গল্পেরা জোনাকি -তে আবদুল বাতেন

কুসুম

৯১১-এ কল করে কুসুম।ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে সে পুলিশ অফিসারকে তাঁর কষ্টের কথা খুলে বলে।তাঁর প্রতিদিনের নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরে।কি আর করতে পারে, সে? যাকে এক কাপড়ে সন্ধ্যার স্ট্রিট ওয়াকে নেমে আসতে হয়েছে।দুধের বাচ্চাকে বুকের কাপড়ে ঢেকে কঠিন শীতের ছোবল সহ্য করতে হচ্ছে! অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে থেকে লক মেরে জয়নাল চলে গেছে।কিন্তু কোথায় যাবে, কুসুম? এই দূর পরবাসে তাঁর আর কে আছে? তাঁর মা বাবা ভাই বোন আত্নীয় স্বজন সবাই থাকে বাংলাদেশ। জয়নাল ছাড়া তাঁর কোন আশ্রয় নেই। তাঁর আর কোন ঠিকানা নেই।কুসুমের যাওয়ার গন্তব্য নেই।সেই জয়নাল যখন তাঁকে মারধোর করে বাসা থেকে বের করে দিয়েছে, তখন কুসুমও এর একটা বিহিত না করে ছাড়বেনা।হারবেনা, সে।এর একটা চূড়ান্ত ফয়সালা সে করিয়েই ছাড়বে।সে জয়নালের হাত পা ধরে অনেক ঝুঁলে থেকেছে।কিন্তু আর না।তাঁর অসহায়ত্বের অনেক সুযোগ নিয়েছে, জয়নাল।কুসুমের দুর্বলতাকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করেছে, সে।সংসার টিকে রাখতে অনেক ছাড় দিয়েছে, কুসুম। শান্তির জন্য অনেক অত্যাচার মুখ বুঁজে সয়েছে, ও।কিন্তু আর চুপ করে থাকা নয়।কুসুমও এখন এদেশের আইন আদালত জানে।নারী অধিকারের বিষয়টা বোঝে।আর জয়নালকে সে বুঝিয়ে ছাড়বে-কত ধানে কত চাল?

তরকারিতে তেল কেন বেশি, ঝাল কেন কম? ভাত কেন ঝরঝরে নয়, বাচ্চাটা কেন কাঁদছে-এমন হাজার অজুহাতে কুসুম অনেক চর থাপ্পড় হজম করেছে।সে শাড়ির আঁচলে নাক মুখ মোছে। দাঁতে নখ কাটে।কমোড ব্যবহারে ও অস্বস্থিবোধ করে। কুসুম টয়লেট সিট ব্যবহারের নিয়ম জানেনা।সুপার মলে গেলে সে সস্তা জিনিসপত্র খোঁজে।ইউ টিউবে হিরো আলমের গান শোনে, কমেডি দেখে।সে পান্তা, সুটকির ভর্তা খেতে পছন্দ করে।ভাতের সাথে মরিচ কামড়ে খায়। আর কাটা চামচে খেতে পারেনা বলে কি কুসুম গন্ডমূর্খ, এক নম্বরের খ্যাত? সে বড় বড় গ্রাসে ভাত খাত। তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করে।তাঁর মিনি ড্রেস, কোণ হিলস ভাল্লাগেনা।চুলের বব কাট পছন্দ করেনা বলে কি কুসুম ছোটলোকের জাত? ফকিরের বাচ্চা? জয়নালের হাজারটা গালাগাল সহ্য করতে করতে সে আর পারেনা।মাঝে মাঝে তাঁর মাথায় রক্ত উঠে যায়।বদমাশটাকে বটি দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে মেরে ফেলতে ইচ্ছা করে।কিন্তু সে কি পারবে, জয়নালের মত ঢ্যাঙা দেহের পুরুষের সাথে পেরে উঠতে? উল্টো তাঁকেই কিচেনে নির্মমভাবে খুন হতে হবে।

দিনে দুই প্যাকেট সিগারেট লাগে জয়নালের।সে পানির মত মগে মগে চা কফি খায়।প্রায় রাতে মদ গাঁজা খেয়ে রুমে ফেরে। মাতলামি করে।কুসুম শান্ত থাকার অনুরোধ করলে সে তাঁর গায়ে হাত তোলে।জয়নাল জুয়া খেলে খেলে ক্রেডিট কার্ডের বারোটা বাজায়।ও কোথায় কোথায় যাতায়াত করে? সে কথা জানতে চাইলে জয়নাল নাকি কাউকে কৈফিয়ত দিতে রাজি নয়। ডাক্তারকেও সে বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যা কথা বলে।জয়নাল লিভিং রুমে প্রায় সারাক্ষণ কানে হেডফোন লাগিয়ে নেটফ্লিক্সে ডুবে থাকে।সোডা রেড মিট কম করে খেতে বললে জয়নাল চোখ রাঙায়।কুসুম নাকি খবরদারি করছে! সে তাঁর বৌ হয়ে কি এসব বিষয়ে নিষেধ করবেনা?

ফটরফটর করে কয়েকটা ইংরেজি ঝারতে পারে বলে জয়নালের মাটিতে পা পড়েনা।সে যেন আমেরিকা কিনে নিয়েছে।আর নিউ ইয়র্ক শহর যেন তাঁর বাপের! সিটিজেনশিপে সে তাঁর জয়নাল নাম ছেটে জন রেখেছে। জন! সে নাম নিয়ে ওর কি গৌরব! আসলে নেড়ি কুত্তার বাঘা নাম! কুসুমের একটা ফেসবুক একাউন্ট নাই। থাকলে সে নাকি প্রেমের বাজার বসাবে? অথচ জয়নাল মেসেনজার, ফেসবুক, উয়িচ্যাট, টুইটার, টিক টক, হোয়াটসআপ, ভাইবার, ইন্সটাগ্রামে চব্বিশ ঘন্টা হাবুডুবু খায়। কুসুম কি সে খবর রাখেনা? সে না হয় একা একা ডাক্তার দেখাতে পারেনা।তাঁর মুখে হরবর করে ইংরেজি আসেনা। আসবে কি করে? গ্রামের স্কুলে ক্লাস টেনে থাকতে তাঁর বিয়ে হয়। মা বাবার একমাত্র মেয়ে, সে। কলিজার টুকরা।আমেরিকায় বিয়ে হলে মেয়ে তাঁদের রাজরাণী হয়ে থাকবে।পরম সুখে পায়ের উপর পা তুলে জীবন কাটাবে।দাসিবাদী রান্নাবান্না, ঘরদোর পরিস্কার করবে।আর তাঁদের মেয়ে শুধু দামী দামী শাড়ি গহনায় সেজেগুজে টিভিতে সিরিয়াল দেখবে।কুসুম দেখতেও কুসুমের মত।কচি আর অপরুপা দেখেই জয়নাল তাঁকে বিয়ে করেছে। পড়ালেখা কিংবা তাঁর আর সব গুণাগুণ সে বিচার করতে যায়নি।সেই কুসুমকে সে দিনে দিনে অরুচিকর ভাবতে শুরু করেছে।যখন তখন বকাবকি, গায়ে হাত তোলা লেগেই থাকে। একমাত্র বেডেই কুসুমকে সে মেগান ফক্স ভেবে বুকে টেনে নেয়। পিরিয়ডেও দুই উরুর মাঝখানে ঠেসে ধরে, জয়নাল।সে তাঁকে ধর্ষকের মত ঠাপায়, খামচায় , যেখানে সেখানে কামড়ায় আর হাঁপায়!

কুসুমের সব কথা শুনে পুলিশ অফিসার জয়নালকে ফোন করে। জয়নাল যেন বিদ্যৎ বেগে এসে হাজির হয়। অফিসার অ্যাপার্টমেন্টের চাবি কুসুমের হাতে ধরিয়ে দেয়।জয়নালকে কি কি সব বলে পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যায়।

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!