অথ শ্রী উপন্যাস কথায় আরণ্যক বসু (পর্ব – ৫০)

শালজঙ্গলে বারোমাস ছয়ঋতু

তৃষ্ণা নামুক হৃদয় জুড়ে , চোখের কোলে ঘুম ,
অরণ্যানীর শান্ততাতে স্বপ্নের মরশুম ;
সারাজীবন কাছে থাকার প্রতিশ্রুতি ঘিরে ,
ভোরের সোহাগ মাখবে বলে রাত চলেছে ফিরে ।

কিছুটা সময় নাকি অনেকক্ষণ ওরা হাতে হাত রেখে বসে থাকলো। মায়ের কোলে ঘুমিয়ে পড়েছে তোয়া। আরও কিছুটা সময় স্তব্ধ থাকার পর , উন্মনা প্রথম নীরবতা ভাঙলো । কবিমন আমাকে একটা সত্যি কথা বলবে তুমি সত্যিই লিখতে পারো না , নাকি ইচ্ছে করে লেখ না ? অমলেন্দু হাসলো। স্তব্ধতার হাসি। আবছা অন্ধকারে তবুও সেটা অনুভব করলো উন্মনা। অমলেন্দু ম্লান হেসে জবাব দিলো। লিখতে পারিনা উন্মনা। ছোটোবেলা থেকে এই পরিণত বয়স পর্যন্ত সমস্ত লড়াই , সমস্ত ভাবনা , সব অনুভূতি যেন তালগোল পাকিয়ে গেছে।কবিতার ভাষায় লিখতে গেলে সেটা প্রবন্ধ হয়ে বেরিয়ে আসে। তোমাদের মতো জলস্রোতের স্বাভাবিকতায় আমি কবিতা লিখতে পারি না । চেষ্টা করে লিখতে হয় । আর চেষ্টা করে লেখা কখনও সাহিত্য হয় না। কাজেই , লেখার ক্ষেত্রে নিজের অযোগ্যতা নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই‌। প্রবন্ধ লিখতে পারি। সেটাই লিখি । যদি আরও পঁচিশ বছর বাঁচি , একটা বড় উপন্যাস লিখবো ইচ্ছে আছে । তবে সেটা অটোবায়োগ্রাফি নয়। কেননা, সেরকম কোনো নমস্য ব্যক্তিত্ব আমি নই। এই জীবনে যা যা অন্যায়, অবিচার, প্রতারণার মুখোমুখি হলাম অথবা যে ভালোবাসার সুদূর ঝর্ণার জলে স্নান সেরে কণ্বমুনির কিংবা গুরু গৌতমের পাঠশালায় ফিরে গেলাম ; অথবা বিদ্যাসাগরের সামনে দাঁড়িয়ে ছাত্র হওয়ার জন্য যে আকুতি লুকিয়ে রাখলাম সারাজীবন , সেই সাধারণ মানুষের কাহিনি লিখবো আমার উপন্যাসে । আপাতত আমি একজন পরিপূর্ণ পাঠক হয়ে বাঁচতে চাই। জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত পড়াশোনা করতে চাই। আচ্ছা , তোমাকে যদি জিজ্ঞাসা করি , তুমি কেন কবিতা লেখো ? তার জবাব দেবে কি ?
হ্যাঁ কবিমন,আমার জবাব তো খুব সহজ সরল। মেয়েকে বড় করছি। সংসারের প্রতিদিনের ইত্যাদি প্রভৃতিতে নিজেকে কর্মক্ষম রাখছি । দেখতে দেখতে বয়স বাড়ছে । প্রাইমারি স্কুলে পড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে একটা অদ্ভুত আলো বা আঁধার , আমাকে মাঝে মাঝে অভিভূত করে দেয় । তাকে এড়াতে পারি না। সেই মনোভাব আমার হাতে খাতা ও কলম জুটিয়ে দেয়। আমাকে নির্জনতা এনে দেয়। আমি পৃথিবীর সবকিছু থেকে বিচ্যুত হয়ে লেখার মধ্যে ডুবে যাই। এটাই আমার কবিতা কেন লিখির উত্তর। কিন্তু কবিমন, কেন লিখছি আমি বা আমরা ? কে পড়বে‌ ? উত্তর আধুনিকতা তো তুমি আমির রোমান্টিক কবিতা পছন্দই করে না। পরবর্তী প্রজন্ম কেমন যেন সাহিত্য বিমুখ হয়ে পড়ছে। তাহলে উপায় ? কেন কষ্ট করে বই ছাপাবো ? কবিমন , আমাদের লেখার ভবিষ্যৎ কি ? বইগুলো শেষ পর্যন্ত আবর্জনা হয়ে যাবে না তো ? অমলেন্দু যেন নিজের মধ্যে ডুবে গিয়ে উত্তর দিলো–‌ সবসময় লেখার মধ্যে থাকবে। কী হবে না হবে ভেবে কোন লাভ নেই। লিখতে লিখতে , মিছিল যখন ডাকবে, মিছিলে যোগ দেবে । ফিরে এসে আবার কবিতায় বসবে। উপন্যাস লিখবে, আবার কবিতায় ফিরবে। ছোট গল্প , প্রবন্ধ, ভ্রমণ কাহিনি সবকিছুতেই নিজেকে বিছিয়ে দেবে, ছড়িয়ে দেবে । কিন্তু ফিরে আসা হবে সেই কবিতাতেই। কবিতাই শ্রেষ্ঠতম সাহিত্য সাধনা। সাহিত্যের সর্বোচ্চ সাফল্য কবিতাতেই । যখন গদ্য সাহিত্য ছিল না তখনও কবিতা ছিল । মুখে মুখে ফিরত সেই কবিতা‌ । প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলতো সেই শ্রুতির ধারা। কাজেই কবিতায় ফেরাটাই আমাদের বাস্তবতা ও জীবন বোধ। বেঁচে থাকতে গেলে যেমন অন্তত ডাল ভাত দরকার হয়, তেমনই কবিতাকে আঁকড়ে থাকার নামই বেঁচে থাকা। দিনান্তের শাকান্নের মতো যা আমাদের বাঁচিয়ে রাখে । সংসারে থেকেও পাঁকে ডুবে মরতে দেয় না। কবিতা আমাদের আত্মহনন থেকে ফিরিয়ে আনে প্রতিদিনের বাস্তবতার, লড়াইয়ের রাজপথে। মানুষের মিছিল যেমন ব্যর্থতার পরে সোজা হয়ে দাঁড়াবার শিক্ষা দেয় , আমাদের জীবনেও কবিতা ঠিক সেই কাজটাই করে। কবিতার নারী , তুমি একবার ভাবো তো, সামান্য কয়েকটা লাইনের মধ্যে জীবনের সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সবটুকু বলে দিতে পারে কবিতা। সেই স্বপ্ন নিয়েই আমি একদিন কবিতাজন্ম এবং কবিতার আশ্রয়ের কথা ভেবেছিলাম। উন্মনার মনে হচ্ছিল , কথাগুলো শুনতে শুনতে সে ভালোলাগা ভালোবাসায় পাগল হয়ে যাবে‌ ! তার কবিমনের মতো কখনও সে গভীরভাবে ভেবে দেখেনি,কেন সে কবিতা লিখছে ? ইচ্ছে করে বলেই এ পর্যন্ত লিখে এসেছে। কিন্তু আজ এই বৈশাখের রাত, এই পাহাড় জঙ্গলের সাহচর্য এই বনজ গন্ধের অনন্য অনুভূতি, আর এই দারুণভাবে বেঁচে থাকা মানুষটার উষ্ণ সান্নিধ্য তাকে তার পূর্বাশ্রমের সমস্ত দুঃখ ভুলিয়ে দিচ্ছে । পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠার এমন পৃথিবীজোড়া পাঠশালা আগে সে কখনো আবিষ্কার করতে কেন পারেনি , এটাই তার মনে হলো। ক্রমশ উন্মনা অনুভব করলো আজকের এই রাতের পৃথিবী ,এই তারাদীপ জ্বলা আকাশ ও ছায়াপথ তাদের সম্মিলিত আশীর্বাদ ঝরিয়ে দিচ্ছে ঘুমন্ত শাল পলাশের ডালে ডালে , আর কবিতা নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষদের মাথার উপর।
তারপর, এমন করে অমলেন্দু তাকে কাছে টানলো ! কেমন করে উন্মনা তার উন্মুখ ভালবাসা প্রিয় কবিমনকে অর্পণ করলো, সে বর্ণনাও লেখা থাকলো রাতের গভীরে , অন্ধকারের সুরমূর্ছনার পরতে পরতে। ভালোবাসা এমনই এক আশীর্বাদ ও স্বাভাবিকতা ,যা প্রথম জলধারার মতো বয়ে যেতে যেতে ক্রমশ নদী হয়ে যায় ,তারপর সাগর মোহনায় নিজেকে নিঃশেষ করে বিলিয়ে দেয়।
এক সময় রাত যেন বললো — এবার বাড়ি ফিরতে হবে। এক সময় আবছা অরণ্য বললো– তোমাদের সমস্ত স্মৃতিচিহ্ন আমরা রেখে দিলাম। একসময় চলার পথ বললো– এসো তোমাদের বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাই। এক সময় উন্মনার আত্মজা তোয়া ঘুম ভেঙে অবাক বিস্ময়ে বললো– অনেক রাত হয়ে গেছে , তাই না মা? আমরা বাড়ি ফিরব না ?

সে রাতে ওরা তিনজন অনেকটা সন্ধে পেরোনো রাতের অন্তরপথ চিনে চিনে যখন বাড়ি ফিরে এলো, তখন মা মৃত্তিকা বাইরের দরজার ফ্রেমে নিজেকে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল , ওদের ফিরে আসার প্রতীক্ষায় । মুখোমুখি কেউ কোন কথা বললো না ।‌শুধু তোয়া দৌড়ে গিয়ে তার দিদুকে জড়িয়ে ধরলো — দিদু ,আমি পাহাড়ের মধ্যে ,বনের মধ্যে , রূপকথার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম আমার ভীষণ খিদে পেয়েছে। তুমি আমাকে গরম গরম ডাল ভাত আর আলু ভাজা খেতে দেবে ? ও বন্ধু, তোমার খিদে লাগেনি ? মা তোমার ?

ক্রমশ

লেখকের কয়েকটি কথা : এই ধারাবাহিক উপন্যাসের ৫০ তম পর্ব শেষ করে দু একটা কথা বলতে ইচ্ছে করছে। সম্পূর্ণ কল্পনার উপর ভিত্তি করে লেখা এই উপন্যাসে , আমি বলতে এসেছি, একটি পরিপূর্ণ কবিতা জন্মের কথা । জীবনে যা অধরা মাধুরী, সেই মরীচিকার পিছনে ছুটতেই সবচেয়ে বেশি মন চায়। তাকেই ছন্দ-বন্ধনে ধরতে ইচ্ছে করে । আর কিছুদিন পরে এই উপন্যাস যখন শেষ হয়ে যাবে, তখনও আমার দু চোখে স্বপ্ন লেগে থাকবে এই উপন্যাসের পরবর্তী পর্যায়ের জন্য। সকলে খুব ভালো থাকুন। 

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।