ধারাবাহিক উপন্যাসে আবুল কালাম আজাদ (পর্ব – ৭)

কিশোর উপন্যাস

ঢাকা টু মানিকগঞ্জ

৭।।
আকমল ভাই বললেন: তোরা বিরিয়ানী খা। খাসির কাচ্চি। সাথে বোরহানী আছে। সালাদও আছে। এলাকার বেস্ট রেস্টুরেন্টের কাচ্চি। খেয়ে-দেয়ে রেস্ট নে’। কিছুক্ষণ পর ও এসে চা-কফি দিয়ে যাবে। আমি গেলাম। হাতে সময় নেই।
আকমল ভাই ছুটে চলে গেলেন। তিনি খেয়েছেন কি না, খাবেন কি না, কোথায় যাচ্ছেন, কখন ফিরবেন কিছুই বলে গেলন না। আমরা কেউ জিজ্ঞেস করার সুযোগও পেলাম না।
আমরা মেঝোতে মাদুরে বসে বিরিয়ানী খেলাম। সত্যিই খুব স্বাদ পেলাম। জীবনে অনেক নামকরা ব্রান্ডের বিরিয়ানী খেয়েছি, এত স্বাদ পাইনি। অথবা পেটে ভীষণ ক্ষুধা থাকার কারণে বেশি স্বাদ লেগেছে। মাহাবুব ভাই বলেন-পেটে যদি পড়ে টান/ পুঁইয়ের ডাটা মুরগির রান।
খাওয়া-দাওয়া শেষে আমরা বিশ্রাম নিচ্ছি। কেউ সোফায় বসে। কেউ খাটে বালিশে হেলান দিয়ে। কেউ বারান্দায় চেয়ারে বসে। কেউ বা কার্পেটে বসে দেয়ালে হেলান দিয়ে। মাহাবুব ভাই দেয়ালে ঠেস দিয়ে চোখ বন্ধ করে গাইতে লাগলেন-তোমারে লেগেছে এত যে ভালো, চাঁদ বুঝি তা জানে……..।
সত্যিই মাহাবুব ভাইয়ের মনটা বেশ চনমনে। রোমান্টিক গান শুরু করেছেন। তিনি বোধহয় বিয়ে করে জীবনের ধাচ বদলাতে চাচ্ছেন। আহ! বাসের জানালায় যদি কঙ্কনা আপুর মুখটা মাহাবুব ভাইকে দেখাতে পারতাম। যার দেখা দরকার সে না দেখে দেখলেন আকমল ভাই। মাহাবুব ভাইয়ের গানের কন্ঠ সুন্দর। গান শুনতে শুনতে আমরা তন্দ্রাচ্ছন্ন হলাম।
বিকেলে কিছু আগেই সেই ছেলেটা এসে আমাদের ঘুম ভাঙালো। সে দু’টি ফ্লাস্ক ভরে চা-কফি এবং বিস্কুট নিয়ে এসেছে।
বৃষ্টির কমতি নেই। মাহাবুব ভাই হয়তো মেঘ রাশির মানুষ। মেঘ রাশির মানুষদের বিয়ের সময় বৃষ্টি হয়। মাহাবুব ভাইয়ের ক্ষেত্রে সব কিছুতেই বাড়াবাড়ি। বিয়ের নাম করতেই বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে।
জানালায় তাকিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। প্রধান সড়ক পেরিয়ে বিস্তৃত মাঠ। বৃষ্টির কারণে পুরো মাঠ সাদা হয়ে আছে। বৃষ্টি আকাশ আর মাটিকে একাকার করে ফেলেছে।
চা-বিস্কুট খাওয়া হলে ছেলেটা ফ্লাস্ক নিয়ে ছাতা মাথায় চলে গেল। ছাতায় তেমন কাজ হচ্ছে না। তার শরীর ভেজা। ছাতাটা হয়তো সান্তনা। মাহাবুব ভাই চা-বিস্কুটের দাম দিতে চেয়েছিলেন। ছেলেটা নিলো না। বলল-স্যারের সাথে কথা বলা আছে।
‘স্যার’ মানে আকমল ভাই।
সন্ধ্যা হয় হয়। মাহাবুব ভাই বললেন: আকমল এখনও আসে না কেন? ছবি আঁকার ক্লাশ কয় ঘন্টা হয়? এই বৃষ্টির মধ্যে ছেলে-মেয়েরা কি ক্লাশ করতে এসেছে, না ও গিয়ে ক্লাশে একাকি বসে আছে?
আমাদের আর কিছু করার নেই। আমরা বসে বসে বৃষ্টির গান শুনছি। বৃষ্টির কারণেই সন্ধ্যাটা কিছু আগে নেমে এসেছে।
মাহাবুব ভাই বললেন: আজ রাতে এখানে একটা গানের আসর বসাতে পারলে বেশ জমতো।
গুল্লৃ বলল: কোনো শিল্পীর এত গরজ নেই যে, এই বৃষ্টির মধ্যে আপনাকে গান শোনাতে আসবে।
: টাকা দিলে ঠিকই আসবে। পেশাদার শিল্পীরা উপযুক্ত পারিশ্রমিক পেলে যে কোনো সময় যে কোনো স্থানে গিয়ে প্রগ্রাম করেন।
: তাহলে পারলে তেমন কারও সাথে যোগাযোগ করেন।
: আসলে সেরকম গান শুনতে ইচ্ছা করছে না। একটু ভিন্ন রকম…..।
ভিন্নরকম গান আবার কেমন গান? আমাদের মনে প্রশ্ন জাগল। মাহাবুব ভাই বললেন: বাউল গানের আসর বসাতে পারলে ভালো হতো। সেরকম কোনো ইনস্ট্রুমেন্ট বা সাউন্ড সিস্টেমের দরকার হতো না। একতারা, দোতারা, মন্দিরা আর ছোট একটা ঢোল-করতাল হলেই খালি জমে যেত।
: বাউল গান!
: হু।
তারপর মাহাবুব ভাই কিছুটা সময় থম মেরে থাকলেন। আমরা বুঝলাম, মাহাবুব ভাই বাউল এবং বাউল গান সম্পর্কে আমাদের কিছু বলবেন। বাউল গানের কথা নিয়ে এসেছেন, সে সম্পর্কে আমাদের কিছু না জানালে কেমন হয়। আমরাও শুনতে ইচ্ছুক। বইয়ের বাইরে নানা বিষয়ে সাধারণ জ্ঞান তো আমরা মাহাবুব ভাইয়ের কাছ থেকেই পাই।
মাহাবুব ভাই বললেন: বাউল বা বাউল গান সম্পর্কে তোরা কিছু শুনতে চাস?
গুল্লু বলল: আমরা শুধু লালন ফকির সম্পর্কে জানি। তাঁর কিছু গানও আমরা শুনেছি। এখন তো বসেই আছি। সামনে বৃষ্টির রাত। এই রাতে আপনার বাউল গান শোনার ইচ্ছা। কিন্তু সে ইচ্ছা পূরণ হবে না। বরং আমাদের কাছে বাউল গান বাউল সম্পর্কে কিছু বলেন।
: বেশ পেঁচিয়ে কথা বলতে পারিস। আচ্ছা, শোন…….। বাউল একটি বিশেষ লোকাচার ও ধর্মমত। এই মতের সৃষ্টি হয়েছে বাংলার মাটিতে। বাউলকূল শিরোমণি লালন সাঁইয়ের গানের মধ্য দিয়ে বাউল মত পরিচিতি লাভ করে। বাউল গান যেমন জীবন দর্শন সম্পর্কিত, তেমন সুর সমৃদ্ধ। বাউলদের সাদামাটা কৃচ্ছ্র সধনার জীবন আর একতারা বাজিয়ে গান গেয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে রেড়ানোই তাদের অভ্যাস। ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে ইউনেস্কো বিশ্বের মৌখিক এবং দৃশ্যমান ঐতিহ্যসমূহের মাঝে বাউল গানকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করে। বাংলাদেশের কুষ্টিয়া-পাবনা এলাকা থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম-বোলপুর-জয়দেবকেন্দুলি পর্যন্ত বাউলদের বিস্তৃতি। বাউলদের মধ্যে গৃহী ও সন্ন্যাসী দুই প্রকারই রয়েছে। বাউলরা তাদের গুরুর আখড়ায় সাধনা করে। প্রতি বছর পৌষ সংক্রান্তির দিন বীরভূমের জয়দেব-কেন্দুলিতে বাউলদের একটি মেলা শুরু হয়, যা ‘জয়দেব’ বাউল মেলা নামে পরিচিত। বাউলেরা উদার এবং অসাম্প্রদায়িক ধর্মসাধক। তারা মানবতার বাণী প্রচার করে। বাউল মতে বৈষ্ণব ধর্ম এবং সূফীবাদের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। বাউলরা সবচেয়ে গুরুত্ব দেয় আত্মাকে। তাদের মতে আত্মাকে জানলেই পরমাত্মা বা সৃষ্টিকর্তাকে জানা যায়। আত্মা দেহে বাস করে, তাই তারা দেহকে পবিত্র জ্ঞান করে। সাধারণ প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষিত না হলেও বাউলরা জীবনদর্শন সম্পর্কে অনেক গভীর কথা বলেছেন। লালন তার বিপুল সংখ্যক গানের মাধ্যমে বাউল মতের দর্শন এবং অসাম্প্রদায়িকতা প্রচার করেছিলেন। লালন শাহ ছাড়াও বিখ্যাত কয়েকজন বাউল হলেন-হাছন রাজা, রাধারমন, পাগলা কানাই, মুকুন্দ দাস, শাহ আব্দুল করিম, ফকির দুর্বিন শাহ, কবি জয়দেব, কবিয়াল বিজয় সরকার, পূর্ণদাস বাউল প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। বলা দরকার যে, রবীন্দ্র সংগীতে বাউল গানের প্রভাব যথেষ্ট। শান্তি নিকেতনেও বিভিন্ন মেলা উপলক্ষে বাউল গানের আসর বসে।
তারপর মাহাবুব ভাই চোখ বন্ধ করে খালি গলায় গাইতে লাগলেন-
মানুষ ধরো মানুষ ভজ শোন বলিরে পাগল মন
মানুষের ভিতরে মানুষ করিতেছে বিরাজন।
মানুষ কি আর এমনি বটে যার চরণে জগৎ লুটে
এই না পঞ্চভুতের ঘাটে খেলিতেছে নিরঞ্জন।
চৌদ্দতালার উপরে দালান তার ভিতরে ফুলের বাগান
লাইলী আর মজনু দেওয়ান সুখেরই করেছে আসন।।
দুই ধারে দুই কঠরা হায়ৎ মউত মাঝখান ভরা
সময় থাকতে খুঁজরে তোরা নিকটেতে কাল সময়
সোনার পুরী আন্ধার করে যেদিন পাখি যাবে উড়ে
শূন্য খাঁচা থাকবে পড়ে কে করবে আর তার যতন।।
তালাশে খালাশ মেলে তালাশ করো রংমহল
উঠিয়া হাবলঙের পুলে চেয়ে থাকা সর্বক্ষণ
দেখিবে হাবলঙের পুলে দুই দিকেতে অগ্নি জ্বলে
ভেবে রশীদ উদ্দিন বলে চমকিছে স্বর্গের মতন।।
আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনলাম মাহাবুব ভাইয়ের বাউলদের ওপর বক্তৃতা, তারপর গান। আসলে মানুষটার অনেক প্রতিভা। এই মানুষটার হওয়া উচিত ছিল কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। অথচ তিনি তার এই মেধা ব্যয় করছেন আমাদের পেছনে। আবার হয়তো কখনো সেরকম কিছু হয়েও যেতে পারেন। আকমল ভাই হয়ে গেলেন না। কল্পনা করিনি যে আকমল ভাই বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার হবেন।
সন্ধ্যায় আকমল ভাই এলেন। সাথে চারজন লোক। আমরা হাঁ করে তাদের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।