সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ১৫)

কলকাতার ছড়া

শোভাবাজারে রাজা রাধাকান্ত দেব বাহাদুরের আমন্ত্রণে হাজির হয়েছেন অভিজাত ইংরেজ রাজপুরুষরা। হাজির রয়েছেন স্বয়ং গভর্নর জেনারেল লর্ড অকল্যান্ড বা ইডেন সাহেবও। একপাশে বসে আছেন ধুতি পরিহিত, গায়ে পাখির পালক লাগানো, খোঁচা খোঁচা দাড়ির অদ্ভুতদর্শন এক ব্যক্তি। নাম রূপচাঁদ। রাজাবাহাদুর তাকে সাহেবদের খুশি করবার জন্য একখানি গান শোনাতে বলায় সে তো নাছোড়বান্দা। শোনাবেন নাকি মাথুর কীর্তন। রাজা তো পড়লেন মহা ফাঁপরে। সাহেবরা কীর্তনের কি বুঝবেন? তবু তিনি বললেন – জনৈক ব্রজনারী মথুরা গেছেন রাজা কৃষ্ণের সঙ্গে দেখা করতে। যথারীতি আটকে দিয়েছে দ্বাররক্ষক। তখন তাঁকে বোঝানোর জন্য সেই ব্রজসখী গাইছেন –
“লেট মি গো ওরে দ্বারি,
আই ভিজিট টু বংশীধারী |
এসেছি ব্রজ হতে, আমি ব্রজের ব্রজনারী ||
বেগ ইউ ডোরকিপর লেট মি গেট,
আই ওয়ান্ট সি ব্লক হেড,
ফর হুম আওয়ার রাধা ডেড,
আমি তারে সার্চ করি |
শ্রীমতি রাধার কেনা সারভেন্ট,
এই দেখো আছে দাসখত এগ্রিমেন্ট,
এখনই করবো প্রেজেন্ট, ব্রজপুরে লব ধরি ||”
আজ বলবো পাখির গল্প। যে সে পাখি নয়। একেবারে মানুষ পাখি। তাও একজন নয়। অনেক। কেউ শালিখ, কেউ ময়না, কেউ গাঙচিল আবার কেউ বা টিয়া। বাসা তাদের বাগবাজার। তাদেরই রাজা রূপচাঁদ। সে একেবারে আস্ত পক্ষী। ঠেলাগাড়িতে খাঁচা বানিয়ে তার ভেতর থেকে গান বাঁধে কলকাতার রাস্তায় রাস্তায়। ডেকে নিয়ে গিয়ে সেইসব গান শুনতে চান রাজা, ধনী অথবা বাবুরা। বাগবাজারের শিবকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের পৃষ্ঠপোষকতায় রমরম করে উড়ছিল পাখির দল। তবে তা ডানার ভারে নয়, ছিলিমে গাঁজার ওজনের গুণে৷ আর সঙ্গে ছিল গান। সেযুগে ছিল আশ্চর্য নিয়ম। এক আসনে একশআট ছিলিম গাঁজা সেবন করলে পাওয়া যেত একটি আস্ত ইট৷ আর তেমন ইট জমিয়ে জমিয়ে পুরো একখানা ঘর বানাতে পারলে পাওয়া যেত পক্ষী উপাধি। তো তখন কলকাতায় ছিল এরকম দেড়খানা পক্ষী। রূপচাঁদ পক্ষী আর নিতাই হাফ পক্ষী। বাড়ির চারদেয়াল তৈরির পরে পরেই নিতাই পঞ্চত্বপ্রাপ্ত হওয়ায় তার আর ফুল পক্ষীর সম্মান জোটে নি।
যাই হোক, রূপচাঁদের জন্ম ১৮১৫ সালে। বংশসূত্রে উড়িষ্যায় চিলকার অধিবাসী হলেও তাঁর জন্মকর্ম সবই কলকাতায়। প্রকৃত নাম গৌরহরি দাস মহাপাত্র। শোনা যায় তাঁর তৈরি গানের দল ‘পক্ষীর জাতিমালা’ সেযুগে সম্ভ্রান্ত গানের সভাতেও বেশ নাম করেছিল। তখন শহরের বহু সম্ভ্রান্ত ছোকরাও নিত্য যাতায়াত করত পক্ষীর আখড়ায়। তবে শর্ত ওই একখানিই৷ ছিলিমে দম দিতে হবে। কলিকাতার বিখ্যাত কবিয়াল রাম বসুরও যাতায়াত ছিল সেই আখড়ায়। এই পাখির দল টপ্পার মুকুটহীন সম্রাট নিধুবাবু বা রামনিধি গুপ্তকে গুরু মানত৷ বাবু শিবকৃষ্ণের সৌজন্যে বাগবাজারে ছিল তাদের আটচালা। সেখানে গাঁজা সেবনের সাথে সাথে বসতো গানের মজলিস। দলের প্রতি সদস্য কোন না কোনও পাখির নাম নিয়ে সারাজীবন সেই পাখির হাবভাব, ডাক অনুকরণ করেই কাটাত। এমনই ছিল ঊনবিংশ শতকের কলকাতায় পক্ষীর দলের মর্জি-মাফিক গান বাজনার কথা। মূলত পাঁচালি, টপ্পা, ঢপের মধ্যে বাংলা ও ইংরাজির মিশ্রণে এক অদ্ভুত মিশেলে শ্লেষাত্মক পরিবেশনই ছিল রূপচাঁদের গানের প্রধান আকর্ষণ। সমাজের প্রচলিত বিষয়বস্তুর উপরও মুখে মুখে গান বাঁধত সে। এ এক আশ্চর্য কলকাতা। যেখানে বাবুদের আসরে কবি ভোলা ময়রা, রাম বসু, অ্যান্টনি কবিয়ালের সাথে আসর মাতাচ্ছেন রূপচাঁদও৷ তাঁর নিজের গানের ভিন্নধর্মী পরিবেশনের ঢঙেই।
শ্রীকৃষ্ণের ব্রজত্যাগের পরে শ্রীরাধার বিরহ মুহূর্তের প্রতিটি আক্ষেপ ও বৈরাগ্য ফুটিয়ে তুলে সে গাইত –
“আমারে ফ্রড করে
প্রাণকৃষ্ণ কোথায় গেলি।
আইয়্যাম ফর ইউ ভেরি সরি,
গোলডন বডি হল কালি।
হো মাই ডিয়র ডিয়রেস্ট,
মধুপুর তুই গেলি কৃষ্ণ,
ও মাই ডিয়র হাউ টু রেস্ট,
হিয়ার ডিয়র বনমালী।
(শুনো রে শ্যাম তোরে বলি)
পুওর কিরিচার মিল্ক-গেরেল,
তাদের ব্রেস্টে মারিলি শেল,
নন্ সেন্স তোর নাইকো আক্কেল,
ব্রিচ অফ্ কন্ট্র্যাক্ট করলি।
(ফিমেল গণে ফেল করলি)
লম্পট শঠের ফরচুন খুললো,
মথুরাতে কিং হল, আংকেলের প্রাণ নাশিল,
কুবুজার কুঁজ, পেলে ডালি।
(নিলে দাসীরে মহিষী বলি)
শ্রীনন্দের বয় ইয়ংল্যাণ্ড, কুরুকেড মাইণ্ড হার্ড,
রহে আর, সি, সি, বার্ড, এ
পেলাকার্ড্ কৃষ্ণকেলি।
(হাফ্ ইংলিশ হাফ্ বাঙালি)।”
ক্রমশ