T3 শারদ সংখ্যা ২০২২ || তব অচিন্ত্য রূপ || বিশেষ সংখ্যায় অরূপ চট্টোপাধ্যায়

ধর্মযুদ্ধ

“আমার মনের মায়াদর্পনে তোমাদের দেখিয়াছি ,
দেখেছি সেখানে কত যে পার্থসারথি, সব্যসাচী।
অনাগত মহাভারতের কুরুক্ষেত্রে তোমরা সবে,
ধর্মরাজ্য আনিতে আবার মেতেছো রনোৎসবে ”
বাংলার অন্যতম কবিশিরোমনি কাজী নজরুল ইসলাম তদানীন্তন জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম কে পর্যালোচনা করেছিলেন – এমনই এক পৌরাণিক বিশ্লেষণের আলোকে । বস্তুতঃ ধর্মের সাথে রাজনীতির মেলবন্ধন আজকের নয় , এমনকি তা শুধু ভারতের ভৌগোলিক সীমারেখায় গণ্ডিবদ্ধ ছিল না প্রাচীন কালেও।
কারবালার প্রান্তরে, হাসান ও হুসেন ভ্রাতৃদ্বয়ের যুদ্ধও সন্দেহাতীত ভাবে ছিল এক ধর্মযুদ্ধ। দুই প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষের তথাকথিত ধর্ম বা “মজহব” অভিন্ন হলেও , হজরত পয়গম্বরের বিভেদ-বিহীন সাম্য ও মৈত্রীর নীতিতে প্রতিষ্ঠিত ধর্মরাজ্যের উত্তরসূরি রূপে তাঁর সুযোগ্য ও ন্যায়নিষ্ঠ দুই দৌহিত্র হাসান ও হুসেনের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা বিদ্বেষ-ভাবাপন্ন করে তুলেছিল দামাস্কাসের খলিফা কে । নৃশংস সেনানায়ক এজিদ মৃত্যুর কারণ হন – পয়গম্বরের দৌহিত্র ভ্রাতৃদ্বয়ের। কারণ সেই শত্রুপক্ষ বদ্ধপরিকর ছিল ছিল তৎকালীন খলিফতন্ত্রের নিরঙ্কুশ আধিপত্যকে অটুট রাখতে।
মধ্যযুগীয় ইউরোপের “ক্রুসেড” এর ক্ষেত্রেও একই চিত্র পরিলক্ষিত হয় । পরবর্তীকালেও দেখা গেছে – রোম দখলকারী বিদেশী রাষ্ট্রনায়ক শার্লামেন কে “পবিত্র রোমান সম্রাট শার্লামেন” বলে আখ্যায়িত করেন তখনকার রোমান পুরোহিতশ্রেণী – কেবলমাত্র রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা লাভের আশায়।
কিন্তু , ধর্মযুদ্ধের এই যুদ্ধ কিন্তু সকল ক্ষেত্রে অস্ত্র দিয়েই হয় নি । অসির বিরুদ্ধে মসীর যুদ্ধও ইতিহাস রচনা করেছে । ধর্মযাজকদের কুসংস্কারচ্ছন্ন ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে – ব্রুনো অথবা গ্যালিলিওর বৈজ্ঞানিক সত্যপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামও নিঃসন্দেহে ছিল – যুগান্তকারী ধর্মযুদ্ধ।
এই নগণ্য প্রতিবেদকের বিচারে, যিনি মহাভারতের শ্রেষ্ঠা রমণী – সেই গান্ধারী নিঃশর্ত আশীর্বাদ দেন নি স্বীয় পুত্রগণকে । বলেছিলেন “যতো ধর্ম: স্তত জয়ঃ” । তাঁর এই বাণী বোধহয় ছিল তাঁর সত্যপলদ্ধি। তবে রামায়ণের আর মহাভারতের দুই ধর্মযুদ্ধে – ধর্মের তথা ন্যায়ের জয় হলেও , দুই যুগের এই দুই ধর্মযুদ্ধের পরিণাম ছিল ভিন্ন চরিত্রের। রামায়ণের যুদ্ধে রাম- বাহিনীর কতিপয় সৈন্যের মৃত্যু ব্যতীত রামকে কোনো চরম মূল্য বা বলিদান দিতে হয় নি । ভ্রাতা, সখা , সকল সেনানী ও পার্শ্বচরগণকে নিয়ে বিজয়োল্লাসে প্রত্যাবর্তন করেন। পক্ষান্তরে , রাবণ- বাহিনীর সকল ভ্রাতা, মিত্র , সেনানী শুধুমাত্র রাজ- আনুগত্য ও দেশপ্রেমের নামে প্রাণ দিলেন। মহাভারতের ধর্মযুদ্ধে কিন্তু চরম মূল্য এবং বলিদান দিতে হয়েছিলো উভয় পক্ষকেই । ফলতঃ বিজেতা পাণ্ডবগণের প্রতিষ্ঠিত ধর্মরাজ্যে যে শান্তিস্থাপন হয় , প্রকারান্তরে তা ছিল – শ্মশানের শান্তি।
কিন্তু পৌরাণিক অনুষঙ্গের, কবিকল্পনার ধর্মযুদ্ধের ধর্ম সাম্প্রদায়িক বিভেদের ধর্ম ছিল না । সেখানে ধর্ম কথাটির তাৎপর্য, – যা মানুষকে ধারণ করে। কিন্তু সাম্প্রদায়িক বিভেদের বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধ করেছিলেন – নানক, কবীর, মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য প্রমুখ যুগনায়ক গণ। এমনকি এই মহৎ প্রয়াসে ব্রতী হয়েছিলেন মুঘল শাহজাদা দারা-শিকোহ থেকে রাজা রামমোহন রায় পর্যন্ত যুগদ্রষ্টা মনীষীগণ ।
কিন্তু রেনেসাঁস পর্বের শতাধিক বছর পরেও দেখা যায় পৃথিবীর দুই প্রান্তের দুই ধর্মযুদ্ধ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসানের পরেই – তুরস্ক রাষ্ট্রের বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জননায়ক কামাল আতাতুর্ক যেন প্রায়শ্চিত্ত করলেন কারবালার প্রান্তরের সেই বর্বরোচিত পাপের। খলিফাতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে , প্রতিষ্ঠা করলেন উন্নত ও প্রগতিশীল রাষ্ট্রচেতনার এক নতুন তুরস্কদেশের।
অন্যদিকে , আগ্রাসন নীতির পাশাপাশি ধর্মান্ধতার তাড়নায় এডলফ হিটলার, পৈশাচিক আক্রমণ চালালেন ইহুদী সম্প্রদায়ের উপর । নিষ্কৃতি দিতে চান নি নিজের স্বদেশবাসী বিশ্ববরেণ্য আলবার্ট আইনস্টাইনকেও। সমগ্র বিশ্বের কাছে তিনি প্রতিপন্ন হলেন বর্বরতার প্রতীক রূপে। তার পরিণাম -তার নিজের এবং তার নাৎসী বাহিনীর সমূল বিনাশ এবং পরবর্তীকালে ইসরায়েল রাষ্ট্রের উদ্ভব।
ধর্মযুদ্ধের প্রয়োজন কিন্তু আজও আছে । কিন্তু আমরা যারা একবিংশ শতাব্দীর এবং নূতন সহস্রাব্দের মানুষ – আমদের সকলের উত্তরদায়িত্ব হলো চেতনার তৃতীয় নয়ন উন্মীলিত করে দিগদর্শন করার – যে আজকের বিজয়মশালকে আমরা কোন পথে নিয়ে যাবো ??

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!