গদ্যে ড: বিশাখা বসু রায়

নস্টালজিয়া ২
আলুগাপ্পা
Higher Secondary পরীক্ষা পাশ করার পর ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পেলাম।
কিন্তু সরাসরি তো সেখানে যাওয়া যাবে না,
এর আগে এক বছর Pre Medical পড়তে হবে!
নীলরতন আর ক্যালকাটা মেডিক্যাল কলেজের মেয়েদের এক বছর Bethune কলেজে কাটাতে হবে।
পরিচিত গন্ডি পেরিয়ে অপরিচিত এলাকা,
দুতিনবার বাস ট্রাম বদলে যেতে হবে।
সেখানে দু একদিন ক্লাস করার পর বুঝলাম,
Higher Secondary তে যা পড়ে এসেছিলাম,
সেগুলোই আবার পড়তে হবে।
অপরিচিত সহপাঠী,
কিন্তু বন্ধু বানাতে দেরী হলোনা!
পড়ার চাপ কম থাকাতে আনন্দে দিন কাটাতে লাগলাম।
যা কোনোদিন করিনি,
শেষ বেঞ্চে বসে বন্ধুদের হস্ত রেখা গণনা করতাম,
আড্ডা গল্পে সময় কাটাতাম।
ম্যাডাম বকলে ক্লাস ছেড়ে মাঠে বসে আড্ডা মারতাম।
দিনের শেষে ক্লাস থেকে বেরিয়ে দেখতাম গেটের ভেতরে “মতি ” আলুকাবলির ঝুড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
মতি বোধহয় আমাদের বয়সী,
বা আমাদের থেকে একটু বড় হবে,
তাই তাকে ” মতি ” না “মতি দাদা ” ডাকতাম,
আজ এতদিন পরে আর মনে নেই।
তবে ওর মুখের হাসিটা মনে আছে,
যেটা আমাদের দেখেই ফুটে উঠতো!
হাতে সামান্য পয়সা,
তাই বাঁচিয়ে, বন্ধুরা মিলে,
ঝাল ঝাল আলুকাবলি খেতাম।
তারপর যখন ঝালের চোটে হুশহাশ করতাম,
তখন মতি একটা ছোট গোল আলুসেদ্ধ নিয়ে, মাথাটা কুরিয়ে,
তার মধ্যে মসলা আর টকজল দিয়ে যেটা খেতে দিতো,
তার নাম সে দিয়েছিলো “আলু গাপ্পা “।
সেই খেয়ে, জিভ ঝুলিয়ে ছুট লাগাতাম বাস স্ট্যান্ড এর দিকে।
কোনোদিন হাতে একটু পয়সা বেশী থাকলে ফুচকা ও জুটে যেতো কপালে।
কোনো কোনোদিন আবার ঝাল কাটাবার জন্য কমলা রঙের কাঠি Ice cream চুষতে চুষতে দৌড় লাগাতাম।
এবার 2/2B বাস দেখতে পেলে ওই উচ্ছল , প্রাণচঞ্চল, সদ্য যুবতী আমরা,
ছুট্টে গিয়ে সোজা দোতলায় উঠে যেতাম,
আর জানালার ধারের seat গুলো দখল করতাম।
বাস কালীঘাট ট্রাম ডিপো পৌঁছোলে নেমে ২৭ নম্বর ট্রামে উঠে পড়তাম!
মোমিনপুরে নেমে একটু হাঁটলেই বাড়ি পৌঁছিয়ে যেতাম।
দিনগুলো কী সুন্দর ছিলো,
জীবনের সব থেকে আনন্দের সময় বোধহয় এইটাই ছিলো।
বছরের শেষে আশাতীত ভালো ফলাফল করে ডাক্তারি পড়তে ঢুকে গেলাম।
ডাক্তারি পড়া তো নয়, যেন আখের রসের কলে ঢোকা!
নধর আখ হয়ে ঢুকে, ছিবড়ে হয়ে বেরোনো!
দিন নেই, রাত নেই, শুধু পড়া, পড়া আর পড়া!
সারাদিন একটা ক্লাস থেকে আর একটা ক্লাস এ ছুটে বেড়ানো,
সন্ধ্যে বেলায় কোচিং ক্লাস এ ছোটা,
আর রাতে ঘরে এসে সেই পড়া গুলো তৈরী করা!
এর মধ্যে এলো নকশাল আমল,
চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা,
পরীক্ষা দিতে বসলে ঠেলে তুলে দেওয়া!
শেষে পাঁচ বছরের সময় সীমা পেরিয়ে পাশ করতে করতে কেটে গেলো ছটা বছর!
তারপর Internship, House staffship
করতে আরো তিনটে বছর গেলো।
এর পর বাইরের জগতে পা দিতে হবে,
চাকরির সন্ধান করতে হবে তো!
দরকারি নথিপত্র গোছাতে গিয়ে দেখি,
Pre Medical এর Certificate টা তোলাই হয়নি।
একদিন ছুটলাম Bethune কলেজে।
Certificate পেতে বেশী বেগ পেতে হলোনা,
বেরিয়ে আসছিলাম,
হঠাৎ অনেকদিন আগের চেনা গলাটা ডেকে উঠলো,
“দিদি, আলুকাবলি খাবে না ?”
দেখি মতি, চুলে অল্প পাক ধরেছে,
আলু কাবলির ঝুড়ি নিয়ে হাসি হাসি মুখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে!
আমি অবাক, বললাম,
” মতি তুমি আমায় চিনতে পেরেছো ? ”
সে হেসে আলুকাবলি ভরা শালপাতার ঠোঙা এগিয়ে দিয়ে বললো, ” চিনতে পারবো না? ”
পরম তৃপ্তি করে আলুকাবলি খেয়ে টাকা দিতে গেলে সে কিছুতেই নিলো না,
একটা সেদ্ধ আলু কুরিয়ে,
তাতে মসলা আর টক জল ভরে,
এগিয়ে দিয়ে বললো, ” নাও, আলুগাপ্পা!”
দুর্দান্ত লেখা।