অথ শ্রী উপন্যাস কথায় আরণ্যক বসু (পর্ব – ৪০)

শালজঙ্গলে বারোমাস ছয়ঋতু
বলতে না পারা সব কথাগুলো যত
চৈত্র শেষে ভেসে যায় শালজঙ্গলে
পায়ে পায়ে ,ধীরে ধীরে ,রাত নেমে এলে ;
রাতপাখি হয়ে ডাকে,পাতা হয়ে দোলে ।
মেয়েকে ঘুমিয়ে পড়তে দেখে , উন্মনার দুচোখ জুড়ে কোথা থেকে এই ভর সন্ধেয় ঘুম নেমে আসে।
মেয়ের সঙ্গে মায়ের কোলের দখল নিতে তারও খুব ইচ্ছে করে।ক্লান্তির ঘুম, নির্ভরতার ঘুম,বর্ষশেষের ঘুম। বুদ্ধি করে বারান্দার আলোটা নিভিয়ে দেয় উন্মনা । তারপর মার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়তে পড়তে বলে–মা , তোমার কিন্তু ছুটি নেই । ছোটোবেলায় তোমার একদিকের কোল আমি দখল নিতাম , এখন আমার মেয়েও নিজের অধিকার বুঝে নিতে শিখে গেছে । মা মৃত্তিকার দুই পায়ের ওপর তোয়া আর উন্মনা ,বড় অসহায় ভালোলাগায় ডুবে যায় মা মৃত্তিকা। মেয়ের চুলে বিলি কাটতে কাটতে বলে — অসময়ে ঘুমোস না , রাতে ঘুম হবে না। কাল ভোরে উঠতে হবে । বরং ওঠ ,এককাপ চা খেয়ে ঘুমটা তাড়া । রাতের জন্য কিছু তো রাঁধতে হবে । হঠাৎ এই চৈত্র শেষের রাতে বহুদূর থেকে সোঁদা গন্ধ ভেসে আসে , সঙ্গে হালকা ঠান্ডা হাওয়া । মায়ের ঠোঁটে সেই হাওয়ার তৃপ্তির মৃদু হাসি । মা গুনগুনিয়ে ওঠে , সেই কবেকার প্রতিমার গানে — আঁধার আমার ভালো লাগে,তারা দিয়ে সাজিও না আমার আকাশ…
এক চৈত্র ক্লান্তি নিয়ে হাই তোলে উন্মনা । তার মা আজও এত সুন্দর গান গাইতে পারে ! মা গান থামিয়ে বলে– নে ওঠ,কিছু একটা চাপাই । একটু গরম গরম ফ্যানা ভাত খাওয়াবে মা ? ভাঙা আতপের খুদ দিয়ে গেল যে আমার ছাত্রের বাবা। বললো , এই খুদের ফ্যানা ভাতের নাকি দারুণ স্বাদ।তোয়াকে মাখন আর আলুডিম ভাতে দিয়ে খাইয়ে দেবো , তারপর আমরাও খাবো । দুটো শুকনো লঙ্কা ভেজে নিও । কামড়াবো আর উঃ উঃ করবো ,তবু খাবো । বছরের শেষ ঝাল খাওয়া।আঃ ! ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ে উন্মনা। মা একই সঙ্গে মেয়ে ও নাতনির মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় ! মেয়ের কোলের কাছে পড়ে থাকে কবিতার খাতা– গোটা গোটা অক্ষরে লেখা কবিতা ,তার মেয়ের সৃষ্টি ,কবি উন্মনার কবিতা। ঘুমন্ত মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে , মনে মনে বিড়বিড় করে পড়ে , এক পাতায় লিখে রাখা ছোট্ট ছোট্ট দুটো কবিতা — প্রথমটি —
ভালো থাকার কথা ছিল চৈত্র শেষের বেলায়
কিন্ত যাবার পথটি অনেক দূর
শেষ বসন্ত মিলিয়ে গেছে হৃদয়হীনপুরে ,
সন্ধ্যা বাজায় ক্লান্ত বাঁশির সুর।
দ্বিতীয়টা–
তোমার জন্য শাল মহুয়া ঝরায় পাতা
তোমার জন্য মাঠ পেতেছে সবুজ খাতা
তোমার জন্য ট্রেন থেমে যায় শীতের বনে
তোমার হৃদয় শিশির পাতের শব্দ শোনে
তোমার সঙ্গে মেয়েবেলার ঢেউ উচ্ছ্বাস
আমার চোখের আঁচলে নামে ভোরের বাতাস।
খাতা থেকে চোখ সরিয়ে , মৃত্তিকা মনে মনে বলে — এবার শুরু হবে তোর কঠিন পরীক্ষা।
বর্ষশেষের রাত যেন তার আত্মজার কবিতায় ভরে উঠলো ! দূরের মাইক্রোফোন থেমে গেছে কখন যেন। উন্মনা ঘুমের গভীরে চুপ ,মৃত্তিকা জাগরণের অতলে চুপ । চরাচর যেন হেমন্তের ম্লান গোধূলির মতো চুপ । বর্ষশেষ যেন তার মেয়ের খাতায় লিখে দিতে চায় — শেষ পাতা ও নতুন পাতা যেন অমর হয় তোমার কবিতায় । মা বিড়বিড় করে বলে — আমি জানি তুই সফল হবি। কবি ও মানুষ হিসেবে জীবনের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে পারবি । নারী ও পুরুষের যৌথ জীবনে ভাঙন আর সেই ভাঙনের পথে অন্য কারোর আগমন আজ আর নতুন ঘটনা নয় । তবু ও ঘুমন্ত মুখ , তুই তোর স্বামী প্রাণতোষকে সব কিছু খুলে বল , দরকার হলে বাড়িতে ডেকে মুখোমুখি কথা বল । জানি ও তোকে বেঁধে রাখবেনা , সে নিজেও হয়তো মুক্তি খুঁজছে । বিবাহিত পুরুষ একা থাকতে পারে না।মেয়েরাও কি পারে ? প্রত্যেকটি ব্যক্তিসত্তার মনের মতো সঙ্গী প্রয়োজন হয় , সেখানেই তার স্বাধীনতা । এই দুনিয়ায় সবাই জন্ম-স্বাধীন ।কেউ কারোর হুকুমের দাস নয় । ও মেয়ে , তুই যাকে বেছে নিবি ,আমি তাকেই মানিয়ে নেবো । তোর মেয়েও মানিয়ে নেবে । তোয়া যদি বাবার কাছে থাকতে চায় , বেঁধে রাখিস না। বদমেজাজি হলেও তোর স্বামী শয়তান বা অমানুষ নয় । অযথা পিছনে পড়ে থেকে তোর জীবনটা ছারখার করে দিচ্ছে না তো ! এবার ওকেও কিছু একটা নিয়ে থাকতে দে। সকলের জীবনটাই আনন্দের হোক।
ঘুমন্ত মেয়েকে আদর করতে করতে কত কথা ভাবে মৃত্তিকা । এই তো সেদিন দু বিনুনি করে মেয়েটা মায়ের হাত ধরে ইস্কুলে যেত । এর মধ্যে কখন সে সন্তানের জননী হয়ে , একটা ব্যর্থ সম্পর্ক ভেঙে আরেকটা সম্পর্ক গড়ে তোলার মতো সাহসী হয়ে উঠলো ? এই তো চোখের সামনে ঘুমন্ত পরীর মতো শুয়ে আছে তার মেয়ে উন্মনা। নিঃশ্বাসের সঙ্গে বুক দুটো ওঠানামা করছে । ম্যাক্সির ফাঁক দিয়ে হালকা গোলাপী ব্রায়ের আভাস । আলতো হাতে মেয়ের পোশাকটা ঠিক করে দিলো মৃত্তিকা । পরিস্থিতি মানুষকে কত বদলে দেয় ! আচ্ছা , আমি মা হয়ে ওর জীবনে দ্বিতীয় পুরুষকে মেনে নিতে পারবো তো ? আমার জামাই প্রাণতোষকে যে আমি আজও খুব ভালোবাসি । তাকে ভুলে যেতে হবে ? আমাকেও তো সে মা বলেই ডেকেছিলো! অমলেন্দু কী বলে ডাকবে ? প্রাণতোষ যখন জামাই হিসেবে রাত কাটাতো একটা চেনা ছক , চেনা গন্ধ , চেনা চাহনি ,চেনা ইচ্ছে অনিচ্ছে– সব কিছুর সঙ্গে একটা চেনা বোঝাপড়া ছিল মৃত্তিকার । মা হিসেবে , শাশুড়ি হিসেবে । গুছিয়ে খেতে ভালোবাসতো প্রাণতোষ । সেও প্রাণভরে খাওয়াতে ভালোবাসতো । কিন্তু আশ্চর্য এই যে , কোনোদিন তার মুখে গান বা কবিতা শোনেনি , কোনো ক্লাসিক উপন্যাসের কথাও নয় । সেটাও স্বাভাবিক বলে মনে হয়েছে মৃত্তিকার কাছে । কারণ , মেয়ে আর জামাই দুজন আলাদা সত্তা । বেড়ে ওঠাও ভিন্ন পরিবেশে । কিন্তু মিল না থাকলেও সাংসারিক বোঝাপড়া তো ছিল । তোয়া তো ওদের ভালোবাসারই সন্তান । তবু নদী আর উপনদীর মতো দুটো জীবন আলাদা হয়ে গেলো কেন ? সেই বাংলা গানটার কথা মনে পড়লো — কি জানি কোথায় কবে কোন ভূমিকায় ,জীবনের সাজঘর কাকে কি সাজায় ! আসল মানুষ কত বদলে যাবে , ছবিটা থাকবে তবু একই ভাবে …
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে , আলতো করে মেয়ে ও নাতনির মাথায় বালিশ দিয়ে , মৃত্তিকা উঠে গ্যাস ওভেনে ফ্যানা ভাত চাপালো । একই সঙ্গে অন্য ওভেনে ফুটতে থাকে আলু ও ডিম । ফ্যানা ভাতের ম ম গন্ধে তোয়া উসখুস করে পাশ ফিরে শোয় । উন্মনা ঘুমিয়ে কাদা । সাইলেন্ট মোডে রেখে দেওয়া ফোন থেকে আলো ছিটকে উঠলো হঠাৎ । কেউ কল করছে । কবিমন লেখা । অমলেন্দুকে তার মেয়ে কবিমন বলে ? মা মৃত্তিকা হঠাৎ ভয় পেয়ে শিউরে ওঠে। যদি প্রাণতোষ মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে তালবাগিচায় আবার সংসার করতে চায় ? উন্মনা ও অমলেন্দুর সম্পর্ক তো অনেক দূর গড়িয়ে গেছে বোঝাই যাচ্ছে । মাঝরাতে মেয়ের কথা ও চাপা হাসির ফিসফিস শুনে……
আচ্ছা , সে মা হিসেবে মেয়ের কোন সম্পর্ককে মেনে নেবে ? মেয়ের দৃঢ়তা সে জানে । প্রাণতোষের সংসারে সে কিছুতেই ফিরে যাবে না । মৃত্তিকা অনুভব করে , তার মেয়ে অমলেন্দু নামের মানুষটির কাছে একটা অনাবিষ্কৃত পৃথিবী পেয়েছে । সেই পৃথিবী ছেড়ে…..
মেয়ের কবিতার খাতাও ফরফর করে হাওয়ায় উড়ছিলো । চোখ পড়ে গেলো , একটা কবিতার ওপরে লেখা — আমার কবিমনকে লিখছি —
আয় না পাগল , আকাশ হয়ে লোটাই মাটির বুকে ,
আয় না একটু বিনম্র হই , অবাক, তুচ্ছ সুখে !
সারারাতের খেলার শেষে ফুলকুঁড়িতে ,
আধফোটাদের কুড়িয়ে রাখি তোর ঝুড়িতে।
কাঁচা লঙ্কা দিয়ে আলু ডিম মেখে , শুকনো লঙ্কা ও পেঁয়াজ বাদামি করে ভেজে , আলুর একটা কালো জিরে দেওয়া নরম ভাজি তৈরি করে , মেয়েকে ডাকতে গিয়ে থমকে গেল মৃত্তিকা । মেয়ের সেই আজন্ম চেনা গন্ধটা পেরিয়ে , একটা অচেনা মিষ্টি গন্ধ তার ঘুমন্ত শরীর থেকে উঠে আসছে । এই নতুন গন্ধটা কিসের ? মৃত্তিকা অবাক হয়।পুরোনো বছরের বিদায়ের গন্ধ , নাকি আগামী বছরের নতুন গন্ধ ! শেষ চৈত্র রাতের ফেলে যাওয়া স্মৃতির গন্ধ , নাকি তার মেয়ের নতুন জীবনের গন্ধ !
ক্রমশ