T3 || ১লা বৈশাখ || বিশেষ সংখ্যায় সমীরণ সরকার

রোদ্দুরের খোঁজ

সকাল থেকেই দিনটা ভাল যাচ্ছে না অমলকান্তির।পরপর তিনটে এটেম্পট এর দুটো মাঝপথেই নেমে গেল বাস থেকে ।
আর তিন নম্বরটা ফুটো কাপ্তান ।চকচকে জামা প্যান্ট, পালিশ করা জুতো, পকেটে মাত্র সাতান্ন টাকা ।
মনটা ভালো করতে অমল টিকিট কেটেঝ চলে গেল পাতাল রেলের স্টেশনে।

না, পাতাল রেলে সে কোন কাজ করে না। দু একবার চেষ্টা করতে গিয়ে ধরা পড়তে পড়তে বেঁচে গেছে ।
অবশ্য বাসে খুব ভিড় থাকলেও অনেক সময় টার্গেট ফসকে যায় ।সেই জন্য মাঝারি ভীড়ের বাসে উঠে পড়ে অমল
‘টার্গেট’ ঠিক করে। ‘টার্গেট’ কন্ডাক্টরকে ভাড়া দেওয়ার সময় কোত্থেকে মানিব্যাগ বের করল আর সেটা কোথায় রাখল সেটা আড়চোখে লক্ষ্য করে। তারপরেই’অপারেশন ‘।
এই কাজে অমলের সমকক্ষ আর কেউ নেই রামু ওস্তাদের ঠেকে।
অমলের বয়স এখন তেইশ । বারো বছর বয়সে ও রামু ওস্তাদের হাতে পড়েছিল।দুটো বছর শিক্ষানবিশি করার পর কাজে নামার লাইসেন্স পেয়েছে।

অমল তো ছোটবেলায় কোনদিন স্বপ্নেও ভাবেনি , পকেটমারের জীবিকা বেছে নিতে হবে তাকে।
বাবা চটকলে কাজ করতো । অমল স্কুলে পড়তো। ভালো রেজাল্ট করতে বলে তাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখতো মা-বাবা ।
হঠাৎ একদিন বাড়ি ফেরার পথে গাড়ি চাপা পড়ে মারা গেল বাবা। মাস তিনেকের মধ্যে বাবার এক সহকর্মী গেনু মিস্ত্রি মাকে বিয়ে করে তার বাড়িতে নিয়ে তুলল।
ওখানে সিঁড়ির নিচে একটা স্যাঁতস্যাঁতে জায়গায় অমল রাত্রে একা শুতো।মাকে জড়িয়ে ধরে শুতে না পারার জন্য রাত্রে খুব কান্না পেত অমলের। একটা নতুন ভাইয়ের জন্ম দিতে গিয়ে মাটা মরে গেল, ভাইটাও বাঁচল না। গেনু মিস্ত্রি তাড়িয়ে দিল অমলকে।

রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে একদিন খিদের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে একটা দোকান থেকে একটা পাঁউরুটি তুলে নিয়ে পালাতে গিয়ে ও ধরা পরল । সেদিন রামু ওস্তাদ বাঁচিয়েছিল তাকে।

আজ শনিবার। মেট্রো স্টেশন ফাঁকা। হঠাৎ অমলের চোখ গেল উপরে ওঠার সিঁড়ির প্রথম ধাপে বসে থাকা একটা মেয়ের দিকে। মেয়েটার মুখশ্রী সুন্দর,কিন্তু অদ্ভুত বিষন্ন ওর চোখ দুটো ।দৃষ্টি উদাস । কেসটা কি? লক্ষ্য করতে হবে তো।
অমল খেয়াল করে ,মেয়েটা হাত দিয়ে চোখ মুছছে ।ও কাঁদছে কেন ? তবে কী……..?
হঠাৎ উঠে দাঁড়ায় মেয়েটি। হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে যায় সামনের দিকে। অমল অনুসরণ করে । একটা ট্রেন আসছে ঘোষণা হলো ।
একটু পরেই আলো দেখা গেল । ট্রেন ঢুকছে।হঠাৎই মেয়েটা লাইনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে গেল, কিন্তু পারল না ।ততক্ষণে অমলের দুই বলিষ্ঠ বাহুর আকর্ষনে মেয়েটি তার বুকে।
ওই অবস্থাতেই ছটফট করছে মেয়েটা ।
অমল ওকে শান্ত করার জন্য অনেক চেষ্টা করেও পারছে না ।কি করবে সে ? অমল হঠাৎই সজোরে একটা চড় কষায় মেয়েটির গালে। মেয়েটা অপ্রত্যাশিত ওই চড় টা খেয়ে হঠাৎই যেন শান্ত হয়ে যায় ।অমল চাপা গলায় বলে , মরতে যাচ্ছিলে কেন?
—ছেড়ে দিন আমাকে!
–ছাড়বো না ।বেশি বাড়াবাড়ি করলে পুলিশে দেব।
–কেন , আমি কি করেছি আপনার?
—জাননা, আত্মহত্যা করার চেষ্টা অপরাধ ?সব খুলে না বললে সত্যি পুলিশের কাছে নিয়ে যাবো।
কিছুক্ষণ পরে ও মুখ খুলে।মেয়েটার বাবা ও মা দুজনেই চাকরি করে ।ক্লাস টুয়েলভে পড়ে মেয়েটা ।মা বাবার প্রচন্ড আশা যে,মেয়ে হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষায় খুব ভালো রেজাল্ট করবে। অথচ আজ স্কুলের টেস্ট পরীক্ষার রেজাল্ট বার হওয়ার পর দেখা যায় যে ,ও দুটো সাবজেক্টে ফেল করেছে ।

অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে মেয়েটাকে বাড়ি ফিরতে রাজি করায় অমল। সারাদিনের রোজকার সেই সাতান্নটা টাকা ভেঙে বাস ভাড়া দিয়ে মেয়েটিকে বাড়িতে পৌঁছে দিতে যায় অমল।
বাড়িতে ছিল মেয়েটির মা । অমলের মুখে সব কথা শুনে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন তিনি। মাকে দুহাতে জড়িয়ে কেঁদে ওঠে মেয়েও ।হঠাৎই মায়ের মুখটা মনে পড়ে যায় অমলের।
এক ফাঁকে টুক করে বেরিয়ে আসে অমল। মেয়েটার নামটা জানা হলো না।

থাক, কি হবে জেনে? আজ অমলের হঠাৎই মনে হলো যে, সে যদি অন্য কোন কাজ করত, তাহলে তো তাকে এভাবে লুকিয়ে পালিয়ে আসতে হত না।
তবে মেয়েটাকে ওর মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিতে পেরে অমলের আজ খুব আনন্দ হচ্ছে । অন্যরকমের আনন্দ।
অমল কী আবার নতুন করে?
–ধুস!..সেটা কী আর সম্ভব?
ভাবতে ভাবতে একটা রানিং বাসে উঠে পরলো অমল।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।