আজ ১৫ই আগষ্ট, ন্যাশানাল হলিডে; অনেকদিন পর আজ সন্ধ্যায় আবার আসর বসবে অমর্ত্যবাবুর বাড়িতে। তবে লোকজন বেশি থাকবে না, মাত্র তিনজন, বন্ধু সুকান্ত, বন্ধুপত্নী শম্পা আর ওদের একমাত্র ছেলে শারদঅর্ঘ্য। এই ছেলেটিকে একটু ভালো করে বাজিয়ে দেখে নেওয়ার জন্যই আজকের আসরের ব্যাবস্থা। ভালো কলেজ থেকে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে একটি মাল্টিন্যাশানাল কোম্পানিতে বেশ কিছুদিন চাকরি করেছিল শারদঅর্ঘ্য, তারপর সে সব ছেড়েছুড়ে লেগে পড়ে সিনেমা বানাতে, দু’একটা পুরস্কারও পায়। লম্বা, চওড়া, ফর্সা, মাথায় ঝাঁকড়া চুল আর মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি- ছেলেটার চেহারায় বেশ একটা সফিস্টিকেটেড ইন্টেলেকচুয়াল ভাব আছে। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, এমবিএ পাশ জামাই তো সবারই হয়, মেয়ের জন্য এমন একখানা ফিল্ম ডিরেক্টর জামাই পেলে মন্দ হয় না। এইসব সাত-পাঁচ ভেবে আজ ওদের ডিনারে ইনভাইট করেছেন অমর্ত্যবাবু।
গত বছর অমর্ত্যবাবু নাসিকের একটি অভিজাত ভাইন-ইয়ার্ডে সস্ত্রীক ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন। ফেরার সময় সঙ্গে এনেছিলেন ওই আঙুরক্ষেতেরই আঙুর দিয়ে তৈরি বেশ কয়েক বোতল স্পার্কলিং ওয়াইন। লকডাউনের জন্য এ বছরের বেশিরভাগ সময়টাই কেটেছে গৃহবন্দী অবস্থায়, বন্ধ হয়েছে পার্টি-শার্টি, বাধা পড়েছে গেট-টুগেদারে, তাই এখনও থেকে গিয়েছে নাসিক থেকে আনা সূর্যের মুখের ছাপ মারা দু’একটা পানীয়ের বোতল। আজকের মায়াবী সন্ধ্যায় তারই একটার সৎ ব্যাবহার করবেন বলে ঠিক করেছেন অমর্ত্যবাবু।
স্বচ্ছ স্ফটিকের সরু সরু ফ্লুটে সফেন পানীয় ঢেলে নিজের পানপাত্রটি উঁচিয়ে ধরে অমর্ত্যবাবু বললেন,” লেটস সেলিব্রেট আওয়ার ইন্ডিপেন্ডেন্স ডে উইথ শ্যাম্পেন”, যদিও উনি খুব ভালোভাবেই জানেন এই পানীয়টি কোনোমতেই শ্যাম্পেন নয়, ভাইন-ইয়ার্ডে ওয়াইন ট্যুর করার সময় গাইড বেশ ভালোভাবেই বুঝিয়ে দিয়েছিল, ফ্রান্সের শ্যাম্পেন নামক গ্রামে যে স্পার্কলিং ওয়াইন তৈরী হয় একমাত্র তাকেই শ্যাম্পেন বলা চলে, বাকিদের নয়। অমর্ত্যবাবুও বুঝেছিলেন, এই শ্যাম্পেনের ব্যাপারটা অনেকটা দার্জিলিং চায়ের মতো; শুধু উৎকৃষ্টতায় কাজ হবে না নির্দিষ্ট স্থানে উৎপন্নও হতে হবে। তবুও সব জেনেশুনে উনি স্পার্কলিং ওয়াইনকে শ্যাম্পেন বলে চালিয়ে দিলেন, কারণ উনি ভাইন-ইয়ার্ড বেড়াতে গেলেও সুকান্ত তো আর সেখানে যায়নি তাহলে সে বা তার পরিবার এতো কিছু জানবে কি করে।
“চিয়ার্স”, পানপাত্রটিকে তুলে নিয়ে সহাস্যে বলে উঠল শম্পা, স্লিভলেস ব্লাউজের ফাঁক থেকে ভেসে এল অতি পরিচিত ফরাসী সুগন্ধ। পানীয়ে চুমুক না দিয়েও মাত হয়ে গেলেন অমর্ত্যবাবু। বিভোর হয়ে দেখতে লাগলেন বন্ধুপত্নীকে; টানা টানা চোখে গাঢ় নীল কাজল, ঠোঁটে গোলাপী লিপস্টিকের পুরু পরত, সরু আঙুলে ঠোঁটের রঙের নেলপালিশ। শম্পার রসালো ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে অমর্ত্যবাবু ঠাওর করার চেষ্টা করলেন ওর ওই লিপস্টিকটা কোথায় তৈরি, ওঁর স্ত্রী পুষ্পিতার কসমেটিক্সের মতো প্যারিসে না কি কন্যা ইপ্সিতার ব্যাবহৃত কসমেটিক্সের মতো নিউ ইয়র্কে।
“হাউ ইজ ইয়োর সান?”, সুকান্তর প্রশ্নে টনক নড়ল অমর্ত্যবাবুর। ওঁর ছেলে ইন্দিবর পেশায় মাইক্রোবায়োলজিষ্ট। দেশে সুযোগ কম তাই বছর তিনেক আগে সান-ডিয়াগোতে পাড়ি দিয়েছিল, তখন থেকে সেখানেই আছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ইন্দিবরের পোষ্ট করা ফটোগুলো দেখে অমর্ত্যবাবু আঁচ করেছেন ছেলে ওখানে একটি মেমসাহেবের সাথে লিভ-ইন করছে। কিন্তু সে কথা তো আর ফলাও করে বন্ধুকে বলা যায় না তাই উনি ইনিয়ে-বিনিয়ে ছেলের কাজের গল্প করতে লাগলেন।
মেয়োনিজ ডিপের সাথে গরমাগরম চিকেন নাগেট নিয়ে কিচেন থেকে বেরিয়ে এল পুষ্পিতা। ও আজ অনেক যত্ন করে বেশ কয়েকটা কন্টিনেন্টাল ডিশ বানিয়েছে ডিনারের জন্য। দুবার সি-সেকশন ডেলিভারির পর পুষ্পিতার তলপেটটা বেঢপ মোটা হয়ে গিয়েছে; ডায়েটিং, এক্সারসাইজ- অনেক চেষ্টার পরেও সেই পেট আর সমতল হয়নি। পুষ্পিতা তাই এখন শাড়ি পরা প্রায় ছেড়েই দিয়েছে। ট্রাউজার আর শার্টেই ও বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করে।
স্টার্টারের প্লেটটা শারদঅর্ঘ্যের দিকে এগিয়ে দিল ইপ্সিতা। অ্যাজটেক প্রিন্ট ম্যাক্সি ড্রেসে বেশ ফ্রেশ লাগছে ওকে। বাড়িতে সারাক্ষন শর্টস আর টি-শার্ট পরে থাকলেও আজ শারদঅর্ঘ্য আসবে শুনে নিজের গরজেই একটু সাজগোজ করেছে।
পানাহারের সাথে চলতে লাগলো গল্পগাছা, চোস্ত ইংরাজিতে।
“বাবার কাছে শুনলাম, আপনার দাদু না কি স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন ?”,শারদঅর্ঘ্য এতক্ষন চুপচাপ বসে ছিল হঠাৎ শুদ্ধ বাংলায় একটা বেয়াড়া প্রশ্ন করে বসল অমর্ত্যবাবুকে।
“হুম, দাদু তো তাম্রপত্র ও পেয়েছিলেন।”, গর্বের সাথে জবাব দিলেন অমর্ত্যবাবু।
“সেটা কি একবার দেখা যায় ?”
“সিওর”, বলে ডাইনিং টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন অমর্ত্যবাবু। শারদঅর্ঘ্যকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চললেন ওঁর স্বর্গীয়া মায়ের ঘরের দিকে। কাচের আলমারির ভেতর সময়ের নিয়মে বাদামী ছোপ ধরা রবীন্দ্ররচনাবলী গুলোর সাথে সসন্মানে বিরাজ করছে অমর্ত্যবাবুর দাদুর পাওয়া তাম্রপত্র, ধূসর ধুলোর পরত মেখে…