অণুগল্পে পঙ্কজ কুমার চ্যাটার্জি

ফর্সা দিদির মোবাইল

বারো বছরের রঞ্জু ট্রেনে বাদাম বিক্রি করে। বছর খানেক হলো এই পেশায়। আগে মহিলা কামরায় উঠতে লজ্জা পেতো। বিলু ওকে জোর করে কয়েকবার তুলে ওর লজ্জাটা কাটিয়েছে। সকাল পৌনে আটটার ব্যারাকপুর লোকালে ও রোজ খড়দা থেকে ওঠে। কারণ ঐ ফর্সা দিদিটা। রোজ ওর কাছ থেকে দু’প্যাকেট বাদাম কিনবেই। ওর কাছে গিয়ে দাঁড়ালে কিছু বলতে হয় নয়া। যন্ত্রের মতো হাতে করে দু’প্যাকেট বাদাম বাড়িয়ে দেয় আর বদলে কুড়ি টাকা নিয়ে চলে যায়।

সেই দিন রঞ্জু ব্যারাকপুরে স্টেশনে চলে গিয়েছিল ভুল করে গ্যালপিং ট্রেনে উঠে। তখন সেই ব্যারাকপুর লোকাল ‘একের এ’ প্ল্যাটফর্ম থেকে ছাড়ো ছাড়ো করছে। দৌড়ে গিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে দেখে সেই ফর্সা দিদিটা কোন রকমে লাফিয়ে মহিলা কামরায় উঠছে। ও আরো দেখতে পেলো মাঝ সিঁড়ি থেকে দিদির মোবাইল ফোন কারো কনুইয়ে ধাক্কা খেয়ে প্ল্যাটফর্মে পড়ে যাচ্ছে। আর পড়বি তো পড় সেই বিচ্ছু বিলুর হাতে। বিলু হাতে পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে পকেটে পুরে নিয়ে ট্রেনের পিছন দিকে দৌড়। অন্য কেউ খেয়াল করেনি।

রঞ্জু প্ল্যাটফর্মে নেমে বিলুর দিকে দৌড়তে থাকে। তারপর দেখে বিলু গিয়ে লম্বা প্ল্যাটফর্মের শেষ দিকের বেঞ্চে গিয়ে বসে পড়েছে। রঞ্জু ওকে দেখে এবার স্বাভাবিক ভাবে হাঁটতে থাকে। কিভাবে বিলুর কাছ থেকে মোবাইল হাতানো যায় তার পরিকল্পনা মনে মনে ভাঁজতে থাকে। শেষে কিছু না বলে ওর পাশে গিয়ে বসে। বিলুর হাওয়াই চপ্পলের স্ট্র্যাপ খুলে গিয়েছিল। ও যখন নীচু হয়ে চপ্পলের স্ট্র্যাপ লাগাচ্ছে তখন ওর হাফ প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইলটা বেরিয়ে এসেছিল। সুযোগ বুঝে রঞ্জু তুলে নিয়ে নিজের প্যান্টের অন্য পাশের পকেটে ঢুকিয়ে নেয়। এই সময় ঘোষণা হয় চার নম্বর প্ল্যাটফর্মে গ্যালপিং শান্তিপুর লোকাল আসছে। বিলুকে ঐ ট্রেন ধরবে বলে সে সটকে পড়ে। প্রাণপণে দৌড়ে ওভারব্রিজ পেরিয়ে পৌঁছয় চার নম্বর প্ল্যাটফর্মে।

গ্যালপিং শান্তিপুর সোজা দমদম প্ল্যাটফর্মের চার নম্বরে সেদিন ঢুকে পড়লো সিগন্যালে না দাঁড়িয়ে। ভাগ্য আজ রঞ্জুর সহায়। ওকে যে ভাবেই হোক ফর্সা দিদির হাতে মোবাইল তুলে দিতে হবে। গ্যালপিং ট্রেনের দশ মিনিট যাত্রাকালে ফর্সা দিদির ফোন বেজেই চলেছে। ভয়ে রঞ্জু কাঠ হয়ে আছে। কোন ভাবেই ফোন বার করেনি। মানসিক চাপ কাটাতে ট্রেনের বাইরের দিকে তাকিয়ে থেকেছে।

দুই নম্বর প্ল্যাটফর্মে পৌঁছে দেখে ব্যারাকপুর লোকাল থেকে যাত্রীরা নামছে। মহিলা কামরা থেকে নেমে ওর ফর্সা দিদি হন হন করে এগিয়ে চলেছে মেট্রো ধরবে বলে। হয়তো ভেবে নিয়েছে মোবাইল আর ফিরে পাবে না। রঞ্জু চিৎকার করে পিছন থেকে ডাকতে থাকে, “ও দিদি, ও দিদি!” দিদির কানে ডাক পৌছচ্ছে নয়া। দৌড়ে একদম পিছনে গিয়ে ডাকতেই ওর ফর্সা দিদি মুখ ঘুরিয়ে রঞ্জুকে দেখে অবাক হয়ে যায়। কোন কথা না বলে রঞ্জু দিদির হাতে মোবাইল ফোন তুলে দিয়ে বলে, “তোমার তো?” ফর্সা দিদি উত্তর দেয়, “হ্যাঁ, তুই কি করে পেলি?” “কাল জানাবো, তুমি অফিসে চলে যাও।”

মেয়েটি নিজের মনে ভাবতে ভাবতে চলে, রঞ্জুই কি চোর? আর ও চুরি করলে ফেরত দিতে এতদূর আসবে কেন? এক সন্দেহ, স্নেহ আর ফোন ফিরে পাওয়ার ভাল লাগা নিয়ে মেয়েটি এগিয়ে চললো।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।