গল্পে বানীব্রত

নিজের জন্য বাঁচা

রাহি এসাইলামের খাটের উপর বসে বাইরের জানলা দিয়ে বসন্তের শোভায় শিমুল পলাশের রঙে নিজেকে রাঙিয়ে নেবার চেষ্টা করছিল আর ভাবছিল, নিজের জীবনের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঘটনা গুলোকে, সম্বিত ফিরে পেল বান্ধবী রূপাই এর আওয়াজে। কি ব্যাপার তোর ফোন বন্ধ, কোন খবর নেই, তোর জন্য বড় চিন্তা হচ্ছিল। তোর বাড়িতে গেলাম কাকিমাকে জিজ্ঞেস করলাম কাকিমা বলল তুই এসাইলামে। কাউকে কিছুই জানালি না এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে রূপাই   এক দৃষ্টিতে রাহির দিকে তাকিয়ে রইল। রাহি ঘুরে রূপাই কে দেখে অবাক। বরফ শীতল কন্ঠে, তুই এখানে?  সেই প্রশ্নটা তো আমারও একটু ঝাঁঝিয়ে বলে ওঠে রূপাই। খাট থেকে নেমে রাহি রূপাইকে জড়িয়ে ধরে বলে আগে বোস তারপর সব বলছি। তুই জানিস না আমার টেনশন হয় তোর খবর না পেলে? বলতে বলতে চোখের কোনায় চিকচিক করে ওঠা জল গড়িয়ে পড়ে চিবুক বেয়ে। রাহি, সযত্নে রূপাইয়ের চোখের জল মুছিয়ে বলে ঘাবড়ে যাস না আমি ঠিক আছি আমার কিছুই হয় নি। শুধু নিজেকে একটু সময় দেব বলে পাগলের অভিনয় করতে হল। জানিসই তো অভিনয়টা আমি ছোটবেলা থেকে ভালোই করি। তাই তো থিয়েটার টা আমার খুব প্রিয়। হেয়ালি রাখ রাহি, আমার ভালো  লাগছে না। বাড়ি ফিরে চল আমার সাথে  বলেই হাতটা চেপে ধরে রূপাই। অনেক অভিনয় হয়েছে আর নয় চল এবার, ফিরে চল।
আরে দাঁড়া দাঁড়া এখনো  দেরী আছে। নিজের সাথে যে এখনো অনেক কথা বলার আছে। তারপর একদিন দেখবি আমি বাড়ি চলে গেছি।  তবে একটা  অনুরোধ কাউকে আমার কথা বলবি না বা আমি যা তোকে বলব সেকথাও কাউকে বলবি না। কথা দে আমায় রূপাই। কথা দিলাম আমার বেষ্ট ফ্রেন্ডকে। বল কি হয়েছে তোর। রাহি রূপাইয়ের কাঁধে হাত রাখল, তারপর ঝরের গতিতে  ঘুরে জানালার গরাদ ধরে দাঁড়ালো। কিছুক্ষন চুপ। রূপাই অবাক হয়ে রাহিকে দেখতে লাগলো এ যেন এক অন্য রাহিকে দেখছে সে। হঠাৎ  রাহি বলতে শুরু করল,  রূপাই বলতো যে মানুষ টাকে তুই পাঁচপাঁচটা বছর ধরে ভালোবাসিস,  তাকে নিয়ে আগামীর স্বপ্ন রচনা করছিস, ঠিক সেই সময় যদি জানতে  পারিস যে,সে বিবাহিত তখন তুই কি করবি বলতো। কিছুক্ষন চুপ থাকে রাহি, অপলক দৃষ্টিতে বাইরের পলাশগাছটার দিকে তাকিয়ে থাকে। একটা কোকিল এসে বসে সেখানে। ডেকে ওঠে।দুজনের নিরবতার মাঝে শুধু কোকিলের কুহুতান।  নিরবতা ভেঙ্গে রাহি বলে, পাখিটাও কত কিছু বলে গেল যেন, শুনলি রূপাই। রূপাই রাহির কথার কোনো উত্তর  দিতে পারলো না,শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস  ছাড়া। জানিস রূপাই সুব্রত আমার সাথে এটাই করেছে। আর সেদিন ওদের একসাথে আমি দেখে ফেলেছি। কষ্টটাকে বুকে চেপে ওর সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিলাম কেমন আছো? ও ঘাবড়ে গিয়ে ছিল এভাবে প্রশ্ন করতে দেখে৷ ওর উত্তরের অপেক্ষা না করেই বলেছিলাম তোমার বউয়ের সাথে পরিচয় করাবে না? হ্যাঁ সেদিন বউয়ের সাথে বান্ধবি বলে পরিচয় করিয়ে ছিল জানিস। ওর বউটা মিষ্টি একটা মেয়ে গালে টোল পরে, আমায় বলল একদিন বাড়িতে এসো দিদি। পারলাম না মেয়েটার মুখে দিদি ডাকটা শুনে কিছু বলতে, তাহলে সুব্রত অসম্মানিত হত আর মেয়েটাও কষ্ট পেত। কাজ আছে বলে সেদিন ব্যস্ততা দেখিয়ে সরে গিয়েছিলাম ওখান থেকে।  এক নিঃশ্বাসে কথা গুলো বলে গুটিগুটি পায়ে রূপাইয়ের কাছে এসে দাঁড়ায় রাহি। কয়েক সেকেন্ডের নিরবতা।
রূপাই রাহিকে  দেখে অবাক হয়ে যায় একটু আগে যার কথার মধ্যে ভেঙ্গে গিয়েও নিজেকে সামলানোর চেষ্টা ছিল তার চোয়াল শক্ত, চোখদুটো স্থির। আস্তে আস্তে বলল,  জানিস আমি তোকে গিয়ে বলতে পারতাম বা বাড়িতে বলতে পারতাম তাতে সহানুভূতি পাওয়া ছাড়া লাভ কিছু হতো না। তাই ঠিক করলাম নিজেকে সময় দিতে হবে। কোন আত্মীয় স্বজন বা বন্ধুবান্ধবদের বাড়িতে গিয়ে লাভ কিছু হতো  না। তাই পাগলের নাটকটা শুরু করলাম। ফোন বন্ধ করলাম যাতে কেউ আমার খোঁজ না পায়। তারপর ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে এখানে। বাবা মাও কিছু বলতে পারে নি। আমি জানতাম তুই আসবি আর তোকেই সব ঘটনা বলব, এরপর আর কেউ এই ঘটনা জানবে না আর তুই কথা দিয়েছিস আমাকে কাউকে জানাবি না। কয়েক দিনের মধ্যেই এখানকার ডাক্তারা বুঝে যাবে আমার কিছু হয়নি তখন আমাকে ছেড়ে দেবে। সে কদিনে নিজের সাথে আরো কিছুটা সময় কাটিয়ে নেব। রূপাই অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল রাহির মুখের দিকে। রূপাইকে অপ্রস্তুত হতে দেখে জড়িয়ে ধরে বলল ঘাবড়ে যাস না আর কয়েকদিন পর আমি এখান থেকে ছুটি  নিয়ে সোজা তোর বাড়ি যাব। অনেক্ষন এসেছিস এবার চল তোকে এগিয়ে দিয়ে আসি।দরজার কাছে গিয়ে রাহি বিদায় জানায় রূপাইকে। দুজনের দৃষ্টি বিনিময় মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য। রাহি হাত নেড়ে ঘরে ঢুকে পরে। রূপাই ব্জ্রকঠিন এক নারীর  চলে যাওয়া নিরবে অপলক দৃষ্টিতে দেখতে থাকে, অস্ফুটে বলে ওঠে স্যালুট বন্ধু স্যালুট।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।