সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে অর্ঘ্য ঘোষ (পর্ব – ৩৬)

সালিশির রায়

কিস্তি – ৩৬

তাই সে বলে — বেশ আমি ওই প্রস্তাবেই রাজি। তারপর থেকে অন্য খাতে বইতে থাকে অঞ্জলির জীবনধারা। বাবা চলে যাওয়ার পর থেকেই স্কুলে যাওয়া অনিয়মিত হয়ে পড়েছিল। এখন আর যাওয়াই হয় না। এখন সকালে হলেই সাইকেল নিয়ে হাজির হয় হৃদয়দা। তার আগে সে ভোর ভোর উঠে রান্না সেরে নেয়। মায়ের জন্য খাবার ঢেকে রাখে। তারপর নিজে খেয়ে নিয়ে তৈরি হয়ে থাকে। তৈরি মানে টিফিন ক্যারিয়ারে দু’জনের মতো খাবার ভরে নেওয়া। আসলে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। তাই মাঝে একবার টিফিনের জন্য ভাত ,তরকারি ভরে নেয়। তারপর হৃদয়দার সাইকেলের পিছনে চেপে কাজের জায়গার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যায়। বেশ কেটে যায় দিনগুলো। সকালে বেরিয়ে সন্ধ্যায় ফিরে আসে। হৃদয়দা রাজমিস্ত্রি আর সে রেজার কাজ করে। দুপুরে মুখোমুখি পা ছড়িয়ে খেতে বসে। খেতে খেতে সে টের পায় হৃদয়দার যেন খেতে কিছুটা কষ্ট হচ্ছে। কষ্ট হওয়ারই কথা।
আসলে তাদের সমাজে এখনও খাওয়া মানে স্রেফ পেট ভরানোর ব্যাপার। ভাতের সঙ্গে একটা তরকারি হলেই চলে যায়। সবার তো তাও জোটে না। নুন-লংকাগুড়ো আর শাক সিদ্ধ দিয়েই বাড়ি থেকে আনা পান্তা খেয়ে পেট ভরায়। বড়ো জোর গঞ্জের মোড় থেকে সস্তার চানাচুর কিম্বা বাসি চপ দিয়ে তরকারির অভাব পূরণ করে। কিন্তু হৃদয়দাদের তো সেই অভ্যাস নেই। তাই সে হৃদয়দাকে একটু বেশি বেশি করে তরকারি তুলে দেয়। হৃদয় আবার তা থেকে তার কৌটোয় তুলে দেয়। সেও ফিরিয়ে দেয়। এইভাবেই কিছুক্ষণ কেটে যায়। এক সময় আঙুলে আঙুলে ঠেকে যায়, আর একে অন্যের দিকে পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকতে থাকতে কোথাই যেন হারিয়ে যায়। খেতে খেতে কত গল্প হয় দুজনের। খাওয়া শেষ হয়ে যায়, কিন্তু গল্প আর ফুরোয় না। ভাবী জীবনের গল্প, স্বপ্ন পূরণের গল্পে বিভোর হয়ে ওঠে দু’জনে। দিনগুলো যে কি ভাবে কেটে যায় টের পায় না। কাজের নাম করে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে এলেও সবদিন তারা কাজে যায় না।
এক এক দিন হৃদয়দার সাইকেলে বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে চলে যায়। কখনও কাজের নাম করে ফুল্লরা মেলা কিন্বা সিনেমা দেখতে চলে যায়। হৃদয়দা তাকে পচ্ছন্দ কাঁচের চুড়ি, নেল পালিশ, স্নো, পাওডার সব জোর করে কিনে দেয়। সিনেমা হলের অন্ধকারে নায়ক–নায়িকাদের প্রেমের সিনে হৃদয়দা তার হাত দুটি নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নিয়ে ঘন হয়ে আসে। তার শরীরও হৃদয়দার সান্নিধ্যের জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। কিন্তু পাছে দুর্বল হয়ে পড়ে তাই নিজেকে সংযত করে। সত্যিই তার জীবনে এর থেকে ভালো সময় আর আসে নি। বেশ কেটে যায়দ দিনগুলো।হৃদয়দা প্রতিদিন তার হাতে বেতনের টাকা তুলে দেয়। সে তা থেকে কিছু কিছু করে টাকা কেটে নিতে বলে। হৃদয়দা কিছুতেই সে কথা কানে তোলে না। বরং আগের মতোই মজা করে বলে — শুধু আসলটাই দেবে , সুদ দেবে না ? সে মনে মনে বলে, তোমাকে তো সব দিয়েই বসে আছি। কিন্তু বলা হয় না।তার কণ্ঠরোধ করে দেয় মেয়েদের সহজাত লজ্জা বোধ। মুখে কিছু বলতে না পারলেও এখন যেন সে হৃদয়দাকে চোখে হারায়। সন্ধ্যায় হৃদয়দা তাকে পৌঁচ্ছে দিয়ে কিছুক্ষণ গল্প গুজব করেই চলে যায়। তার মন হৃদয়দাকে আরও কিছুক্ষণ আটকে রাখতে চায়। কিন্তু পাড়ার লোকেদের কথা বিশেষ করে ওই অশোক আর শোভন শয়তান দুটোর কথা ভেবে পারে না।এমনিতেই পাড়ার লোকেরা তাদের মেলামেশা নিয়ে গুজগুজানি শুরু করেছে। তার যাওয়া আড়চোখ দেখে আর হাওয়ায় গায়ে জ্বালা ধরানো মন্তব্য ছুঁড়ে দেয়।
তার উপরে ওই শয়তান দুটো সব সময় নজরদারি চালায়। তাদের চোখে প্রতিশোধের আগুন জ্বলে। অঞ্জলি বুঝতে পারে পান থেকে চুন খসার অপেক্ষায় রয়েছে তারা। কিন্তু সে সুযোগ তাদের সে দেবে না। তাই হৃদয়দা এলেই সে মা’কেও তাদের কাছে এনে বসায়। মা’ও তাদের কথাবার্তার মাঝে টুকটাক কথা বলে। সেদিন মা একবার ভাইয়ের কাছে যাওয়ার কথাটা পাড়ে। অঞ্জলি ও কয়েকদিন ধরে ভাইয়ের কাছে যাওয়ার কথাই ভাবছিল। হাতে কিছু টাকা জমেছে। হৃদয়দার সঙ্গে গিয়ে একটা জামাপ্যান্ট, টুকিটাকি জিনিসপত্র আর কিছু টাকা সে ভাইকে দিয়ে আসবে। সেইমতো পরদিনই সে আর হৃদয়দা মটর বাইকে ভাইয়ের হোস্টেলের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। যাওয়ার পথে বাজারে জিনিসপত্রগুলো কিনে নেয় তারা। হৃদয়দার পিছনে বসে যেতে যেতে একটা রোমাঞ্চ অনুভব করে সে। একদিন রাতে তো সে এমনি ভাবেই হৃদয়দার সঙ্গে নিরুদ্দেশে হারিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল। মনে হচ্ছিল যেন সেই স্বপ্নটাই সত্যি হয়ে ধরা দিয়েছে তার কাছে। হৃদয়দার কোমর জড়িয়ে ধরে সে আদিবাসী ভাষায় গুনগুনিয়ে প্রেমের গান গেয়ে ওঠে। হৃদয়দা একটু পিছনে সরে এসে যেন আরও একটু ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করে। অন্যরকম একটা সুখানুভূতিতে ভরে যায় তার মন প্রান। মনে হয়, হৃদয়দাকে জড়িয়ে ধরে চুল গুলো সব এলোমেলো করে দেয়।
কিন্তু কপট রাগ দেখিয়ে বলে — হচ্ছেটা কি ?এ কদম দুষ্টুমি করবে না কিন্তু।
—- দুষ্টুমি আবার করলাম কোথাই ? তবে বললেই যখন তখন ছোট্ট একটা দুষ্টুমি করেই নি কেমন ?
বলেই হৃদয়দা মুখটা তার মুখের কাছে নিয়ে আসে। আর সে দ্রুত মুখটা অন্যদিকে সরিয়ে নিয়ে বলে — আরে করছো কি তুমি ? তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি ? রাস্তার লোকেরা সব তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। সামনে তাকাও। শেষে একটা দুর্ঘটনা ঘটাবে দেখছি।
— সত্যি অঞ্জু , তোমার জন্য আমার সবসময় কেমন পাগল পাগল লাগে।
অঞ্জু মনে মনে ভাবে সে তো তারও লাগে। কিন্তু সে কথা সে বলতে পারে না।তাহলে হৃদয়দা আরও অধৈর্য্য হয় পড়বে।
কিন্তু তার তো ধৈর্য্যহারা হলে চলবে না । ভাইয়ের পড়াশোনা , মায়ের দায়িত্ব অস্বীকার করে এখনই সে হৃদয়দার সঙ্গে ঘর বাঁধতে পারবে না। তাকে চুপ করে থাকতে দেখে হৃদয়দা বলে, দুর্ঘটনা যদি ঘটেই , তুমি কি আমার সঙ্গে মরতে ভয় পাও?
— তুমি কি আমাকে এই চিনলে। মা-ভাইয়ের একটা ব্যবস্থা হয়ে গেলেই তোমার সঙ্গে আমি নরকেও যেতে পারি।
— তুমি আমাকে এতটাই ভালোবাসো ?
—- কেন তুমি অনুভব করতে পারো না ?
— পারি গো পারি। আমিও যে তোমায় খুব ভালোবাসি।
— সত্যি?
—- সত্যি — সত্যি– সত্যি।
ওইভাবে খুনসুটি করতে করতেই ভাইয়ের হোস্টেলে পৌঁচ্ছে যায় তারা। তাদের দেখেই ছুটে আসে ভাই। সে ভাইকে জড়িয়ে ধরে। এই কয়েক মাসেই অনেক পরিবর্তন হয়ে গিয়েছোভাইয়ের। বেশ শান্ত বুদ্ধিদীপ্ত দেখায় তাকে।অরুণস্যারের কথা মনে পড়ে যায় অঞ্জলির। অরুণস্যারই তো বলেছিলেন , একটা সিস্টেমের মধ্যে থাকলেই আদব-কায়দা পুরোপুরি বদলে যাবে। কথাটা যে নেহাৎ মিথ্যে নয় তা ভাইকে দেখেই সে বুঝতে পারে। কথায় কথায় ভাই বাবা-মায়ের কথা জিজ্ঞাসা করে। সে বলে , মা এখন আগের থেকে একটু ভালো আছে। কিন্তু বাবার হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি সে ভাইকে বলে না। বললে সে কষ্ট পাবে। তাই সে বলে, বাবা এখন বর্ধমানে কাজে করতে গিয়েছে।
— তাহলে তো তোর স্কুলে যাওয়া হচ্ছে না, তাই না দিদি ? সে আসল ব্যাপারটা চেপে যায় ভাইয়ের কাছে। কিছুতেই বলতে পারে না অভাবের জন্য স্কুলে যাওয়া ছেড়ে এখন সে মজুর খাটতে যায়।তাই সে বলে, হ্যা রে মা’কে একা ফেলে এখন আর আমার সবদিন স্কুলে যাওয়া হয় না।
আসার সময় ভাইয়ের চোখ দুটো ছলছল করে ওঠে। তারও খুব কষ্ট হয়। সে ভাইকে কাছে টেনে নিয়ে আদর করে বলে — আর তো একটা মাস। তারপরই পুজোর ছুটি পড়ে যাবে। তখন আমরা এসে তোকে নিয়ে যাব কেমন ?
আরও কিছুক্ষণ থেকে ভাইয়ের কাছে থেকে বিদায় নিয়ে বেড়িয়ে আসে তারা।আসার সময় ভাইয়ের জন্য তার মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। বিষয়টা আন্দাজ করে হাসি ঠাট্টায় তাকে ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা করে হৃদয়দা।এক সময় মনের ভারটা কিছুটা হালকাও হয়। অঞ্জলি আন্দাজ করে বাড়ি ফিরতে তাদের বেশ কিছুটা রাত্রি হয়ে যাবে। হৃদয়দাকে আজ খেয়ে যেতে বলবে সে।এজন্য মাঝপথে একটা কসাইখানা থেকে কিছুটা মাংস নিয়ে নেয়। বাড়ি ফেরার পথে পাড়ার মোড়ে দেখে কিসের যেন একটা জটলা চলছে। শোভন আর অশোক ও রয়েছে সেই জটলায়। তাদের দেখে কিছুটা চুপচাপ হয়ে যায় জটলার মানুষগুলো। তারা অবশ্য কোনদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে সোজা বাড়ি ঢুকে যায়। হৃদয়দাকে রান্নাচালার কাছে মোড়া পেতে বসতে দেয়। তারপর পরিস্কার হয়ে এসে হৃদয়দার সঙ্গে গল্প করতে করতে রান্না চাপায়। বেশ জমিয়ে রান্না করে সে। মা ‘কে খাইয়ে দিয়ে তারা খাওয়ার তোড়জোড় শুরু করে। কিন্তু খাওয়া আর হয় না তাদের ।

ক্রমশ

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।