সাপ্তাহিক ধারাবাহিক গল্পে আনোয়ার রশীদ সাগর (পর্ব – ১)

দিদি ও চন্দ্রিমা

দিদির একটাই আবদার তোর সাথে গ্রামের বাড়ি দেখতে যাবো। পাশ থেকে চন্দ্রিমাও সুর তোলে, আমি কী দোষ করলাম?
আমি প্রায় চল্লিশ বছর পর ওদের দেখা পেলাম। কী করে বোঝাবো, তোমাদের গ্রামের বাড়ি এখন অন্য বাড়ি, অন্যরকম, অন্যকালচার চলে সে বাড়িতে। সেখানে কোনো স্মৃতি নেই, কোনো গাছ নেই, কোনো পূজাঘর নেই। আছে পশ্চিমে একটা মসজিদ আর সারি সারি বড় বড় বিল্ডিং। তবুও তাদের দাবী আমাদের জন্মভিটে দেখবো।
আমার বন্ধু নিমাইয়ের বড় বোন মালতি-দি। আমরা দিদি বলে ডাকতাম। দুষ্টমী করলে তেড়ে ধরে কোলের মধ্যে নিয়ে আদর করে কান মূলে দিতো। আর পাশে দাঁড়িয়ে চন্দ্রিমা খিলখিলিয়ে হাসতো।
নিমাইয়ের বাবা ভালো মিষ্টি তৈরি করতো। সারা এলাকায় বেশ নাম ছিল সে মিষ্টির। জিলাপী, সন্দেশ, খুরমা, রসমালাই সব ধরনের মিষ্টি বানাতো তিনি নিজে হাতে।
আমাদের বাড়ি বড় গৃহস্থবাড়ি ছিল। বাপচাচা, মাচাচী, ভাইবোন মিলে মিশে প্রায় শতাধিক সদস্য এক সাথে বসবাস করতাম। বাড়িতে গরুমো’ষ ভেড়াছাগল ও হাঁসমূরগী ছিল। প্রতিদিন গরু এবং মোষের দুধ দুয়ে রাখতো দাদী। সে দুধ নিমাইয়ের বাবা নিয়ে আসতো। পাশাপাশি আমাদের বাড়ি ছিল। প্রায়ই আমি নিমাইদের বাড়ি মিষ্টি খেতে যেতাম। ওদের যে ঘরে বসে মিষ্টি খেতাম, ওই ঘরের দেওয়াল ঘেষে দাঁড়িয়ে থাকতো চন্দ্রিমা। আজো চন্দ্রিমার সেই অপলক চেয়ে থাকা চোখ দুটি আমার মনে গেঁথে আছে।
বিদেশ থেকে প্রায় তিরিশ বছর পর বাড়ি এসেছি। এসেই শহরে এসেছি মার্কেট করতে। বাজারের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ আমার নাম ধরে নিমাই উচ্চস্বরে ডাকতে থাকে। পিছন ফিরে চিনে ফেলি, এতো নিমাই। দাঁড়াতে দাঁড়াতে নিমাই ওর ঘর থেকে বেরিয়ে এসে জড়িয়ে ধরে, এতদিন পর! -কেমন আছিস?
আমার চোখ ছলছল করে ওঠে, হ্যা-রে ভালো আছি?
তোরা কেমন আছিস?-কাকীমা চন্দ্রিমা?
চন্দ্রিমার নামটি কিভাবে মুখ থেকে বেরিয়ে গেছে বুঝতে পারিনি।
নিমাই কোনো উত্তর না দিয়ে টানতে টানতে ওর মিষ্টির দোকানের ভিতর নিয়ে যায়। ও দ্রুত ক্যাশবাক্স হিসাব-নিকাশ গুছিয়ে ম্যানেজারকে বুঝিয়ে দিয়ে, আমার হাত ধরে টানতে টানতে ওদের বাড়ি নিয়ে যায়।
ততদিনে নিমাইয়ের বাবা-মা পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে। ওর দুটি সন্তান অনেক বড় হয়ে গেছে। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করে। শুধু মালতি দিদি আর চন্দ্রিমা রয়েছে। তবে তারাও বিবাহিত এবং তাদের ছেলেমেয়ে পশ্চিম বাংলায় চলে গেছে। মালতি-চন্দ্রিমাও গিয়েছিল, ফিরে এসেছে। একমাত্র ভাইয়ের কাছে তাদের আশ্রয়।
নিমাই বলে, সে অনেক ঘটনা, তুই আগে রেস্ট নে। সব বলবো।
দিদি এসে পাশে বসেছে। দিদি ঠিক কাকীমার মত। তার স্নেহভরা হাত মাতৃ শান্তির পরশ যেন। কত বয়স হয়ে গেছে! আমার বয়স পঞ্চাশ-বায়ান্ন হলে দিদির বয়স ষাট-বাষট্টি হবে। তবে বুড়ি মনে হচ্ছে না। বেশ গোছানো শরীরের ত্বক। ঝকঝকেই রয়েছে গায়ের রং। আর চন্দ্রিমা? – এখনো ওর চোখের দিকে অথবা শরীরের দিকে ভালো করে তাকাইনি আমি। ওতো আমার দুএক বছরের ছোটই হবে। আমার ঘাড়ের উপর ওর দাঁড়িয়ে থাকা অনুভব করছি। আমার মনে হতে থাকে আমি সেই দূরন্ত কিশোর আর চন্দ্রিমা সেই চঞ্চলা বালিকায়।
একটুও মনে হচ্ছে না আমি এখন পঞ্চাশ বছরের একজন মানুষ। আমার অনেক দায়িত্ব রয়েছে সমাজ ও সংসারে।
আমি মনে মনে হারিয়ে যাচ্ছি কৈশোরে। সেই গাছপালা,নদীর ঘাট,পাড়া-প্রতিবেশীদের গলির বাঁকে বাঁকে লুকোচুরি খেলা, বাগানের ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে লুকিয়ে গল্প করা সবই স্মৃতির পাতায় ভেসে বেড়াচ্ছে। চন্দ্রিমাকে নিয়ে পালিয়ে যাবো,দুজন ঘর বাঁধবো,
কত-কত রকম বুদ্ধি করতাম ঝোপে বসে বসে। ধানের মাঠে,গোয়াল ঘরে,ভূসিঘরে পালিয়ে-পালিয়ে, লুকিয়ে রাখা আতাফল খেতাম আর চন্দ্রিমার ওড়নায় মুখ মুছতাম। ও যখন টান দিয়ে ওড়নার আঁচল নিয়ে নিতো তখন জড়িয়ে ধরে ভূসিঘরের মধ্যে জড়াজড়ি করতাম। তারপর জোর করে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলতো, আর আইসবু না। অথচ দুদিন না যেতেই আবার চলে আসতো। যেন কিছুই হয়নি,কিছুই মনে নেই। সেই আগের মতই আবার আমাদের কাছাকাছি থাকার পালা শুরু হতো। খেলতে খেলতে হারিয়ে যেতাম দূরে মাঠে মাঠে। পূজার সময় হলে একদম প্রতিমা বা স্বরস্বতির মত সেজে থাকতো চন্দ্রিমা। একদম পূর্ণিমার চাঁদের মত দেখতাম ওকে।
চন্দ্রিমার নিঃশ্বাস আমার মাথার উপর যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। আমি চা খাচ্ছি আর দিদির সাথে গল্প করছি।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।