সপ্তমীর সকালবেলা বাসস্ট্যান্ডে চা-এ চুমুক দিতে দিতে মানিক দা কে জিজ্ঞাসা করলাম বননবগ্রাম যাবার বাস কখন আছে? উত্তর এলো মোটর ভ্যানে চলে যা, বাসের ভরসায় থাকিস না। সকালবেলা শরতের ঝলমলে রোদ দুধারে আউশগ্রামের শালের জঙ্গল, মধ্যে পিচ ঢালা রাস্তায় আমাকে ও আরও কয়েকজন যাত্রীকে নিয়ে গাড়ি চলল আপন গতিতে। শরতের বাতাস ও নতুন কিছু দেখবার জানবার আকাঙ্ক্ষায় মনটা ভারী চঞ্চল হয়ে উঠল। পৌঁছালাম বননবগ্রাম। শিউলির গন্ধ আর দূর থেকে ভেসে আসা ঢাকের আওয়াজ আমাকে তখন আরো দ্রুত পায়ে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে গন্তব্যে। পথ চলতি মানুষকে জিজ্ঞাসা করে অবশেষে পৌঁছালাম পুরোনো কাছারীর দূর্গা মন্দিরে।
এই আউশগ্রামের বননবগ্রামেরই বাসিন্দা জমিদার সারদাপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠা করেন এই চট্টোপাধ্যায় পরিবারের দূর্গাপুজোর। ছয় পুত্র, পুত্রবধূ পরিবার গ্রামের মানুষজনদের নিয়ে একসময় মেতে উঠতেন পুজোর কয়েকটা দিন। গ্রামের মানুষদের জন্য আয়োজন করা হত মহোৎসব। তবে এখন পুজো হয় ঠিকই পরিবারের সকলে এক হন কিন্তু সেই জাঁকজমক আর নেই। আর একটু এগিয়েই দেখলাম আরো একটি পুজো মন্ডপ সেখানে ঢাক-ঢোল বাজছে, অনেক মানুষজনের ভিড়। ঠাকুরমশাই পুরোনো পুঁথি পাঠ করছেন, বয়স্করা মনোযোগ সহকারে শুনছেন। আমাকে দেখে এগিয়ে এলেন এক বয়স্ক,জিজ্ঞাসা করলেন কোত্থেকে আসছি তারপর উনি আমাকে নিয়ে উঠলেন দূর্গামন্ডপে শুরু হল গল্প। এই ভদ্রলোক অসিত চট্টোপাধ্যায়, সারদাপ্রসাদেরই বংশধর। তার কথাতেই উঠে এল নতুন কাছারীর পুজোর ইতিহাস। সারদাপ্রসাদেরই ছয় পুত্রের একজন নলিনী রঞ্জন চট্টোপাধ্যায় (ব্রিটিশ আমলে বিচারপতি ছিলেন) তিনিই এই নতুন কাছারীর পুজোর প্রতিষ্ঠাতা। কোনো এক পারিবারিক বিবাদের কারণে পুরোনো কাছারী থেকে নতুন কাছারীর দূর্গাপুজোর সূচনা। সেই থেকে আজও চলছে পুজো, বেশ ধুমধাম করে। কর্মসূত্রে বাইরে থাকা পরিবারের লোকজন এসময় আসেন আর পাশে থাকা প্রতিবেশীদের নিয়ে মেতে ওঠেন পুজোর দিনগুলিতে,সপ্তমী থেকে নবমী অবধী চলে খাওয়া দাওয়া আড্ডা। আজও মায়ের ভোগ রান্না হয় পাশের প্রতিষ্ঠিত পুকুরের জল থেকে। অসিত বাবুর কথায় আজও নতুন কাছারীর পুজো হয় সারদা প্রসাদ চট্টোপাধ্যায় এর করে যাওয়া “অর্পণনামা দলিল “দেখে , শেষে বয়সে সারদাপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় সংসার ত্যাগ করে কাশীবাসী হয়েছিলেন। দূর্গামন্ডপের পাশেই সারি-সারি শিব মন্দির, দরজায় পরিবারের লোকজনদের নাম এখনও জ্বলজ্বল করছে। পারিবারিক উদ্যোগে জীর্ণ মন্দির সংস্কারও শুরু হয়েছে। তবে জীর্ণ পড়ে রয়েছে বননবগ্রাম বাসস্টপের কাছে পুরোনো আমলের বাড়িটি। তবে পুজোর সময় বাড়িটিও প্রাণ ফিরে পায়, নতুন সদস্য সদস্যাদের আনাগোনাতে প্রাণ ভরে নিশ্বাস নেয়।তবে ঢাকের আওয়াজ স্তব্ধ হলেই আবারও শূন্যতা গ্রাস করবে। ঘন নির্জনতায় অপেক্ষা করবে “আসছে বছর আবার……. ” । সে একা একাকি এক নির্জন ।