পৃথিবী জুড়ে কোভিড অতিমারীর বিস্ফোরক আত্মপ্রকাশ সারা পৃথিবীর পক্ষে চূড়ান্ত যন্ত্রণাদায়ক বটে। কিন্তু এই সময়টা দুনিয়াজোড়া সাহিত্যস্রষ্টাদের কাছে হতে পারত তাঁদের সেরা সৃষ্টির মধ্যে ডুবে যাবার উর্বর সময়। দুনিয়াজুড়ে খিদে, দারিদ্র, অদৃশ্য অস্ত্রের রহস্যময় অনুরণন তারই মধ্যে মাসের পর মাস গৃহবন্দি হয়ে থাকবার পরিস্থিতি।
সিনেমা, থিয়েটারের জন্য যেমন লকডাউনের চরম প্রতিকূলত পরিস্থিতির কারণে নাটক, সিনেমা একা একা করা সম্ভব নয় কিন্তু যে সৃষ্টি এককভাবে সভব লকডাউন তো সেই সৃষ্টিকে একটা সুবিশাল সুযোগ এনে দেবার মতো পরিসর।
হৃদয় ক্ষতবিক্ষত নাহলে লিখতে পারেননা অধিকাংশ মহৎ স্রষ্টা ; এইসময় সাহিত্য রচয়িতারা একদিকে পেলেন সেইরকম বেদনাদীর্ণ হৃদয় বিক্ষত করে তোলা কোভিড প্রেক্ষাপট , অন্যদিকে তাদের সামনে রইল অতিদীর্ঘ লকডাউনের অলস অবকাশ। যারফলে কিনা তাঁরা নিজের রক্তাপ্লুত হৃদয়কে সাদা কাগজে অথবা আধুনিক আইপডে ফুটিয়ে তুলে কিছু লিখে ফেলবার মত অঢেল সময় হাতে পেলেন। এইসময় মধ্যবিত্তকে বিশেষত মহিলাদের গৃহকাজ কিছুটা করতে হয়েছে ঠিকই কিন্তু ঘর বাহির দুই দিকে সামঞ্জস্য রেখে ছুটবার তুলনায় সেই গৃহকাজ অবশ্যই নগন্য। চাকুরি, ব্যবসা বা জীবিকায় তুলনামূলক স্বল্প সময় দেবার জন্য অহরহ লেখক কবিদের যে গালি শুনতে হয় পরিবার পরিজন প্রিয়জন প্রভৃতি থেকে, সেই গালির স্বতঃস্ফূর্ততা লকডাউনে অনেকটা কমে গেল।পেশাগত জীবনে সামন্য ব্যর্থতা এলে কবিকূলের কবিতা লেখার কু-অভ্যাসকে কাঠগড়ায় তুলে অহরহ কবিদের গুষ্টির তুষ্টি করে তাঁদের মনোবল টুকরো টুকরো করা হয় কিন্তু এই দীর্ঘ লকডাউনে সেই অসম্মান কবিদের খুব বেশি সইতে হয়নি। কারণ পেশাইতো বন্ধ ফলে পেশাগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ব্যর্থতার নিরিখে মানুষকে বিচার করাও বন্ধ ছিল। নাহলে রবীন্দ্রনাথ থেকে জীবনানন্দ সকলেই লেখালিখি করে ‘মিছিমিছি সময় নষ্ট’ করবার জন্য তীব্র গালির অভিঘাত সয়েছেন। কেউ গালি খেয়েছেন বন্ধু আত্মীয়র থেকে, কেউবা স্ত্রী সন্তানের কাছ থেকে। তা এই অভূতপূর্ব পরিস্থিতিতে চাকুরিতে মাইনে না বাড়ার জন্য, চাকরি খোয়ানোর জন্য, চাকরি না-পাবার জন্য লেখক কবিদের গালি দেবার অবকাশ আর রইলনা। সব কাজকর্মই যেখানে বন্ধ সেখানে আর কাজ তুলে কতবার মুখঝামটা দেওয়া সম্ভব? ফলে কবি লেখকরা কিছুটা শান্ত পরিবেশও পেয়ে গেলেন এই তালে। দুঃখিত দুনিয়া, আপাত শান্ত গৃহ, অখন্ড কর্মহীনতা ছেয়ে রইল সাহিত্য স্রষ্টাদের জীবনকে। আমি উৎফুল্ল হয়ে ভেবে নিলাম যে এবার পৃথিবীতে আবার আধ জডন শেক্সপীয়র, গোটা চার রবীন্দ্রনাথ, জনা কুড়ি কীটস ইত্যাদি আত্মপ্রকাশ করতে পারবে। গোটা দুনিয়ার খবর আমি এত সহজে পাবনা জানতাম কিন্তু এটা ধরেই নিয়েছিলাম যে বাংলায় অন্তত তিনজন ফেলুদা, দুটো ব্যোমকেশ চারটে কাকাবাবুর সমতুল্য গোয়েন্দা চরিত্র পাব। নীললোহিতের পাঁচ ছ-খানা বিকল্প নামিয়ে দেবেন লেখকরা। বনলতা সেনকে ছাপিয়ে যাবে গোটা তিরিশ কবিতা। ‘সোনার তরী’ বা ‘মানসীর’ সঙ্গে তুলনীয় কাব্যগ্রন্থ একটা হলেও লেখা হবে। সুকুমার রায়ের পরে আর একজন আসবেন যিনি ‘আবোলতাবোল ট্যু’ লিখবার ক্ষমতা রাখেন। বনফুল, তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ, মানিক, নরেন মিত্র, আশাপূর্ণা মিলে বাংলা ছোটগল্পর যে ঘরানা তৈরি করেছিলেন যা বর্তমানে সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত ; ভেবেছিলাম সেটা আবার ফিরে আসবে। ছোটরা আর একটা ঠাকুমার ঝুলি আর ক্ষিরের পুতুল পাবে হাতে। মেঘনাদবধের একটি বা দুটি অতুলনীয় ইন্টারপ্রিটেশন লিখবে কেউ, এইসব ভেবে এই কষ্টকর সময়ে আমার মনের ছোট একটা অংশ একটু আলোকিত হয়েছিল কিন্তু ক্রমে লকডাউন উঠল; নতুন স্বাভাবিক যুগের সূচনা হোল, সকলের কাজকর্ম, জীবনযজ্ঞ শুরু হয়ে গেল, প্রায় সমস্ত শারদ সংখ্যা হাতে পেয়ে গেলাম। লকডাউনে কোভিড বিস্ফোরণ থামেনি কিন্তু সাহিত্যে যে বিস্ফোরণের আশায় ছিলাম তার বিন্দু বিসর্গ লক্ষণ কোথাও দেখলামনা। নতুন বাঁধ ভেঙে দেওয়া, জলস্রোতে প্লাবন ডাকা লেখা কোথাও দেখলামনা… তারমানে কি আমি ভুল আশা করেছিলাম? অসুস্থ পৃথিবী, অলস অবকাশ এগুলো কি তাহলে লেখক কবিদের সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট উপাদান নয়? পরিবেশ কি এতটুকু ছাপ ফেলেনা লেখকের লেখায়? এতটা সময় গৃহবন্দি তবু সকলে আগে যেমন লিখতেন এখনও তেমনই লিখছেন, পড়াশোনা করবার, ভাববার এতটা সময় পেয়েও নিজেকে কেউ অনেকটা ভাঙলেননা কেন?
প্রশ্নগুলো বেশ ভাবিয়ে তুলল আমাকে! এবং তারফলে এই নূতন স্বাভাবিক যুগের বিক্ষিপ্ত সময়ে আমি অন্যরকম চিন্তার উত্তাপে নিজেকে খানিকটা উজ্জীবিত করে রাখলাম কিছুক্ষণ।