রম্য রচনায় বিশাখা বসু রায়

নষ্টালজিয়া : লোয়ার সারকুলার রোড

আমাদের আদি বাড়ী ছিল রাজশাহী জেলার মালঞ্চী গ্রামে।
আমার ঠাকুরদা ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ।
উনি রাজশাহী থেকেই অবিভক্ত বাংলা, বিহার, ওড়িশা ‘র Matriculation পরীক্ষা তে প্রথম স্থান অধিকার করেন , তার পর Presidency College থেকে BSc. Mathematics এ First Class First আর MSc. Mathematics এ Calcutta University তেও First Class First হলেন ।
তার পর উনি বিলেত যাবার প্রস্তাব উপেক্ষা করে সরকারি চাকরি তে ঢুকলেন , আর Undivided Bengal er District Magistrate হয়ে retire করলেন ।
এর পর ই এলো partition !
দেশ ভাগের সময় উনি কলকাতায় চলে আসার সিদ্ধান্ত নেন ।
শুনেছি এই সময় অনেকে property exchange করে এ দেশের লোক ও দেশে চলে গেছেন , আবার ও দেশের লোক এ দেশে চলে এসেছেন ।
আমার ঠাকুরদা যেহেতু কারোর সঙ্গে property exchange করেন নি , তাই সেই সম্পত্তির কাগজ পত্র সব ওখানেই রেখে এসেছিলেন !
এও শুনেছি , আমাদের সম্পত্তির দেখা শোনা যে নায়েব মশাই করতেন , হাফিজ চাচা , উনি নাকি পরবর্তী কালে আমাদের সম্পত্তি সব হাপিজ করে দিয়েছিলেন !

যাই হোক , আমার আজকের গল্প সে বিষয়ে নয় !

আমার ঠাকুরদা ছিলেন বংশের একমাত্র ছেলে । ওনার দুই বিবাহিত বোন ছিল যারা বাংলাদেশে থাকতেন !
দেশ ভাগ হবে জেনে আমার ঠাকুরদা Lower Circular Road এ একটা বিরাট বাড়ী ভাড়া নেন । সে বাড়ীতে সতেরো (17) খানা বিরাট বিরাট ঘর ছিলো । বাড়ীওয়ালা ছিলেন অবাঙালী , দেশে থাকতেন । কলকাতায় খুব কমই আসতেন ! উনি নিজেদের থাকার জন্য কয়েকটা ঘর বন্ধ রেখে বাকিটা আমার ঠাকুরদাকে ভাড়া দিলেন ।
মৌলালি থেকে মল্লিক বাজার যেতে গেলে বাঁ দিকে Sur Industries এর বিরাট factory ছিলো , আর তার ঠিক উল্টো দিকে , ডান হাতের রাস্তাতে ছিলো এই বাড়ী , যার ঠিকানা ছিলো Lower Circular Road , লোকে বলে তালতলা ।
রাস্তার মাথায় ছিলো বসন্ত কেবিন , যেখানে অত্যন্ত সুস্বাদু Fowl Cutlet পাওয়া যেতো !
দোতলা বাড়ী , দুদিকে দুটো টানা বারান্দা …উত্তরের বারান্দায় দাঁড়ালে পুরো রাস্তা টা দেখা যেতো , আর দক্ষিণের বারান্দার পেছনে ছিলো মস্ত বড় খোলা মাঠ !
আর ছিলো বিরাট খোলা ছাত !
এই বাড়ীতে প্রথমে এসে উঠলেন আমার ঠাকুরদা ওনার মা , স্ত্রী , আর সাত সন্তান নিয়ে । বড় মেয়ের আগেই বিয়ে হয়ে গিয়েছিল।
এর পর এলেন ওনার বড় বোন, তাঁর স্বামী ,আর আট সন্তান নিয়ে , তারপর ছোট বোন , তাঁর স্বামী,
আর চার সন্তান নিয়ে । আর এলেন দূর সম্পর্কের এক ভাগ্নে !
এর পর আমার ঠাকুরদার বড় জামাই (আমার বড় পিশেমশাই ) বিলেত গেলেন পড়াশোনা করতে …এ বাড়ীতে রেখে গেলেন্ আমার পিশিমাকে , তার চার সন্তান , আর নিজের ভাই বোনদের !
একটা সময় এ বাড়ীতে 35/36 জনের পাত পড়তো !
বাড়ী পুরো জমজমাট ! সব ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করে ….প্রত্যেকেই নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার লড়াই লড়ছে !
উত্তর কলকাতার পুরোনো বাড়ী , হাত বাড়ালেই পাশের বাড়ীর জানালা ছোঁয়া যায় !
বাঁ দিকে চ্যাটার্জি বাড়ী , যে বাড়ীতে থাকতেন চ্যাটার্জি দম্পতি , ও ওঁদের তিন সন্তান ।
বড় মেয়ে পূরবী , রবীন্দ্র সঙ্গীত শিখতেন ।
শুনেছি , ওঁকে গান শেখাতে আসতেন শ্রদ্ধেয় হেমন্ত মুখোপাধ্যায় মহাশয় , …5 নম্বর, Galiff Street এর tram এ করে । নামতেন রাস্তার মোড়ে , আর হাঁটতে হাঁটতে আসতেন , সেই হাতা গোটানো বাংলা shirt আর ধুতি পরে ! লম্বা সৌম্য দর্শন ভদ্রলোক !
উনি Bombay চলে যাবার পর শুনেছি , আসতেন শ্রদ্ধেয় দেবব্রত বিশ্বাস মহাশয় !
পরবর্তী কালে পূরবী চট্টোপাধ্যায় বিবাহ সূত্রে হন পূরবী মুখোপাধ্যায় , নামকরা রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী !
উল্টো দিকের কোন একটা বাড়ীতে নাকি ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব আসতেন।

এর পর এক এক করে ছেলেরা প্রতিষ্ঠিত হলো , আর যে যার সংসারে চলে গেলো , তাদের বাবা মা কে নিয়ে , আর মেয়েদের সব বিয়ে হয়ে গেলো !

আমার যখন জ্ঞান হয় , তখন ওই বাড়ীতে থাকতেন আমার ঠাকুরমা , ঠাকুরদা , আমার বড় জ্যেঠামশাই ,যিনি High pressure এ ভুগতেন , আর ঠাকুরদার সেই দূর সম্পর্কের ভাগ্না । তবে পূজো পার্বণে সব ছেলে মেয়েরা আসতেন তাদের বউ বাচ্চা দের নিয়ে ।
তখন বড় হল ঘরে আসন পেতে সবাই মাটিতে খেতে বসতো….বড় বড় কাঁসার থালায় , মোটা ভারী কাঁসার গেলাস , ভারী ভারী কাঁসার বাটিতে খাওয়া হতো । এঁটো কাঁটার বালাই ছিলো খুব ! তাই বামুন ঠাকুর খাবার পরিবেশন করবার সময় খুব সাবধানে থাকতে হতো ..ছোঁয়াছুঁয়ী না হয়ে যায় !
ছোট ছোট হাতে (শুধু ডান হাত ব্যবহার করা যাবে )ভারী গেলাস তোলা , সে এক বিরাট পরীক্ষা !
তবে এতজন মিলে একসঙ্গে বসে খাওয়া …মজাই ছিলো আলাদা ! ! !
বড় জ্যাঠামশাই অকালে মারা যাবার পর ঠাকুরদা , ঠাকুরমা ও তাদের ভাগ্নে চলে গেলেন শান্তিপুরে …যেখানে ওদের একটা বাড়ী ছিলো !
ওই তালতলার বাড়ীর কি পরিণতি হলো আর খোঁজ পাওয়া গেলনা !
এত বড় বাড়ী …হয়তো কোন promoter এর হাতে পড়ে এখন Multistoried building এ পরিণত হয়েছে !
জানিনা ! ! !

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।