নীরা সিরিজ মুক্ত গদ্যে রুনা দত্ত

প্রেম রে তুহু মম শ্যাম সম

নীরা প্রতিদিন একটি দুটি তিনটি বা তার ও বেশী প্রেমের কবিতা লেখে। প্রেম ভালোবাসার আন্তরিক রূপ নীরার কলমে কি ভীষণ আন্তরিক ধরা দেয়  যা ছুঁয়ে দিলেই যেন কবিতরা  মুহূর্তে মূর্ত হয়ে  ওঠে। এভাবে প্রেম ভালোবাসার কবিতা জমতে জমতে পাহাড় সমান উঁচু হয়ে ওঠে । শব্দগুলো সব  প্রেমিকা হয়ে আকাশ স্পর্শ করতে পারার স্পর্ধা রাখে।
সবাই মুগ্ধ হয়ে নীরার কবিতা পড়ে , ভালোবাসার কবিতাগুলো কারো কারো জীবনের সাথে একাত্ম হয়ে ওঠে । কবিতার মধ্যে দিয়ে অনেকেই নীরার জীবনকে ছুঁয়ে যেতে যায় । নীরাকে একনিষ্ঠ প্রেমিকা বলেই তার পাঠকরা মনে করে নেয় ।  এও মনে করে নীরাকে প্রেম নানাভাবে নানারূপে ছুঁয়ে গেছে বারবার তাই হয়তো প্রেমের কবিতারা এতো স্বতঃস্ফূর্ত এতো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে নীরার কলমের আঁচড়ে । জন্ম নেয় হাজার হাজার প্রেমের কাব্য বা কবিতা । নীরার পাঠককূলে ও কেউ কেউ তার কবিতার গুণমুগ্ধ হওয়ার সাথে সাথে নীরার প্রতি ও আকর্ষিত হয়ে পড়ে । ফিনিক্স পাখির মতো নীরা কে সাথে  নিয়ে আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে যেতে ও কেউ কেউ পিছ পা হয় না ! !
কিন্তু নীরার অবস্থান তো  এসব থেকে শত যোজন দূরে তার অতল মনের সন্ধান পাওয়া এ জীবনে আর সম্ভব নয় । আসলে যে বয়সে প্রেমের স্পর্শে জীবন রঙিন হয়ে ওঠে , রাগে অনুরাগে জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত মুগ্ধতায় ভরে থাকে , সমর্পণের গভীরতায় জীবন কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে ঠিক সেই মুহূর্তে নীরার জীবন থেকে সব রঙ মুছে গিয়েছে । প্রত্যাখান ও বঞ্চনার দীর্ঘ ইতিহাস নীরাকে ভেঙে চুরমার করে রেখে দিয়েছে । তারপর থেকে প্রেমের এক একটি শব্দ নীরার কাছে  মৃত্যুর দহন হেমলক বলেই মনে হয় । মৃত্যুর নীল বিষে আচ্ছন্ন নীরার মন ও মননে  নতুন করে ভালোবাসার শব্দ আর কোন অনুরণন সৃষ্টি করতে পারে না । নতুন করে ভালোবাসার ঘ্রাণ ভেসে আসলেই নীরা সজোরে মনের দরজা বন্ধ করে দেয় কারণ ভালোবাসা আজকের এই অনেক পরিণত হয়ে ওঠা নীরার কাছে বিশ্বাসঘাতকতারই যেন  আরেক স্বরূপ যার মুখোমুখি নীরা আর কোনদিনই হতে চায় না ।
তাই প্রেম নয় অ-প্রেম ছুঁয়ে ছুঁয়েই যেন  নীরার এক একটি কবিতার জন্মলগ্ন । অপূর্ণতার গভীর থেকে উঠে আসা প্রেমের আকাঙ্ক্ষাই নীরার জীবনের ক্যানভাসে ভালোবাসার  নানা ছবি এঁকে যায় আর তাইই যেন ভালোবাসার স্মারক হয়ে ফুটে ওঠে নীরার প্রত্যেকটি কবিতায় । আর সব হারিয়ে ও কবিতাজন্মের মধ্যে দিয়ে পূর্ণ হয়ে ওঠে নীরার একক জীবন যেখানে কারো অনধিকার প্রবেশ নেই , কারো অনধিকার চর্চা নেই । যেখানে শুধুই নীরার একলা আকাশে নীরার ভালোবাসার শব্দরা নীরাকে ভালোবেসে বড়ো আপনভাবে ছুঁয়ে থাকে । আর নীরা ও তার ভালোবাসার প্রত্যেকটি কবিতায়  অভিযোজিত হতে হতে এক পরম প্রাপ্তির পথে এগিয়ে চলে ঠিক রাধা বা মীরার মতো যেখানে শুধু নিছক পার্থিব প্রাপ্তি নয় বরং গভীর চাওয়া থেকেই সৃষ্টি হয় এক অপার্থিব ভালোবাসার যা গভীর উপলব্ধির , গভীর অনুভবের যেখানে মন বারবার গেয়ে ওঠে ….
“প্রেমরে  তুহু মম শ্যাম ও সম ।”

নীরার দিবারাত্রির কাব্য

ঘড়ির কাঁটা বারোটা ছুঁইছুঁই । নীরা সব সেরে লেখা নিয়ে বসেছে । আপনমনে শব্দ নিয়ে কাটাকুটি করে চলেছে ডায়েরির পাতায় । জীবনদর্শন ছুঁয়ে মূর্ত হয়ে উঠছে জীবনের কথারা ।শব্দের আঁচড়ে ক্যানভাসে নিপুণ ভাবে ফুটে উঠতে থাকে মানুষ ও জীবনের কথা।
এভাবে কেটে যায় অনেক অনেকটা মুহূর্ত। রাতের আকাশে নক্ষত্ররা ও আস্তে আস্তে মুছে যেতে থাকে হয়তো আবার একটা নতুন ভোরের অপেক্ষা । ঘড়ির কাঁটা পাঁচটা ছুঁইছুঁই। এক মুঠো আলো এসে ছুঁয়ে দেয় নীরার আনত মুখ । ভোরের মৃদু বাতাস খোলা জানালা দিয়ে এসে ছুঁয়ে যায় সারা শরীর, ভালোবেসে জড়িয়ে থাকে। পাখির মৃদু আলাপন দিনের আলোয় আবার নতুন জীবনের জেগে ওঠা সবকিছুই নিখুঁত ভাবে চলতে থাকে ।
নীরা আস্তে আস্তে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় । ঘর থেকে বেড়িয়ে বাগানের সবুজ ঘাসে পা ছুঁইয়ে মুক্তির আস্বাদ নেয় । সারারাত জেগে থাকার ক্লান্তি নীরাকে আর স্পর্শ ও করে না । আসলে ঘুম পাড়িয়ে দেবার বা মাথায় হাত বুলিয়ে ভালোবেসে কাছে টেনে নেবার মানুষটাই ত কবে হারিয়ে গেছে , তাই হয়তো এ ভাবে জেগে থাকাটাই এখন নীরার একমাত্র অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে ।
মানুষের জীবনে একজন ভালোবাসার মানুষের খুব প্রয়োজন হয় যে স্নেহ মায়া মমতা ও ভালোবাসা দিয়ে তাকে  সবসময় জড়িয়ে রাখবে কিন্তু যখন জীবন থেকে এই ভালোবাসার ছোঁয়াই হারিয়ে যায় তখন তার কাছে সবকিছু মূল্যহীন  হয়ে পড়ে । তাই নীরার কাছে আজ লেখালেখির এই একান্ত আপন পৃথিবী ছাড়া বাকি সবকিছুই যেন ভীষণ মূল্যহীন।
কথা দিয়েছিলে……
আজীবন পাশে থাকবে
পাশাপাশি ছুঁয়ে আকাশ দেখবে
হাজার নক্ষত্রের ভীড়ে
আমায় ঠিক চিনে নেবে
শুরু থেকে শেষ অবধি
আমায় ভালোবাসবে ।
কিন্তু কথা দিয়ে কথা না রাখাটাই
আসলে তোমার খুব প্রিয় অভ্যাস ছিলো
যা বুঝতে বুঝতে প্রায় এক যুগ
পার হয়েই গেলো !
কথা রাখার শব্দগুলো তো সব
বুদবুদের মতো কবেই
শূন্যে মিলিয়ে গেছে …….

নীরার অভিসার আজ চাঁদ জোছনা নক্ষত্র ছুঁয়ে

নীরা আজও ডায়েরি খুলে বসেছে ভাবছে লিখবে ভালোবাসার এক অদম্য আরব্য রজনী।  যেখানে আদম ও ইভ সারাজীবন নিবিড় আশ্লেষে  একে অপরকে ভালোবেসে চলে , যেখানে শ্লীলতা অশ্লীলতার কোন সীমারেখা থাকেনা । থাকে শুধু সঙ্গমরত নারী পুরুষের এক অপূর্ব শিল্পসুষমার কাব্যরূপ ……
ঝুরো ঝুরো চাঁদ বৃষ্টির মতো নেমে আসে
ভিজিয়ে দেয় শৈল্পিক নারী পুরুষের
সমস্ত গোপন গ্রন্থি
মহুয়া আফিমের মাদকতায়
নারীর ঠোঁট চিবুক স্তনবৃন্ত নাভি ছুঁয়ে
শঙ্খশুভ্র উরুতে জমা হয়
পুরুষের ভালোবাসার স্বেদবিন্দু
দেহজ উষ্ণতায় মিশে যেতে যেতে
গোপন হলুদ গভীরে ছড়িয়ে পড়ে
ভালোবাসার জাফরানি সুঘ্রাণ ।
নীরা দেখে তার অজান্তেই কখন কবিতার ক্যানভাসে ফুটে উঠেছে নারী পুরুষের সঙ্গমের এক অপূর্ব কাব্যরূপ যেখানে দেহজ ভালোবাসার  সীমা ছাড়িয়ে অসীমে বিলীন হয়ে গিয়েছে দুই আজন্ম প্রেমিক -প্রেমিকা।
নীরা ধীর পায়ে উঠে দাঁড়ায় , বাইরে বেড়িয়ে আসে , আস্তে আস্তে সব বাঁধন থেকে মুক্ত করে  নিজেকে । সবুজ গালিচার বিছানায় এলিয়ে দেয় ভালোবাসবে বলে উন্মুখ হয়ে ওঠা এক নারীকে ।  অভিসারিকার মতো জুঁই বেলি ফুলের ঘ্রাণ মেখে হারিয়ে যেতে থাকে গভীর থেকে গভীরে ….
নক্ষত্রের আলোয় ভেসে যেতে  থাকে নারী থেকে মানবীতে রূপান্তরিত হয়ে ওঠা এক নগ্ন অবয়ব।

নীরার মেঘলা দিন একলা আকাশ

বৃষ্টির টুং টাং শব্দ শুনতে শুনতে নীরার যে মাঝে মাঝে কিছুই ভালো লাগেনা। নিজের একলা আকাশে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে  বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে  গান শুনতে। ইচ্ছে করে  জানলা দিয়ে বৃষ্টির পরের আকাশের রঙ বদলকে হাত দিয়ে ছুঁয়ে দিতে ।
ইচ্ছে করে মনের অনুভূতির প্রত্যেকটি শব্দকে আলতো হাতে স্পর্শ করে ঠোঁট দিয়ে ছুঁয়ে দিয়ে পরম মমতায় একটার পর একটা শব্দ জুড়ে ক্যানভাস জুড়ে ভালোবাসার একটা পূর্ণাঙ্গ ছবি এঁকে নিতে ।
তারপর খুউব ইচ্ছে করে বিছানা ছেড়ে ধীর পায়ে সামনের সবুজ লনে গিয়ে ঘাসের মধ্যে পা ডুবিয়ে হাঁটতে হাঁটতে  ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে খুব করে ভিজতে।  ।ভেজা শরীরে পৃথিবীর সমস্ত আদ্রতা শুষে নিয়ে উন্মুখ হয়ে ভালোবাসতে ।ইচ্ছে করে  এক এক করে সব বাঁধন উন্মুক্ত করে ভেজা পৃথিবীর সব ঘ্রাণ বুকে নিয়ে আচ্ছন্নর মতো মেঘলা আকাশের নীচে শুয়ে থাকতে আদি অনন্তকাল ধরে।
আর তখন যেন ঝুরো ঝুরো বৃষ্টি নীরার তামাটে পিঠের পেলবতা  ছুঁয়ে মিশে যেতে থাকে নগ্ন শরীরের প্রতিটি বিভাজিকায়। বৃষ্টির মৃদু সুরের মুর্ছনায় ভেসে যেতে থাকে নীরার মন ও মনন । নীরা আসতে আসতে উঠে দাঁড়ায় মুঠো মুঠো বৃষ্টি হাতে নিয়ে উড়িয়ে দিতে থাকে অসীম শূন্যতায়,  তারপর হঠাৎ করে পায়ের নূপুরের তালে তালে নাচতে আরম্ভ করে , নৃত্যরতা নীরা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে থাকে বৃষ্টিঘেরা কুয়াশার ক্যানভাসে ।
দূর থেকে মনে হয়  ক্যানভাস জুড়ে ফুটে উঠছে কখনো মীরা বা কখনো রাধার মতো এক নৃত্যরত প্রেমিকার আকুল নিবেদনের এক স্বর্গীয় চিত্রকল্প । যাকে মুগ্ধ হয়ে শুধু ভালোবাসা যায় কিন্তু কোনদিনই ছোঁয়া যায় না ।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।