ধারাবাহিক ভ্রমণ সিরিজ আমেরিকার ডায়েরি || সুব্রত সরকার পর্ব – ২

আমেরিকার ডায়েরি – ২
।। ৭ অগাস্ট, বুধবার- দোহা, কাতার ।।
বৃষ্টি ধোয়া ভোরের প্রথম আলোয় কলকাতার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের লাউঞ্জ থেকে সরাসরি কাতার এয়ারওয়েজের ভেতরে প্রবেশ করলাম। ঘড়িতে সময় ৩. ৪০।
সিট পেয়ে গেলাম মনের মত। মেয়ে -জামাইয়ের দেওয়া উপহার- “তুমি জানলার ধারে বসো!.”
আহা কি আনন্দ আজও বুকে বাজে সিট পেলে জানলার ধারে!..
বিমান টেক অফ করল একদম ৩.৫০। বৃষ্টি ভেজা রানওয়ে দিয়ে ধীরে ধীরে দৌড় শুরু করে একদম শেষ পর্বে এসে লং জাম্পে উড়ে গেল উড়ান আকাশে!…আমি চললাম বিশ্বভ্রমণে! এ বড় গোপন আনন্দ অনুভব। বেড়ানোর নেশা আমাকে আজও খুব প্রাণিত করে। বিশুদ্ধ এক আবেগে বুকের ভেতরটা কেমন সুরেলা হয়ে যায়, মন মেতে যায় মেলে দিয়ে রঙিন পাখনা!.. উড়ানের জানলার ধারেই পেয়ে গেলাম বিমানেরও ডানা। মস্ত বড় সেই ডানাটার দিকে তাকিয়ে শিশুর আনন্দে ভাবছিলাম, চড়লাম তবে পক্ষীরাজের ডানায়!..
কলকাতা থেকে দোহা মোটামুটি পাঁচ ঘন্টার সফর। কাতার এয়ারওয়েজের বিমানসেবিকাদের ড্রেসটা খুবই চমৎকার। বেশ মেরুন রঙের মাথায় কেমন বাঁকা এক টুপি, পরণের পোষাকও মেরুণে সাদায় জমজমাট। আর এমনিতেই এয়ারহোস্টেসরা দারুণ সাজুগুজু করে থাকেন। ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক দেওয়া হাসি ও সাহায্য করার ছটফটে প্রবণতা ওদেরকে বেশ চঞ্চলা করে রাখে। একদম গেটের মুখে দাঁড়িয়ে ওদের হাসিমুখের অভ্যর্থনা থেকে শুরু করে সিটে বসিয়ে দেওয়া ও সুন্দর খাবার পরিবেশনের মধ্যে দিয়ে এই জার্নিটা ভালো ভাবে শুরু হয়ে শেষও হল সুন্দরভাবে।
দোহা কাতারের রাজধানী। কাতার এক মরু রাজ্য। আকাশের প্রায় তিরিশ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে নামতে নামতে নেমে এলাম একদম এয়ারপোর্ট গ্রাউন্ডে। আমার স্মার্ট ওয়াচ তখন নিজেই তার স্মার্টনেসের পরিচয় দিয়ে জানাল, টাইম জোন অলরেডি চেঞ্জড্। ভারতীয় সময় এখন আর নয়। কাতারে বাজে তখন সকাল ৬ টা বেজে ২৮ মিনিট। ভারতীয় সময় থেকে কম বেশি আড়াই ঘন্টা পিছিয়ে।
বিমান থেকে রানওয়েতে নেমে কাতার এয়ার বাস আমাদের পৌঁছে দিল ফের ট্রান্সফার লাউন্জে। বাসের চালক ও পরিচালক দুজন কালো যুবক। দোহায় দেখলাম অনেক আফ্রিকান যুবকদের এয়ার স্টাফের কাজ করতে। ওরা বেশ কর্মঠ ও বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহারে কাজগুলো করছেন। এবার আমাদের পরের বিমান নিউইয়র্কের জন্য এখান থেকে পাব। সেটাও কাতার এয়ারওয়েজের। হাতে সময় কমবেশি দু’ঘন্টা। এখানেও আবার কড়া সিকিউরিটি চেকিং হল। এমনকি পায়ের জুতো মোজা খুলে। এই বারবার বাড়াবাড়ি রকমের সিকিউরিটি চেকিং ব্যাপারটা খুব বিরক্তিকর। এলোমেলো করে দেয় নিজের সাজানো ব্যাগ। তখন আবার সব জিনিস সামলে গুছিয়ে নেওয়া এক ভয়ংকর ধৈর্যের পরীক্ষা।
আমরা দোহার হামাদ এয়ারপোর্ট লাউন্জের সুন্দর ওয়াশরুমে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। কাতারে বহু দেশ বিদেশের মানুষকে দেখতে পেলাম। সাদা, কালো, বাদামী, এশিয়ান, ইউরোপিয়ান সবাই আছে। প্রচুর শপিং স্টোর। হৈ হৈ করছে চারপাশ। এখানে সাজানো বিখ্যাত টেডি বিয়ারটা দেখলাম। এক ঝলক উইন্ডো শপিংও করলাম মজা করে। সুন্দর একটা জলপাই সবুজ ব্র্যান্ড নিউ গাড়ি ডিসপ্লে করা ছিল ডিউটি ফ্রি এরিয়ায়। মনে মনে ভাবলাম, ডিউটি ফ্রি হলে কত পরবে দামটা একবার জিজ্ঞেস করে দেখি!..যাওয়ার সময় নয় কাতার থেকে এই গাড়িটা চালিয়েই কলকাতা চলে যাব!.. ডুলুং বোধহয় আমার মনের কথা বুঝতে পেরে বলল, “ঠিক আছে আপাতত গাড়িটার সামনে পোজ দাও, তোমার একটা ছবি তুলে দিই!..” সত্যি শেষ পর্যন্ত ঐ মন কেড়ে নেওয়া গাড়িটার কাছে দাঁড়িয়ে বাধ্য বাবা হয়ে মেয়ের আবদার রেখে একটা হাসিমুখের ছবি তুলে গাড়িটাকে টা টা করে চলে এসেছি!..
।। নতুন বিমান – দোহা থেকে জে এফ কে, নিউইয়র্ক ।।
এবারও আমার সিট জানলার ধারে। যদিও আমি একবার লাজুক হেসে শ্বশুরের স্নেহে জামাইকে অফার করেছিলাম, “সোহম এবার তুমি নয় বসো উইন্ডোর ধারে।”
“না। না। আপনি বসুন।” সোহম উদার হেসে এবারও উপহার দিল আমাকে জানলার ধার! ডুলুং সব বুঝেছে এমন একটা হাসি মিটিমিটি করে হাসল। এই না হলে মেয়ে জামাইয়ের সাথে বেড়ানো!..
দোহা থেকে নিউইয়র্কের জে এফ কে এক লম্বা সফর। সিটের স্ক্রিনে শো করছে সময় লাগবে প্রায় চোদ্দ ঘন্টা। পথ আটহাজার মাইল।
এটাও কাতার এয়ারওয়েজের বিমান। এই বিমান বেশ বড়। সিটে বসে চোখের সামনে ভাসতে থাকা ছোট্ট পর্দায় আমাদের রুট ম্যাপের যাবতীয় তথ্য সুন্দর ভেসে ভেসে উঠছে।ডুলুং অপারেট করা শিখিয়ে দিল। সারা পথ এটা দেখতে দেখতে যাওয়াটা আমি খুব উপভোগ করেছি। এত এত অচেনা দেশ, মহাদেশ, সমুদ্র, আইল্যান্ডকে পেরিয়ে পেরিয়ে যাওয়া যেন সত্যি এ এক সাত সমুদ্র তেরো নদীর ভ্রমণ!
সুয়েজ খালের পাশ দিয়ে যখন বিমান যাচ্ছে আহা ঐ নীল জল দেখার আনন্দ অতুলনীয়। মিডল ইস্টের চেনা অচেনা কত দেশ আবুধাবি, বাহরিন, সৌদি আরব, ওমান পেরিয়ে, তাদের পাশ দিয়ে এগিয়ে চললাম। মেডিটেরেরিয়ান সি তাকেও পেরোলাম। এই ভূমধ্যসাগররের তীরে দাঁড়িয়ে কি আনন্দ পেয়েছিলাম গত ডিসেম্বর(২০২৩) মাসে মিশর ভ্রমণে আলেক্সান্দ্রিয়া শহরে গিয়ে। আর ঠিক সাত মাস বাদে সেই ভূমধ্যসাগরের ওপর দিয়ে প্রায় বত্রিশ হাজার ফুট আকাশের উচ্চতা থেকে তাকে আবার দেখার সৌভাগ্য কজনের হয়!.. আমি ধন্য। আমি কৃতজ্ঞ আমার এই জীবনের কাছে। আমার এই মুসাফির মনকে আমি যেন আরও কিছু বছর বাঁচিয়ে রাখতে পারি। দেখব এবার জগৎটাকে- এই স্বপ্নটা আমার যেন অনেকটা সত্যি হয়!.
আকাশ পথে ভাসছি। কখনো তিরিশ হাজার, কখনো বত্রিশ, কখনো চৌত্রিশ হাজার ফুট উচ্চতায় বসে বিশ্বভ্রমণ করছি। পাখির চোখে দেখতে দেখতে চলেছি- কায়রো, লুক্সার, প্যালেস্তাইনের গাজা, সুয়েজ খাল, ভূমধ্যসাগর… উইরোপ ভূখণ্ডের জার্মানির কত সব চেনা অচেনা দেশের ওপর দিয়ে, পাশ দিয়ে এগিয়ে চলেছি। আশপাশে বিখ্যাত বিখ্যাত ইউরোপের শহরগুলোও রয়েছে -প্রাগ, বার্লিন, হ্যামবার্গ, অ্যাথেন্স, আর্মস্টারডম, গ্ল্যাসগো, অসলো, অনেকটা দূরে গ্রীন ল্যান্ড। এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার অভিজ্ঞতা সত্যিই বিশ্বভ্রমণের স্বাদ পাওয়ার নির্মল আনন্দ। জার্মানির ওপর দিয়ে অনেকটা পথ গেলাম। দেখলাম কতদিনের চেনা জায়গাগুলোর অবস্থান। এ দেখার বিস্ময় আনন্দ সারাজীবনের পরম পাওয়া।
দীর্ঘ এই আকাশপথে একঘেয়েমি আসবেই। শারীরিক অস্বস্তি হয়। সময় কাটানোর জন্য সিনেমা দেখা, গান শোনা যায়। এত উচ্চতায় ঘুম সব সময় ঠিক আসে না। মাঝেমাঝে একটু পায়চারি করে নিয়ে বাড়তি চা কফি চেয়ে খেয়ে কাটাতে কাটাতে চললাম। পুরো জার্নিটায় নানারকম সুখাদ্যর আয়োজন খুব ভালো। সে ভেজ, নন ভেজ এমন কি ব্রেক ফাস্ট ও ডে স্ন্যাকও খুব ভালো পেয়েছি। চকলেট, নানারকম বিস্কুট, কর্নও পাওয়া যায় প্রয়োজন মত। পানীয়র অনেক রকম অপশন। আমি রেড ওয়াইন, হোয়াইট ওয়াইন চেয়ে চেয়ে খেয়েছি। সব মিলিয়ে বেশ রাজকীয় একটা সফর- যাচ্ছি তো ইউ এস এ!.
আকাশপথে ভাসছি সাড়ে আট ঘন্টা হয়ে গেল। চোখের সামনের ছোট পর্দায় ভেসে উঠছে সব তথ্য- Time to Destination, Estimated Arrival Time, Time since Departure, Local time at origin, Distance to Destination, Distance Travelled, Outside Air Tempareture, Greenwich Mean Time, Ground speed, True Airspeed, Altitude, Vertical Speed…এমন সুন্দর সুন্দর সব তথ্য জানতে জানতে চলা ও নিজেকে সমৃদ্ধ করে তোলার আনন্দ ভ্রমণকে বেশ আকর্ষনীয় করে তোলে।
আমেরিকার ডায়েরি আমার চলমান ভ্রমণ কথা দিয়ে সাজানো ভ্রমণ কাহিনি। তাই স্মৃতি থেকে রোমন্থন ও সময়ের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়ে ধীর স্থির ভাবে বসে লেখা এ নয়। যা দেখছি, যেমন দেখছির গল্পগাছা। ঘুরব, দেখব, লিখব। এই প্রয়াস পাঠক বন্ধুদের কেমন লাগবে জানি না, আমি ভ্রমণ পথের পথিক, পথের কথা লিখব পথ চলার আনন্দে!..
।। অবশেষে আমেরিকায়…।।
বিমান সফর প্রায় যখন শেষ হয়ে এসেছে, এয়ার স্টাফ ঘোষণা করলেন, “সিট বেল্ট বেঁধে নিন। আমরা ফাইনাল ডেস্টিনেশনে পৌঁছে গেছি, প্লেন এবার ল্যান্ড করবে জন কেনেডি এয়ারপোর্টে।”
সে উত্তেজনার আনন্দ দারুণ। দীর্ঘ এই সফর শেষ হচ্ছে। আমি আমেরিকার মাটিতে পা দেব! সিট বেল্ট বেঁধে নিলাম। নিজের কিছু জিনিসও গুছিয়ে নিচ্ছি, ওমা হঠাৎ দেখি বিমানের জানলা গুলোর পাশ দিয়ে উড়ো মেঘের স্রোত বয়ে যাচ্ছে। কোথায় ছিল এই মেঘের দল! পুরো আকাশ মেঘে মেঘে ছেয়ে গেল। আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না! নিমেষে আকাশ হারিয়ে গেল। কোনও মেঘদস্যু এসে ছিনতাই করে যেন নিয়ে চলে গেল ঝকঝকে সুন্দর আকাশটাকে। বুঝতে পারছি বিমানের গতি কমে গেল, কেমন ন যোযৌ ন তস্থৌ অবস্থা। সেফ ল্যান্ডিং হবে না, পাইলট সাবধানী হয়ে উঠেছেন নিশ্চয়ই। এভাবে সময় নষ্ট হল পাক্কা কুড়ি মিনিট। এই প্রথম খুব উৎকন্ঠা হল। এত সুন্দর দীর্ঘ সফরটা হঠাৎ শেষ লগ্নে এসে কেমন থমকে গেছে। মন খারাপ মন নিয়ে চেয়ে আছি মেঘে মেঘে ঢাকা বাইরেটার দিকে। এই মেঘ নিয়ে আমাদের কত কাব্যকথা। মেঘবালিকাদের নিয়ে কত গল্প। সেই মেঘকে দেখে এখন হঠাৎ কেমন ভয় হল!..
অবেশেষে চোখের সামনে ভেসে উঠল জলরাশি। ঐ দেখা গেল হাডসন রিভার। দূরের আবছা ভূখন্ড জেগে উঠছে। ঐ তো নিউ ইয়র্ক সিটি! সারি সারি বাক্সবাড়ি। মেঘেরা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল আকাশে। সব কিছু আবার ঝলমলে।
আমাদের কাতার এয়ারওয়েজের মস্ত বড় বিমানটা সেফ ল্যান্ডিং করল রানওয়েতে। ভেজা ভেজা রানওয়ে। বৃষ্টি হয়েছে একটু আগে। আমাদের স্বাগত জানাল আমেরিকার মেঘ ও বৃষ্টি! আমরা চলে এসেছি আমেরিকায়!..
আমার স্মার্টওয়াচে দেখলাম সময় ৩.৫০। আমেরিকার আকাশ বাতাস হাসছে। বিমান থেকে নামব আর কয়েকটা মুহূর্ত পরেই… তারপর শুরু হয়ে যাবে পরপর কতগুলো কাজ… ইমিগ্রেশন করানো, লাগেজ নেওয়া এবং চেক আউট করে বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে আসা।
আজ আমরা থাকব নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের এক হোটেলে। এয়ারপোর্ট থেকে বেশ কিছুটা দূরে এই ম্যানহাটন। দুদিন হোটেল বুক করে রেখেছে ডুলুং। এই দু’দিন নিউইয়র্কে বেড়াব। পৃথিবী বিখ্যাত এই শহরের ইতিকথা ও ভ্রমণের গল্প আগামী সংখ্যায় লেখা হবে।
আপাতত কলিং ইমিগ্রেশন!..যাই লাইনে দাঁড়াই। পাসপোর্টের পাতায় আরও এক নতুন দেশে আসার ছাপটা সেঁটে নিই, এ এক আশ্চর্য মহাদেশ আমেরিকা!..আমার চতুর্থ বিদেশ ভ্রমণ!..
এলেম অবশেষে তোমার কাছে…ও আমেরিকা!..
শুভসন্ধ্যা
Ashadharan…..
অসাধারণ।