সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে মানস চক্রবর্ত্তী – ১২

মর্তকায়ার অন্তরালে

||১২||

চিকিৎসক বিদ্যাসাগর

“আজ চা কে তৈরি করেছিল ?”
“আমিই তৈরি করেছি |”
“আজ ঐ চা পান করে আমার হাঁপানির টান অনেক কমে গিয়েছে | তুই কি ঐ চায়ে শুঁট বা আদার রস কিছু মিশিয়ে ছিলি?”
“না তো , কিছুই মেশাই নি | যেমন প্রতিদিন করি আজ তেমনই করেছি | তবে …..”
“তবে কী ?”
“আজ তাড়াতাড়ি করে কেটলি না ধুয়েই ঐ জল চাপিয়ে চা করেছি |”
“আচ্ছা কেটলিটা আন দেখি |”
ভৃত্য কেটলি নিয়ে এলে বিদ্যাসাগর মহাশয় দেখলেন ঐ কেটলির মধ্যে দুটো মরা আরশোলা|
মনে হয়তো একটু ঘৃণার উদ্রেক হয়েছে – বিদ্যাসাগরের মুখ দেখে ভৃত্য অনুমান করল | ভাবল আজ খুব বকুনি খাবে |
কিন্তু বাস্তবে তা হলো না | বরং সে ( ভৃত্যটি ) প্রশংসিত হলো | এই ঘটনায় বিদ্যাসাগর মহাশয় যথেষ্টাধিক আহ্লাদিত হয়েছিল | তিনি ভেবেছিলেন , এক কেটলি জলে দুটো আরশোলা পড়ে তাঁর হাপানির টান অর্ধেক হয়ে গেছে , তবে উহা বহু পরিমাণ জলে সিদ্ধ করে , পরে অ্যালকোহল ফেলে ছেঁকে dilute করে হোমিওপ্যাথি ওষুধ বানানো সম্ভব | তথ্যসূত্র ঘেটে আমরা জানতে পারি তিনি উহা কার্যে পরিণত করে বিশেষ ফললাভ করেছিলেন এবং উক্ত ওষুধ তৈরির পদ্ধতি অপরকে না জানিয়ে বহু মানুষকে ব্যধির যন্ত্রণা অনেক লাঘব করতে , অনেক উপশম করতে সমর্থ হয়েছিলেন |
উপরের লেখাটি ভুবনকৃষ্ণ মিত্র মহাশয়ের তথ্যানুসারে ভাব ঠিক রেখে শব্দান্তর করা হলো |
বিদ্যাসাগরের চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করার আগে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ দেওয়ার আছে | ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার মহাশয়কে তিনিই প্রথম হোমিওপ্যাথিতে হাতে খড়ি দেন | এই তথ্য আমাদেরকে স্বয়ং দিয়েছেন ক্ষুদিরাম বসু | কে এই মহেন্দ্রলাল সরকার ?
১৮৮৫ সালের কোনো এক সময়ে শ্রী শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে চিকিৎসার জন্য আনা হয় মহেন্দ্রলালের শাঁখারিটোলায় |
শ্যামপুকুরে রোগের বাড়াবাড়ি হলে সম্ভবত হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক প্রতাপচন্দ্র মজুমদারের পরামর্শে মহেন্দ্রলাল সরকারকে ঠাকুরের চিকিৎসার জন্য নিয়োগ করা হয় | শ্যামপুকুরে মহেন্দ্রলাল সরকারের শুভাগমন ঘটে ১২ অক্টোবর ১৮৮৫ | প্রথমদিন ফি নিয়েছিলেন ১৬টাকা | পরে ফ্রি |
তিনি ভারতীয় ভাবধারায় বিজ্ঞান চেতনাকে মেশাতে চেয়েছিলেন | কারণ তাঁর মনে হয়েছিল এছাড়া ভারতের প্রকৃত উন্নতি অসম্ভব | সেই উদ্দ্যশ্যেই ডাক্তার সরকার প্রতিষ্ঠা করলেন ‘ইণ্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দি কাল্টিভেশন অব সায়েন্স |’ এখানে বিদ্যুৎ , চুম্বকত্ব , চক্ষুবিদ্যা , জীবতত্ত্ব প্রভৃতি বিষয়ে বক্তৃতা দেন |
এইরকম লোকের হাতেখড়ি যিনি করান , সেই বিদ্যাসাগরের হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা সম্পর্কে সন্দেহের কোনো অবকাশ থাকে না | বিদ্যাসাগর যে স্বয়ং হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক ছিলেন তা তাঁরই স্বলিখিত একটি চিঠির অংশবিশেষ তুলে দিলেই বেশ স্পষ্ট হয় | পত্রটি তিনি লিখেছেন রাজনারায়ণ বসুকে | “আমি কল্য অথবা পরশ্ব আপনাকে দেখিতে যাইব স্থির করিয়াছিলাম , কিন্তু এরূপ দুইটি রোগীর চিকিৎসা করিতেছি যে তাহাদিগকে পরিত্যাগ করিয়া যাওয়া কোন মতে উচিত নহে | এজন্য ২/৪ দিন দেওঘর যাওয়া রহিত করিতে হইল | ১
আর একজনের কথা উল্লেখ করব যিনি চিকিৎসার সুফল পেয়েছেন | তাঁর নাম পূর্বেই একবার উল্লিখিত হয়েছে – ক্ষুদিরাম বসু | তিনি লিখছেন , ” আমার একবার পেটের ব্যারাম হয়েছিল | ব্রজেন বাঁড়ুয্যে , প্রতাপ মজুমদারের ওষুধও ঠিক লাগছিল না | বিদ্যাসাগর মশাই আমাকে দেখতে এসে বললেন : ” ‘থাকবে ? – না যাবে ? ‘ আমি একটু হাসলাম | তিনি বই খুঁজে খুঁজে আমাকে ওষুধ দিলেন | ২/৩ বার খেয়েই সুস্থ হলাম | ” ২ তিনি আরো উল্লেখ করেছেন : ” লালবিহারী মিত্রের ( দে ? ) এক সময় লিভার এবসেস হয় | মহেন্দ্র ডাক্তার দেখে শুনে ওষুধ দিয়ে গেলেন | তারপর বিদ্যাসাগর মশাই এসে রোগীকে দেখে সে ওষুধ আর দিলেন না | তিনি নিজে দেখে শুনে ওষুধ খাইয়ে তাঁর দুরারোগ্য রোগ সারিয়েছিলেন | ” ৩
ইন্দ্র মিত্রের সহায়তায় বিদ্যাসাগর মহাশয়ের স্বহস্তে লিখিত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা সংক্রান্ত একখানা ডায়ারির কিয়দংশ দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে | মোট নয়টি কেস হিস্ট্রির কথা ওখানে উল্লেখ আছে | তারই কয়েকটি নিম্নে উল্লিখিত হলো |
” Harimohon
a large boil on the left hip
25.9.80. Arnica 3
27.9.80. Hepar Sulphur 6
28.9.80. Silicea 6
cured 30.9.80.”
” Sarat Kumari
Hiccaugh…..nausea in the morning and after meal-vomiting of food- awakens from sleep with a start
15.10.80. Supper 30
night and morning
no improvement.” ৪
ইন্দ্রমিত্র মহাশয় ফুটনোটে জানাচ্ছেন এই ডায়ারি বর্তমানে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে রক্ষিত আছে |
বিদ্যাসাগর মহাশয় শিক্ষক , শিক্ষাবিদ , সমাজসংস্কারক , লেখক , চিন্তাবিদ , প্রাবন্ধিক | এতৎ সত্ত্বেও তিনি হোমিওপ্যাথির দিকে ঝুকলেন কেনো ? অনিরুদ্ধ সরকারের একটি লেখাতে তার উত্তর দৃষ্টিগোচর হয় | সংক্ষেপে বললে এই রকম দাঁড়ায় – বিদ্যাসাগরের ছোটো মেয়ের কঠিন পীড়ার নিরাময় হয় হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় | তখন তিনি ঠিক করেন নিজে এই চিকিৎসা শিখবেন | এইজন্য সুকিয়া স্ট্রিটের চন্দ্রমোহন বোসের কাছে হোমিওপ্যাথি শিক্ষা নিতে শুরু করেন | সেইসঙ্গে আরো জানতে পারি শব ব্যবচ্ছেদ পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে শেখার জন্য নরকঙ্কাল সংগ্রহ করেন |
ঠাকুর শ্রী শ্রীরামকৃষ্ণদেব যে উত্তম চিকিৎসকের বিবরণ ‘ কথামৃত ‘ গ্রন্থে দিয়েছেন বিদ্যাসাগর ছিলেন সেই ধারার চিকিৎসক | সহোদর শম্ভু চন্দ্রের বিবরণ সেই সাক্ষ্য বহন করে | ” দাদা প্রাতঃকাল হইতে বেলা দশটা ঘটিকা পর্যন্ত সাঁওতাল রোগীদিগকে হোমিওপ্যাথি মতে চিকিৎসা করিয়া থাকেন এবং পথ্যের জন্য সাগু , বাতাসা , মিছরি প্রভৃতি নিজ হইতে প্রদান করেন | …….অপরাহ্নে পীড়িত সাঁওতালদের পর্ণ কুটীরে থাকিয়া তত্ত্বাবধান করিতেন | ” ৫
অনুরূপ ঘটনার উল্লেখ অনেকেই করেছেন , যেমন বিহারীলাল সরকার , কৃষ্ণা রায় , ক্ষুদিরাম বসু প্রমুখ | এদের মধ্যে কৃষ্ণা রায়ের বিবরণটি এখানে উল্লেখ করব | ” কারমাটারে একদিন সকালে এক মেথর কাঁদতে কাঁদতে এসে তাঁকে বলল , আমার ঘরে মেথরানির কলেরা হয়েছে | সঙ্গে সঙ্গে রওনা হলেন বিদ্যাসাগর , ওষুধের বাক্স আর মোড়া নিয়ে এক ভৃত্য তাঁর সাথী হল | সারাদিন রোগিনীর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ওষুধ দিয়ে তাকে কিছুটা ভাল করে সন্ধ্যেবেলায় বাড়ি ফিরে স্নানাহার করলেন | “
পরিশেষে আর একটি মূল্যবান সংবাদ দিয়ে এই লেখা শেষ করব | বিদ্যাসাগরের জন্ম ছিল বহুজন হিতায় চ , বহুজন সুখায় চ | বহুজনের কল্যাণার্থে বিদ্যাসাগর একটি সন্ন্যাসী প্রদত্ত ওষুধের বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন ১৭৮২ এর ‘ তত্ত্ববোধিনী ‘র মাঘ সংখ্যায় | শিরোনাম ছিল শূল রোগের ওষুধ | বিজ্ঞাপনটিতে ওষুধ প্রস্তুতের নিয়ম , ওষুধ সেবনের নিয়ম , পথ্যাপথ্যের নিয়ম বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া ছিল|
বিদ্যাসাগরের এই যে চিকিৎসা জীবন ,তা অনেকটা লোকচক্ষুর অন্তরালেই রয়ে গেলো | ঈশ্বরচন্দ্র শর্ম্মা যেমন বিদ্যাসাগর , তেমনই ভালো চিকিৎসক |
—————————————————————–
তথ্য সংগ্রহ : ১| করুণাসাগর বিদ্যাসাগর , ইন্দ্রমিত্র , আনন্দ পাবলিশার্স , সেপ্টেম্বর ২০১৪ , পৃঃ ৩২ ২| ঐ , পৃঃ ৩২ ৩| ঐ, পৃঃ ৩২ ৪| ঐ, পৃঃ ৩৫ |
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।