সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে নীলম সামন্ত (পর্ব – ৭)

মহাভারতের মহা-নির্মাণ (অম্বা অম্বিকা অম্বালিকা)
আ ভি যা আ ভি যা দিলরুবা আভি যা…
ফেসবুক টাইমলাইনে গানটা শুনতে শুনতে ফিরে যাচ্ছিলাম ছোটবেলায়। মহাভারত আর ছোটবেলার মধ্যে একটা দারুন গল্প আছে। সন্ধ্যাবেলায় যখন পড়াশোনা শেষ হয়ে যেত আর মা ছুটি দিয়ে বলতেন “কালকের বই গুছিয়ে নে”। কোন রকমের সেসব কাজ মিটিয়ে দৌড় দিতাম আমার মেজঠাকুমার কোলে। পৌরাণিক গল্পই হোক কিংবা মহাকাব্য মেজঠাকুমার জ্ঞান ছিল অপরিসীম। আজ তিনি বেঁচে নেই। কিন্তু মহাভারত লিখতে বসে ভাবি সেযুগে একটি একান্নবর্তী বনেদি পরিবারের বউ হয়েও মেজঠাকুমা কিভাবে এত বই পড়েছেন। এক একদিন এক একটা গল্প ছোট্ট ছোট্ট করে আমাদের বলতেন। সেই দিনগুলোতে কখনো মনে হয়নি মহাভারত এত জটিল কিংবা অন্য কোন পৌরাণিক গল্প অন্যভাবে ভাবা যায়। তখন কি মুগ্ধ হয়ে শুনে যেতাম কৌরব, পান্ডব পিতামহ ভীষ্মের কথা। অর্জুনের তীরে কিভাবে ভীষ্ম তীরবদ্ধ হলেন সেই গল্প যেদিন বলেছিলেন সেদিন অম্বার কথা শুনেছিলাম। তখন তৃতীয় লিঙ্গ কি সে সব বুঝতাম না। শুধু জরিপ করে মেপে গেছি একটা মানুষের গায়ে শত শত তীর গাঁথা হয়ে থাকলে তার কতখানি কষ্ট হয়। রাত্রিবেলায় বিছানায় শুয়ে কেঁদেওছি ভীষ্মের কষ্টের কথা ভেবে। সেই থেকে মাথার মধ্যে শিখণ্ডী চরিত্রটা গেঁথেছিল। প্রায়ই ভাবতাম শিখণ্ডী কিভাবে শিখণ্ডী কেনই বা শিখণ্ডী। আজ যখন রাজকন্যা অম্বা অম্বিকা অম্বালিকা এদের নিয়ে লিখব ভাবছি তখন বারবার মেজ ঠাকুমাকে মনে পড়ছে, মনে পড়ছে তার বলা মহাভারতেরই ছোট ছোট গল্প।
নারী হয়ে জন্মানো যেন দুর্বিষহ। যদিও পাঁচ হাজার বছর আগে এমনটা ছিল না। মহাভারতের নারীদের দেখে কখনোই অবলা, নিপীড়িত বা গৃহবন্দী মনে হয়নি। সে যুগে হয়তো নারীদের মতামতের অনেক দাম ছিল নইলে স্বয়ংবরের মতো সভা কিভাবে ঘটতো! কিন্তু অম্বা অম্বিকা অম্বালিকার ক্ষেত্রে দেখুন নিজের পছন্দ মুখ ফুটে বলার আগেই পৌরুষ বলে বন্দী হতে বাধ্য হয়েছিল। সত্যিই তো ভীষ্ম যেভাবে বলবান হয়ে তিনটে মেয়েকে তাদের মত অমতের ঊর্ধ্বে গিয়ে তুলে নিয়ে এসেছিলেন সেখানে ওরা কি বা করতে পারতো। এই তিনটি নারী যেন মহাভারতের সব থেকে বেশি অবহেলিত চরিত্র। কেন এত অবহেলা তাদেরই কপালে জুটলো? অম্বিকা অম্বালিকা এদের শুরুর জীবন ঠিক থাকলেও সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য তাদের ঠেলে দেওয়া হয়েছিল অদ্ভুত দাবীতে৷ বংশরক্ষা করতে হবে। নারী যেন বংশরক্ষা করার এক এবং অদ্বিতীয় যন্ত্র। আবার রাজনৈতিক ভাবে দেখলে ভাবি এই পন্থা যদি অবলম্বন না হত তবে বেদব্যাস কিভাবেই বা হস্তিনাপুরে নিজের মাটি শক্ত করতেন। আর অম্বা?
হস্তিনাপুরে আসার কিছুদিন পর যখন ঠিক হলো তিন বোনের বিবাহ সম্পন্ন হবে তখন অম্বা হাসিমুখে ভীষ্মকে এসে বললেন— “আমি মনে মনে পূর্বে শাল্বরাজকে পতিত্বে বরণ করেছিলাম। তিনিও আমাকে পত্নী করবেন বলে স্বীকার করেছিলেন এবং আমার পিতারও এইরূপ ইচ্ছা ছিল। সুতরাং আমি স্বয়ংবরে শাল্বরাজকেই বরণ করতাম। হে ধর্মজ্ঞ, আপনি এইসব জেনে যথার্থ ধর্মের অনুসরণ করুন।” এই শুনে ভীষ্ম বেদপারদর্শী ব্রাহ্মণদের সাথে আলোচনা করলেন। কি করা উচিত! যে সম্পর্কে মন নেই সেই সম্পর্ককে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করলে মানুষটিকে কখনোই সুখী রাখা যাবে না সাথে সম্মানও দেওয়া হবে না। তাই তাকে শাল্বরাজের কাছে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। শুধু অনুমতি না অম্বাকে পাঠানোর ব্যবস্থাও করে দিয়েছিলেন ভীষ্ম। কিন্তু পাঠালে বা অম্বা চাইলেই তাকে গ্রহণ করার জন্য কে বসে আছে? শাল্বরাজ? হায় রে পোড়া কপাল! অম্বার ওই পোড়া কপাল ছিল। শাল্বরাজ তাকে গ্রহণ করেননি। বলেছিলেন অন্য একজন পুরুষের সাথে অনেকটা সময় তিনি কাটিয়ে ফেলেছেন। তাই গ্রহণ করা যায় না৷ সত্যিই কি তাই? প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ভীষ্মের কথা কে জানত না? নাকি অন্যের বাড়ি গিয়ে থাকলেই অসতীত্ব? মহাভারতের নারীদের নিয়ে এমন কথা কিন্তু একেবারেই মনে হয় না যেখানে বিবাহের আগে তারা সন্তান প্রসব করেছে, যা নিয়ে কোন সমস্যাই তৈরি হয়নি পরবর্তীতে।
আমার কি মনে হয় জানেন, ওই যে ভীষ্মের সাথে যুদ্ধে হেরে গেছিল, সেটা মেনে নিতে পারেননি৷ সত্যিই তো শাল্বরাজও তো রাজা৷ হেরে যাবার পর তাঁকে মাথা নিচু করে ফিরতে হয়েছিল। যেখানে লড়াই ছিল তার প্রেম নিয়ে৷ যেখানে ভীষ্ম অনায়াসে তাঁকে হারিয়ে অম্বাকে কেড়ে নিয়ে গেলেন সেখানে তাঁকে ঠাঁই দিলেন না। কেনই বা শাল্বরাজ অন্যের দান নেবেন? সোজাসুজি অম্বাকে জানিয়ে দিয়েছিলেন ভীষ্ম যেহেতু স্বয়ংবর থেকে তাকে জয় করে নিয়ে গেছেন ভীষ্মেরই উচিত তাকে বিয়ে করা। ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা জানার পরেও এই বাক্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি। সাধে কি বলে মেল ইগো! এই দুই পুরুষের পুরুষত্বের মাঝে সব থেকে বেশি অপমানিত হলেন কাশীরাজ জ্যেষ্ঠা অম্বা৷ কার ওপর তার সব থেকে বেশি রাগ হত? ভীষ্ম নাকি শাল্বরাজ? দুজনের ওপরেই হওয়ার কথা। একজনের ওপর রাগ আরেকজনের ওপর অভিমান। তীব্র প্রেম হেতু শাল্বরাজকে ক্ষমা করা গেলেও ভীষ্মকে তিনি ক্ষমা করতে পারলেন না৷ প্রত্যাখ্যাত এবং পরিত্যক্ত অম্বা আস্তে আস্তে একা হয়ে গেলেন। নিজের সম্মান ফিরে পাওয়ার জন্য তিনি অনেক লড়াই করেছেন কখনো পরশুরামের কাছে আবার কখনো কার্তিকের কাছে গেছেন কিন্তু উপায় আর হাতে আসেনি। এই একাকীত্ব এবং হেরে যাওয়া থেকে তার রাগ কষ্ট দুঃখ মান অভিমান সমস্ত কিছু পুঞ্জিভূত হয়ে তাকে দৃঢ়প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করে তোলে। অনেক সাধ্যসাধনা করে দেবাদিদেব মহাদেবের কাছ থেকে বর পেলেন পরজন্মে তিনিই ভীষ্মের মৃত্যুর কারণ হবেন।
এই বিধ্বংসী প্রতিশোধস্পৃহা থেকে সাধনার ফলস্বরূপ যে বর পেলেন সেই বর হেতু মহাভারতে এমন একটা মুহূর্ত এলো যেখানে পুরুষসুলভ, নারীসুলভ, পুরুষ ও নারীর হয়ে ওঠার চিরাচরিত ধারণাটি প্রশ্নের মুখে পড়ে। নারী মানেই যে এক ধরনের শারীরিক, মানসিক দুর্বলতাকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়, তাকে অস্বীকার করে স্রেফ ন্যায় পাওয়ার জন্য অম্বার এই কঠিন-কঠোর তপস্যা। আচ্ছা বলুন তো এই ঘটনা পুরুষতন্ত্রের চেনা কাঠামোকে কি একেবারে নাড়িয়ে দেয়নি? যদিও মহাভারত যে একেবারে গোঁড়া পুরুষতন্ত্রের খাঁচায় রচনা হয়েছিল আমার তা মনে হয় না৷
যাইহোক, পরের জন্মে অম্বা জন্মালেন দ্রুপদ রাজার কন্যা শিখণ্ডিনী হয়ে এবং স্থুণাকর্ণ নামে এক যক্ষের সাথে লিঙ্গ পরিবর্তন করে শিখণ্ডী হন ।যাঁকে সামনে রেখে ভীষ্মের উপর তির চালিয়ে ছিলেন অর্জুন। তির ছুঁড়েছিলেন শিখণ্ডীও।
আচ্ছা সেই তীর ছোঁড়ার মুহূর্তে শিখণ্ডী কি একবারও ভেবেছিলেন অম্বার কথা? তাঁর যন্ত্রণার কথা? মনে পড়ছিল সব? যেভাবে সিনেমার ফ্ল্যাশ ব্যাকে দেখায়। হয়তো মনে পড়েছিল হয়তো বা না। তাঁর পরমাত্মার শান্তির জন্যই হয়তো প্রতিশোধের গল্প রচনা হয়েছিল।
চলবে