও সেচ দেয়, তেমনই স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম, গ্রাম থেকে গ্রামপুঞ্জ, গ্রামপুঞ্জ থেকে জেলাগুলি স্বাধীনতাকে ধরে রাখতে পারবে। এই ভাবনাই পরে দেখা গিয়েছে ‘সোভিয়েত’ নামে। ভারতে নয়ের দশকে ৯৩ ও ৯৪ তম সংবিধান সংশোধনী পাস হয়ে সেটাই হল পঞ্চায়েতি রাজ।
তাঁর সৃষ্টি এমনই অনন্য, একক। বিশ্বে একটি মাত্র বিশ্ববিদ্যালয় আছে, যেখানে প্রি-নার্সারি থেকে পোস্ট ডক্টরাল পর্যন্ত শিক্ষার ব্যবস্থা আছে! আর সেটি বিশ্বভারতী। বিশ্বভারতীর সঙ্গে গড়ে তোলা শ্রীনিকেতনে পড়ুয়াদের হাতেকলমে বস্ত্রবয়ন, চর্মশিল্প, পটারি, বাগিচা শিল্প-সহ কাজ শিখতে হয়। প্রথাগত শিক্ষার সঙ্গে কর্মমুখী শিক্ষা বেশি গুরুত্ব পায়! গ্রাম উন্নয়ন, গ্রামবিকাশ সেখানে অন্যতম পাঠক্রম। অন্য কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণি থেকে এমন শিক্ষার পাঠক্রম নেই।
রিটিশ আমলে ইংরেজি জানা থাকলেই ব্রিটেনে আইন পড়া যেত। রবীন্দ্রনাথকেও মহর্ষি আইন পড়তে লন্ডন পাঠাচ্ছিলেন। তখন লোকে উচ্চশিক্ষার জন্য জার্মানি, জাপানে যেত। রবীন্দ্রনাথ তখন নিজের ছেলেকে কৃষিবিদ্যা শিখতে, আর বন্ধুর ছেলেকে প্রাণিবিদ্যা শিখতে পাঠালেন কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে। ছেলেকে চিঠিতে লিখলেন, সে ‘জমিদারের পয়সায় পড়তে গিয়েছে। জমিদারের পয়সা আসে কৃষকদের কষ্টার্জিত অর্থ থেকে। ফিরে এসে সেই শিক্ষা যদি কৃষকদের মানোন্নয়ন না করতে পারে, তা হবে অর্থহীন।’ আজকের কজন বাবা এমন সমাজমনষ্ক?
রবীন্দ্রনাথ আসলে সারা জীবনে একটাই লেখা লিখেছেন। তাঁর জীবনদর্শন। সেই দর্শন তিনি অন্য দার্শনিকদের মত বলে ক্ষান্ত হননি, নিজে সেটি রূপায়ন করে দেখিয়েছেন। ব্রিটিশ তাঁকে সর্বদা সন্দেহের চোখে দেখেছে, তার পিছনে গোয়েন্দা লাগিয়েছে। তিনি পরোয়া না করে ‘প্রয়োজনে মুষ্টিযোগের’ নিদান দিয়েছেন। ঘরছাড়া বিপ্লবীদের প্রতি লিখেছেন ‘মেঘের কোলে কোলে যায় যে চলে বকের পাঁতি’, যেখানে ঘরছাড়া মানুষগুলির ঘরে হানা চলছে আর ‘অজানার পথে’ যাদের ‘নেই তো মানা’, তারা দেখছে ‘মনোহরণ আঁধার রাতি’।
বিশ্বযুদ্ধের আগে ইউরোপ সফরে দেশে এসেছেন সামরিকতন্ত্রের উদ্ধত রূপ। লিখেছেন, “ক্ষয়কাশে রোগীর গণ্ডদেশ রক্তিম হয়। মিলিটারিত্বের মহিমায় ইউরোপের গণ্ডদেশ যে রক্তিম হইয়াছে, ইহা কী স্বাস্থ্যের লক্ষণ!”
বাইরের অসুন্দরের বিরুদ্ধে অন্তরের সুন্দরকে প্রতিবাদী চেহারা দিয়ে লিখেছেন,–
“পালোয়ানের চ্যালারা সব ওঠে যেদিন ক্ষেপে
ফোঁসে সর্প হিংসা দর্প সকল পৃত্থী ব্যাপে
বীভৎস তাঁর ক্ষুধার জ্বালায় জাগে দানব ভায়া
গর্জি বলে ‘আমিই সত্য, দেবতা মিথ্যা মায়া’।
সেদিন যেন কৃপা আমায় করেন ভগবান
মেশিনগানের সম্মুখে গাই জুঁই ফুলের এই গান।”
আজ দেশজুড়ে, বিশ্বজুড়ে উদ্ধত ‘পালোয়ানের চ্যালাদের’ সামনে রবীন্দ্রনাথের সেই জুঁই ফুলের গান গাওয়ার বড় সাধ হয়।

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!