সাপ্তাহিক শিল্পকলায় “অশ্লীল ও সেন্সরশিপের ইতিকথা -০১”- লিখেছেন আলবার্ট অশোক (পর্ব – ১৩)

সাধারণ মানুষের ভাবনাকে আঘাত দেওয়ার মত উপাদান বা বস্তুকে (- মূলতঃ যৌন বিষয়ক)  বৈধ ধারণায় অশালীন বা অশ্লীল বলাহয়, যা পৃথিবীর সবরাস্ট্রের সংবিধানে শাস্তিযোগ্য অপরাধ গণ্য করা হয়ে থাকে। কিন্তু অশ্লীলতার কোন সন্তোষজনক সংজ্ঞা পৃথিবীর কেউ কোথাও  দিতে পারেনি। বরং দেখা গেছে, যেভাবেই সংজ্ঞায়িত হয়েছে ব্যুমেরাং হয়ে ফিরে আসছে। যাইহোক, সাধারনের চোখে যা অশ্লীল তা অন্য কারুর চোখে সুন্দরের উদাহরণ হতে পারে। সুতরাং সাধারণ সামাজিক ভারসাম্যতা রক্ষার্থে নানা বিষয় ও পরিপ্রেক্ষিত কেন্দ্র করে প্রত্যেক রাস্ট্র তার মত করে অশ্লীলতার শাস্তি বিধান রেখেছে। কেউ চ্যালেঞ্জ করলে, আদালতের রায় পালটে যায় বা যেতে পারে। অশ্লীল কথা বা কাজ কাউকে শারিরীক কোন ক্ষতি করেনা, মানসিক মন্দ আনেনা। এটা কারুর পছন্দের অধীনে, যিনি দেখেন বা ব্যবহার করেন তিনিই তাকে চালনা করতে পারেন।
সারা পৃথিবী জুড়ে অনেক আলোচনা, পালটা আলোচনা, সবই অশ্লীল সংজ্ঞায়িত করতে ব্যর্থ, কারন, স্থান, কাল, পাত্র – এই ৩টি জিনিস আপেক্ষিক ও পরিবর্তনশীল। কারু চোখে বা বিচারে কোন জিনিস মন্দ বা ক্ষতিকর, আবার একই জিনিস কারুর চোখে বা বিচারে  সমাজের দাবি বা মংগলজনক।
 কিন্ত  একটা বিষয়ে সারা পৃথিবী একমত যে, শিশুদের (যারা ১থেকে ১৬ বা কোন দেশে  ১৮ বছরের নীচে) অপ্রাপ্তবয়স্কদের নিয়ে কিছু নগ্নতা, যৌনতা, বা অপব্যবহার করা যাবেনা। ফলে পর্ণগ্রাফি বা যৌন রগরগে ছবি ও সাহিত্য বড়দের জন্য দেখা যায়, শিশু ও কিশোরদের বাদ দিয়ে।
এটা জেনে রাখা ভাল, প্রত্যেক দেশে রাস্ট্র চালায় কিছু রাজনৈতিক দল ও তার নেতা। রাজনৈতিক নেতা মানেই ৯০ শতাংশ ক্ষমতালোভী, বদমায়েস। ফলে তারা যে আইন বিধান করেন তা সূপ্রীমকোর্ট সেই বিধান মেনে শাস্তি দেন। সুপ্রীমকোর্টের বিচার পতি আইন বানাননা। ফলে অশ্লীল শ্লীলের বিচার কখনোই ঠিক না।এছাড়া সমাজে অনেক ঘটনা ঘটে, পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতাদের অংগুলি হেলনে।
এই অশ্লীলতা কাজকর্ম  উল্টোদিক থেকে এসেছে। সাধারনতঃ অশ্লীলতা মহিলা ও শিশুদের যৌন নিরাপত্তা ভাঙ্গে ও কিছু মানুষকে কুকর্মে প্রবৃত্ত হতে উৎসাহিত করে সেইহেতু সামাজিক বিধিতে পরিণত ও শাস্তি বিধান করে দমিয়ে রাখা হয়েছে।
নগ্নতা ও যৌনতার প্রচার, ব্যবহার সুপ্রাচীনকাল থেকেই। সভ্যতার উন্মেষ পর্বের সাথে সাথে। যৌনাঙ্গ, যৌনমিলন ও তাকে নিয়ে সংস্কৃতি, রাজনীতি, বিজ্ঞান দর্শন ও আধিদৈবিক, আধ্যাত্মিক ভাবনা ও কাজকর্ম মুক্তভাবে বিস্তার ও ব্যবহার পেয়েছে। ক্রমে সামাজিক নিরাপত্তা ও সুষ্ঠব্যবহারের ভাবনায় যৌনতাকে বিশ্লেষিত করে দেখা শুরু করল। পরিবার ও সম্পত্তির বিবর্তনের সাথে সাথে যেদিন নারীকে সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র হিসাবে বা বংশ বিস্তারের লিঙ্গ ভাবা হল, তখন দেখা গেল কিছু নিয়মকানুন। নারীকে ভোগ করার চুক্তি। নারীকে নিরাপত্তা দেওয়ার ভাবনা। যাতে কেউ ফুঁসলে অবলা নারীকে ব্যবহার না করতে পারে। জন্ম হল বিবাহপ্রথার। নারী, পুরুষের এই অধিকারের বিরুদ্ধে কোন রা বসায়নি। বরং তার মনে হয়েছে তার ভাত কাপড়ের, বিলাসিতার সংগ্রাম থেকে অব্যহতি পেল। নিজেকে তার বিলাসিতা,  খাদ্য, আশ্রয় ও সুরক্ষা অর্জন করতে হবেনা। বরং সে একজন মালিক হিসাবে ক্ষমতা পেল। বিনিময়ে সে পুরুষের যৌনসুখ, সেবা ও সন্তান সন্ততির ভার নেবে, যেগুলিতে তার ১০০ ভাগ কামনা আছে। নারীকে ও তার পরিবারের অন্য সদস্যদের উপর গৃহকর্তা তার সম্পূর্ণ ক্ষমতা  ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে গিয়ে ও সুরক্ষা দিতে গিয়ে শ্লীল অশ্লীল, সম্মান, অসম্মান ভাবনা এনেছে।  ১৫০০ শতাব্দীতে মুদ্রণ শিল্প আসার পরও নগ্নতা ও যৌনতা বা ভীষণভাবে অশ্লীল বিষয়- প্রচার ও প্রসার করা যেত। কিন্তু ১৭০০ তে দেখা গেল প্রশাসন ও চার্চ কর্তৃপক্ষ অশ্লীলতার দায়ে লোককে শাস্তি দিচ্ছে। ১৮০০ শতাব্দী অব্ধি ইংল্যান্ডে অশ্লীলতার বিরুদ্ধে শাস্তি দেওয়ার কোন আইন  সংবিধানে ছিলনা। ১৮৪২ এ আমেরিকার ফেডারেল সরকার অশ্লীল বা কোন নীতি বহির্ভূত যৌনাচার কে শাস্তি দেওয়ার বিধি প্রণয়ন করল।

 

 ১৯৮০তে নারীবাদীরা অশ্লীলতাকে ভাবতে লাগল নারীদের অবস্থান ও মর্যাদাকে ছোট করা। তাদের ভাবনা, যোনি স্তন ইত্যাদি তাদের শরীরের অঙ্গ, এসবের মর্যাদা হানি হয়েছে। ফলে তারা নারী শরীরকে প্রচার করতে লাগল।যে তাদের যোনি ও স্তনের মর্যাদা বা মূল্য অনেক। তারা নির্লজ্জের মত কাপড় খুলে তাদের শরীর সাধারণ মানুষকে প্রকাশ্যে ছুঁতে দিল দেখতে দিল, প্রতিবাদের উপায় হয়ে উঠল হঠাৎ পাবলিকের সামনে ন্যাংটো হওয়া। এগুলি আমেরিকা সংস্কৃতি।
কোন কথা বা কাজ যদি স্থানীয় কোন সাধারণ মূল্যবোধ বা নীতি ভাঙ্গে, কুকর্মে উৎসাহিত করে, যৌনকামোদ্দীপক করে তবে তাকে অশ্লীলতা ধরা হয়। বিচারের সময় দেখা হয়ঃ
১। কোনকাজ (আংশিক নয়) সম্পূর্ণভাবে কোন সমাজের মূল্যবোধকে ও নৈতিকতাকে খর্ব করে দিল কিনা, মন্দের  দিকে ঠেলে দিল কিনা,
২। স্থানীয় কোন কানুনকে অবজ্ঞা করে, যৌনাচার ভুলভাবে ব্যাখ্যা বা বর্ণনা করল কিনা,
৩। সেই কাজটিতে কি সাহিত্য, শিল্প, রাজনীতি বা বিজ্ঞানের ব্যবহার বহির্ভূত কিনা।( শিল্প, সাহিত্য, রাজনীতি বা বিজ্ঞানের স্বার্থে হলে অশ্লীলতা ধরা যাবেনা।)
এই ৩টি ভাবনার উপর অশ্লীলতার বিচার হয়। ( ভাবনাটি আমেরিকার আদালতের, কিন্তু গড়ে সকল সভ্য দেশ, চীন ও সৌদি আরব ছাড়া, মানা হয়) ।
কারুর কথা, কাজকর্ম স্থানীয় কর্তৃপক্ষের দ্বারা নীতিবিগর্হিত পরীক্ষা  বা ইংরেজি শব্দ সেন্সর করা, যতটুকু তথ্য মেলে তা সম্ভবতঃ খ্রীষ্টজন্মের ৪০০ বছর পূর্ব থেকে চালু আছে।
যীশুখ্রীষ্টের ৪৪৩ বৎসর আগে প্রাচীন গ্রীকরা তাদের সমাজের জনজীবন ও চরিত্রকে সুন্দর রূপায়নের জন্য নানা নীতি নিয়েছিল। কোনটা করা যাবেনা, কোনটা করা যাবে, তার রূপরেখা। তখন থেকে বিধিসতর্কীকরণ, নীতিবিগর্হিত পরীক্ষা বা সেন্সর শব্দটির ব্যবহার। পরে রাজনৈতিক ও সামাজিক নীতিবোধ রূপায়ন এক সম্মানীয় কাজ ও শাসন দন্ড হিসাবে ধরা হত।
যীশুর জন্মের ৩০০ বছর পর থেকে চীনে , প্রশাসন থেকে, প্রথম বিধি সতর্কীকরণ বা সেন্সর প্রথা চালু হয়।
প্রাচীন যুগে, বিধিভঙ্গের প্রথম শাস্তি পেয়েছিলেন সক্রেটিস। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি যুবকদের কুপথে নিয়ে যান, সামাজিক স্থিতি ভঙ্গকারী ও রাজনৈতিক মূল্যবোধ নষ্টকারী। তাকে বিষপান করতে আদেশ দেওয়া হয়েছিল।
যীশুখ্রীষ্ট একধরণের ইহুদী নীতি ভঙ্গকারী হিসাবে ক্রুশবিদ্ধ হন। যীশুখ্রীষ্টের জন্মের ৪৮০ থেকে ৪০৬ বছর আগে ইউ-রি-পিদিজ (Euripides), এক গ্রীক নাট্যকার, যিনি ৯০টি নাটক লিখেছিলেন, তিনি প্রথম প্রবক্তা বাক্‌স্বাধীনতার।
জন মিলটনের Areopagitica (1644)  হল ক্লাসিক দৃস্টান্ত সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে বাক্‌স্বাধীনতার উকালতি।
ডি এইচ লরেন্স,১৯২৯ সালে ডরোথি ওয়ারেন গ্যালারি, লন্ডনে, তার পেন্টিং এর একটা প্রদর্শনী করেন। পুলিশ প্রদর্শিত কাজের ৯টি অশ্লীলতার দায়ে বাজেয়াপ্ত করল। লরেন্স তখন ইতালিতে। তার সময় ভাল যাচ্ছিলনা, তার বই Lady Chatterley’s Lover (1928), The Rainbow (1915). অশালীনতার দায়ে অভিযুক্ত। আদালতের রায়ে নিষিদ্ধ। যাই করছিলেন তাই নেতিবাচক ফল আসছিল।

সেন্সরশিপের বড়ঘটনা ঘটে ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময়, ১৯৩৩ সালে। মানুষের মন বিশুদ্ধ করার জন্য হিটলারের বাহিনী, ইহুদি, কমিউনিস্ট বা মানবতাবাদীদের (Jewish author, communist or humanist, ) লেখা বই  ২০, ০০০ ভলিউম, আগুনে জ্বালিয়ে দিয়েছিল, হিটলার স্বয়ং নিজে এইসব কাজে সক্রিয় থাকেন। ডিজেনারেট (Degenerate) বা অধঃপতিত একটি শব্দ বার করে, প্রচুর শিল্প সাহিত্য ধ্বংস করেন। শিল্পী, সাহিত্যিকরা ও ইহুদীরা যারা পেরেছেন পালিয়ে বেঁচেছেন, যারা পারেননি তারা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে, গ্যাস চ্যাম্বারে মারা যান। ইতিহাসে গণহত্যা হিসাবে হিটলার এক কলঙ্কিত ঘৃণ্য মানুষ। Pablo Picasso  Paul Klee, Oskar Kokoschka and Wassily Kandinsky Max Beckmann, Emil Nolde and Georg Grosz. Otto Dix, Ernst Ludwig Kirchner (committed suicide a year after hundreds of his paintings were removed from public collections – he had earlier suffered from mental illness),Max Ernst  সবাই ডিজেনারেট বা অধঃপতনের তালিকায় পড়েছিলেন।
যেসব দেশগুলিতে সভ্যতার আলো আগে ফুটেছে সেসব দেশে অশ্লীল শব্দের প্রয়োগে বহু শিল্প সাহিত্য নিষিদ্ধ হয়েছে। লেখক শিল্পীরা, সাংস্কৃতিক কর্মীরা সরকারে রোষানলে পড়ে পুড়েছেন, শাস্তি পেয়েছেন। ১৯৫০ এর পর সাহেবদের দেশে এক নবচিন্তন ও বিশ্লেষণ এসেছে। তারা  শিল্প সাহিত্য রাজনীতি ও বিজ্ঞান থেকে অশ্লীল শব্দটির গুরুত্ব কমিয়ে দিয়েছেন। ফলে, শিল্পী সাহিত্যিক বিজ্ঞানীরা তার যথেচ্ছ ব্যবহার করছেন।
যৌনকেশ বা বালের রাজনীতি থেকে শুরু নীতিবাগীশদের সাংস্কৃতিক দর্শন।
 অশ্লীলতা। এ এক বায়বীয় জিনিস। তার কোন রুপ নেই। জলের মতন তরল, হাওয়ার মত অদৃশ্য।ঈশ্বরের মতন ঘোড়ার ডিম। আর তা নিয়েই সারা পৃথিবীর দাপানি।আপনি মনে করলে আপনার যৌনাঙ্গটাকে অশ্লীল বলতে পারেন। আবার এটাকে স্রষ্টার রূপে পূজা করতে পারেন। কখনো আপনার মনে হতেই পারে এই যৌনাঙ্গটা আপনার নিয়ন্ত্রণ বা দমিয়ে রাখা দরকার। আপনি যত সভ্যতার আলোকে পৃথিবীর সাথে জীবজন্তুর সম্পর্কগুলি বুঝতে পারবেন, মধ্যযুগের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন, নরনারীর পারস্পরিক শ্রদ্ধা শিখবেন অশ্লীলতা ব্যবহার তত লোপ পাবে।
     মিকেল অ্যাঞ্জেলোর ডেভিড।
আমরা উচ্চারণ করি মাইকেল এঞ্জেলো আসলে ইতালিয়ান ভাস্করশিল্পীটির নামের উচ্চারণ ( mikeˈlandʒelo di lodoˈviːko ˌbwɔnarˈrɔːti siˈmoːni]) মিকেলেঞ্জেলো ডি লডোভিকো বয়নারোটি সিমনি। রিপাব্লিক অব ফ্লোরেন্সে তার জন্ম ও মৃত্যু বর্তমান ইতালীতে ৮৮ বছর বয়সে, যথা 6 March 1475 – 18 February 1564 সাল।
১৫০১ সালে মিকেলঅ্যাঞ্জেলো বয়োনারতি (Michelangelo Buonarroti) র বয়েস ২৫ বছর। ১৭ ফুট লম্বা – ডেভিডের মর্মর মূর্তীটি বিশাল একটা মার্বেল পাথরে চাঁই কেটে কাজ করছেন; মর্মর পাথরটা কয়েক দশক পড়ে ছিল , অন্য একজন ভাস্করের কথা ছিল পাথরটি দিয়ে অন্যকিছু কাজ করবেন। তখন ফ্লোরেন্সে অনেক ভাস্কর ছিলেন , তারা  সবাই রেনেসাঁর। তারা প্রত্যেকেই শক্তিশালী শিল্পী।  (Donatello, Born: 1386) দনাতেলো এর মধ্যে অধিক সুনামী ও প্রভাবশালী। মিকেলেঞ্জেলো তাদের উদ্দেশ্যে পেশার বা ভাস্কর্য নির্মাণের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছুঁড়ে দিলেন। এবং তিনিও কম নন প্রমান করলেন। মিকেলেঞ্জেলো অনেক গুণের অধিকারী তার মধ্যে অধিক প্রকাশ পেয়েছিল ভাস্কর্য, পেইন্টিং, স্থাপত্য ও সাহিত্যে। তিনি একজন বিশিষ্ট কবি ছিলেন। প্রায় ৩০০র উপর কবিতা সৃষ্টি করেন। সবই তার উপলব্ধি ও ঈশ্বরে বিশ্বাস ও নীতি মূলক। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি ছিলেন তার থেকে ২৩ বছরের বড়। ও ৬৭ বছর জীবন আয়ু অধিকারী। মিকেলেঞ্জেলোর বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। ইতালীতে মিকেলকে ভাবা হত ঈশ্বরের পরবর্তী স্থানাধিকারী। তার জীবিত থাকাকালীন তাকে নিয়ে (তার জীবনী ও কাজ নিয়ে) ২টো পূস্তক প্রকাশন হয়েছিল। এটাই একটা রেকর্ড যে, বিশ্বে প্রথম কোনো শিল্পীকে নিয়ে শিল্পীর জীবদ্দশায় প্রকাশিত পূস্তক। কাজের দিক থেকে লিওনার্দোকে ছাপিয়ে উঠা এক শিল্পী।
 রিপাব্লিক অব ফ্লোরেন্সের নাগরিকদের স্বাধীনতার প্রতীক হিসাবে বাইবেল থেকে নেওয়া ডেভিডের চরিত্রটি মার্বেল পাথরে বানানোর একটি কাজ পেয়েছিলেন মিকেলএঞ্জেলো।
বাইবেলের একটা কাহিনী ছিল, দৈত্যের মত পরাক্রমশালী গলিয়াথকে  মেরে বালক-রাখাল ডেভিড ( দায়ুদ)  ইব্রীয় জাতির রাজা হয়েছিলেন, তিনি ছিলেন  সাহস ও শৌর্যের প্রতীক হিসাবে। এই ভাবনাটা ফ্লোরেন্স শহরের ফটকে সাহসী ও শৌর্যের প্রহরী হিসাবে  মিকেলেঞ্জেলো রাখতে চেয়ে ডেভিড বা দায়ুদের মর্মর মূর্তী ১৭ ফুট লম্বা পাথরের চাঁই কেটে বানান।
 মিকেলেঞ্জেলো একজন চিত্রশিল্পী, ভাস্কর ও স্থপতি  এই তিন শিল্প মাধ্যমের মানুষ ছিলেন। সেযুগে ভাস্কর্যকে অধিক  উত্তম শিল্প মানা হত । কারণ তাতে প্রকৃতিকে প্রকৃতির মত অনুকরণ করা যেত। ও সেটা স্বর্গীয় করুণা হিসাবে দেখা হত।
 ১৭ফুট ডেভিডের মূর্তী ১৫০৪ সালে ফ্লোরেন্সের পাবলিক প্লাজার (public plaza of Florence, the Piazza della Signoria.) সামনে স্থাপন করা হয়েছিল। তার তিনশ বছর পর ১৮৭৩ সালে এর একটি নকল প্রতিমূর্তী করে মিকেলেঞ্জেলোর আসল কাজটি সুরক্ষার জন্য স্থানান্তরিত করে  Accademia delle Belle Arti, তে নিয়ে যাওয়া হল। ১৮৮২তে পাবলিক প্লাজার সামনে নকল ডেভিড রাখা হল।
বাইবেলে, রাজা ডেভিডের পুরো সুন্নত হয়েছিল। সেই হিসাবে মিকেলের ডেভিডের পুংলিঙ্গ টির অগ্রভাগ, খুব অল্প কাটা হয়েছে। বোঝাই যায়না। সুন্নত বা লিংগের অগ্রভাগ ছেদন, যা প্রাচীন ইহুদীদের বা মুসলিমদের একটি আচার । এটা নিয়ে বিতর্ক ছিল, যে বাইবেলের আদিপুস্তকে মোজেস বা মোসীর সময় থেকে যেরকম ছিল তা রোমান সময়ে এসে, পুরো অগ্রভাগ কাটার রীতিতে বদলে যায়। মিকেল তার ডেভিডের নির্মাণ বাইবেল বর্ণিত সময়ের কিনা তা মানুষের কৌতূহল ছিল। পরে স্থির করা হল মিকেল তার নির্মাণে কোন ত্রুটি রাখেননি। অনেকে ভেবেছিলেন গ্রীক নান্দনিক সৌন্দর্য তত্ত্ব অনুযায়ী কোন দেহের অংশ কাটা থাকলে তাকে সুন্দর ধরা হবেনা, মিকেল কি সেই গ্রীক ভাবনা অনুসরণ করে লিংগচ্ছেদ করেননি?
 শতাব্দী পুরাণ এই মূর্তীতে, ডেভিডের শিশ্ন ও রোম নিয়ে বিতর্ক ও অস্বস্তি শুরু হল ১৯৩৯ এর পর। যখন এর অনুকরণ মানুষ তৈরি করে নানা দেশে ও স্থানে বানাতে শুরু করলো ও পাবলিক প্লেসে স্থাপন হতে লাগল। নগ্ন ছবি মুদ্রিত হতে লাগল।
অস্ট্রেলিয়ার সরকার ১৯৬৯ সালে ডেভিডের মুদ্রিত প্রিন্ট নিয়ে নিষিদ্ধ করে দিল, অনেক বিতর্কের শেষে ডেভিডের পোস্টার ছাড়পত্র পেল।
আর্টের ছাত্রছাত্রীদের কাছে পুরাতত্বের ভাস্কর্য ছবি যা আমরা অ্যান্টিক পিস বলি তা নকল করা বিশ্বের সকল পঠনপাঠনের সিলেবাসে আবশ্যিক পাঠ।
 ১৯৩৯ এর আগে মানুষ নোংরা এত ছিলনা? ৪০০ বছর আগে যখন মূর্তিটি তৈরি হয় ও তার ৪০০ বছর কেটে যায় সাধারণ লোকের চোখের সামনে, সাধারণ লোক অশ্লীল মনে করেনি, দেখতে চলতে ফিরতে অসুবিধা হয়নি। হঠাৎ ঊনিশ শতকে এসে কেন ধাক্কা খেল?

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।