কর্ণফুলির গল্প বলায় নুসরাত রীপা

স্বপ্ন

কী একটা মহামারী এসেছে। মানুষ,মানুষের কাছে গেলেই বলে জীবাণু আঁকড়ে ধরে। তারপর মৃত্যু নিশ্চিত। এই রোগের বিস্তার থামাতে দেশে লক ডাউন চলছে। সব স্কুল কলেজ অফিস আদালত বন্ধ। সব বন্ধ হলে আমাগো চলে ক্যামনে? আপনমনেই বিড়বিড় করে আজমল।

মোড়ের ধারের বিশাল ঘোড়ানিম গাছটার নিচে নিজের রিক্সায় বসে আকাশ পাতাল ভাবে সে। আজকাল প্যাসেঞ্জার নাই বললেই চলে। সব বন্ধ লোকজন যাবেই বা কই।

পাশেই ছোট্ট দোকানটা থেকে পুরি সমুচা ভাজার গন্ধ ভেসে আসছে। ঝিম ধরা সাদা দুপুরের আলোয় ভেসে ভেসে সে ঘ্রাণ ছড়িয়ে যাচ্ছে মসৃন বাতাসে। বাতাসের নরম স্পর্শে দুয়েকটা হলদে-সরু পাতা থির থির করে ঝরে পড়ে হু হু করা ভঙ্গীমায়। সেদিক নির্লিপ্ত তাকিয়ে আজমল আবারো দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

দোকানের ভেতরে কাস্টমারও আছে, অল্প।এদিকে পুলিশ আসে না। আসার শব্দ পেলেই দোকানী টুপ করে ঝাঁপ ফেলে দেয়। পুলিশ ঘুরে টুরে চলে গেলে আবার ঝাঁপ তোলে। না তুলে করবে কী। বউ পোলাপানের মুখে তো কিছু দিতে হবে।

সাফি গলির ভেতর প্যাসেঞ্জার নামিয়ে আজমলের রিকসার পেছনে তার রিক্সাটা রাখে। ভাদ্রমাস, যা গরম পড়েছে। ঝলমলে নীল সাদা ছোপানো আকাশটার দিকে তাকালে এই গা পোড়া গরমেও মনটা ভালো হয়ে যায়। গামছা দিয়ে মুখ গলা মুছতে মুছতে আজমলকে ডাক দেয়, ও কাহা, লও চা খাই।

আজমল সাফির দিকে তাকায়। সারা শরীর ঘামে ভেজা। গায়ের শার্টটা দেখে মনে হচ্ছে কেউ জল ঢেলে দিয়েছে।হাতের গামছাটা দিয়ে ঘাড়, মুখের ঘাম মুছছে।কাজলের বয়সী। অথচ কত দায়িত্ব তার। পুরো সংসারটা ঘাড়ে। তবু প্রাণ চঞ্চলতায় ভরপুর । মনে মনে ছেলের চেহারা কল্পনা করে। শহরে, কলেজে পড়ে। অনার্স না কী বলে। নিজের মাথা ভালো ছিল কিন্তু অভাবের কারণে পড়াশোনা করতে পারে নাই,আজমল তাই ছেলেকে শিক্ষিত করে নিজের অপারগতার কষ্ট ভুলতে চায়।

কাজল ছাত্র ভালো। জেলা শহরের বড় কলেজে পড়ে। মাস দুইমাস পর পর আসত। লকডাউনে সে শহর থেকে আসে নাই। পড়াশোনা না কি এখন মোবাইলে,
কম্পিউটারে হয়। গ্রামে নেটওয়ার্ক ভালো না-এই অজুহাতে।

ছেলেকে শহরে রাখতে আজমলকে একটু বেশি কষ্ট করতে হয়। থাকা খাওয়ার খরচ তো আছেই তাছাড়া বইখাতা,মোবাইল খরচ আরো কত কী! ছেলে বলে, আজমল অতো বোঝে না। কিন্তু ছেলের লাগবে, তাই সে যেভাবেই পারে টাকা জোগাড় করে।

এস এসসি পাসের পর অনেকে বলেছিল ছেলে এবার টিউশনি করেই তো নিজের খরচ মেটাতে পারে। আজমল সায় দেয় নি। এমনকি ছেলেকে বলেছে, তোমার কোনো কাজ করতে হবে না বাজান। তোমার প্রয়োজন আমি বাপে মেটায়াম তুমি শুধু পড়বা। আমার স্বপ্ন একদিন তুমি একটা বড় চাকরি করবা। আমার,তোমার মায়ের কষ্ট দূর করবা।—

দীর্ঘ অপেক্ষার পর একটাই মাত্র সন্তান কাজল। আজমল আর তার বউ এর চোখের মনি।বুকের সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে বড় করছে। ছেলের সাধ আহ্লাদ পূরণে চেষ্টার ত্রুটি নেই। ছেলেকে বড় করতে হবে। মানুষের মতো মানুষ করতে হবে। ছেলের সফল জীবনের আশায় অপেক্ষায় আছে আজমল আর তার স্ত্রী।

কাহা। চা লও- সাফি হাতে একটা প্লেটে দুটো পুরী আর দুই কাপ চা। সদ্য ভাজা বাদামী রংয়ের ফোলা ফোলা পুরী গুলো সুঘ্রান ছড়াচ্ছে।আজমল অবাক হয়ে বলে, আমি ত এখন চা খামু না।
আমি খাওয়াইতাসি। খাও।
আজমল একটা পুরী তুলে নিয়ে বলে, ঘটনা কী?
সাফি হাসতে হাসতে বলে, এক বড়লোকের পুতরে রেলস্টেশন থেইকা বাসায় পৌঁছায় দিতে গেসিলাম। পুরা একশ টাকার একটা নোট ধরাইয়া দিছে।
তিরিশ টাকা ভাড়া। এলাইগা ভাবলাম তোমারে চা খাওয়াই। তুমি কতদিন আমারে ভাত খাওয়াইছো— বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চায়ের কাপে সশব্দে চুমুক দেয়।
আজমলের মনে পড়ে, প্রথম প্রথম সাফি রিকসা ভালো চালাতে পারত না। তাই দূরের খেপ ও নিত না। অল্প আয়ে সাত জনের পরিবার চালাতে তার খুব কষ্ট হত। সে সময় আজমল মাঝে মধ্যে রওশনের দোকানে ভাত খেতে গেলে নিজের অর্ধেকটা সাফিকে তুলে দিত। আলাদা করে কিনে খাওয়াবার সামর্থ্য তো তার নাই। তবু ছেলের বয়সী সাফিকে দেখে তার বড্ড মায়া হত।

সাফির সাথে কাজলের কোনভাবেই মেলে না। কাজল শ্যাম, সাফি বেশ ফর্সা। তবে সাফি শুকনো। এই বয়সে ঠিক খাওয়া জোটে না, পুষ্টির অভাব শরীরে। কিন্তু কাজল তা নয়। কাজলকে তার বড়লোক বন্ধুদের সাথে দেখেছে আজমল। ওদের চাইতে একটুও আলাদা নয় ছেলে। আজমল মনে মনে তৃপ্তি পায়। ছোটবেলা থেকেই সে আর তার স্ত্রী সাহানা নিজেরা খেয়ে না খেয়ে ছেলেকে খাইয়েছে। মাছের মুড়ো, মুরগীর রান, দুধের সর। যখন যা কিছু ভালো সযত্নে তুলে দিয়েছে ছেলের পাতে। পরিয়েছে ভালো পোষাক। তাদের স্বপ্ন ছেলে একদিন অনেক বড় হবে। তখন যাতে তার অতীতের খাওয়া পরা নিয়ে কারো কাছে কোনো খোঁটা শুনতে না হয়।

আজমলের এ কথা শুনে, স্কুলের হাকিম মাস্টার বলেছিল, এ তোমার ঠিক চিন্তা নয় আজমল। যে যেমন তার সেটা স্বীকার করে চলাটাই উত্তম। শিকড় তো ছিঁড়ে ফেলা যায় না। কাজল যত বড়ই হোক সে কি অস্বীকার করতে পারবে যে তুমি রিকসাওয়ালা? পারবে? কও

মাস্টারের এ কথাটা বেশ কিছুদিন পেরেশান করেছিল আজমলকে। পরে, বউ বলল, ছেলে চাকরি পাইলে তোমারে তো আর রিকসা চালাইতে দেবে না। ঐসব আজাইরা চিন্তা বাদ দাও।

হুম, আজমল আর সাহানা আজাইরা চিন্তা বাদ দিয়ে ভবিষ্যতের সুখের আশায় ছেলের পথে চেয়ে আছে। ছেলের পাশ করে বেরোবার কথা, অথচ করোনার কারণে সব থেমে আছে। কাজল অবশ্য বলে, চাকরির বাজার খুব খারাপ মা৷ চাকরি পাওয়া আর সোনার হরিণ পাওয়া এখন সমান।

আজমল বলে পাসটা নিয়া দে বাপ। চেয়ারম্যান স্যাররে যায়া হাত পা ধরুম তরে একটা চাকরি দিতে। তুই আগে পাশ দে–

আজমলের বউ বলে, চেয়ারম্যান সাব লাগতো না। কাজলে নিজেই চাকরি পাইয়া যাইবো।দেইখো।

আজমল বউয়ের কথা শোনে। ছেলের কথা ভাবে। ছেলেটা তার পড়াশোনায় ভালো। ওরে শিক্ষিত হয়ে চাকরি করতে হবে এটাই বড় কথা। আজমল প্রাইমারী স্কুলে গিয়েছিল কিছুদিন। আজ তার সাথের কতজন কলেজে পড়ায়, কেউ বড় ব্যবসাদার, কারো কারো গাড়িও আছে। আর আজমল? রিকসাওয়ালা। রিকশা চালায়। গরীব বাপ দশ সন্তানকে জন্মদিয়েই খালাস।

ক্লাসের সাথীরা আজ তাকে চেনেও না। কেউ বলে, যাবা নাকি?

আজমল ঠিকই চেনে, ও খায়ের। সে জাবেদ, উনি আমরান—-
আজ তিনচার দিন হয়। ছেলের কোনো খবর নাই। শেষ দুপুরে আজমল বাড়ি ফিরে। মরা রোদ উঠোন টপকে দরজার ফাঁকা দিয়ে রান্না ঘরের মেঝের ওপর সটান লেপ্টে আছে। আনমনে সেদিকে তাকিয়ে বসে আছে সাহানা। জাফরীকাটা জানলার ওপাশে কলার পাতা বাতাসে শব্দ করে দুলে ওঠে। বুলবুলি কী চড়ুই এর ধ্বনি শোনা যায় দূর হতে। গোসল সেরে দাওয়ায় গামছাটা নেড়ে দিয়ে আজমল ভাত খেতে বসলে সাহানা কথাটা জানায়। আজমলের ফোন নাই। কই কই যেতে হয় খেপ নিয়ে৷ হারিয়ে যায় শেষে। তাই ফোন রাখে না। ফোন সাহানার কাছে থাকে।স্ত্রীর কথায় আজমল চিন্তিত হয়। দিনকাল খারাপ। ভয়ংকর রোজ জীবানু বাতাসে। ছেলের জন্য তার ভয় হয়। বউ বলে, এইবার ফোন দিলে বলমু চইলা আসতে।মহামারী কমলে আবার যাবে। মইরা গিয়া অত পড়ার দরকার নাই।
আজমল বিচলিত বোধ করে।

আরো দুইদিন পেরোয়।ছেলের জন্য মন
অস্থির লাগে। ছেলের ফোন বন্ধ, খবর নাই। আজমল সিদ্ধান্ত নেয়, কাল শহরে যাবে। সরাসরি যাওয়া যায় না। ভেঙে ভেঙে যেতে হবে। হোক। ছেলেটা কেমন আছে? বুকটা মুচড়ে ওঠে।

এশার আজানের পর পর অচেনা নম্বর থেকে ফোন এলে আজমলের বউ কাঁপা হাতে ফোনটা এগিয়ে দেয়। আজমল ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে কে একজন বলে, কাজল মারা গেছে। না, করোনায় নয়। কয়েকজন বন্ধু মিলে নৌকা ভাড়া করে নদীতে ঘুরতে গিয়েছিল। গভীর স্রোতে নৌকা থেকে পড়ে ডুবে গেছিল কাজল। ডুবুরিরা আজ সকালে লাশ তুলেছে—-

আরো কী সব বলে ওপাশের কণ্ঠ, আজমল ঠিক বুঝতে পারে না।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।