মেহেফিল -এ- কিসসা এম উমর ফারুক (গদ্য)

অতঃপর ললিতা

মনটা ভীষণ ভালো। ফুরফুরে মেজাজে ঘুরছি শহরের অলিগলি। প্রিয় মানুষকে নিয়ে সবাই ঘুরতে ভালোবাসে। তাই প্রিয় বন্ধু শ্যামল ও আজ আমার পাশে দু’বন্ধু মোটর সাইকেল করে ঘুরেই চলেছি। কখনো আমি আর কখনো শ্যামল ড্রাইভ করছে। মোবাইলে গান ছেড়ে এয়ারফোন কানে দিয়ে শুনতে বেশ লাগে।
শহরের শেষ প্রান্তে একটি গলির মাথায় ব্রিজের ওপর মোটরসাইকেল থামাল শ্যামল। আমিও নেমে পরি। শ্যামল সিগারেটটা ঠোঁটে লাগিয়ে দিয়াশলাই ঠুকে আগুন দিল। আর আমি ব্রিজের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়ালাম। শ্যামল বলল এই এলাকাটাকে মানুষ নিষিদ্ধপল্লী হিসেবে জানে। কী অসামাজিক কাজগুলো এখানে হয়। হঠাৎ ষোড়শী এক মেয়ে এসে দাঁড়াল ঠিক আমাদের দু’জনের মাঝখানে যে জায়গাটুকু ফাঁকা ছিল ঠিক সেখানে।
-ভাইজানেরা কি পাকাইতে (ঘুরতে) আইছেন?
-হ্যাঁ, ঘুরতে এসেছি। কথার ভঙ্গি দেখে বুঝে ফেললাম মেয়েটা পতিতা।
-আর কিছু লাগব নাকি?
মুহূর্তে চমকে যায় আমার পৃথিবী। কি বলছে মেয়েটি। কেন বলছে?
নিজের অজান্তেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো কোথাও শান্তি নেই। শান্তির মা যেন মরে গেছে। মানুষের মনের ভেতরে পাথর জমে গেছে।
আমার মুখে অপ্রত্যাশিত কথাগুলো শুনে বিরক্ত হয়ে মেয়েটা বলল, ভাইজান কিছু লাগলে কন।
শ্যামল চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল নদীর দিকে চেয়ে। আমি মেয়েটির কথা না বুঝার ভান করে বললাম- কি আছে তোমার কাছে?
তুমি কি দিতে পারবে?
মেয়েটি বলল-পুরুষ মানুষ যা চায় আমার কাছে তাই আছে। চাইলে দেওয়ার জন্য আমি প্রস্তুত। বলেই মাথা একটু ঝাঁকুনি দিয়ে মুচকি হাসি দেয়। না বোঝার ভান করে জিজ্ঞেস করি যেমন?
তারপর আমার কথায় যারপরনাই বিরক্ত হয়ে মেয়েটা শ্যামলকে বলে দোস্ত, সিগারেটটা দাও। সিগারেট এগিয়ে দিলে মেয়েটা টানতে টানতে চলে গেল।
আমি তো রীতিমতো অবাক। এ কোন আজব মেয়ে। এ দেশে এমন মেয়ে আছে। আমাকে জানতে হবে। মেয়েটা সম্পর্কে। কেন সে এ পথের বাসিন্দা। জানতে হবে তার সেই মুচকি হাসির পেছনে লুকিয়ে থাকা পাহাড়সম কষ্টের রহস্য।
আমার কথা শুনে অবাক হয় শ্যামল। কিন্তু আমার আগ্রহের বাইরে কোনো বিরক্তিবোধ নেই তার। শুধু বলল। সে জন্য অপেক্ষা করতে হবে। মোটরসাইকেল নিরাপদে রেখে দু’বন্ধু গল্পের ছলে সময় কাটাচ্ছি। ক্রমশ রাত গড়াচ্ছে। ফুটপাতের হোটেলের কাঠের চেয়ারে বসে আছি দুই বন্ধু। বসে চা, আর মোগলাই পরটা খেয়ে শ্যামল একটা সিগারেটে আগুন ধরিয়ে টানতে লাগল। সিগারেটের ধোয়ায় কুণ্ডলী পাকিয়ে আশপাশটা ভরে গেল। আর দূষিত বায়ুতে নিঃশ্বাস টানতে হচ্ছে দেখে খুব বিরক্ত লাগল। কেন যে মানুষ সিগারেট খায়? অযথাই কেন যে আশপাশের পরিবেশটাকে দূষিত করে? বোকা লোকগুলো এর মাঝে কি সুখ খুঁজে পায় আমার বুঝে আসে না। আবার এ বিরক্তির কথা প্রকাশ করাও যাচ্ছে না। যদি শ্যামল আবার চলে যায়। রাতের আকাশে ক্ষয়ে যাওয়া চাঁদ। ছেঁড়া মেঘের ফাক-ফোকর গুলিয়ে মরা জোছনা এই মধ্যরাতের প্রকৃতিকে বড় অচেনা করে আনে। জলসিক্ত হাসনাহেনার গন্ধ মাদকতা ছড়ায়।
চারদিক তখন একেবারে নীরব নিস্তব্দ; পুরো শহর তখন গভীর ঘুমে মগ্ন। দূরে নিমগাছে একটি কুক পাখি ডেকে চলছে অবিরাম। কুক পাখির ডাকটাই যেন কেমন! শুনলে গা ছম ছম করে উঠে! কেমন যেন একটা বিষাদ ও বিরহীভাব ডাকটার মধ্যে। সেই ডাক এই শীতের রাতের নিঃস্তব্দতাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
নাভির উপরের অংশে কাপড় ছাড়া একটা নারীদেহ; মুখে হাত দিয়ে দুই চোখ ঢেকে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। তার ভরাট দেহ যেন বর্ষার নদীর ঢেউয়ের মতো ফুলে ফুলে উঠছে! চোখটা সরিয়ে নিলাম। কি বলব তাকে ঠিক বুঝে উঠছিলাম না। ’ জোরে ধমক দিলাম! এই মেয়ে তুমি কে? কিছু বুঝে ওঠার আগেই নারী দেহটি ডাইভ দিয়ে দুই পা জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল।
ভাইজান, আপনার আল্লাহর দোয়াই আমারে এই শহরের পতিতা বানাবেন না। আমার কোনো দোষ নাই। আবার ধমক দিলাম, চুপ কর; কাপড় পরে নাও তারপর কি হয়েছে বলো? মেয়েটি পা ছেড়ে পাশের ঝোপের আড়াল থেকে শাড়ি নামক এক বস্তু গায়ে জড়িয়ে এলো যা তার রঙ হারিয়েছে অনেক আগে। শাড়িতে কয়েকটি তালি লাগানোর পরেও মেয়েটির দেহ ঢাকতে ব্যর্থ হয়েছে।
এরপর ফুফিয়ে ফুফিয়ে মাথা নিচু করে এসে সামনে দাঁড়াল। তাকিয়ে দেখলাম, বয়সে আমার থেকে অনেক বড় হবে, তাই এবার আপনি করেই বললাম। সে মাথা নিচু করেই বলতে লাগল। সে পাশের বাড়ির মৃত আজাহার আলীর ছেলে সিরাজের স্ত্রী। তার স্বামী বিদেশে কি এক কারখানায় নাকি চাকরি করে। আগে বছর খানেক পর পর বাড়ি আসত, কাপড় নিয়ে টাকা নিয়ে। কিছুদিন থাকত; তাকে আদর সোহাগ করে আবার চলে যেত। দুই বছর হয়ে গেল সিরাজ আর আসে না। ওখানে সে আরেকটা বিয়ে করেছে; এখন সে আর আসবে না। সে গৃহস্থ বাড়িতে কাজ করে। অনেক যুবক এমনকি বয়স্ক বৃদ্ধরাও তাকে কুকর্মের প্রস্তাব দেয়। সে কোনোদিন রাজি হয়নি। অনেকবার ভেবেছে এই শহর ছেড়ে; স্বামীর ঘর ছেড়ে চলে যাবে সে। কিন্তু ঘরে অসুস্থ শাশুড়িকে রেখে কীভাবে যাই? একটু মায়া স্বরেই বলল সে।
আমি অবাক হলাম! যে স্বামী তার খোঁজ খবর না নিয়ে আরেকটা বিয়ে করে সুখে থাকতে পারে অথচ তারই বৃদ্ধ অসুস্থ মায়ের দায়িত্বভার বহন করছে সে। আমি অবাক দৃষ্টিতে শুনতে লাগলাম তার কথাগুলো। প্রতিদিন একবেলা খেয়ে দিন কাটায় তাও আবার জোটে না ঠিকভাবে। না খেয়ে ঘরে বসে থাকে সে। বাহিরে বেরুলেই তার জন্য খারাপ প্রস্তাব নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে অনেকেই। সে আর যায় না কাজে। নিজে না হয় না খেয়ে মরে যাব তাতে দুঃখ নেই। কিন্তু বৃদ্ধ শাশুড়ি ক্ষিধের জ্বালায় যখন ছটফট করে তখন আর সহ্য হয় না। সবাই তাকে শাড়ি, টাকার লোভ দেখায়। কাপড়ের অভাবে অন্য কোথাও কাজের জন্য যেতে পারি না। তাই শাশুড়ির চিৎকারে আজ এই লোকটির কথায় বলতে গিয়ে … আবার কেঁদে উঠল। এবার আর ধমক দিলাম না!
কাছে গিয়ে আস্তে তার মাথায় হাত রাখলাম। মেয়েটি ভয়ে ভয়ে মাথাটা সোজা করল। তার ঠোঁট দুটো মাছির পাখার মতো কাঁপছে; ভয় আর লজ্জায় মেয়েটি এখন আর কথা বলতে পারছে না। আমি বললাম, আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। এ কথা আমি কাউকে জানাব না। কথাটি শুনে মেয়েটা একটা নিঃশ্বাস ছাড়ল। মনে হল, হয়তো বুকের ওপর চাপানো একটন ওজনের একটা পাথর এইমাত্র সরে গেল।
জিজ্ঞেস করলাম আপনার নাম কী?
খুব বিরক্ত আর তাচ্ছিল্য স্বরে উত্তর দিল মোহনা। আমি বললাম, চিন্তা করবেন না। এখন আপনি যান। ছিঁড়া, তালিযুক্ত কাপড়টাকে কোনো মতে গায়ে জড়িয়ে; ক্লান্ত দেহটা বয়ে নিয়ে আস্তে আস্তে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল মেয়েটি।
আমার মনে নানা প্রশ্ন উদিত হলো। নিজেকে ভীষণ অপরাধী মনে হলো, আমি অসাধারণ কেউ নই। সমাজ সংস্কারক ও নই, অতি তুচ্ছ একজন মানুষ; তবুও মনের পর্দায় জেগে উঠল, জীবনে দেখা অনেক মহিলার কথা। শাড়ি ওদের জন্য ফ্যাশন। টিভির পর্দায়, খবরের কাগজে, মানুষের মাঝে নিজেকে আকর্ষণ করে তোলার এক উপদ্রব। কোনো এক বিশেষ দিনে নিজেকে বিকশিত করে তোলার এক আবরণ। আলমারিতে শোভা করে রাখা এক অহঙ্কার। তাই আজ মনে পড়ল সেই সব শাড়ি পরিহিতাদের কথা; যাদের নামি-দামি বর্ণাঢ্য শাড়ির ঝলকানিতে চোখ ঝলসে গিয়েছে কিন্তু পানি আসেনি। অথচ আজ এই ছেঁড়া-তালিযুক্ত অতিসাধারণ একটি শাড়ি, তা দেখে চোখে পানি চলে আসল, কেন জানি না।
শ্যামল আমার দিয়ে তাকিয়ে বলে চল এবার চলে যাই। এই নিষিদ্ধ পল্লী থেকে।
আমি বললাম না।
কেন?
ওই মেয়েটাকে তো পেলাম না।
আরও অপেক্ষা করতে হবে।
ঠিক আছে, আমি অপেক্ষা করব।
শ্যামল আবারও একটা সিগারেট টানতে শুরু করল। কি আর করায় খারাপ লাগলেও মেনে নিতে হচ্ছে।
পাশের গলিতে দাঁড়াতেই প্রায় ৩০-৩২ বছর বয়স্কা একটা মহিলা এলো আমাদের দুজনের কাছে। কিছু না বলতেই মহিলাটা বেশরমের মতো নিজের চেহারা উপস্থাপন করে বলেনÑ বন্ধু, কিছু করবেন। নাকি এমনি আইছেন?
-ঘুরতে এসেছি। আমি জবাব দিলাম।
-তাইলে একটু ওইদিকে গিয়া খাড়ান। এইদিকে পুলিশ আহে, পরে আপনাগো ঝামেলা হইব। ওইদিকে গিয়া যতক্ষণ ইচ্ছা খাড়াইয়া থাকেন।
-আচ্ছা যাচ্ছি। বলে আমরা একটু দূর গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। আর লক্ষ্য করতে লাগলাম কী কী ঘটছে। মহিলা পেছন থেকে আবার ডাক দিয়ে বলল-বন্ধু শরম পাইতেসেন নাকি? শরম ভাঙলে ডাক দিয়েন।
কিছুক্ষণ পর অন্ধকার একটা গলির ভেতর থেকে ভদ্রলোক গোছের একটা লোক বাজারের ব্যাগ হাতে বেরিয়ে আসছে। একটু পর একটা ছেলে এলো সাদা শার্ট পরিহিত। ছেলেটাকে আমি এর আগেও দেখেছি। অনেক চেনা মুখ কিছুক্ষণ পর এদিক-ওদিক করতেই এক মহিলা তার দিকে এগিয়ে গেল। ছেলেটা মহিলার হাত ধরে গলির ভেতর ঢুকে গেল। আবার ৫ মিনিট পর বেরিয়ে এসে ভদ্রলোকের মতো হেঁটে হেঁটে চলে গেল।
ওড়নাবিহীন হলুদ রঙের কামিজ-স্যালোয়ার পরা মেয়েটি আবার এলো আমাদের কাছে। কিছু বলার আগেই মেয়েটা বলল, কী ব্যাপার এখন পল্লীতে। কার ঘরে যাওয়ার অপেক্ষা।
আমি বললাম এই মেয়ে শোন
জি বলেন,
কী নাম তোমার?
কেন?
নাম জেনে কী হবে? আপনাদের চাওয়াতো আমার দেহটা।
শোনেন, আজ আমার দেহটাকে ভোগ করতে দিতে পারব না। এই শহরের নেতা, সরকারি দলের বড় নেতা। সে আজ সারারাত আমাকে ভোগ করবে। হা হা হা।
অন্যদিন এসো তোমাকে উজাড় করে দেব।
আমি কথাগুলো শুনে পাথরের মতো স্থির হয়ে গেলাম।
জানতে চাইলাম আবারও তোমার নাম কী
মেয়েটা বিরক্তির হাসি দিয়ে বলল ললিতা।
হঠাৎ এক মহিলার চিৎকার। মুহূর্তে কিছু লোক একত্রিত হলো। জড়ো হওয়া লোকগুলোকে উদ্দেশ করে মহিলাটা বলছে ফুর্তি করার সবকিছু দিতে চায়। কাজ শেষ হওয়ার পর টাকা কম দিয়ে যাচ্ছে। টাকা নাই তো এখানে আসে কেন। যারা দেহ বিলিয়ে দেয় তারা কী খায় না? তাদের পেটে কী ক্ষুধা নাই? তাদের তো খেয়ে-পরে বাঁচতে হয়।
একটু দূর থেকে কে যেন ডাকল ললিতা ললিতা, ও ললিতা।
আসছি,
চলে গেল ললিতা।
তাকিয়ে আছি ললিতার দিকে…
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।