সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে চার অক্ষর (পর্ব – ৭)

রাজপুত্রের গল্প

আগে যা হয়েছে:
বাকুদের সমস্যা সমাধানের জন্য রাজপুত্র বাকুসভায় উপস্থিত হয় এবং জানতে পারে সমস্যা আদতে বাকুদের রান্নাবান্না সংক্রান্ত। সামান্য মনক্ষুণ্ণ হলেও রাজপুত্র তা প্রকাশ করে না বরং সুযোগের সদ্ব্যবহার মারফত নিজের স্পেসশিপ থেকে সিগারেট আনিয়ে নেয়।
কি কি ভেবে ফেলেছিল রাজপুত্র নিজেকে? মিমাসের মহামান্য বিচারক? বাকু জাতির পথ প্রদর্শক? পোড় খাওয়া পরামর্শদাতা? ছোঃ ! গোটা ব্যপারটা গিয়ে শেষ অব্দি দাঁড়ালো পর্বতের পুচুকজাত মূষিক প্রসব। আকাট গাম্বাট দু পিস বাকু স্বামী স্ত্রীর মতন ঝগড়া করছে হাতা খুন্তি নিয়ে আর তাতে করে নাকি গোটা জাতির ক্রাইসিস! যত্তসব! আর শালারা ঝগড়াটাও ঠিক করে করতে জানলে একটা কথা ছিল। ওই যে বাকু যার নাম তেতাল্লিশ সে বলার মধ্যে শুধু একতিরিশকে বলেছিল আগুনের আঁচ বাড়িয়ে রান্না করতে যাতে রান্না তাড়াতাড়ি হয়। ব্যাস! এই সামান্য কথায় একতিরিশ একেবারে গাল ফোলা গোবিন্দের মা হয়ে রান্না বন্ধ করে ফোঁপাতে ফোঁপাতে শালিসি সভার আয়োজন করে একাকার কাণ্ড। আর ওই পালের গোদা নীল রঙের ষাঁড় তো এমন ভাবে কথা বলে যেন কত্ত বোঝে, কত্ত জানে, সে নাকি এত যুদ্ধ জিতেছে নিজের দল বল নিয়ে, বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সবচেয়ে বীর জাতির এই তো নমুনা। যা সটিয়া তাই ঘটিয়া। এই সব ফ্রাসটুর মধ্যে কাজের কাজ বলতে রাজপুত্রের সিগারেট খাবার স্বাধীনতাটুকু আয়ত্ত হয়েছে এই যা। একতিরিশ আর তেতাল্লিশের কথা আলাদা আলাদা ভাবে শুনে রাজপুত্র ইতিমধ্যে তিন নম্বর সিগারেট ধরিয়ে চুপ চাপ আকাশ পাতাল ভাবছিল। এই নেকুপুষু মার্কা সমস্যার কোন সমাধান রাজপুত্র করবে কিছুতেই ভেবে উঠতে পারছিল না। প্রথমত এটা যদি সমস্যা হয় তাহলে তার সোজা সমাধান একতিরিশ আর তেতাল্লিশের ডিপার্টমেন্ট আলাদা করে দেওয়া। দ্বিতীয় সমাধান দুজনেরই গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে ভাব করিয়ে দেওয়া। তৃতীয় সমাধান তেতাল্লিশ বা একতিরিশের যে কোনো একজন কে সমর্থন করা। চতুর্থ সমাধান গোটা বাকু সভার পিণ্ডি চটকে ওদের মুখের ওপর বলে দেওয়া এই সব ন্যাকাবোকা ইশু নিয়ে রাজপুত্রের মাথা খারাপ না করতে।
চতুর্থ সমাধানটাই রাজপুত্রের সব চাইতে মনপসন্দ। কিন্তু তাতে করে এই উপগ্রহে বাকুদের হাতে রাজপুত্রের ছবি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা হচ্ছে পচানব্বই পারসেন্ট। যে কোনো একজন কে সাপোর্ট করার যে তৃতীয় সমাধান, তার সাইড এফেক্ট হচ্ছে এই বাজারে রাজপুত্রের বাকু শত্রু টুং করে বেড়ে যাওয়া এবং তার অবধারিত পরিণতি স্বরূপ একতিরিশ বা তেতাল্লিশ যে কোনো একজন রাজপুত্রকে পিস পিস করে একবেলার লাঞ্চ সেরে ফেলতেই পারে। যদিও বাকুদের খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে রাজপুত্রের কোনো ধারণা নেই। এই সব নানা ছক কষতে কষতে রাজপুত্র নিজের ঘিলুর ভেতরকার প্রথম দুটো পায়রাকে হাতে নিয়ে এগোনোই আপাতত ঠিক করলো।
“ যা হয়েছে সেটা যথেষ্ট জটিল সমস্যা। আমি আপনাদের মতন বাকু নই, সাধারণ মানুষ হিসাবে খুব সীমিত দৃষ্টিকোণ নিয়েই একতিরিশবাবু আর তেতাল্লিশবাবুর এই যে অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ, তার স্থায়ী সমাধানের চেষ্টা করছি…” সভার মাঝামাঝি জায়গায় দাঁড়িয়ে কেটে কেটে রাজপুত্র কথা গুলো বলা কালীন টের পেলো তার বুকের হৃৎপিণ্ড অলরেডি স্কিপিং করা শুরু করে দিয়েছে। কার দিকে তাকিয়ে কথা গুলো ছুঁড়বে রাজপুত্র সেটাও ঠিক করতে পারলো না তার কারণ মোড়ল এবং বাকি সমস্ত বাকু নিজেদের তিন খানা ঠাণ্ডা চোখ নিয়ে রাজপুত্রের দিকে সটান তাকিয়ে।
কিছুটা নার্ভাস হয়েই বাকু মোড়লের দিকে বাঁ হাত তুলে রাজপুত্র শুরু করলো “স্যার ঠিকই বলেছেন, আপনারা মহান বাকু জনতা যারা হচ্ছে একজাতি একপ্রাণ একতা। মতবিরোধ আপনাদের মানায় না। আপনারা এত এত যুদ্ধ জয় করে এসেছেন , গোটা ব্রহ্মাণ্ড আপনাদের সমীহ করে চলে কিন্তু তবুও বলি, একটা কথা কিন্তু মাথায় রাখতেই হবে যে মত প্রকাশ যে কেউ করতেই পারে, এই যেমন তেতাল্লিশ বাবুর মনে হয়েছে তাই উনি একতিরিশ বাবুকে বলেছেন রান্নার আঁচটা বাড়িয়ে দিতে। এই কথার থেকে কখনই প্রমান হয়না একতিরিশ বাবুকে খাটো করবার জন্য তেতাল্লিশবাবু ওকথা বলেছেন। আমাকে আলমারি … ইয়ে ,তারগি ৬৭ বলেছে মহান বিজান্টারের কাছ থেকে ব্যক্তি চেতনা পাবার পরেও আপনারা একভাবে চিন্তা করেন। আমারা যদি সেইটে ধরি তাহলে তো এটা খুব পরিষ্কার যে তেতাল্লিশ বাবুর কথাটা যদি একতিরিশবাবুর গায়ে লেগে থাকে তাহলেতো তেতাল্লিশ বাবুর নিজের কথাও ওনার নিজেরই গায়ে লাগবার কথা। আমি একতিরিশ বাবুর প্রতি যথেষ্ট সম্মান নিয়ে বলছি, আপনি কখনই ভাব্বেন না আপনাদের মতবিরোধ হয়েছে কারণ বিরোধ জিনিসটা দু জন আলাদা ব্যক্তির মধ্যে হয়। কিন্তু মহান বাকু জাতির সুপার ব্যাপার হচ্ছে তাদের একতা। তাই আমি মনে করি মতবিরোধ আদৌ হয়নি। আর যেহেতু তা হয়নি সেহেতু আর কোনো সমস্যাও হয় নি।“ গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাওয়াতে থামতে এক রকম বাধ্য হোলো রাজপুত্র। নার্ভাস হয়ে গেলে ঘিলুর অজানা কোনা থেকে তড়বড় করে এত অনায়াস হাবি জাবি কথা যে বেরোতে পারে রাজপুত্র সেটা প্রায় প্রথম টের পেলো।
এই সংক্ষিপ্ত লেকচার বাবদ বাকুরাও স্ট্যাচু স্ট্যাচু খেলা মুলতুবি রেখে নিজেদের মৃদু গুঞ্জন শুরু করতেই রাজপুত্র জটলা থেকে চুপচাপ একপা দুপা পিছিয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে পকেট হাতড়ে চার নম্বর সিগেরেট ধরানোর তোড়জোড় শুরু করলো, মিমাসের বিকেলে ততক্ষণে এক দুপিস তারা ফুটতে শুরু করেছে সদ্য।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।