অনসূয়া বললেন, অরিন্দম, বী রোমান ইন রোম। তোকে ডিনারে ডাকা হয়েছে, আর চর্ব্য চোষ্যের আয়োজন থাকবে না?
শ্যামলী বলল, আলুবোখরার চাটনি আছে দেখছি। লেহ্যও তো হয়ে গেল!
অরিন্দম চোখ টিপে অনসূয়াকে বললেন, পেয় কি কিছু হবে?
অনসূয়া বললেন, হায় সেদিন গিয়াছে। একদা এই ভবনের পুরুষগণ কিছু কিছু উৎসবে আসব পান করিতেন। এখন সকলি বিলুপ্ত। কেবল কাটগ্লাসের কিছু পানপাত্র সেইসব স্বর্ণালি দিনের স্মৃতি নিয়ে পড়ে আছে।
অরিন্দম বললেন, শ্যামলী নিশ্চয়ই ড্রিংক করো না!
শ্যামলী বলল, আমি করার সুযোগ পাই নি।
অনসূয়া ধমক দিয়ে বললেন, পেলেই খাবি না কি?
শ্যামলী হেসে বলল, প্রকৃত আর্যেরা কিন্তু বাছুরের মাংসের কাবাব আর আসব খুব ভালবাসতেন।
অনসূয়া বললেন, কাজ নেই তোর আর্য হয়ে। তোর মুখে পোকা পড়ুক, বলে গলদা চিংড়ির বাটিটা তার দিকে ঠেলে দিলেন।
অরিন্দম হেসে বললেন, সত্যি কি মজার ব্যাপার, চিংড়ি জিনিসটা জলের পোকা, অথচ আমাদের জন্য সুখাদ্য। টিকটিকি যখন আরশুলা ধরে, তখন সেও মনে হয় এর থেকে কম তৃপ্তি পায় না।
শ্যামলী খেতে খেতে বলল, রুচি জিনিসটা বহু রকম, এবং সবটাই তার তার মতো করে সত্য। সাপের মাংস, বাদুড়ের মাংস বললে অতি উদার বাঙালিও তা মুখে পুরতে দুবার ভাববে। আর বাঙালি মাছ খায় শুনে পশ্চিমা ব্রাহ্মণেরা ওয়াক থু করে।
অরিন্দম বললেন, পোশাকেও তাই। আমি কোনোদিন ভাবতেই পারি না যে আমার দিদিমা গাউন পরে ঘুরে বেড়াতে পারতেন।
শ্যামলী বলল, নাৎসিরা গোটা দেশটাকে একটা ছাঁচে ঢালতে চেয়েছিল। জন্মের পর প্রথম দশটা বছর নাৎসি পার্টি বড় পুঁজির বিরুদ্ধে বলত, বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে কথা বলত, বড় ব্যবসায়িক স্বার্থের বিরুদ্ধে বলত। কিন্তু ১৯৩০এর দশকে সে সব পাট চুকিয়ে সোজাসুজি ইহুদি বিদ্বেষী আর মার্কসবাদ বিরোধী হয়ে উঠল।
অরিন্দম বললেন, নাৎসি পার্টির জন্মই হয়েছিল কমিউনিজম থেকে শ্রমিকদের সরিয়ে আনার জন্য। অনসূয়া বললেন, হিটলার নাকি ইহুদিদের মানুষের পর্যায়েই মনে করত না। গেগেনরেস বলত।
শ্যামলী বলল, গেগেনরেস মানে?
অনসূয়া বললেন না-মানুষ।
অরিন্দম বললেন নাৎসি তাত্ত্বিকরা মনে করতেন, ইহুদিরা পোকামাকড় জীবাণুর স্তরের প্রাণী। এদের মেরে ফেলাই এদের প্রতি সুবিচার করা। আর ভাবতেন ইহুদিরা বদমাইশি করে মার্কসবাদ সৃষ্টি করেছে জার্মানদের বাঁশ দেবার জন্য।
১৯৩৩ সালের ৩০ জানুয়ারিতে অ্যাডলফ হিটলারকে জার্মানির চ্যান্সেলর বলে ঘোষণা করা হয়। জার্মানির প্রেসিডেন্ট পল ভন হিন্ডেনবুর্গ হিটলারকে চ্যান্সেলর পদে অভিষিক্ত করেন।
১৯২১ সালের ২৯ জুলাই আন্তন ড্রেক্সলারকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে হিটলার পার্টি চেয়ারম্যান হলেন। ক্রমে নিজেকে ফুয়েরার বা সর্বময় নেতা বলে ঘোষণা করে নিলেন। সেটা ১৯২৫। হিটলার নানা ভাবে হিন্ডেনবুর্গকে কায়দা করে বুঝিয়ে তাঁকে দিয়ে নিজেকে জার্মানির চ্যান্সেলর ঘোষণা করান। আর তারপরেই সাতাশে ফেব্রুয়ারিতে রাইখস্ট্যাগে আগুন লাগার ছুতোয় বিরোধী রাজনৈতিক দলের লোকেদের উপর সাংঘাতিক দমন পীড়ন নামিয়ে আনলেন। নাগরিক অধিকারগুলো কেড়ে নিলেন। বিশেষ করে ইহুদিদের আইনি, অর্থনৈতিক, আর সামাজিক অধিকার গুলো কেড়ে নিলেন হিটলার। তেত্রিশ সালের পয়লা এপ্রিল ইহুদিদের ব্যবসা করার উপর জনগণের বয়কট ডাকা হল, সাত এপ্রিল আইন করা হল যে, সিভিল সার্ভিসে ইহুদিদের জায়গা নেই। তারপর বলা হল যে, ইহুদিদের ওকালতি জজিয়তি করা বন্ধ, সংবাদপত্র পরিচালনা বা সম্পাদনা বন্ধ, প্রেস ক্লাব বা জার্ণালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন করা বন্ধ। এমনকি ইহুদিদের কোনো ফার্ম বা খামারবাড়ির মালিক হবার অধিকার পর্যন্ত কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। ওই তেত্রিশ সালের মার্চে সাইলেশিয়া এলাকায় আদালত চত্বরে ঢুকে একদল লোক ইহুদি আইনজীবীদের বেধড়ক পেটাল। ড্রেসডেন এলাকায় আদালতে শুনানি চলাকালীন সওয়ালরত ইহুদি আইনজীবী, বিচারের কাজে ব্যস্ত বিচারককে কলার ধরে চড় থাপ্পড় কিল ঘুঁষি মারতে মারতে কোর্টরুম থেকে টেনে বের করে এনেছিল।তেত্রিশ সালে জার্মানিতে ইহুদি পরিচালিত বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ছিল পঞ্চাশ হাজার। আর হিটলারী জমানায় ওদের চাপ দেওয়া হল, এই ব্যবসা জার্মানদের হাতে ছেড়ে দিতে হবে। ১৯৩৯ এর এপ্রিল মাসে ইহুদি মালিকানার ব্যবসা কমে দাঁড়ায় মোটামুটি সাত হাজারটি।
শ্যামলী বলল, গতকাল সন্ধ্যায় আমি কারখানায় ঢুকেই একটা অদ্ভুত পরিস্থিতি টের পেলাম। যে ইন্দিরার ছবি আমার সময় নামিয়ে ঢেকে রাখা ছিল, তা আবার দেওয়ালের ওপরে উঠে পড়েছে। আর, শ্রমিকরা আমার দিকে চোখটা পর্যন্ত তুলে তাকাতে ভয় পাচ্ছে। অথচ এই কারখানাটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আমি ঝুঁকি নিয়ে সেটা খোলালাম। দেনার জন্য ব্যাঙ্ক দুবার নোটিশ দিয়েছিল। আমি এই কারখানায় শ্রমিকদের জন্য ফ্রি টিফিন আর বাথরুমের ব্যবস্থা করে দিই। প্রত্যেককে পার্সোনাল সাবান দেওয়া শুরু করি। আগে একটা সাবানে সবাই হাত ধুতো। আমি বোনাস দিয়েছিলাম। অথচ আমাকে এভাবে সরানো হতে শ্রমিকেরা টুঁ শব্দটিও করল না।
অরিন্দম বললেন, হিটলারের সময়ে যারা নির্দোষ লোকজনের উপর অত্যাচার করত, তাদের সংখ্যাটা কম ছিল না। জনগণের একটা বড় অংশকে পকেটে পুরে ফেলতে না পারলে হিটলারী বাঁচে না।