ধারাবাহিক উপন্যাসে আবুল কালাম আজাদ (পর্ব – ৫)

কিশোর উপন্যাস

ঢাকা টু মানিকগঞ্জ

৫।।
তারপর পোস্ট করে দিলেন ফেসবুকে। খালাম্মা কাকে কবে কাঁদিয়েছিলেন কে জানে। তবে তিনি যে কাঁদানোর মতো মানুষ তা বোঝা যায়। তার ছেলের বয়সী আমাকে দাঁড় করিয়ে রেখে দুই আসন দখল করে বসে আছেন।
এমন সময় কন্ডাক্টর এসে খালাম্মাকে বলল: আফা, তারে বসতে দেন।
: বাজে কথা বলবা না।
: বাজে কথা কী কইলাম?
: সে সাড়ে তিনকোটি মানুষের গু গুলানো পানিতে ডুব দিয়া আসছে। তারে আমার পাশে বসাবো বমি করার জন্য? ওয়াক থুঃ!
: তাহলে আপনার দুই সিটের ভাড়া দিতে হবে।
: দিব, দুই সিট কেন, দশ সিটের ভাড়া দিবো যদি ঐ পোলারে গাড়ি থেকে নামিয়ে দাও।
এই কথা পর আমি কিছু না বলে পারলাম না। বললাম: খালাম্মা, আপনি আমার মায়ের বয়সী। আপনার ভেতর দয়ামায়া থাকা উচিত।
: তোমার প্রতি দয়ামায়া ঠিকই আছে, কিন্তু গুয়ের প্রতি তো মায়া দেখাতে পারি না। যাও, তিনটা লাইফবয় গোল্ড সাবান দিয়া গোসল দিয়া আসো, তোমারে আমি কোলে বসাবো। এই অবস্থায় আমার পেটের পোলারেও আমি খাড়া করায়া রাখতাম। ওয়াক থু!
কন্ডাক্টর চলে গেল। আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল। গাবতলী পর্যন্ত দাঁড়িয়েই যেতে হবে। খালাম্মা বা সেই মেয়েটার ওপর আর রাগ-অভিমান থাকলো না। সব দোষ আমার কপালের। আমার নিজের লোকটাই তো আমাকে পাশে বসাতে চাচ্ছেন না। মাহাবুব ভাইয়ের পাশ থেকে নদুকে উঠিয়ে খালাম্মার পাশে দিতে পারেন। নদুকে পাশে বসাতে তো খালাম্মা কোনো আপত্তি করবে না। আমাকে ডেকে নিতে পারেন তার পাশে।
আসলে মানুষ শেষ পর্যন্ত স্বার্থপর। এমন সময় কে যেন পেছন থেকে আমাকে ডাকলো: এই তুই গাব্বু না? আয়, আমার পাশে আয়।
আমি চমকে পেছনে তাকালাম। দেখি আকমল ভাই। আকমল ভাই ওখানে বসে আছেন! কি যে ভালো লাগল! অনেক দিন পরে আকমল ভাইয়ের দেখা!
আমি ছুটে গেলাম আকমল ভাইয়ের কাছে। আকমল ভাই বললেন: গতিশীল পানিতে আবর্জনা থাকে না। গন্ধও থাকে না। এই পানি ভরা স্রোতোজ নদীর পানির মতোই গতিশীল ছিল।
: বুড়িগঙ্গার পানিতে তো গন্ধ।
: বুড়িগঙ্গা তো মৃত নদী। বস, আমার পাশে বস।
আমি আকমল ভাইয়ের পাশে বসলাম। বসে খুব শান্তি পেলাম। পা একেবারে ধরে গিয়েছিল।
আকমল ভাই মাহবুব ভাইয়ের ছোটবেলার বন্ধু। আমি ছাড়া আর কারও সাথে আকমল ভাইয়ের পরিচয় নেই। সবাই অবাক হচ্ছিলো-লোকটা কে, একেবারে আমাকে তুই-তোকারি করে কথা বলছেন।
ওদেরকে অবাক করে দিতে পেরে আমার ভালো লাগছিল। খুব তো আরাম করে বসে ছিলে। এখন দেখো, কেউ একজন আমাকে ডেকে নিয়ে পাশে বসিয়েছেন।
আমি বললাম: কোথায় যাচ্ছেন আকমল ভাই?
: জাহাঙ্গিরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে।
: প্রকৃতির ছবি আঁকতে?
: না।
: তাহলে?
: সেখানে চারুকলা অনুষদে আমি লেকচারারা হিসাবে চাকরি পেয়েছি।
: বলেন কি! বিরাট খবর! আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছেন। তাহলে তো আপনাকে আর ‘আকমল ভাই’ ডাকা ঠিক হবে না। ‘স্যার’ ডাকতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কম কথা না।
: আরে নাহ! মাহাবুব ভাইকে যতদিন ‘ভাই’ ডাকবি আমাকেও ততদিন….। তোরা যদি কখনও জাহাঙ্গিরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাস, তখনও আমাকে ‘ভাই’ ডাকতে পারবি।
: আপনি যে জীবনে চাকরি-বাকরি করবেন তা ভাবতেও পারিনি।
: মাস্টারির চাকরি বলে নিলাম। শেখনোর মধ্যে এক রকমের আনন্দ আছে। তা ছাড়া, এখানে অর্ডারি কোনো কাজ তো করতে হবে না। আর নিজেরে ক্রিয়েটিভি প্রকাশের জন্য ফিক্সড একটা ইনকার্ম সোর্স থাকা দরকার।
: তা ঠিক।
: অনেক সময় মাথায় এমন কোনো কাজের পরিকল্পনা এসে যেত যেটা করা অনেক ব্যয়বহুল। টাকার অভাবে ছবিটা আঁকা হতো না।
: আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করছেন শুনে এতটা আনন্দ জাগছে মনে! বোধহয় আমি নিজে চাকরি পেলেও এতটা আনন্দিত হতাম না। আমার জীবনে আরও দুইটা সাধ আছে।
: কী?
: আপনার আর মাহাবুব ভাইয়ের বিয়ে, ঘর-সংসার দেখা।
: তুই আমাকে অনেক ভালোবাসিস বোঝা গেল। কারও বিয়ে, ঘর-সংসার কামনা করা হলো ভালোবেসে পেছন থেকে মাথায় পাকা বাঁশের বাড়ি দিতে চাওয়া।
: ধ্যাত্তারি! মাহাবুব ভাইকে অনেকবার আপনার কথা জিজ্ঞেস করেছি, তিনি কিছু বলেন নাই।
: ওর সাথে তো আমার প্রায়ই দেখা হয়। আমার চাকরি হওয়ার পর ওকে মিষ্টিও খাইয়েছি।
: আর আমাকে কিচ্ছু বললেন না। খুবই রহস্যময় মানুষ। মাঝে মাঝে মনে হয়, এই রহস্যময় মানুষটা সঙ্গ ছেড়ে দেই।
: পারবি না। রহস্য এমন একটা জাল, যে জালে আটকে গেলে বের হয়ে আসা যায় না। রহস্যের পেছনে ঘুরে ঘুরেই তো মানুষ শেষ পর্যন্ত বড় কিছু পেয়ে যায়, আমরা তাদের বলি বড় মানুষ।
: তাহলে আমরা বড় কিছু পাবো হয়তো।
গাড়ি চলছে। তুমুল বৃষ্টি এবং রাস্তায় পানি বলে গাড়ির গতি তুলনামূলক কম। আকমল ভাইয়ের সাথে এটা-ওটা নিয়ে আমার গল্প বেশ জমে উঠেছে। গাবতলীতে আমাদের নামতে হয়নি। ফার্মগেট থেকেই আমরা আরিচার বাস পেয়েছিলাম। সেই কলেজেরে মেয়েরা সবাই মিরপুর, মোহাম্মদপুরে নেমে গেছে। বৃষ্টির কারণে বাসে নতুন যাত্রী তেমন ওঠেনি। আসন কিছু খালি। আমি ইচ্ছা করলে যে কোনো আসনে গিয়ে গা এলিয়ে আরাম করে বসতে পারি। আকমল ভাইয়ের সাথে গল্প জমে যাবার কারণে আর উঠিনি।
জাহাঙ্গিরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ একটু আগে। সেই খালাম্মা বললেন: এই কন্ডাক্টর রাখো।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।