বন এক অদ্ভুত অনুষঙ্গ, মানুষ ওখানে নিজেকে খুঁজে পায়, নৈঃশব্দ, যতটুকু জেনেছি বনের পথে কথা বলাটা বাহুল্য শুধু।
যখন তোর্ণা দূর্গের পেছনে সূর্য এক অসামান্য উদ্ভাসে অস্ত যেতো, তামিনীঘাটের ওই উপত্যকার পরতে পরতে ফুটে ওঠা সেই রঙের কথা ভাষায় প্রকাশ করতে পারি এ শক্তি আমার নেই।আমি তখন ফিরে আসতাম পাকদন্ডী বেয়ে কিকউয়ী গ্রামের পথে।
ওখানে বিঠঠল কালের ছোট্ট একটা পাতার বাড়ি।ওও একা লোক।বাবা মা মারা গেছেন, বউ চলে গেছে অন্য কারো সাথে।বিঠঠল অসাধারণ লাভনী গাইত।সন্ধ্যাবেলা সহ্যাদ্রীর মাথার ওপর গোল হয়ে উঠত চাঁদ।সে লাবণ্যমন্ডিত বনের সঙ্গে আমার দেখা একজনের মিল পাই আমি।তাই তাকে ডাকি জ্যোৎস্নাপ্লাবিত বনভূমি।
সেই চাঁদের নীচে ও আগুন জ্বেলে রুটি তৈরি করত আর লাভনী গাইত, মাওয়ালী রূপকথার গল্প বলত।ওইসব গহীন বন পাহাড়ে আওরঙ্গজেবের মহাপরাক্রমী মুঘল সৈন্যকে শিব্বারাওয়ের মাওয়ালী সৈন্যের রুখে দেওয়ার গল্প।
আর সহ্যাদ্রীর সেইসব নিথর বন পাহাড় এক অনাস্বাদিত মাধুর্যে নিথর, হয়তো বহুদূর থেকে ভেসে এল হরিনের ডাক।সেই ডাক নৈশঃব্দকে আরও গভীর করে তুলল।
সেই আমি সেখানেই থেকে গেছে, ফেরেনি।খুব ইচ্ছা করে নেকলেস পয়েন্টের বাঁকে, যেখানে দূরে পাহাড়ের মাথায় মাথা তুলে মারাঠা বীরত্বের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাজগড় ফোর্ট, যেখানে নিচের উপত্যকায় শান্ত বালিকার মতো বয়ে চলেছে নীরা।সেখানে একবার ওই পাহাড় ওই অসাধারণ প্রকৃতির বুকে দাঁড়িয়ে তোমার নাম ধরে ডাকি।ওই পাহাড়, জঙ্গল ওই উপত্যকা দেখুক।তুমি আমার কেউ না হলেও, আমি তোমাকে ভীষণ ভালবেসেছি।
দেখো, আবার সেসব কথা, থাক।
ওখানেই এক চাঁদনী রাতে বিঠঠল কালের উঠোন পেরিয়ে গেল চিতা।আমি বুঝিনি।মনে হল বিরাট কোন এক প্রানী অন্ধকারে চুপিসাড়ে বনে মিশে গেল।অনেকক্ষণ পরে বিঠঠল বলেছিল ওটা চিতা।
ওখানে আমার অনেক কিছু ফেলে এসেছি।ওই জঙ্গল রূক্ষ, কঠোর কৃচ্ছ্বসাধনরত যোগীর মতো, কিন্তু যখন বর্ষা আসে।সমস্ত উপত্যকা সবুজ হয়ে ওঠে।সমস্ত বন পাহাড় ভরে ওঠে ময়ূরের ডাকে।অনেকগুলো অস্থায়ী ঝর্ণা নেমে আসে।যেন মনে হয় ভানুসিংহের পদাবলীর সেই প্রকৃতি, সমস্ত আকাশকে সঙ্গে নিয়ে ঝুঁকে আছে অনিমিখে তোমারই দিকে।