সাপ্তাহিক গল্প নেই-তে কল্যাণ গঙ্গোপাধ্যায় – ২০

গল্প নেই – ২০

খবর

খবর উড়ছে খবর বৃষ্টি এসে ডুবিয়ে দিল বেআক্কেলে শহর
জাত ভিখিরির কাঁথা কানি পাঁচহাজারির টিভি
জলের ভিতর সোঁদা গন্ধে গড়ছে উইয়ের ঢিবি
ত্রাণপুরুষের তুরকি নাচন দূর আকাশে যন্ত্র পাখি
ছুঁড়ে দিচ্ছে খুদ ও কুঁড়ো এর বেশি আর প্রয়োজন কি
জলের ভিতর মানুষ যেন গা ঘিন ঘিন জলের পোকা
তার ভিতরে কে যে সবুজ আর কে যে লাল গন্ধ শোঁকা
  খবর এল খবর মাটির নিচে খোঁড়াই ছিল অনেক দিনের কবর
  এটা লিখেছিলাম ১৯৮৪ তে। প্রকাশিত হয়েছিল উত্তম দাশ সম্পাদিত ‘মহাদিগন্ত’ পত্রিকার শারদীয় সংখ্যায়।
লেখাটি দেখে মনে হল এখনও সব একই আছে। ১৯৭৮এর বন্যায় কলকাতা ভেসে কল্লোলিনী হয়ে থাকা থাকা এখনও চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
একদিন অফিসে যাচ্ছি। তখন ইছাপুর থেকে ট্রেনে শিয়ালদা গিয়ে সেখান থেকে হেঁটে যেতাম। ছাতা নেওয়ার অভ্যাস কোনো কালেই তেমন ছিল না। ট্রেনে বসে দেখতে পাচ্ছিলাম আকাশে মেঘ জমছে। ভেবেছিলাম বৃষ্টি নামার আগে অফিসে পৌঁছে যাব। অসুবিধা হবে না।
শিয়ালদায় যখন নামলাম তখন হালকা বৃষ্টি। কোলেমার্কেটের রাস্তাটুকু হাঁটতে হত দড়ির উপরে হাঁটার মতো করে। খুব সাবধানে। একটু এদিক ওদিক হলেই পপাত ধরণীতলে। লিচু পাতার উপরে বৃষ্টির জল সামান্য জমলে আছাড় খাওয়ার তো কোনো অসুবিধে নেই।
বউবাজার অবধি গেলাম মোটামুটি ভালোভাবে। ভয়ে কোনো গলিতে ঢুকলাম না। একটু বৃষ্টিতে গলিগুলিতে জল জমে যায়। মাসখানেক আগে কেনা জুতো পায়ে। বড়ো মায়া। ভিজে গেলে সহ্য করতে পারব না। তাই সোজা রাস্তায় হাঁটছিলাম। সেন্ট্রাল এভিনিউর কাছে যখন এলাম বৃষ্টিটা ঝেঁপে এল। মেট্রোরেলের দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম বৃষ্টি কমলেই অফিস যাব।
এদিকে জল প্রথম সিঁড়ি থেকে উপরের দিকে উঠছে। বাধ্য হয়ে দাঁড়ালাম একেবারে উপরের সিঁড়িতে। বৃষ্টির জলে রাস্তা আলাদা করে বোঝা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে সামনে একটা বিশাল নদী। মাঝে মাঝে এক একটা বাস এলে জল চাকার ধাক্কায় ঢেউ খেলে এগিয়ে আসছে। মেট্রোরেলের ভিতরে গেলাম। সেখানে অনেক লোক। অনেক পরে একজন খবর দিল বৃষ্টি কমেছে। তখন ঘড়িতে সাড়ে তিনটে।
এবার! বেরুতে হবে। আমার অফিস তখন ছিল গণেশ এভিনিউতে। ভাবলাম জুতো তো পায়ের নিরাপত্তার জন্যই। অতএব জুতোর জন্য মনে মনে শোকপ্রস্তাব পাঠ করে নেমে পড়লাম জলে। কোথাও কোমর জল। কোথাও বুক অবধি। খুব সাবধানে নিজেকে বাঁচিয়ে ওই সামান্য রাস্তাটুকু যেতে অসামান্য দক্ষতায় একটা সফল অভিযান শেষ করতে সময় লাগল প্রায় একঘন্টা।
ফলে অফিসে পৌছলাম সাড়ে চারটের সময়।
অফিসের জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে মনে হল দাঁড়িয়ে আছি যেন একটা জাহাজের ডেকে। একটু একটু করে অফিস খালি হচ্ছে। আমিও বেরুলাম। জুতো জোড়ার দিকে আর তাকাইনি। অনুভব করছিলাম মোজা সমেত সেটা আমার পা আঁকড়ে ধরে আছে। আমি কোনো নিরাপত্তা দিতে না পারলেও আমার পায়ের দেখভালের জন্য যেন সে প্রাণ দিতে প্রস্তুত।
সেদিন ফেরার পথে চারিদিকের জল হাটকে শিয়ালদায় যাওয়াটা যে কি সাংঘাতিক কাজ হয়েছিল ভাবলে এখনও শিউরে উঠি।জল পেয়ে রাস্তার বহুকালের নোংরা নরম হয়ে গলে উপরে ভেসে উঠেছে। আমার দু’পাশ দিয়ে তা ভেসে চলেছে। আমি যে এড়িয়ে যাব তা পারছি না। যতটা পারছি কোমর জল যেখানে, সেখান দিয়েই সাবধানে হাঁটছি। কখোনো বুকজল। পা ফসকে যদি একটু নীচে পা রাখি তবে ডুবজলে গিয়ে হয়ত পড়ব। তখন কে সাহায্য করবে? সবারই তো এক অবস্থা। প্রাণ হাতের মুঠোয় করে শিয়ালদায় গিয়ে শুনলাম ট্রেন বিকেল থেকেই চলছে না।
চারিদিকে লোকজন থিক থিক করছে। আমি সেখানে পৌঁছাবার আগেই খুব ঝামেলা হয়ে গেছে। যাত্রীরা উত্তেজিত। এমন হলেই কিছু লোক থাকে যারা সব ভাঙতে শুরু করে দেয়। কে এই দায়িত্ব তাদের দেয় কে জানে। সেদিনও তাই হল। একদিকে জনতা অন্যদিকে পুলিশ, সে এক ভয়ঙ্কর অবস্থা।
রাত একটা নাগাদ চোখ জ্বালা করছে আমার। উত্তেজিত লোকজনকে সরাবার জন্য কাঁদানে গ্যাসের শেল ফাটানো হয়েছে। সারাদিনের ঘনঘটায় কেমন করে বাড়ি ফিরব এসব ভেবে তখন খিদে উধাও। একসময় গলা ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছিল। তা গলা ছেড়ে না হোক কাঁদানে গ্যাসের দৌলতে বাধ্য হয়ে নীরব কান্নায় চোখের জলে ভাসতে লাগলাম।
তখন টিভি ছিল না। ছিল না মোবাইল। বাড়িতে যে অবস্থাটা জানাব তার উপায় ছিল না। জানতাম দুশ্চিন্তায় মায়ের চোখে ঘুম নেই। আমার কিছু করার নেই। তখন এমনই ছিল দিনকাল।
শেষ অবধি ট্রেন ছাড়ল রাত দু’টো নাগাদ।
বৃষ্টিতে কোমর জলে বহুবার জলকেলি করতে হয়েছে কলকাতার অনেক জায়গায়। গণেশচন্দ্র এভিনিউ,সেন্ট্রাল এভিনিউ,আমহার্স্ট স্ট্রিট,বি টি রোড,শ্যামবাজার,আকাশবাণী,রবীন্দ্রসদন, বালিগঞ্জ, রাসবিহারি,দেশপ্রিয় পার্ক এমন আরও অনেক জায়গায়। নাম বলতে গেলে একটু একটু করে সব মনে পড়ে যাবে,যা সহসা শেষ হবার নয়। একেবারে এমাথা থেকে ওমাথা।
ব্যারাকপুরে বাবলুদার (লেখক তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়) বাড়িতে আমাদের আড্ডা হত। সেখানে কলেজের পরে মাঝে মাঝে আসতেন লেখক প্রলয় সেন। তিনি থাকতেন ঢাকুরিয়া। যাবার সময় আমি আর সুজিত দাশগুপ্ত প্রলয়দাকে এগিয়ে দিতাম ব্যারাকপুর স্টেশন অবধি। ওই সময়ের সঙ্গটুকু আমাদের কাছে ছিল খুব লোভনীয়।
একদিন প্রলয়দা এলেন। তাঁকে দেখে মনে হল খুব বিপর্যস্ত তিনি। সবাই জিজ্ঞাসা করতে বললেন, তার দাদা মারা গেছেন। আমহার্স্ট স্ট্রিটে বৃষ্টির জলে রাস্তা পার হচ্ছিলেন, সেখানে বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে পড়েছিল। বিদ্যুৎপৃষ্ট হয়ে মারা যান তিনি। প্রলয়দার মনের বেদনা আমাদের মনটাকেও আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। অনেকদিন।
মনে মনে ভেবেছি কলকাতায় কতবার জলে হেঁটেছি। টিকে যে গেছি এ তাঁর অপার দয়া। যিনি একান্তে এ বিশ্ব নিয়ে খেলছেন।
বহুকাল থেকে যা চলেছে এখনও তাই। বদলায়নি খুব একটা। মাঝে মাঝে হিসেব করি আমাদের দেশ স্বাধীন একথা বলা হচ্ছে কবে থেকে!
তবে একেবারে যে উন্নতি হয়নি তা নয় বৃষ্টির পরে এখনও যখন কলকাতা ডুবুডুবু জলে ভেসে যায়, তখন জানতে পেরেছি বৃষ্টি হলে লন্ডনেও এমন জল জমে। শুনে মনে আনন্দ আর ধরে না। ভাবি এবার দ্যাখ কেমন লাগে। আমাদের পরাধীন করে রেখেছিলে, এখন জীবন যায় যায় হলেও জলযন্ত্রণায় আমরা তোমাদের সমান সমান।
যার জীবন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে উপরে গেল তিনি দেখতে না পেলেও এখন তার পরিবারের লোকেরা চাইলে পেতে পারেন দু’লক্ষ টাকা। তা কলকাতা,হাওড়া বা যেখানেই হোক না কেন এভাবেই চলছে। চলবে আরও বহু কাল।
আমরা স্বাধীনভাবে বৃষ্টির কোমর জলে দাঁড়িয়ে উল্লাসে বলে যাব-জয় হো।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।