গোপনে গড়েছে কত স্বপ্নিল সাঁকো
ইভানের ছোট্ট একরত্তি ভাইটাকে জানালা দিয়ে দেখা গেল। জানালায় একেবারে চাপাচাপি – হীরা, নেহা, ইভান, ছুটি। এই তুই সর, তুই সর, উফফ সরে যা, করতে করতে দেখা গেল অত:পর। ছোট্ট ছোট্ট লাল লাল হাত পা, কেমন ফুলো ফুলো চোখ, মাথায় লেপ্টানো হাল্কা চুল, গলায় হাল্কা ফ্যাসফ্যাসে আওয়াজ। ছুটির মনে হলো বাইরের আলো ওর চোখে বড্ড লাগছে। কপাল কুঁচকে এবার তারস্বরে কান্না – ওঁয়াও ওঁয়াও। কান্নাটাও কেমন যেন। নেহা ফিসফিস করে বলে – ছুটি, তুইও এরকম ছিলি। ছুটি বলে – তুইও। ই:, নিজে যেমন অন্যরকম ছিল। ইভান বলে – আর আমি? কিরকম ছিলাম? নেহা মুখ ভেংচে বলে – তুই তো শেয়ালের মতো ছিলি। হীরা হো হো করে হাসে। ইভান রেগে গিয়ে বলে – তুই… তুই ভালুকের মতো ছিলি। চেঁচামেচি লেগে গেল। শেষে দাদি এসে সবাইকে সরিয়ে দিলেন।
৷ নেহা দিব্যি ছোট্ট ভাইটাকে দেখভাল করে। ছড়া কাটে। তিনমাস চলে গেছে কী করে যেন! বাচ্ছাটার মুখে হাসি ফুটেছে। নাম রাখা হয়েছে ধ্রুব। ওদের উচ্চারণে ধ্রুব ্। অবাক হয়ে ছুটি শুনত নেহা ছড়া কাটছে আর ধ্রুব ্ হাসছে। শিশুদের “দাঁত নেই হাসি “কী সুন্দর! নেহা ছড়া কাটত –
“অনরমনর পুয়া পাকেলা
কৌয়া গিলহরি নাচেলা
কৌয়া গৈল খেতকিনার
আনলসে পাচসাতি ধান
সেই ধান সে ভাত বনাঈ
ধ্রুব্ খাইয়া লাখভরি। “
ছুটির কানে শোনা, কোনটা ঠিক বেঠিক সে জানে না। সে তার বাজে খাতায় সেটা তুলে রাখল। এরপর নেহাকে বলল – এটা বুঝিয়ে দে তো। আমাদের বাংলায় অনেক অনেক ছড়া আছে। বলব?
নেহা বলে – আমি কিছু কিছু জানি।
– খোকা গেল মাছ ধরতে, তারপর আরও কীসব ভুলে গেছি। ব্যাঙ ট্যাঙ কীসব আছে।
ছুটি বলল – খোকা গেল মাছ ধরতে/ ক্ষীর নদীর কূলে
ছিপ নিয়ে গেল কোলা ব্যাঙে / মাছ নিয়ে গেল চিলে।
– হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক ঠিক।
– তুই আমাকে এখন বুঝিয়ে দে তোর ছড়াটার অর্থ।
-মানে হলো- অনরমনর করে পুয়া ভাজা হচ্ছে।
– অনরমনর মানে কি? পুয়া মানে কি?
-আরে মনে কর তোদের বাড়িতে লুচি ভাজা হচ্ছে। একটা শব্দ হয় না লুচি ভাজার? অনরমনর?
-হ্যাঁ। শব্দ তো হয়, সেটা অনরমনর, বেশ ঠিক আছে, পুয়া?
-ধরে নে লুচি। লুচি ভাজার গন্ধে কাক আর গিলহরি নাচছে।
-গিলহরি মানে আমি জানি, হিন্দি বইএ আছে – গিলহরি মানে কাঠবেড়ালি।
-ব্যস তাহলে তো হয়ে গেল। কাক ক্ষেতকিনারে গিয়ে ধান নিয়ে এল।
– পাঁচ সাতি মানে?
– পাঁচ কিলো হতে পারে।
– সেই ধান দিয়ে ভাত রান্না হলো। সেই ভাত খেয়ে ধ্রুব ্ শক্তি পেল।
– কিন্তু এটা তো বইয়ের হিন্দি নয়।
-না। আমরা যে ভাষায় কথা বলি সেটা বইএর হিন্দি নয়। মুখের ভাষা। আওয়াধি।
-তোদের বাড়ি কোথায় ছিল রে?
-উত্তরপ্রদেশ। কিন্তু অনেক আগে মনে হয় ঠাকুরদাদা অচিনপুরে এসে বাড়ি তৈরি করে।
– তুই কিন্তু এত ভালো বাংলা বলিস, কিছু বোঝা যায় না।
নেহা হাসে। বলে – চলি রে। ঘরে অনেক কাজ। দাদির তো হীরাকে দেখতে হয়।
ছুটি ভাবছে, ছড়ার কোনো কার্যকারণসূত্র নেই, কিন্তু কী সুন্দর সুন্দর ছোট্ট ছোট্ট ছবি। এই যে ছিপ নিয়ে গেল কোলা ব্যাঙে, মাছ নিয়ে গেল চিলে। কোথায় সেই ক্ষীর নদীর কূল? কেমন যেন স্বপ্ন।
কিন্তু ভাললাগা যখন উত্তুঙ্গে তখন তা ভেঙে গেল। হঠাৎ করেই ইভানরা অচিনপুরে চলে গেল। চাকরি ছেড়ে দিলেন ইভানদের বাবা প্রতাপ সিং। কিছু একটা মতান্তর হয়েছে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে। ইভানদের পৈতৃক সম্পত্তি অনেক বেশি। চাকুরি করাটা প্রতাপ সিং এর শখের ছিল। যাবার সময় সবার এত মন খারাপ। দাদি বারবার অচিনপুরে তাদের বাড়ি যাবার জন্যে বলছিলেন। ইভান নেহা হীরা ওরা কাঁদছিল। বিকেলের দিকটায় ওরা চলে গেল কোয়ার্টারটা শূন্য ফাঁকা করে। এই প্রথম ছুটির মনে হলো চা বাগানটা বড্ড নিরিবিলি। এই নির্জনতা কেমন যেন ভীষণ। একেবারে ভালো না লাগার। কোথাও কীসের যেন বড্ড ফাঁক আছে। নেহা ওরা আর ফিরে আসবে না। ধীরে ধীরে তাদের ভুলে যাবে সবাই। ওরাও তাদের ভুলে যাবে। পড়ার ঘরের পাশে বাতাবিলেবু গাছটায় সন্ধের পাখিদের কিচিরমিচির। হঠাৎ করে ইভানের কথাটা মনে পড়ল – তোমার বাবা মা সব মরি যাইতো, আমার বাবা মা সব মরি যাইতো, খালি তুমি আর আমি ঘুমতাম।
দু’চোখ ভরে জল এলো ছুটির। ছোট্ট ছুটির ভুবন কতো ছোট, কতটাই ছোট। এই প্রথম ছুটির একটা ভীষণ ভাললাগার থেকে বিচ্ছেদ। রাতে পড়ায় মন বসল না মোটেই। এমন মন খারাপ কখনও হয় নি তার। একান্ত ভাললাগার বাজে খাতায় কিছুই লিখতে পারল না শুধু লিখল – হীরা প্লিজ বেঁচে থাকিস।
মা সব বুঝতে পারছেন। তার মন কতটা খারাপ তা বোধহয় ছুঁতেও পারছেন। কাছে এসে বললেন – ওদের সাথে আবার দেখা হবে। অচিনপুরে ওদের বাড়ি যাবি। আমি নিয়ে যাব তোকে। আরেকবার ওদের সাথে দেখা হলে মন খারাপ কমে যাবে দেখিস।
– কবে যাবে মা?
– আরে যাবো। এত তাড়ার কিছু নেই।
ছুটি নতুন স্বপ্নে এলো। অচিনপুরে মাঝে মাঝে পিসিমা, মামার বাড়িতে সে যায়। মার সাথে। এবার আবার যাওয়া হবে। নেহা বলেছে বাড়িতে ওদের দুই পিসি আছে। এখনও বিয়ে হয়নি। বিয়ের সময় ছুটিদের যেতেই হবে ইত্যাদি। যাই হোক ওদের বিয়েতে না হোক একবার ওদের সাথে দেখা হলেই হলো।
পরদিন রবিবার। ছুটির মনে হচ্ছে আজ রবিবার না হলে ভালোই হতো। কোয়ার্টারটার বন্ধ জানালা গুলো কী যে অদ্ভুত রকমের ভূতুড়ে মনে হচ্ছে তা কাউকে বলার নয়। ইদানিং ধ্রুবের কান্না শোনা যেত যখন তখন। চারপাশ বড় বেশি নিশ্চুপ। তাই হয়তো কারখানার ঝরঝর ঘড়ঘড় বড় বেশি কানে বাজছে।
এইসময় একটা লোক এলো। কেমন ভাঙাচোরা যেন। লটরপটর করে হাঁটছে। কাছে এসে বলল- হামি বুধুয়া।
ছুটি দেখল বুধুয়ার একটা চোখ সাদা। একটা চোখ ঠিক আছে, তবে একটু হলুদ ভাব আছে। বুধুয়াকে চেনে ছুটি। টিলার নীচে একটা কোয়ার্টারে গরুর ঘাস দেয়। অনেক বড় ঘাসের বোঝা নিয়ে আসে। মানুষ দেখা যায় না, ঘাসের বোঝার নীচে দুটো পা লটরপটর করে। ছুটির বেশ ভালো লাগলো বুধুয়াকে দেখে।
-কেন এসেছ বুধুয়া?
– বাবু বইল্ল গরুর ঘাস দিতে।
বুধুয়া তাদের বাড়ি ঘাস দেবে, বেশ মজা হবে তাহলে। মাথায় বিরাট বড় ঘাসের বোঝা, মানুষ দেখা যায় না, শুধু ঘাসের বোঝার নীচে দুটি পা লটরপটর। ছুটি চেঁচিয়ে বলল – বাবা, বুধুয়া এসেছে।
বাবা বেরিয়ে এলেন।
বুধুয়া বলল- বাবু, ঘাস আজ লে দিব?
– হ্যাঁ, আজ থেকেই দে। এদিকে আয়, বোস। দুটো রুটি খেয়ে যা।
বুধুয়া হাসল। হেসে বারান্দায় গুছিয়ে বসল। মনে হলো ভারি খুশি হয়েছে।
ক্রমশ