অ আ ক খ – র জুটিরা

রুফ-ট্প স্টোরি…

আজ প্রায় অনেকদিন পর আবার রাত্রিযাপন করলাম। এলো মেলো হয়ে থাকা বিছানা টা ছেড়ে গুটি গুটি পায়ে হাজির হয়েছিলাম ছাতে। বাইরে বেশ হিমেল হাওয়া বইছে। বোঝাই যায় শীত প্রায় পড়বে পড়বে। এবছর যেন একটু তাড়াতাড়িই শীত পড়ে যাবে। আসলে এই যান্ত্রিক কলকাতায় প্রায় নভেম্বর ছাড়িয়ে তবে গিয়ে একটু শীতের দেখা মেলে। তবে এবছর ব্যতিক্রম, অক্টোবরের শেষ সপ্তাহেই বেশ শীতের পরশ। যদিও বা কথায় বলতেই বলে ঠাকুর জলে পড়লেই ঠান্ডা পড়ে যায়। কিন্তু চারিদিকের এই দূষণের ভিড়ে কোথায় আর সেই হাড় কনকনে ঠান্ডা, সেই ছোট্ট বেলার মাঙকি টুপি!
যাই হোক কলকাতার জমাটি বহুতুলের ভিড়ে, এই ছাতটাই আমার একটু স্বাস নেওয়ার জায়গা বলা যায়। সারাদিনের ব্যস্ত সময়ের শেষে এই রাতের ছাতটা বেশ আকর্ষণ করে আমায়। ছোট থেকে বরাবরই রাত আমার খুব পছন্দের। আমার অনেক বন্ধুদের থেকে শুনেছি অন্ধকার নাকি খুব ভয়ের। তবে আমার কোনদিনই অন্ধকার কে ভয় লাগে না। এই নিশুতি রাত মায়াবী অন্ধকার, এর মধ্যে যেন কি আছে!
যখন খুব মন খারাপ হয় গিয়ে দাঁড়াই এই অতি-পরিচিত ছাতে। আমার বাড়ির দু-পাশে দুটো পুকুর আছে। তাই ওখানে উঠলে একটু প্রাণ ভরে স্বাস নেওয়াই যায়।
বাইরে বেশ শীত শীত ভাব। হালকা ফুরফুরে হিমেল বাতাস গাঁয়ে শিহরণ জাগিয়ে যাচ্ছিল। প্রতিটা রোমকূপ জানান দিচ্ছিল শীতের আগমন। বেশ লাগছিলো। সামনেই কালী পুজো। পাড়ায় পাড়ায় আলোর চমক ছড়িয়ে। আমাদের এখানেও আলো দিয়েছে। একদম পরিস্কার ঝকঝকে। পুজোর এই কটা দিন প্রায় প্রতিদিনই আলো গুলো সারারাত জ্বলে। আমার বাড়ির ছাতে বেশ অদ্ভুত একটা পরিবেশ ছিল আজ। কালী পুজো উপলক্ষে একদিকে যেমন ঝকঝকে আলো অন্য প্রান্ত ঠিক সেরকমই জমাটি কালো। তাই অনেক ভাবনা-চিন্তা করার পর গিয়ে বসলাম কালো জায়গায়। রাতের এই অন্ধকারে আকাশ দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। আজও তাই করলাম।
সবকিছু কে পিছনে ফেলে এই বিশাল আকাশের মাঝে কোথাও যেন নিজেকে খুঁজে পাই। স্বত্তা বলতে পারেন। এক আকাশ ভর্তি তারা মিটমিটিয়ে খিল খিল করে হাসছে। আর মাঝখানে একফালি চাঁদের টুকরো আলো বিকিরণ করছে। ঠিক যেন চাঁদ তার আপন স্বত্তা দের বয়ে বেড়াচ্ছে। হ্যাঁ একফালি চাঁদই বটে। সামনে যে অমাবস্যা। আর মাত্র দু-দিন। তারপরই আকাশ এর বিশাল সমুদ্রের মাঝে এত বড় চাঁদটা মুছে যেতে যেতে একদম শুন্য হয়ে যাবে। তারপর সব অন্ধকার, চারিদিক জুড়ে শুধুই কালোর রাজ। কিন্তু আবার পড়দিনই সারা আকাশের বুক চিরে একফালি টুকরো জ্বল জ্বল করে উঠবে। কি অদ্ভুত সমীকরণ!
পুরো শেষ হয়ে গিয়েও ফিরে আসা যায়, সত্যি?
প্রায় বছর দু-এক আগে, এই আকাশ দেখা ছিল নিত্য দিনের এক অভ্যাস। শুধু আকাশ দেখা নয় সারাদিনের জমিয়ে রাখা এক-গুচ্ছ কথাও অনর্গল বলে যেতাম। হঠাৎ ই এই অভ্যাস বদলে গেল… বিনিদ্র রাত্রি-যাপন ত্যাগ স্বীকার করে ঘুম আশ্রয় নিলো আমার চোখে। যেন এক মায়ার পরশ। চোখ বন্ধ করলেই সেই পরম ছোঁয়ায় এক অদ্ভুত মায়াবী জাদুতে ঘুম-পরীরা ঘুম এঁকে দিত আমার দু-চোখ জুড়ে। সত্যি না কল্পনা বুঝতে পারছিলাম না। ধীরে ধীরে সেই হয়ে উঠলো আমার সারাদিনের সঙ্গী। সেই হয়ে উঠলো আমার অভ্যাস। সারাদিনের জমানো কথা জমে থাকতো তার জন্য। ফাঁক পেলেই একবার ফোন ঘুরিয়ে দিতাম স্যাটেলাইটে। অনেকসময় উত্তর আসতো কিছু সময় নয়। কি যেন এক অদ্ভুত টান জমে উঠলো তার প্রতি। মানুষ তো অভ্যাস এর দাস। আকাশ এর বিশাল সমুদ্র ঠাঁই নিলো গিয়ে তার বুকে। আমিও সুখের সাগরে ভেসে চললাম।
আসতে আসতে সরতে থাকলো আমার স্বত্তা কিংবা বিনিদ্র রাত্রি-যাপন। সত্যি কি আকাশ এর এই বিশাল সমুদ্রের মত কেউ আমায় আপন করে নিতে পারে! পারে না…
তাই সেই মায়াজাল কাটিয়ে ফিরলাম আবার বাস্তব সাগরে। সারাদিনের ক্লান্ত দেহ কে টানতে টানতে আজ আবার নিয়ে গেছি সেই বিশাল সমুদ্রে।
হঠাৎ করেই এক ফোঁটা আলো আমার চোখে এসে পড়লো। না এতো কালী পুজোর আলো নয়…! তবে?
চোখ তুলে দেখি সারা আকাশের অন্ধকার কেটে যেতে যেতে ঈশান কোন থেকে ভোরের কিরণ উঁকি দিচ্ছে। যদিও বা তখনো সূর্যের দেখা মেলে নি। আমি বুঝলাম আমারও সময় শেষ তবে। ঠিক যেমন স্কুল ছুটির ঘন্টা বাজত, আজকের মত আমার ও সময়ের ঘন্টা ফুরিয়েছে।
আবার একটা গোটা দিনের অপেক্ষা। শুধু যেতে যেতে একটা খুব মনে পড়ছে।
কবি শঙ্খ ঘোষ “সঙ্গিনী” – তে বলে গেছেন….

“হাতের উপর হাত রাখা খুব সহজ নয়
সারা জীবন বইতে পারা সহজ নয়
এ কথা খুব সহজ, কিন্তু কে না জানে
সহজ কথা ঠিক ততটা সহজ নয়”

অনিন্দিতা ভট্টাচার্য্য

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!