রবীন্দ্রনাথ আজ জন্মালে পরে খেতে পেতেন? রবীন্দ্রনাথের কথা তোলা বোধহয় বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে, তাই বলছি, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এ যুগের হলে কতটা কী করতে পারতেন? জানি, এই প্রশ্নটা শুনলে পরে ডোরা তৎক্ষণাৎ জিজ্ঞেস করত, রবীন্দ্রনাথ থেকে একলাফে সৌমিত্র? উত্তরে আমি হয়তো বলতাম, টাইম মেশিনে তো পেট্রল লাগে না, অতএব যেখান থেকে, যখন খুশি, যেখানে খুশি চলে যাওয়া যায় | কিংবা কে জানে, হয়তো কিছুই বলতাম না | নিজেকে যতটা চিনি তাতে দ্বিতীয়টাই হত খুব সম্ভবত | আর আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে ডোরা জিজ্ঞেস করত, কী হল, এয়ার নিচ্ছিস আমার ওপর নাকি সংলাপ মুখস্থ হচ্ছে?
ওই সংলাপই কাল হল আমার | ছোটবেলায় রজতবাবুর কাছে আবৃত্তি শিখতে যেতাম আর ছোটবেলা হলে যেটা হয়, যে কোনও জিনিস খুব গেঁথে যায় মনে | আমারও ওই গলা ওঠানো, গলা নামানো, ছোট ছোট খাঁজে অল্প অল্প ভাঁজ মানে, গোদা বাংলায় যাকে বলে ভয়েস মডুলেশন খুব পছন্দ হয়ে গেল | দিন নেই, রাত নেই, আমি গলায় শব্দ বসিয়ে খেলতে শুরু করলাম, আমার বয়সি বাচ্চারা যেভাবে হাতের পাতায় লাট্টু বসিয়ে খেলত | আর খেলাটা কখন যেন নেশায় বদলে গেল |
ওই নেশার ঘোরেই ছোট থেকে বড় হলাম আর হতে হতে বুঝলাম, আর সবকিছু ছাড়লেও নেশাটা ছাড়া যাবে না | কিন্তু আবৃত্তিকার হয়ে থাকতেও আমার মন চাইছিল না | কারণটা চুপি চুপি বলি, আয়নার সামনে দাঁড়ালে আয়না বেশ একটা সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত আমার দিকে | তখন টিনএজার, আয়নার তারিফ আমার ভিতরের সব স্বপ্নের সলতে পাকানো শুরু করে দিল। আর আমি সেই জোয়ারে ভাসতে ভাসতে শোভাবাজার, আহিরিটোলা, বাগবাজার ঘাট পেরিয়ে কোথায় কত দূরে যে চলে যেতাম, বাস্তবের ভাটায় ফিরতে সময় লাগত অনেক | এইভাবে যাওয়া-আসা করতে করতে মনের মধ্যে বুজগুড়ি কাটত একটাই উচ্চাশা , নেশাটাকে পেশায় বদলে নেওয়া যায় না ? নিজের স্বপ্ন সফল করার চেষ্টায় সব মানুষই সাধ্যমতো করে, মুখে বলুক আর না বলুক | আমিও করা শুরু করলাম কিন্তু আমার ক্ষেত্রে অচিরাৎ ফল ফলল না |
সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’-এর মতো আমার কোনও বন্ধু আমার জন্য ‘ব্রেক’ নিয়ে আসেনি, আপনা হাত জগন্নাথ, যে সমস্ত ফোটো (পাড়ার স্টুডিয়োতে তোলা) জমা দিয়ে এসেছিলাম টেকনিশিয়ান্স, ইন্দ্রপুরীতে – তাদের মধ্যেই একটা একদিন কোনও অ্যাসিস্টান্ট ডিরেক্টরের চোখে পড়ল, আর আমি একটা ফোন পেয়ে হাজির হলাম স্টুডিয়োপাড়ায় | রোলটা ছিল চার মিনিটের কিন্তু পার্ট-ফার্ট শেষ করে, নগদ আড়াইশো টাকা হাতে আর ঠোঁটে উইলস ফিল্টার নিয়ে যখন দাঁড়িয়ে আছি স্টুডিয়োর গেটের সামনে, তখনই ঘটনাটা ঘটল |
আমার কলেজের বন্ধু মলয় রাস্তা ক্রস করতে গিয়ে আমায় দেখতে পেয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল | কীভাবে, কে জানে, ওর মনে ধারণা জন্মে গিয়েছিল যে স্টুডিয়োর বাইরের গেটে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছি মানেই আমার বিরাট স্টার হওয়া শুধুমাত্র সময়ের অপেক্ষা | আমি ওকে অল্প কিছুক্ষণ বোঝানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিলাম | কিন্তু মলয়ের অতিশয়োক্তি আর অঢেল প্রশংসা নিতে পারছিলাম না | তাই ওকে নিরস্ত করব বলেই স্টুডিয়োর ভিতর বসে পানপরাগ চিবোনো মাড়োয়ারি প্রোডিউসারকে নকল করে দেখাতে শুরু করলাম | মলয় দেখছিল কি দেখছিল না খেয়াল করিনি কিন্তু মিমিক্রি করতে করতেই টের পেলাম যে সামান্য দূর থেকে অন্য একজন আমায় খেয়াল করছেন | তখন এমন মাঝদরিয়ায় যে নিজেকে থামানোর উপায় নেই, এদিকে শিরশিরানি একটা ভয়ও উঠে আসছে মেরুদণ্ড বেয়ে | কিন্তু সেই ভয়ের পাশাপাশি ঠিকঠাক একটা জিনিস করতে পারার উত্তেজনাও সেই প্রথম টের পেয়েছিলাম | ওটাকেই কি শিল্পের সঙ্গে শিল্পীর সংযোগ বলে ? যাক গে, এসব ভারী ভারী কথা না বলাই শ্রেয়, যা হয়েছিল সেটাই বরং বলি | আমার নকলনবিশি শেষ হতেই আমি একটা হাততালির শব্দ শুনলাম এবং একটু আগে যিনি বন্ধুর সিরিয়ালে আমার অভিনয় দেখে, ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ কিছুই বলেননি, সেই পরিচালক শোভন সরখেল আমার সামনে এসে বললেন, তুমি তো ছুপা রুস্তম হে! পেটে পেটে এত ট্যালেন্ট লুকিয়ে রেখেছ, ডিক্লেয়ার না করলে ইনকাম ট্যাক্সের লোকরা এসে ধরবে তো।
কী বলব বুঝতে না পেরে তোতলাতে তোতলাতে বললাম, মানে এমনিই একটু এন্টারটেইন করব বলে…
শোভন সরখেল এক দাবড়ানি দিয়ে বললেন, তোতলাচ্ছ কেন, আমি কি তোমার ওই আড়াইশো টাকা কেড়ে নেব নাকি?
আমি আবার বললাম, না মানে …
– কোনও মানে-ফানে নেই | তোমায় আমি আমার নেক্সট টেলিফিল্মে নায়কের রোলটা দেব | করবে ?
হাতে চাঁদ দিয়ে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে, নেব কি না, কী বলবে মানুষ তখন? এমন কিছু যে ঘটতে পারে, আমি কি এক মুহূর্ত আগেও আশা করেছি? এখন যখন ঘটছে তখন নার্ভাস লাগবে না?
চুপ করে আছি, শোভনদা আবার জিজ্ঞেস করলেন, করবে ?
মলয় বলে উঠল, আপনি চান্স দিচ্ছেন আর ও করবে না, এ কখনও হতে পারে ?
শোভনদা গলা তুলে বললেন, আলবাত হতে পারে, একশোবার হতে পারে | শিল্পীর সম্মান তার জীবন কিংবা মৃত্যুর চাইতে বড় | শিল্পী কারও চাকর নয় যে বলামাত্র তাকে যে কোনও প্রস্তাবে রাজি হতে হবে |
– কিন্তু আপনি বলছেন … আমি বলে উঠলাম |
– আমি কে ? ফেলিনি না গোদার? নাকি ঋত্বিক ? শোভনদা একটা সিগারেট ধরালেন , আর যদি ওদের মতো কেউ হইও তবু তুমি তো তুমি | তোমার গ্রহণ-বর্জনের স্বাধীনতা থাকবে না ? পরশু দিন বেলা সাড়ে এগারোটায় এখানেই আমার সঙ্গে দেখা করবে আর তার আগে একদম ফোন করবে না |
আমি হেসে ফেললাম আর মলয় বলে উঠল, স্টার হয়ে গেলি, তুই আজ থেকে স্টার হয়ে গেলি |
শোভনদা এক পা এগিয়ে গিয়েছিলেন, কথাটা শুনে পিছিয়ে এসে আগুন চোখে মলয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, স্টার নয় শিল্পী | অভিনেতা | স্ক্রিপ্ট দেখে পছন্দ না হলে যার প্রত্যাখ্যান করবার হক আছে, ছুড়ে ফেলে দেবার অধিকার আছে |
সেদিন মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম শোভনদার কথা শুনে, ছাতি ফুলে উঠেছিল গর্বে | মনে হয়েছিল শিল্পের পথ মোড়ে মোড়ে তোরণ তৈরী করে স্বাগত জানাচ্ছে আমায়, আমি এগিয়ে গেলেই পুষ্পবৃষ্টি হবে আমার মাথার ওপর, চন্দনের সুগন্ধ সৃষ্টি হবে আমারই শরীর থেকে |
আচ্ছা, মদের গন্ধকে কি সুগন্ধ বলা চলে ? জানি না কিন্তু সেদিন মলয়ের প্রতি একটা অসম্ভব কৃতজ্ঞতা জন্ম নিয়েছিল।|বলে ওর প্রস্তাব আমি ফেলতে পারিনি। ওর সঙ্গে একটু নেশা করতে একটা বারে ঢুকে পড়েছিলাম। আর ঢুকতে ঢুকতে বলেছিলাম, কী মনে হচ্ছে জানিস, আমার সাফল্য যেন তুই হাতে করে বয়ে নিয়ে এসেছিস, আমার মাথায় মুকুটের মতো পরিয়ে দিবি বলে ।
উত্তরে অনেক কথা বলেছিল মলয় আর আমি প্রায় প্রত্যেকটাই বিশ্বাস করছিলাম। ইচ্ছে করছিল বিশ্বাস করতে। আরে শরীরে না থাক, মদে না থাক, বিশ্বাসের গায়ে যে সুগন্ধ আছে সে কথা কে না জানে ?
কিন্তু মাস দেড়েক পরে সত্যি সত্যিই যখন সেই টেলিফিল্মের শুটিং শুরু হল, আমার মনে হল আমি যেন সেরকম একটা শহরে ঢুকে পড়েছি যেখানে নিঃশ্বাস নেওয়ার মানে দিনে কুড়িটা করে সিগারেট খাওয়া | প্রথমেই দেখলাম যে আমার চরিত্রটা নায়কের নয় | আসলে ওটা এমনই একটা টেলিফিল্ম যেখানে গল্পই নায়ক | অন্যভাবে বলতে গেলে ওটা একটা নায়িকাপ্রধান কাহিনি | সে যাক গে, চার মিনিটের রোল থেকে যখন চল্লিশ মিনিটের রোলে এসে পৌঁছতে পেরেছি তখন ও সমস্ত নিয়ে না ভাবাই উচিত | আমিও ভাবনাচিন্তা মুলতুবি রেখে কনসেনট্রেট করার চেষ্টা করছিলাম কিন্তু শোভনদা অকারণে খারাপ ব্যবহার করছিলেন আমার সঙ্গে | ফ্লোরের একদিকে প্লাস্টিক চেয়ারে বসে থাকা এক ভদ্রমহিলাকে দেখিয়ে বললেন, একে আবার নকল-টকল করতে যেয়ো না যেন | মাঝপথেই শুটিং বন্ধ হয়ে যাবে | আমি থতমত খেয়ে চুপ করে রইলাম, বয়সের আগে বুড়িয়ে যাওয়া সেই ভদ্রমহিলাও কিছু বুঝতে না পারা চোখে তাকালেন এদিক-ওদিক | একটু পরেই জেনেছিলাম উনিই প্রযোজিকা এই টেলিফিল্মের | কিন্তু বুঝিনি কেন ওঁর সামনে শোভনদা মাঝেমধ্যেই আংসাং কথা বলছিলেন আমাকে | হতে পারে যে ওই রোলটা আমাকে দেওয়ার জন্য শোভনদাকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল, এও হতে পারে যে একটা নতুন কিছু তৈরির সময় পরিচালকের মনে যে টেনশন থাকে, তার ছুটকো-ছাটকা এদিক-ওদিক উড়ে আসে | বললে, আত্মপ্রশংসার মতো শোনাবে কি না জানি না কিন্তু ঘটনা হল সেইসব উল্কা, ধূমকেতু আমি ভালই হ্যান্ডল করছিলাম | এবং অভিনয়টাও করার চেষ্টা করছিলাম মন, প্রাণ, শরীর, সবকিছু নিংড়ে | হাজার হোক, প্রথম সুযোগ, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, ওটা যে সুযোগ, ওটা যে আমি নাও পেতে পারতাম, দৈবাৎ পেয়ে গেছি, কাজ করতে করতে সে কথা মন থেকে মুছে গিয়েছিল একদম | মনে হচ্ছিল, এ তো আমার চরিত্র, আমার ভূমিকা, আমি ছাড়া আর কেউ সুবিচার করতে পারত না এই পার্টটার প্রতি | একেই কি ইগো বলে ? বলে, অহঙ্কার ? যা পতনের মূল ?
ডোরা প্রতিবাদ করে উঠত, এই জায়গাটায় | ডোরা আমার প্রথম টেলিফিল্মের সহকর্মী | কিন্তু তিন দিন শুটিং-এর পরই আমার মনে হয়েছিল ও কলিগ কম, বন্ধু বেশি | এই বন্ধুত্ব কি প্রেম ? মোটেও নয়, অন্তত তখনও নয় | তা হলে, আকর্ষণ ? ডোরাকে যাঁরা চেনেন তাঁরা নিশ্চয়ই মানবেন দেখলে পরেই প্রবলভাবে আকর্ষিত হওয়ার মতো চেহারা ডোরার নয় | মাঝারি উচ্চতা, শ্যামলা রং, গালে ব্রণর দাগ – আমি মেক-আপ ছাড়া প্রথম দিন ওকে দেখে হতাশ হয়েছিলাম | এই মেয়েটা নায়িকার রোল করবে ? মানাবে একে?
ক্যামেরার সামনে সেই ডোরাকে দেখেই চমকে গিয়েছিলাম | মনে হয়েছিল, অন্ধকার একটা গাছের ডালে-ডালে, পাতায়-পাতায় কে যেন টুনি বাল্ব লাগিয়ে দিয়ে গেছে | আর ‘অ্যাকশন’ শোনামাত্রই সবকটা টুনি জ্বলে উঠছে একসঙ্গে | গা ছমছমে পরিবেশটা মুহূর্তে বদলে যাচ্ছে উৎসবের পরিবেশে | আমি একা নই, ফ্লোরে উপস্থিত সবাই টের পেত একটা বদল ঘটে যাচ্ছে ভিতরে ভিতরে; একটা সাধারণ চেহারার মেয়ে অসাধারণ হয়ে উঠেছে লাইট আর সাউন্ডকে হাতিয়ার করে | দখল নিয়ে নিয়েছে পুরো সিচুয়েশনটার | আর তার সঙ্গে যারা কাজ করছে তারা নেহাতই বোড়ে, কেউ কেউ ঘোড়া বা গজ | কিন্তু সে যেন মন্ত্রী | সোজাসুজি, কোনাকুনি যত ঘর ইচ্ছে, যতবার ইচ্ছে, অবাধে বিচরণ করতে পারে আর নিজেকে করে তুলতে পারে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু |
আর এখান থেকেই ডোরার প্রতি একটা মুগ্ধতা তৈরি হল আমার | অথচ ডোরা সেই মুগ্ধতা ভাঙতে শুরু করল দ্বিতীয় বা তৃতীয় আলাপেই | আর তখনই আমার মনে হতে শুরু করল যে ডোরা হয়ত মাটির মানুষ | উল্টোদিকে আমি নিজেই একটা অহংকারের স্তূপ, একটা ইগোর বান্ডিল |
– মোটেই না, মোটেই না | বলে উঠত ডোরা |
– কিন্তু তুমি যেরকম সহজে মিলেমিশে যাও সবার সঙ্গে, আমি তো পারি না কই ? আমি জিজ্ঞেস করতাম |
– সেটা তুমি আমার মতো নও বলে | তুমি ইন্ট্রোভার্ট বলে |
– আর তুমি এক্সট্রোভার্ট ? আমি ডোরার দিকে অপলক তাকিয়ে জিজ্ঞেস করতাম।
– আমি কিচ্ছু নই, কিচ্ছু না | সাপ নই, ব্যাং নই, নই আমি কিচ্ছু। ডোরা হো হো করে হেসে উঠল আমার কথার উত্তরে । তারপর চোখ নাচাল আমার দিকে তাকিয়ে।
– ধ্যাত, ইয়ার্কি মারছ তুমি |
– সত্যি বলছি, মা কসম | অভিনয় যে করে তার কিচ্ছু হতে নেই, কিচ্ছু হওয়া চলে না | সে এই সাধু তো এই লম্পট; এই পতিব্রতা তো ওই বেশ্যা; পলকে স্থিতি, পলকে লয় | মুহূর্তে ইয়েস, আবার মুহূর্তে , নো; তুমি বলো, অভিনেতা-অভিনেত্রীর কিছু হওয়া সাজে ? তাদের জলের মতো হয়ে থাকতে হয়, যখন যে পাত্র পাবে, তার আকার নেবে |
– যখন যেমন রোল পাব সেই রোলে আমার আমিকে মিশিয়ে দেব, তাই তো ? আমি যেন ডোরাকে মাস্টার পেয়েছি, এভাবে জানতে চাইলাম।
– মিশিয়ে দেবে না, মিশিয়ে দিলে তো তুমি থেকে গেলে চরিত্রটার ভিতরে | তুমি নিজেকে বিসর্জন দেবে |
– তা কী করে হয় ? আমিই তো করছি অভিনয়টা ?
– তুমিই করবে | কিন্তু কীভাবে করতে হবে বলো তো ? খোসা যেভাবে ফলটাকে ধরে রাখে ঠিক সেভাবে তোমার চেহারা, এক্সপ্রেশন, ডায়ালগ থ্রোয়িং — ক্যারেক্টারটাকে ধরে রাখবে | যখন লোকে তোমার অভিনয়ের রস আস্বাদন করবে তখন ‘তুমি’ লোকটাকে খোসার মতো ছুড়ে ফেলে দেবে বাইরে, কোথায় পড়ল তাকিয়েও দেখবে না |
– স্ট্রেঞ্জ ! এভাবে ভেবে দেখিনি তো কখনও |
– ‘ভাবো, ভাবো, ভাবা প্র্যাকটিস করো |’ ঋত্বিক বেঁচে থাকলে বলতেন | ডোরা আবারও হেসে উঠল |
আমি ওর হাসিতে যোগ না দিয়ে চুপ করে রইলাম | মাথার মধ্যে তখন অনেকগুলো ভাবনা একটা মিক্সির ভিতরে ঘেঁটে ঘ হয়ে গেছে।
আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে ডোরা বলল, অত ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই, ব্যাপারটা আদতে সহজ | তুমিই ভাবো না, ‘পথের পাঁচালি’ কিংবা ‘রশোমন’-এর অভিনেতাদের নাম আমরা মনে রাখি ? আমরা মনে রাখি অভিনীত চরিত্রদের | কিন্তু টলিউডে এরকম কটা উদাহরণ তুমি পাবে হে ? আর তা ছাড়া উদাহরণ দেখলেই যে তা ফলো করতে হবে, এমন কোনও কথা নেই কারণ শেষ অবধি এই রাস্তাটা সাকসেসের রাস্তা নয় |
– এটা আবার কী বলছ ? মন্ত্রমুগ্ধ ছাত্র থেকে কনফিউজড শ্রোতায় রূপান্তরিত হয়ে আমি জিজ্ঞেস করলাম।
– ঠিকই বলছি | সাকসেস তখন আসে যখন নায়ক রিক্সাওয়ালার পার্ট করলেও সে নায়ক আর নায়িকা বাসন মাজলেও সে নায়িকা | চরিত্রের চেয়ে অভিনেতা-অভিনেত্রী বড় না হলে সাফল্য আসবে কী করে ? অমিতাভ বচ্চন, শাহরুখ খান, মাধুরী – সব একই ইতিহাস | এমনকি উত্তমকুমারের বেলাতেও এই কথাটা সত্যি। ওদের টানে যে লোকগুলো হলে ছুটে গেছে বা যায় তারা ওদের দেখতেই যায়। ওদের অভিনীত চরিত্রগুলো সেখানে গৌণ।
– উফ, আমার মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে তোমার উল্টো কথা শুনে |
– উল্টো কথাটাই তো কথা | সোজা কথা তো জাস্ট আ স্টেটমেন্ট। ডোরা হেসে উঠল আবার।
ওর কথার মধ্যেই শোভনদা আমাদের সামনে চলে এসে তুমুল বকা লাগালেন, এটা কী হচ্ছে ডোরা? নতুন ছেলেটার মাথা খাচ্ছ কেন তোমার তত্ত্বকথা শুনিয়ে ? এরপর ও ক্যামেরার সামনে সবকিছু গুলিয়ে ফেলবে তখন প্রোডিউসারের জুতো-লাথি কে খাবে শুনি ? তুমি ?
ডোরা একটা অদ্ভুত মুখভঙ্গি করল তারপর শান্ত মেয়ের মতো, আমার সামনে থেকে উঠে চলে গেল, শোভনদার কথা শেষ হতেই। সেই উঠে যাওয়ার ভঙ্গিতে আমি একসঙ্গে সোজা আর উল্টো দুটো দিকই দেখতে পেলাম | ভাবটা এমন হতে পারে যে ‘ক্ষমা করে দিন শোভনদা, আমিই সব কিছুর জন্য দায়ী |’ আবার ভাবটা এমনও হতে পারে যে, ‘আমি তো আমার কথা বলবই, যার ইচ্ছে করবে না শুনবে না; কিন্তু কেউ যদি শোনে তো আমি কী করব ?’
শুটিং চলছিল, চলতে থাকল, একসময় শেষও হল | যদিও টেলিফিল্ম আজ দেখালে লোকে কাল ভুলে যায় তবু আমার প্রথম টেলিফিল্মের খ্যাতি হল, চ্যানেলে অনেক দর্শকের অনুরোধ আসায় রিপিট টেলিকাস্টও হল বার দুয়েক | আর সবচেয়ে বড় কথা , অভিনেতা হিসেবে অল্পস্বল্প নাম হল | আমি স্টার হয়ে গেলাম না কিন্তু আমার অজান্তেই একটা পরিচিতি তৈরি হল আমার | জোকা, পৈলান পেরিয়ে বিষ্ণুপুরের আমতলার বাড়ি ছেড়ে আমি কুঁদঘাটের একটা ছোট্ট ফ্ল্যাটে ভাড়া চলে এলাম | নানুবাবুর বাজারে রিক্সা থেকে নামলে বা অটোয় উঠলে লোকে টুকটাক চিনতে শুরু করল আর তখনই উত্তমকুমারের সেই অমোঘ উপদেশের কথা বারবার করে মনে পড়তে লাগল , অভিনেতাকে ওভার এক্সপোজড হতে নেই | যদিও মহানায়ক সেই কথা বলেছিলেন , শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়কে নিজের গাড়িতে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে পেট্রোল ভরাতে দেখে, তবু আমার কেন জানি মনে হতে লাগল সে কথাটা আমার ক্ষেত্রেও খাটে | শুভেন্দু সেই সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক আর আমি নেহাত চুনোপুঁটি; টেলিফিল্ম আর সিরিয়ালে কাজ করছি, তাও কেন যে মনে হতে লাগল, গাড়ি দরকার, আমারও একটা গাড়ি দরকার …
রবীন্দ্রনাথ এখন কী করতে পারতেন, সৌমিত্র হিরো হতে পারতেন কি না, এই জাতীয় বেয়াড়া প্রশ্নের উত্তর না দিক, জীবনের সঙ্গে জড়িত প্রশ্নের উত্তর মন ঠিকই দেয় | আর দেয় বলেই আমি জানলাম যে আমার মাথার মধ্যে ওই উল্টো-সোজার কারসাজি যার জন্য শুরু হয়েছে, তার নাম ডোরা | সে পলকে বলবে, আত্মবিলোপ করো, হয়ে ওঠো নিজের অভিনীত চরিত্রটাই; পরমুহূর্তেই বলবে, এখানে এসব করে কী লাভ ? তার চেয়ে নিজের কিছু ম্যানারিজম তৈরি করো যাতে লোকে ছোট বা বড় পর্দায় তোমাকে দেখলেই চিনতে পারে |
– কেন কন্ট্রাডিক্ট করো নিজেকে ? আমি জিজ্ঞেস করলাম ।
– কেন রাম বললে রাবণটাও বলি, যুক্তি দিলে পরক্ষণেই হাজির করি তার পাল্টা যুক্তি ? কেন ? ডোরা পালটা প্রশ্ন করল।
সেদিন আমরা বসেছিলাম একটা নির্জন রেস্তরাঁয় | বিরাট হাই-ফাই কিছু নয় কিন্তু ভীষণ আরামদায়ক | এলিয়ে বসার মতো সোফা, দেওয়ালে আলো-আঁধারির কাটাকুটি, ব্যাকগ্রাউন্ডে লাইট ক্লাসিকাল, মনটাকে চুরমুরের মতো দেখে একটা অন্যরকম কিছু করছিল |
স্যুপে ফুঁ দিয়ে ঠিক তখনই ডোরা আমায় ‘তুই’ বলে বলল, আমায় ট্রিট দিচ্ছিস কেন ?
– কারণটা তুমি, মানে তুই জানিস, আমি একটা বড় ব্যানারের সিনেমায় সেকেন্ড লিড করার চান্স পেয়েছি | যে রোলটা পাওয়ার জন্য অনেকে অনেক কসরত করছিল, একেবারে কিচ্ছু না করে, আই মিন, কোনও পি আর না করে সেই রোলটা আমি পেয়েছি | আর পেয়েছি বলেই …
– তোর মনে হচ্ছে যে এই রোলটা পাওয়ার পিছনে নিশ্চয়ই ডোরার হাত আছে কারণ ডোরা নিজেও এই ছবিটায় আছে; তাই তোর কৃতজ্ঞতাবোধ তোকে বলছে যে ডোরাকে একটা ট্রিট দেওয়া উচিত | ব্যাপারটা এই তো? ডোরা স্থির দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল।
আমার কী মনে হল আমি বলতে পারব না, শুধু বলতে পারি মাথার ভিতর রক্ত এমন ঝনরঝন নেচে উঠল যে আমি অগ্রপশ্চাৎ, সোজা-উল্টো সব ভুলে গিয়ে আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকা ডোরার মুখটা ওর ঘাড়ের পিছনে হাত দিয়ে নিজের দিকে টেনে নিয়ে একটা চুমু খেলাম ওর ঠোঁটে | তারপর আবার একটা | একটু বেশি সময় ধরে | আমাদের টেবিলটা রেস্তরাঁর একটু কোণের দিকে বলে কেউ খেয়াল করল না ব্যাপারটা | কিংবা হয়তো করল | কে জানে ! আমার মাথায়, মনে তখন ডোরা ছাড়া আর কিছু নেই |
ডোরা কথা পড়তে না পড়তেই জবাব দেওয়ার স্বভাবটা ভুলে চুপ করে বসে ছিল মাথা নামিয়ে | একজন ওয়েটার অর্ডার নিতে এসে, কে জানে কী মনে করে, কোনও কথা না বলে সামনে থেকে চলে গেল | আমি উত্তেজনা আর আনন্দে ছটফট করতে করতে হঠাৎ করে শান্ত হয়ে গেলাম | দিনের আলোয় কিচিরমিচির করতে থাকা পাখিরা যেরকম সূর্য ডুবে গেলে হঠাৎ শান্ত হয়ে যায়…
– কেন এরকম করলি ? ডোরা মাথা তুলে জিজ্ঞেস করল বেশ কিছুক্ষণ পর।
– আমি জানি না ডোরা, বলতে পারব না |
– তোকে বলতেই হবে |
– তা হলে এটুকু বলতে পারি, তোকে আমি ভালোবাসি | আমি সারেন্ডার করলাম |
– খুব ক্লিশে , খুব একঘেয়ে শোনাচ্ছে।
– শোনাক, আমি তো রবীন্দ্রনাথ নই |
– তুই সৌমিত্রও নোস | কিন্তু নিজেকে ভাবিস বোধহয়? ডোরা হালকা হাসল |
– মোটেই ভাবি না | আমি সাধারণ, তুচ্ছ কিন্তু …
– অত অ্যাডজেকটিভ দিতে হবে না | তার চেয়ে যে এক্সপ্রেশনটা দিচ্ছিস এখন সেটা মনে করে রাখ, এটাই ক্যামেরার সামনে দিতে হবে |
– কেন ? আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম |
– এই সিনেমাটায় আমার আর তোর একটা বেডসিন আছে জানিস না ? ডোরা জোরে হেসে উঠল |
আমি থতমত খেয়ে গরম স্যুপ ফুঁ না দিয়েই মুখে দিলাম |
জিভ পুড়ল |
২.
কপাল যে এভাবে পুড়বে, এমন অপ্রত্যাশিতভাবে, ভাবতেও পারিনি | কেই বা পারে ? চারপাশে অনেককে ট্রেনে-বাসে কাটা পড়তে দেখেও মানুষ নিজেকে দুর্ভেদ্য ভাবে, নিজের ঘরের লোককে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, ক্যান্সারে মরতে দেখেও মানুষের অমর বলে মনে হয় নিজেকে | এই আশাবাদের জোরটুকু না থাকলে প্রতিদিনের পথ চলাও হয়তো সম্ভব হত না , সবাই মুখ থুবড়ে পড়ত দরজার বাইরে পা রাখতে না রাখতেই | আমি আলাদা হব কী করে ? বিশেষ করে যখন আমার মনে হচ্ছে যে এইবার কপাল খুলছে, তালগোল পাকানো অক্ষরগুলো নিজেরাই নিজেদের সাজিয়ে সমাধান করে ফেলছে ধাঁধা তখন আবার খারাপ কিছুর কথা ভাবতে যাব কোন দুঃখে ?
কোনও কারণ ছিল না অবশ্য |
প্রথম দিন শটের পর পরিচালক নিজে ডেকে আমার কাজের প্রসংসা করলেন | আমি শুটিং সেরে ফেরার পথে ইন্দ্রপুরীতে গিয়ে একটা প্রনাম ঠুকে এলাম শোভনদাকে | হাজার হোক, উনি প্রথম ব্রেকটা দিয়েছিলেন বলেই …
– অনেক দূর যাবি, তুই আরও অনেক দূর যাবি | শোভনদা আলতো হেসে বললেন |
আমি কোনও কথা না বলে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম | মনে মনে বললাম, আমাকে যেতেই হবে |
রাত্রে ফোন করলাম ডোরাকে | আমি তখন সপ্তম স্বর্গে | শোভনদার শুভকামনাটার কথা জানালাম | আমার কাজ কীরকম হয়েছে জিজ্ঞেস করলাম |
ডোরা কীরকম একটা কাঠ কাঠ গলায় উত্তর দিল, ভালই তো করছিস |
– ভালো ? শুধু ভালো ? আমি নিবে যাওয়া গলায় বললাম |
– তাহলে কী বলতে হবে বল ? ডাস্টিন হফম্যানের মতো ? নাসিরুদ্দিন শাহর মতো ? ডোরা একটা হাই তুলল |
– তোর কী হয়েছে ডোরা ? আমি রীতিমতো হার্ট হয়ে জিজ্ঞেস করলাম |
– কী আবার হবে, কাল শুটিং আছে, ঘুমোতে হবে না ?
তখনই মনে হল পিছনে যেন কোনও পুরুষের গলার আওয়াজ শুনলাম | ডোরা তো যতদূর জানি, লেক গার্ডেন্সে একটা ফ্ল্যাটে একা থাকে, তা হলে এত রাতে ওর ঘরে কে এল ? জিজ্ঞেস করব ? পরক্ষণেই নিজেকে নিজেকে অনেক তিরস্কার করে সন্দেহটাকে বার করে দিলাম মাথা থেকে | ডোরার ঘরে কেউ আসেনি, যেহেতু ডোরা আমার কাজের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেনি, তাই আমার এসব মনে হচ্ছে | ছিঃ !
– রাখছি বুঝলি | ডোরার গলাটা তীক্ষ্ণ শোনাল |
– ওকে বাই, গুড নাইট | আমি বললাম।
ফোনটা ছেড়ে দিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে আমার ফ্ল্যাটের লাগোয়া ছোট বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম | বাতাসের ধোঁয়ার সঙ্গে বুকের ভিতরের ধোঁয়া মিশে কীরকম সব জটিলতার সৃষ্টি হল | যে ডোরার সুপারিশ ছাড়া আমি এই রোলটা পেতেই পারতাম না, আমাকে ভালো কাজ করতে দেখে তার গলা এতটা ঔদাসীন্যে ভরে গেল কী করে ? ও কি খুশি নয় আমার ভালো কাজ দেখে? ধ্যাত, কী সব উল্টোপাল্টা ভাবছি | কিন্তু যদি উল্টোপাল্টাই হবে তা হলে ও এত কোল্ড কেন আমার সঙ্গে ? এমন কি হতে পারে যে আমার কোনও ব্যবহারে ও আঘাত পেয়েছে? কী করেছি আমি ? জিজ্ঞেস করব, একবার ফোন করে ? না থাক, কাল সকালে স্টুডিয়োয় তো দেখা হচ্ছেই | ভাবতে ভাবতে শুয়ে পড়লাম | পরদিন ভোরে একটা পাখির ডাক শুনে ঘুমটা ভাঙল | আর ঘুম থেকে উঠে খুব ফ্রেশ লাগল | গতকালের যা কিছু রাগ, অভিমান, মনোমালিন্য সব কালকেই শেষ হয়ে গেছে, আজ একদম নতুন ভাবে শুরু করতে হবে | মাথার ভিতরে বাজতে থাকা অ্যালার্ম ঘড়িটা বলল , টিকটিক করে |
স্টুডিয়োতে পৌঁছলাম, কলটাইমের আগেই | মেক-আপ করে কনসেনট্রেট করছি , ডোরা সামনে এসে বলল, কী রে ধ্যান করছিস নাকি ? বলে, আমার উত্তরের অপেক্ষা না করেই হেসে উঠল খিলখিল করে | তারপর যেমন ঝড়ের বেগে এসেছিল সেভাবেই বেরিয়ে গেল | আর আমার মনে মেঘের যে ছিঁটেফোটা ছিল, সঙ্গে করে নিয়ে গেল |
কাজেও তার প্রভাব পড়ল হয়তো | পরিচালক সুমঙ্গল সেন লাঞ্চব্রেকের সময় আমাকে আলাদা করে ডেকে প্রশংসা করলেন | আমি গলার ভিতরে দলা পাকিয়ে ওঠা আনন্দটাকে নিয়ে কী করব বুঝতে না পেরে বাথরুমে গিয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে কেঁদে ফেললাম | উফ, শান্তি !
শান্তি অবশ্য অশান্তিতে বদলে গেল লাঞ্চব্রেকের পরেই | সিনেমায় হিরোর পার্ট যে করছিল, সেই প্রতাপের সঙ্গে আমার লাগল | না লেগে কোনও উপায় ছিল না, ও সারাক্ষণ ডোরার পর্দার নাম ‘মধুরিমা’কে ‘মধুর মা’, ‘মধুর মা’ বলে উচ্চারণ করছিল |
অ্যাসিস্টান্ট ডিরেক্টর ঝন্টু প্রথম ব্যাপারটা আমার নজরে আনে | আমি ওকে, সুমঙ্গল সেনকে জানাতে বলি | কিন্তু ঝন্টু ভয় পাচ্ছিল কারণ ফিল্ম লাইনে প্রতাপের অগাধ ক্ষমতা এবং সেটের ভিতরে ঘুরে বেড়ানো প্রতাপের চামচারা ইতিমধ্যেই বারবার করে সবাইকে জানিয়ে দিয়েছে, এই সিনেমার প্রোডিউসারের সঙ্গে ওর কীরকম দাদা-ভাইয়ের সম্পর্ক |
কথাগুলো যে আমারও কানে আসেনি তা নয় | কিন্তু আমি নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম বলে খেয়াল করিনি | আর তা ছাড়া প্রতাপ সাক্সেনা ইউ পি-র ছেলে, সিক্স প্যাক চেহারার মালিক, যে কোনওদিক দিয়েই বক্স অফিস আর্টিস্ট, সেখানে আমি নেহাতই একজন স্ট্রাগলার। আমি প্রতাপের ব্যাপারে মাথা গলাতে যাব কেন ?
মুশকিল হল, একটা ক্যামেরার আওতায় যখন যখন দুটো মুখ চলে আসে তখন তার একটা সুপারম্যানের আর একটা হরিপদ কেরানির থাকে না | তখন এ যদি আফ্রিকার সিংহ হয় তা হলে ও বাইসন | বিনা যুদ্ধে কেউ কাউকে এক ইঞ্চি জমিও দেবে না | এভাবেই ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় স্ক্রিন স্পেস শেয়ার করতেন উত্তমকুমারের সঙ্গে, এভাবেই পরেশ রাওয়াল টক্কর দেন অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে | ওখানে কোনও ছাড়াছাড়ি নেই | আর আমি কীভাবে প্রতাপের মুখে সারাক্ষণ, ‘মধুর মা’ শুনে যাব ? আমার হাসি পাবে না ?
দু’তিনবার শট এন.জি হওয়ার পর যখন ফ্লোরে থমথমে নীরবতা তখনই প্রতাপের এক চামচা বলে উঠল, স্যার, সুপারস্টারদের লোকে ক্রেজে দেখতে চায়, অভিনয় তো আলফাল আর্টিস্টরা করবে | প্রতাপ ভাইয়া জো করেগা ওহি হিট হো যায়েগা।
প্রতাপ একগাল হেসে তাল দিল, মাটন অ্যায়সে বনাও কি ত্যায়সে বনাও – লোকে হুপহাপ খেয়ে নিবে, ওইসব সবজি-অবজি নিয়ে কমপ্লেইন আসবে – নুন কম, মিঠাস বেশি …
– শাট আপ | গলাটা ফ্লোরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত কাঁপিয়ে দিল |
আমি অবাক হয়ে দেখলাম, গলাটা আর কারও নয়, এই ছবির পরিচালকের |
সুমঙ্গল প্রচন্ড রেগে বলে উঠলেন, মিস্টার সাক্সেনা, এটা কোনও হোটেল নয় আর আমরা এখানে মাছের কালিয়া, মাংসের কোর্মা কিংবা পটোলের ডালনা বানাচ্ছি না |
প্রতাপ একটু থতমত খেয়ে বলল, অ্যাকচুয়ালি আমি বলতে চাইছিলাম …
– আপনি কী বলতে চাইছিলেন, আমার বোঝা হয়ে গেছে | এবার আমি কী বলতে চাইছি সেটা বোঝার চেষ্টা করুন | আপনার যদি নিজেকে বোনলেস মাটন বলে মনে হয় তা হলে আপনি কলকাতা শহরে যারা রেজালা বানায়, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন আর যদি মনে হয় যে আপনি একজন আর্টিস্ট, সরি, আর্টিস্ট শব্দটা বাড়াবাড়ি হয়ে গেল, তবুও বলছি, একমাত্র তা হলেই কাল আবার সেটে আসবেন | থ্যাঙ্ক য়ু অ্যান্ড প্যাক আপ | সুমঙ্গল সেনের গলাটা বাজের মতো ফেটে পড়ল |
সেটে সবাই মৃত সৈনিকের মতো বসে আছে এমন সময় আমার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় প্রতাপ দাঁতে দাঁত চেপে আমায় বলে গেল, কাজটা ভালো করলি না | তোকে দেখে নিব | আমি অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম | কিছু বলতে পারলাম না |
– আচ্ছা, ও আমাকে হুমকি দিল কেন ? রাতে ফোন করে জিজ্ঞেস করলাম ডোরাকে |
– ডোরা ঝাঁজিয়ে উঠল, থ্রেট দেবে না তো কী করবে, তোকে আদর করবে ? তুই একাই পুরো ফিল্মটা নষ্ট করে দিচ্ছিস | আর তুই সেটা বুঝতেও পারছিস।
– আমি নষ্ট করছি না প্রতাপ নষ্ট করছে ? হতবাক হয়ে গেলাম ডোরা আমায় অ্যাকিউজ করছে দেখে।
– শোন, লোকে যদি সিনেমাটা দেখতে আসে তাহলে প্রতাপের জন্যই আসবে | তোর-আমার থোবড়া দর্শক টানবে না |
– আমি তো ভাবছিলাম এই ছবিটার গল্প, গান, ট্রিটমেন্ট দর্শক টানবে |
– ভাবের ঘরে চুরি করিস না তো, ওই জমানা চলে গেছে | গল্পের জোরে ছবি চললে তামিল, তেলুগু ডিভিডি নকল করে সিনেমার পর সিনেমা তৈরি হত না, হিটও করত না |
– কিন্তু আমরা যে সিনেমাটায় সুযোগ পেয়েছি, সেটা তো ওইসব ঢপের ফিল্মের বিরুদ্ধে একটা কিছু করার প্ল্যাটফর্ম | সেখানে দাঁড়িয়ে আমরা…
ডোরা আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, সারাজীবন ওই প্ল্যাটফর্মেই দাঁড়িয়ে থাকতে হবে, ট্রেনে আর চড়া হবে না তোর কথামতো চললে |
– তুই কী বলছিস, আমি কিছু বুঝতে পারছি না |
– তোর বোঝার দরকার নেই, শুধু একটা রিকোয়েস্ট করছি, আমার বাড়া ভাতে ছাই দিতে আসিস না |
– মানে ?
– মানে, তোর কী হবে আমি তাই নিয়ে ইন্টারেস্টেড নই, আমাকে আমার কেরিয়ার গুছিয়ে নিতে দে |
– নে না গুছিয়ে | কে বারণ করেছে ? মাথা গরম হয়ে গেল আমার |
– শুধু বারণ করলে পরে তো ল্যাঠা চুকে যেত, তুই বাগড়া দিচ্ছিস |
– কী আবোল তাবোল বকছিস?
– একদম ঠিক কথা বলছি। আর শুধু বলছি না, তোকে একটা ওয়ার্নিং দিচ্ছি | অনেক কষ্টে আমি প্রতাপের হিরোইন হওয়ার চান্স পেয়েছি | ও আমাকে ‘মধুর মা’ ডাকুক বা ‘যদুর মা’ ডাকুক সেটা আমি বুঝে নেব | তুই এর মধ্যে জড়াস না | একদম অ্যালুফ থাক।
– আমার দায় পড়েছে জড়াতে | তুই তোর কষ্ট করে পাওয়া কেষ্ট এনজয় কর | আমার কোনও প্রবলেম নেই | কিন্তু আমার সঙ্গের সিনগুলোয় ও যদি ঝোলায় তাহলে আমি বাওয়াল করবই | তোর যেমন প্রতাপের লেজ ধরে স্টার হওয়ার একটা অপশন আছে, আমার তো নেই, তাই না ? আমাকে অভিনয় করেই যেখানে পৌঁছোবার, পৌঁছতে হবে | আর সেই রাস্তায় নোংরা থাকলে সেটা ঝেঁটিয়ে বিদেয় করতে হবে আমাকেই |
– খুব বড় বড় কথা বলছিস | তুই জানিস না প্রতাপ সাক্সেনাকে চটানোর ফল কী মারাত্মক হতে পারে ! ইন্ডাস্ট্রিতে টিকতে পারবি, ওর সঙ্গে শত্রুতা করে ? ও ডাবিং-এর সময় সব সামলে দেবে, তুই পারবি ?
– না পারলে, পারব না | তাই বলে একটা সব-স্ট্যান্ডার্ড লোকের সঙ্গে কমপ্রোমাইজ করে নিজের অভিনয়টাকে গলা টিপে খুন করব ?
– ফিলসফি ঝাড়িস না। ডিরেক্টরকে একটু হাত করেছিস বলে ভাবছিস ওর পা চেটে বিরাট কেউকেটা হয়ে যাবি | কিন্তু পৃথিবীটা অত সহজ নয় বাচ্চু | সাপ-লুডো খেলা দেখেছিস তো ? কখন যে নিরানব্বই থেকে একদম তিনে নেমে আসবি, টেরও পাবি না | ডোরার গলাটা নিষ্ঠুর শোনাল |
– তখন আবার তোর সুপারিশ চাইব, তিন থেকে নিরানব্বইয়ে ওঠার জন্য, আমি চেষ্টা করে হাসলাম |
– মর শালা হারামি | ডোরা ফোনটা কেটে দিল |
আমি গুম হয়ে বসে রইলাম কিছুক্ষণ | তারপর একটা টি-শার্ট গলিয়ে বেরিয়ে গেলাম রাস্তায় | অনেকক্ষণ পায়চারি করেও মনটা শান্ত হল না, অনেকগুলো সিগারেট খেয়েও না | একটা মদের দোকানের সামনে মিনিট দুয়েক দাঁড়িয়ে ভাবলাম আকাশ-পাতাল | একজন কর্মচারী সম্ভবত আমায় চিনতে পেরে দু’তিনবার মুখটা দেখে গেল | ফিসফিসিয়ে একবার জিজ্ঞাসাও করল কিছু | কিন্তু আমি কোনও জবাব দিলাম না | শুধু বিড়বিড় করে বললাম, একটা সমস্যা এড়াতে আর একটা সমস্যাকে জীবনে টেনে আনার কোনও মানে হয় না | আমি কষ্ট ভোলার জন্য নেশা করব না | আমার তো অভিনয়টাই নেশা, আমার কাল সকালে কলটাইম | কেরিয়ারের এই স্টেজে আমি ল্যাদ খেয়ে পড়ে থাকতে পারি না, আমি হ্যাংওভার অ্যাফোর্ড করতে পারি না | আমাকে ঠিক সময়ে যেতে হবে | জানপ্রাণ দিয়ে অভিনয় করতে হবে | ফাটিয়ে দিতে হবে |
ফাটিয়েই দিলাম | একদিন, দু’দিন, তিন দিন | আমার সঙ্গের দৃশ্যগুলোয় প্রতাপ সাক্সেনা যে ম্রিয়মাণ, জ্যালজেলে তা বলে না দিলেও বোঝা যাচ্ছিল | বুঝতে পারছিল প্রত্যেকটা টেকনিশিয়ান, বুঝতে পারছিল ডোরা, বুঝতে পারছিলেন সুমঙ্গল সেন আর সবচেয়ে বেশি করে বুঝতে পারছিল প্রতাপ নিজে | ও চেষ্টা করছিল, ওর মতো করে প্রাণপণ চেষ্টা করছিল কিন্তু যে ‘বর্ণপরিচয়’ পড়েনি তার পক্ষে কি ‘শেষের কবিতা’র মাধুর্য উপলব্ধি করা সম্ভব ?
এই প্রশ্নটাই সুমঙ্গল সেন আমাকে করলেন, চতুর্থ দিন শুটিং-এর শেষে | আমি কোনও জবাব না দিয়ে ওঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম |
– চার-পাঁচটা ফড়ে যোগাড় করতে পারলেই কোনও কোনও গুজরাতি, মাড়োয়ারি, সিন্ধির মনে হয় যে সে রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে গোটা বাংলা সাহিত্যটাই রি-রাইট করতে পারে, সত্যজিত থেকে তপন সিংহ নতুন করে বানাতে পারে, একটু সুফি আর একটু জ্যাজ-এর ফিউশন করে নজরুলগীতি থেকে অতুলপ্রসাদি, সলিল চৌধুরী থেকে নির্মলেন্দু চৌধুরী সবকিছুর খোলনলচে পাল্টে দিতে পারে।
– আমরা মেনে নিই কেন ? আমি একটু সঙ্কোচের সঙ্গেই জিজ্ঞেস করলাম |
– মানি কারণ আমাদের গলায় গান, হাতে লেখা থাকলেও, মনোবল নেই | আমরা ক্ষয়রোগে ভুগতে ভুগতে এটা বিশ্বাস করতে শুরু করেছি যে যার এত এত টাকা তার পক্ষে কোনও কিছুর অথরিটি হওয়াই অসম্ভব নয় |
– এ তো সেই ‘উলঙ্গ রাজা’ কবিতাটার মতো | সবাই জানে যে রাজা উলঙ্গ কিন্তু মুখ ফুটে কেউ কিছু বলছে না |
– গুড | এই জন্যই তো আপনাকে চাই | সুমঙ্গল আমার পিঠ চাপড়ে দিলেন |
– আমার সৌভাগ্য স্যার | আপনার কাছ থেকে যে এতখানি গাইডেন্স আর ভালোবাসা পাব, আশা করিনি।
– উঁহু, ভালোবাসা নয় | ভালোবাসার ‘ভ’ও নয় | সুমঙ্গল হাসলেন। কাজ, শুধু কাজ | যে লোকটা ফিল্মটা বোঝে মোটামুটি, সে ভালো কাজ করে যে তাকে চাইবে না ?
– চায় কই ? আমি একটা দীর্ঘশ্বাস চাপলাম |
– চায় না তার একটা কারণ আপনি বললেন, ‘উলঙ্গ রাজা’ কনসেপ্ট | আর একটা, আমি বলি | আমাদের এই লাইনে আপনি হামেশাই ছ’ফিট ঘরের মধ্যে চার ফিট ট্রলি দেখতে পাবেন |
– একটু যদি এক্সপ্লেন করতেন স্যার। আমি বললাম।
– একবার ভাবুন, | ওইটুকু একটা ঘরের মধ্যে যদি ওরকম একটা ট্রলির ওপর ক্যামেরা বসানো থাকে, তা হলে ট্রলিটা ঘুরবে কী করে আর ছবি উঠবে কী করে ?
– সম্ভব নয় কোনওটাই |
– রাইট | আর ছ’ফিট লোকগুলোর মধ্যে যদি চার ফিট করে ইগো থাকে, তা হলে তারা মন খুলে সবকিছু বিচার করবে কীভাবে আর সিদ্ধান্তই বা নেবে কেমন করে ? তারা শুধু খুঁজবে সেই লোকগুলোকে যারা ওই বিরাট ইগোটাকে আরও ফোলাতে পারে |
– ভালুক চেনে শাঁকালু, হবে।
– ঠিক তাই | আর এই কারণেই ইন্ডাস্ট্রি ছেয়ে গেছে সিক্স প্যাক আর এইট প্যাকে | সব চাবুকের মতো শরীর কিন্তু মাথাটায় হাত দিয়ে দেখুন | শক্ত গোবরের ডেলা, কংক্রিটের চেয়েও শক্ত | এর মধ্যে যদি শার্প কোনো মাথাওয়ালা অভিনেতা চোখে পড়ে তা হলে পছন্দ হবে না ? সেই পছন্দ হওয়াটা কিন্তু ভালোবাসা নয় | অন্তত আপনি ডোরাকে যে অর্থে ভালোবাসেন, সেরকম ভালোবাসা নয় | সুমঙ্গল সেন জোরে হেসে উঠলেন |
আমি চোখ তুলেও ধরা পড়ে যাওয়ার লজ্জায় তৎক্ষনাৎ নামিয়ে নিলাম চোখ | কিন্তু চোখের জল আটকাতে পারলাম না |
চোখের জল যে গ্লিসারিন ছাড়াও আসে তা আমি জানতাম কিন্তু বড় অভিনেত্রীরা যে সেটা ট্যাপ কলের জলের মতো বার করতে পারে, সেটা ডোরার সঙ্গে বেডসিন করতে গিয়ে জানলাম |
রিহার্সাল দেওয়ার সময় যে মেয়েটা সবরকম সহযোগিতা করছিল সে যে হঠাৎ শটের মধ্যে – ‘এ কী আপনি অসভ্যতামি করছেন কেন’ বলে চিল-চিৎকার জুড়ে দেবে, আর আগে থেকে তৈরি চিত্রনাট্য অনুযায়ী প্রতাপ সাক্সেনা দুটো চামচা নিয়ে শুটিং স্পটে ঢুকে এসে আমাকে এলোপাথাড়ি মারতে শুরু করবে, আমি কল্পনাও করতে পারিনি | কিন্তু যে জঙ্গলে মেশিনগান হাতে থাকলেও নিরাপত্তা বোধ করা যায় না, সেই জঙ্গলে যখন কাজ করতে এসেছি তখন ভাবা উচিত ছিল | অন্তত আঁচ করতে পারা সম্ভব ছিল ডোরার আগের দিনের কথাবার্তা থেকে | একটু প্রিকশন অন্তত নেওয়া যেত তা হলে | আচমকা বাজ পড়ত না মাথায়।
প্রতাপের হাতে মার খেতে খেতে পাল্টা মার দেওয়ার বদলে এই কথাগুলোই ঘুরছিল আমার মাথায় | সুমঙ্গল সেন আর ঝন্টু মিলে আমায় ওর হাত থেকে বাঁচিয়ে নিলেও ওদের শয়তানি থেকে বাঁচাতে পারা সম্ভব ছিল না |
ডোরা, আমার নামে আর্টিস্ট ফোরাম, গিল্ড – সর্বত্র চিঠি দিল | আমিও দিলাম পাল্টা চিঠি কিন্তু শ্লীলতাহানির চার্জে একজন অভিনেতাকে ফাঁসানো যত সহজ, ষড়যন্ত্রের চার্জে একজন অভিনেত্রীকে প্যাঁচে ফেলা তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন | আর এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা ছিল, আমি কে? কোন হরিদাস পাল আমি যে আমার বিরুদ্ধে কেউ ষড়যন্ত্র করবে ? তাও আবার প্রতাপের মতো সুপারস্টারকে সঙ্গে নিয়ে?
আমি যে একটা কেউ হয়ে উঠতে পারতাম, এই সিনেমাটা রিলিজ করার পর, লোকে যে আমাকে খেয়াল করতে বাধ্য হত, সে কথা কাকে বোঝাব ? রাঙামাসির গোঁফ হলে আমার কটা মামা হত, কে শুনবে সে কথা ?
কেউ শুনল না | সুমঙ্গল সেন অনেক লড়াই করলেন আমার জন্য | ফিল্মের অনেকটা শুট করা হয়ে গেছে, এই অবস্থায় আমাকে বাদ দিলে পুরোটাই নতুন করে তুলতে হবে নয়তো নষ্ট হয়ে যাবে এতদিনের কাজ – ইত্যাদি অনেক কিছু বললেন কিন্তু প্রযোজকরাও অতিমানব নন | তাঁদেরও এই ‘জোর যার মুলুক তার’-এর বাজারে ব্যবসা করে খেতে হয় | প্রতাপ সাক্সেনাকে চটানোর চাইতে আমার মতো ‘নোবডি’কে হটিয়ে দেওয়া অনেক বুদ্ধিমানের কাজ, এটা বোঝার জন্য রকেট সাইন্সে পিএইচ.ডি করতে হয় না |
তাই সুমঙ্গল সেন, নিজেই হটে গেলেন একদিন | মানে, ভদ্র ভাষায়, সরিয়ে দেওয়া হল ওঁকে | আর ওঁর জায়গায় যিনি এলেন তিনি সবদিক সামলে ছেঁটে কেটে যা দাঁড় করলেন, তাতে আমার সেকেন্ড লিড একটা অতিথি শিল্পীর রোলে গিয়ে দাঁড়াল | সুমঙ্গল সেন সরে যাওয়ার পর অভিনয় করতে ডাকা হয়নি আমায়, ডাব করতেও না | ওদিকে হাওয়ার আগে ছুটতে থাকা বদনাম আমার বর্তমান এবং ভবিষ্যতের সব প্রোজেক্টের দরজায় আমার জন্য ঝুলিয়ে দিছিল একটা মস্ত বড় ‘না’ | এই এতগুলো ‘না’-এর ভিতরেও ওই সিনেমাটা রিলিজ করলে আমি একদিন দেখতে না গিয়ে পারলাম না | আর প্রায় ফাঁকা হল দেখে, পাল্টে যাওয়া গল্প দেখে, জঘন্য অভিনয় আর সর্বোপরি অতিথি শিল্পীকে দেখে আমি চিৎকার করে বলে উঠলাম, না | কিন্তু আমার আওয়াজ কারও কানে পৌঁছল না |
৩.
বছর তিনেক আগেকার কথা, আমার এতদিনে অনেকটাই ভুলে যাওয়া উচিত ছিল; কিন্তু পারিনি | একটা শব্দ, একটা দৃশ্যও ভুলতে পারিনি | সবকিছু সেই ঘটার মুহূর্তে যতটা জ্যান্ত ছিল, আজও ততটাই |
কিন্তু জীবন তো জীবনের মতো করে খাজনা নেবেই, তাই না ? আমার ক্ষেত্রেও নিয়েছে | ফিল্ম কিংবা টেলিভিশনের লাইনে আমার সমস্ত সম্ভাবনাকে তিলে তিলে মরতে দেখার পরও আমি তাই বেঁচে রইলাম | ঝুটো হয়ে গেল ওই সাউন্ড, লাইট, ক্যামেরা রোলিং, অ্যাকশন কিন্তু আগের থেকে আরও বেশি সত্যি হয়ে জেগে উঠল আমার পেটের খিদে | সেই খিদেকে কোনও ঘুমপাড়ানি গান শুনিয়ে ঘুম পাড়ানো যায় না, ঝুমঝুমি বাজিয়ে ভোলানো যায় না | যায় না বলেই আমি লাইন চেঞ্জ করলাম | চেহারার দৌলতে একটা চাকরিও জুটিয়ে নিতে পারলাম |
যেখানে মাথা কুটেও নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারব না, সেখান থেকে সরে এসে সাধারণের পৃথিবীতে লড়ে বাঁচার যুদ্ধে নামলাম | এখানে লড়াইটা তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছ | কারও মুখের কথায় কারও জীবন নষ্ট হয়ে যায় না |
চেহারার পাশাপাশি ওই সুন্দর করে কথা বলতে পারার ক্ষমতাটাও আমার কাজে লাগল এই নতুন চাকরিটার ক্ষেত্রে | ট্যুরিজমের ব্যবসা তো, এরা এমন লোক চায় যারা কিছুটা হলেও দর্শনধারী আবার একই সঙ্গে যাদের কথা বলে লোককে ইমপ্রেস করার ক্ষমতা আছে | আমি দু’দিক দিয়েই উতরে গেলাম এবং পিছুটান নেই বলে কাজও করতে লাগলাম নিজের সবটুকু দিয়ে |
সেই কাজের সূত্রেই এবার সিকিম আসা | পুজোর পরপরই যে ট্যুরটা হবে, সে ব্যাপারে আগে থেকে সব খোঁজখবর নিয়ে রাখা আমার উদ্দেশ্য | তাতে ব্যবস্থা করতে সুবিধে হয় | আরও একটা ব্যাপার অবশ্য আছে | এই টাফ কম্পিটিশনের বাজারে আমার কোম্পানি এমন সব নতুন ট্যুরিস্ট স্পটে ভ্রমণার্থীদের নিয়ে যেতে চায় যেখানে অন্য কেউ নিয়ে যাচ্ছে না | সেইসব নতুন স্পট, যার খবর এখনও অন্য কেউ রাখে না, খুঁজে বের করাটাও আমার কাজের মধ্যে পড়ে | আমি তাই উত্তর সিকিমের মাঙ্গান, চুংতাং, লাচেন আর লাচুং-এর এদিক-ওদিক চষে বেড়াচ্ছি ক’দিন ধরে। খুঁজে বেড়াচ্ছি, এমন দু’একটা স্পট যেগুলো সৌন্দর্যে তুলনারহিত কিন্তু খরচাপাতিতে সাধ্যের মধ্যে |
একটা জ্যাকপট মারতে পেরেছি বলেও মনে হচ্ছে | লাচুং-এর লাগোয়া তিনটে গ্রাম এবার আমার আবিষ্কার | গ্রামগুলোর নাম থোমচি, সিংগ্রিং আর বিচ্ছু | তিনটে গ্রামই দমবন্ধ করা সুন্দর | পাহাড়ি ঝরনা থেকে শুরু করে রডোডেনড্রন – কিছুরই অভাব নেই | আমি তিনটে গ্রামই দেখে-শুনে থোমচিকে বাছলাম আমার প্রথম টার্গেট হিসেবে | কারণ, থোমচিতে একটা বড় মনাস্ট্রি আছে যেটা দৃষ্টিনন্দন এবং দ্বিতীয়ত এখানকার বাড়িগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটাকে সরাইখানা হিসেবে চালিয়ে দেওয়া যাবে |
ওই মনাস্ট্রি থেকে বেরোবার পথেই আমার কাঁধে একটা হাত পড়ল এবং আমি ঘুরে দাঁড়িয়ে যাকে দেখলাম, যমকে দেখলেও তার চেয়ে কম অবাক হতাম |
প্রতাপ সাক্সেনা একগাল হেসে বলল, কী করছ আজকাল ?
আমি অনেক কিছু বলতে গিয়ে সামলে নিলাম নিজেকে | বললাম, কিছু করার রাস্তা তো খোলা রাখোনি তাই ঘুরে বেড়াচ্ছি।|
– আমিও ঘুরতেই এসেছি, ইন ফ্যাক্ট রেস্ট নিতে এসেছি | চলো আমার ডেরায় চলো, একটা ড্রিংক হয়ে যাক | কতদিন পর দেখা, সম্পর্ক তো তোমার সঙ্গে আজকের নয়।
আমি ‘না’ বললাম, জোরের সঙ্গেই বললাম কিন্তু সেই বলার ভিতরে বোধ হয় ততটা জোর ছিল না নইলে প্রতাপ আমায় হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল কী করে ? হতে পারে যে একটা অদম্য কৌতুহল আমাকে টানছিল | প্রতাপ নয়, সেই কৌতুহলের পিছুপিছু আমি গিয়ে হাজির হলাম একটা চমৎকার পাহাড়ি বাংলোর দোতলায় যেখানে প্রতাপের ছুটি কাটানোর সমস্ত ব্যবস্থা আছে আর সঙ্গে আছে ডোরা |
দু’পেগ খাওয়ার পর ডোরা বিছানা থেকে মাটিতে নেমে এসে বলল, আমিই তোকে লোকেট করেছি জানিস তো | তারপর প্রতাপকে বললাম তোকে এখানে ধরে আনতে | বিশ্বাস কর, এত ভালো লাগল তোকে আবার দেখতে পেয়ে। প্রথমটা অবশ্য খুব অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। পরে ভাবলাম, যাই হোক না কেন, তোকে একবার আমাদের এখানে নিয়ে আসতেই হবে।
– কেন, আর কী হিসেব-নিকেশ বাকি আছে আমার সঙ্গে তোদের এখনও? আমি ডোরার চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করলাম।
– তুই ক্ষমা করে দে, প্লিজ আমাদের ক্ষমা করে দে | ডোরা ওর মুখে-চোখে একটা অনুতাপের ভঙ্গি ফুটিয়ে তুলল |সেটা যে নকল, তা হয়তো অভিনয় না করলেও বুঝতাম।
কোনও উত্তর না দিয়ে তাকিয়ে রইলাম ডোরার দিকে | অনেকটা মোটা হয়ে গেছে, চেহারা আর অভিব্যক্তিতে ভালগারিটি আর ক্লান্তি একসঙ্গে ফুটে বেরোচ্ছে | মনে পড়ে গেল, সেই শ্যামলা রোগা মেয়েটাকে যার হাসি অন্ধকার আকাশে তারা হয়ে ফুটে উঠত।
– কী দেখছিস অমন করে? আমার ফিগার আর চাবুক নেই সেটা? ডোরা সেই আগের মতো করে চোখ নাচাল।
আমি ওর কথার উত্তর না দিয়ে বললাম, তুই অভিনয় করিস না আর ?
– না | আমি এখন প্রতাপের প্রোডাকশন হাউসের সিইও | জাস্ট বিলো দ্য ম্যানেজিং ডিরেক্টর | ডোরা প্রতাপের দিকে তাকিয়ে হাসল |
– অ্যান্ড আই অ্যাম দি এম.ডি | প্রতাপ এক চুমুকে অনেকটা মদ সাবাড় করে বলল |
– তার মানে তুই প্রতাপের রক্ষিতা এখন ? আমি বললাম আর আশা করলাম যে ওরা রেগে যাবে |
কিন্তু ওরা দু’জনেই হেসে উঠল খুব জোরে | ডোরা বলল, তুই তোর বিয়ে করা বউকে সাতজন্মে সেগুলো দিতে পারবি যে সুখ, যে আরাম, প্রতাপ ওর রক্ষিতাকে দিতে পারে ?
– আমি বিয়েই করিনি |
প্রতাপ আর ডোরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করল কথাটা শুনে | তারপর প্রতাপ বলল, শোন, আমার দুটো বউ | একটা বিয়ে সেই কোন ছোটবেলায় ইউ.পি-তে করেছিলাম ঠিক মনে নেই, আর তারপর এখানে আরেকটা | প্লাস আই হ্যাড লটস অব আদার উইমেন | স্টিল ডোরা আমাকেই ভালোবাসে | আর তুই শুধু ডোরাকেই ভালোবাসলি তবু ডোরা তোকে পাত্তা দিল না |
– শুধু ওটুকুই না, তোমাকে ডাউন করতে চেষ্টা করছিল বলে ওর পুরো কেরিয়ারটাই খতম করে দিলাম, সেটা বলো |ডোরা আধো-আধো গলায় বলল।
– সহি বাত ! প্রতাপ হেসে উঠল ডোরাকে জড়িয়ে ধরে |
– বাট আই ওয়ান্ট টু কমপেনসেট | আমার নতুন যে ফিল্মটা প্রোডিউস করছি, তাতে তোকে একটা ভালো রোল দিতে চাই রে | অলমোস্ট নেক্সট তো হিরো | তুই করবি তো ? ডোরা প্রতাপকে বড় একটা পেগ বানিয়ে দিয়ে নিজে একটা নিল তারপর আমার গ্লাসটা নিয়ে ভরে দিল আবার |
এবার আমি গ্লাসটা হাতে নিলেও ঠোঁটে ঠেকালাম না | জিজ্ঞেস করলাম, কিন্তু আমি যদি আবার প্রতাপকে ছাপিয়ে যাই ?
ডোরা আর প্রতাপ হেসে গড়িয়ে পড়ল কথা শুনে | একজনের শরীর আরেকজনের ওপর লুটোল আবার সোজা হল | তারপর আর একটু ঘন হয়ে বসল।
আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, কিন্তু আমার প্রশ্নটার উত্তর পেলাম না | যদি আবার প্রতাপকে ছাপিয়ে যাই ?
ডোরা বলল, আমার সাত পেগের নেশা কাটিয়ে দিলি তুই, এই একটা প্রশ্ন করে |
প্রতাপ বলল, আমার নেশা অবশ্য বাড়ল | তুম সোচো, ওর সবকুছ গেল লেকিন ঘমন্ড গেল না |
– অহংকার নয়, এটা অধীত বিদ্যা | যা ডোরা হারিয়ে ফেলেছে আর তোর কখনও ছিল না | বলে আমি গ্লাসের অর্ধেকটা ডোরার মুখে ছিটিয়ে দিলাম আর বাকি অর্ধেকটা প্রতাপের মুখে | দিয়েই একলাফে ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি প্রায় টপকে নেমে এলাম নীচে |
নামতে নামতে যে কাঁপুনিটা টের পাচ্ছিলাম, বাংলোর বাইরের রাস্তায় পা দিতেই সেটা যেন দামামা বাজাতে লাগল আমার গোটা শরীরে | কী এমন নেশা করেছি যে আমার সর্বাঙ্গ কাঁপছে ?
তখনই চোখের সামনে বাংলোর অর্ধেকটাকে দেশলাই বাক্সের মতো চুপসে যেতে দেখলাম | আর মুহূর্তের মধ্যে শূন্যে ঝুলতে থাকা ব্যালকনিতে পা টেনে টেনে বেরিয়ে আসা ডোরার আর্ত চীৎকার কানে এল , বাঁচা, আমায় বাঁচা | আমি শুধু টাকার জন্য প্রতাপের সঙ্গে থাকি | আমি শিল্পী হতে চেয়েছিলাম, বেশ্যা নয় | আমায় ক্ষমা কর, আমায় বাঁচা, আমায় বিয়ে কর …
আমি কে জানে কোন অজানা মোহে এক পা, এক পা করে এগোতে যাচ্ছিলাম ডোরার দিকে কিন্তু তার আগেই পুরো বাংলোটা তালগোল পাকিয়ে বসে গেল মাটিতে | আর গড়াতে গড়াতে আসা একটা মস্ত পাথর আছড়ে পড়ল তার ওপর | এবার আর চীৎকার নয়, গোঙানি শুনতে পেলাম | সেটা ডোরা না প্রতাপের বুঝতেও পারলাম না ঠিকমতো | বোঝার সময়ও সেটা নয় কারণ আর একটা বড় পাথর আমার দিকেই এগিয়ে আসতে দেখলাম | আমি লাফ দিয়ে সরে গেলাম, যতটা পারলাম | তখন আমার পা কাঁপছে, হাত কাঁপছে, বুক কাঁপছে, মাথা কাঁপছে, পায়ের নীচের পাতাল কাঁপছে, মাথার ওপরের আকাশও বোধহয় কাঁপছে | এটা কী হচ্ছে ? পৃথিবীর শেষের শুরু ?
৪.
তিন দিন পর যখন গ্যাংটকে পৌঁছোতে পারলাম শেষ পর্যন্ত তখন আধমরা অবস্থা আমার | তবে শুধু প্রাণটুকু সঙ্গে থাকার আনন্দ যখন মানুষ অনুভব করতে পারে তখন অন্য সব দুঃখ তুচ্ছ হয়ে যায় তার কাছে | আমারও তাই হয়েছিল | হাজারও কান্নার ভিতর একটা বাচ্চার হাসি আমায় মনে করিয়ে দিচ্ছিল , সব শেষ হয়ে যায়নি | প্রাণ আছে, এখনও প্রাণ আছে |
আমার কোম্পানির মালিক অনেক চেষ্টা করেছিলেন এই তিন দিন আমার খবর নেওয়ার | স্বাভাবিকভাবেই পারেননি | কারণ কোথাও কোনও নেটওয়ার্ক নেই | আমার ফোনটা পেয়ে উনি এমন উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন যে আমার সত্যিই মনে হল, একটা পরিবারের সদস্য আমি |
– তুমি ঠিক আছ ? তুমি সুস্থ আছ তো ? কম সে কম পাঁচবার কথাটা জিজ্ঞেস করলেন গুহসাহেব |
– হ্যাঁ স্যার, ঠিক আছি। আপনি চিন্তা করবেন না।
– তুমি কলকাতায় ফিরে এসো, অ্যাজ আর্লি অ্যাজ পসিবল | আর টাকার চিন্তা কোরো না। যেভাবে হোক ফেরো, বাকিটা আমার রেসপনসিবিলিটি।
– ফিরছি স্যার, ফিরেই রিপোর্ট করব আপনাকে |
– ও.কে | সাবধানে এসো |
– থ্যাঙ্ক য়ু স্যার | বাই |
– বাই | অ্যাই শোনো শোনো, ফোন ছেড়ো না | সিকিমের ভুমিকম্পর পাশাপাশি কলকাতাতেও ক’দিন ধরে একটা খবর নিয়ে ভূমিকম্প চলছে | ওই যে তোমাদের সুপারস্টার অভিনেতা, প্রতাপ সাক্সেনা, সে নাকি তার কোন বান্ধবীকে নিয়ে কাউকে কিছু না জানিয়ে সিকিমে ছুটি কাটাতে গিয়েছিল | গত ক’দিন ধরে ওদের কোনও খবর পাওয়া যাচ্ছে না | মিডিয়া বলছে ওদের শেষ নাকি লাচুং-এর ধারেপাশে দেখা গিয়েছিল | জানি না কীভাবে বলছে, হয়ত মোবাইলের কল হিস্ট্রি সার্চ-টার্চ করে | আমি ভাবছিলাম, তুমি তো ওই চত্বরেই ছিলে | ওই স্টার এবং তার বান্ধবীর কোনও হদিশ-টদিশ দিতে পারো ?
গুহসাহেব একনিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে যখন দম নিচ্ছেন ততক্ষণে আমি স্টুডিয়োর কোন ফ্লোরে পৌঁছে গেছি মনে মনে | আমার সামনে লাইটস অন হয়ে গেছে, ক্যামেরা রোল করছে, ডিরেক্টর বলে উঠলেন – অ্যাকশন …
গুহসাহেব আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে ফোনের ওপার থেকে বললেন, ভাবলাম, বাই চান্স তোমার সঙ্গে মোলাকাত হয়েছে কি না …
আমি আমার সবটুকু অভিনয়ক্ষমতা স্পিকারের সামনে নিয়ে এসে বললাম, প্রতাপ সাক্সেনা আর তার বান্ধবীর কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না, ভুমিকম্পের পর থেকে ? আপনি কী বলছেন স্যার ? আমি তো ভাবতেও পারছি না …