রবীন্দ্রনাথ নাকি রংকানা ছিলেন। ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’ নামে বিপুল গবেষণাধর্মী গ্রন্থে এমনটাই দেখিয়েছেন কেতকী কুশারী ডাইসন,সম্ভবত ছবি আঁকার সময় লাল রঙটা তাঁর চোখেই পড়ত না। আবার কে যেন বলেছেন রবীন্দ্রনাথ ছিলেন গ্রাফোম্যানিয়াকও । গ্রাফোম্যানিয়া বেশ একটু গেরেম্ভারি শব্দ, ক্যাংলাসপার্টিদের পক্ষে। এর মানে হচ্ছে অবসেশন উইথ রাইটিং বুকস। কেতাব লেখার বাতিক। মানে যা কিছু লিখছি, খাদ্য, অখাদ্য সবই বই হওয়া চাই। এটাই নাকি রবীন্দ্রনাথের বিপুল সৃষ্টির রহস্য।
তা রবীন্দ্রনাথকে একা দোষ দিয়ে কী হবে, আমরা সবাই কম বেশি সে দোষে দুষ্ট। সেই যে বঙ্কিমচন্দ্র নিদান দিয়েছিলেন ‘লিখিয়াই প্রকাশের জন্যে ব্যকুল হইও না, কিছুদিন ফেলিয়া রাখিও’ সেসব শুনতে আমাদের ভারি বয়ে গেছে।
ভেবে ভেবে বার করলাম, আমারও এরকম একটা বাতিক আছে। অক্ষর বাতিক। কোথাও কিছু লেখা থাকবে, তা আমার নজরে পড়বে না, এমনটা হতেই পারে না। সে লেখা দেওয়ালে হতে পারে, হোর্ডিং এ হতে পারে, ঠোঙ্গায় হতে পারে, কারো হাতের উল্কিতে হতে পারে, কিংবা বাড়ির নামফলকে হতে পারে। আমি অমনি ঘ্যাঁক করে পুলিশি কুকুরের মতো সেই অক্ষরগুলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ব।
গুগল ঘেঁটে বার করলাম হাইপারলেক্সিয়া বলে একরকম ডিসঅর্ডার আছে, এ কি তাই? জেরোম কে জেরোমের ‘থ্রি ম্যান অ্যান্ড দা বোট’-এ আছে সেই যে অকর্মণ্য তিনজনের একজন বসে বসে অসুখের নাম পড়ত, আর ভাবত সেই অসুখটাই তার হয়েছে। খানিকক্ষণ গুগল ঘাঁটার পর আমারও সেই অবস্থা হল। আমার মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল, বুক ধড়ফড় করতে লাগল, হাড়ে এমন মটমট শব্দ হতে লাগল যে আমি স্পষ্ট বুঝতে পারলাম আর কিছু না হোক, আমার অবশ্যই হাড়মড়মড়ি রোগ হয়েছে।
কিন্তু ওই যে অক্ষরবাতিকের কথা কী যেন বলছিলাম।আমাদের ছোটবেলায় একটা মস্ত সুবিধে ছিল, অক্ষর পরিচয়ের পর যখন নতুন নতুন শব্দ কামড়াবার জন্যে দাঁত সুড়সুড় করত, বাপ মা শব্দ জুগিয়ে জুগিয়ে ক্লান্ত, সেসময় আমাদের ছড়া ও ছবিতে প্রথম ভাগ, দ্বিতীয় ভাগ হয়ে আসত আমাদের ছোট শহরের লম্বা দেওয়ালগুলো। দেওয়ালের যেমন কান আছে, তেমনই জিভও ছিল। তখন নির্বাচনের পর দেওয়াল মুছে দেবার এমন বদ অভ্যাস চালু হয়নি, দেওয়ালগুলো ছিল আমার এক্সটেন্ডেড আনন্দময়ী পাঠশালা। সেইসময়, প্রায়ই দেওয়ালে দেওয়ালে দেখতাম দীর্ঘনাসা, ডানাওলা এক হিংস্র রক্তপায়ী প্রাণির ছবি আঁকা। তার ঠোঁট দিয়ে রক্ত ঝরছে।সেটা বাদুড় না ঈগল না ভ্যাম্পায়ার না প্রাগৈতিহাসিক কোন প্রাণি তা কারো সাধ্য নেই বোঝার।ডিসকভারি চ্যানেলেও এই প্রাণি কখনো দেখাতে পারবে না। তাহলে এ কে? নিয়মিত খবরের কাগজ পড়ার অভ্যেস ছিল বলে নিজেই আবিস্কার করি সেই প্রাণিটিকে। ইন্দিরা গান্ধী। সেসময় দেওয়াললিখনে প্রিয়দর্শিনী ইন্দিরাকে এইভাবেই আঁকা হত।
দলতন্ত্র, পরিবার তন্ত্রের সব অভিযোগ নিয়েও শতবর্ষের এই দল তখনো তাদের সেইসময়ের কট্টর বিরোধী দল বামফ্রন্টের মতোই সাইনবোর্ড হয়ে যায়নি।তাদের পাশে বিজেপির নামের থেকে বেশি শোনা যেত অটলবিহারী বাজপেয়ীর নাম। সেটা অনেকটাই সুবক্তা ও কবি হিসেবে। টিভিতে যেমন এতগুলো চ্যানেল ছিল না, ব্যাঙের ছাতার মতো প্রি–স্কুল গজায় নি, তেমনই ভারত জুড়ে এতগুলো আঞ্চলিক দলও ছিল না। আঞ্চলিক দলনেত্রী হিসেবে খুব নাম শোনা যেত জয়ললিতার, যিনি সবসময় একটা বুলেটপ্রুফ জোব্বা পরে থাকতেন। পশ্চিমবঙ্গের দেওয়ালগুলি মুখ্যত কংগ্রেস আর সিপিএমরদখলে ছিল, এক একটা দেওয়ালে সেই আশির দশকে আমি লেখা থাকতে দেখেছি আপ টু ২০২০। এই দেওয়াললিখন গুলি কিছু দেওয়াল শিল্পী ও কবি নিশ্চয় আপন খেয়ালে লিখতেন না, একটা নিয়ন্ত্রণ অবশ্যই ছিল। তবে আপ টু ২০২০ এই খোয়াব কারোরই পূর্ণ হয়নি। ‘হারানো সুর’-র উত্তমকুমারের একটা বিখ্যাত ডায়লগের অনুকরণে বলা যায় উচ্চাকাঙ্ক্ষা ভালো, কিন্তু তার একটা সীমারেখা থাকা উচিত!
দেওয়ালগুলোতে শুধু ছবিই নয়, ছড়াও থাকত, যার কিছু ছিল বেশ উচ্চমার্গের। তার দু একটা এখনো মনে পড়ে-
‘ভোট দেবেন কীসে?/ কাস্তে ধানের শিষে’
‘ভোট দিন বাঁচতে/ তারা হাতুড়ি কাস্তে’
‘দিনের বেলায় কৌটো নাচায়, রাত্রে করে ফিস্ট/ তারাই আবার বলে বেড়ায় আমরা কমিউনিস্ট’
‘আগে তোরা দিল্লি সামলা/ তারপর গড়বি সোনার বাংলা’ (রাজীব গান্ধীর সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন ধুলোয় মিশিয়ে বামফ্রন্ট বিপুল ভোটে ফিরে আসার পর)
‘জ্যোতি জ্যোতি জ্যোতি
জ্যোতি গেল কার বাড়ি
আয়রে জ্যোতি ফিরে আয়
লোডশেডিং-এ প্রাণ যায়
‘জ্যোতিবাবু দিল্লি গেলেন’
(শেষের দুটো সেইসময়ের ভয়াবহ লোডশেডিং-র স্মৃতি বহন করছে। ফেলুদার উপন্যাসে এই লোডশেডিং -র অনেক উল্লেখ আছে। শুনেছি ফেলুদার স্রষ্টাকে বিজয়া রায় এই লোডশেডিং-এ কাজকর্মের ব্যাঘাতের জন্য অনেকবার বম্বে পাকাপাকিভাবে চলে যেতে বলেছিলেন, বলা বাহুল্য সত্যজিৎ রায় যাননি)
লোডশেডিং নিয়ে একটা চমৎকার ছড়া মনে পড়ছে, আনন্দমেলায় বেরিয়েছিল। কার লেখা ভুলে গেছি-
‘রাত না হতেই আঁধার/ লোডশেডিং-র ছাড়া গরু লোক নেইকো বাঁধার!’
যদি কেউ খুব সিরিয়াসলি এই দেওয়ালচিত্র ও ছড়াগুলোর নোট নিয়ে থাকে, তবে একটা অধোগমন চোখে পড়তে বাধ্য। ছবিগুলোর মান বেশ খারাপই ছিল, কিন্ত ছড়াতে বেশিরভাগ সময়েই চমৎকার বুদ্ধির দীপ্তি ফুটে উঠত। গ্লো সাইন, হোর্ডিং, কাট-আউট – প্রযুক্তির বহুবিধ অনুপ্রেরণার ফলে বাঙালি ইন্টেলিজেনশিয়ার প্রকাশের একটা জায়গা মার খেয়েছে নিঃসন্দেহে।তবে এটাও ঠিক কতকগুলো শব্দ বারবার শুনতে শুনতে আংশিক বধিরতাও এসে গেছে। সেগুলো ব্যবহার করার আগে অনেকবার ভাবব। যেমন কালো হাত, (ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও) নিপাত যাক (আহা এটা কতদিন শুনি না), হিংস্র শ্বাপদ , হায়না, (সাথীদের খুনে রাঙা পথে পথে হায়নার আনাগোনা), দলে দলে যোগ দিন, শ্রমিক ঐক্য- এরকম ‘পোচুর’ উদাহরণ দেওয়া যায়।
কোথায় যেন পড়ছিলাম শ্রী চৈতন্যের যে রসতত্ত্ব, তা সবার জন্যে ছিল না, সেটাই সাধারণ্যে প্রচারিত হয়ে দেশে নিষ্কর্মা, দুর্বল লোকের সংখ্যা বাড়ল। আমাদের বাংলার কমিউনিজম অনেকটা সেইরকম ব্যাপার, মার্ক্সবাদ অপভ্রংশ হয়ে মাছভাতে পৌঁছতে বেশি সময় নেয়নি। আমার মনে হয় আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে মার্ক্সবাদের খুব একটা তফাত নেই, সঠিকভাবে না বুঝলে তা হয়ে দাঁড়ায় মৌলবাদ। যাঁরা নৈবেদ্যের ওপর সন্দেশের মতো থাকেন , তাঁরা তাঁদের ক্যারিশ্মা দিয়ে ধস আটকাবার চেষ্টা করেও পারেননি, কারণ ওই যে বিপুল জনতরঙ্গের কাছে পুরো ব্যাপারটা সম্পূর্ণ অন্য মানে নিয়ে হাজির হয়েছিল। ধরা যাক একজায়গায় কীর্তন হচ্ছে, মূল গায়ক গাইছেন, ‘ঘোর কলিতে পাপী তরাতে নিমাই আমার নাম এনেছে।’ এবার যারা দোহার মানে দোয়ার্কি তারা স্বাভাবিকভাবেই অতশত তত্ত্ব পড়েনি, তারা শুনছে তাদের মতো করে, আর গলা ফাটিয়ে গাইছে – ‘ঘুলঘুলিতে পাখি তাড়াতে নিমাই আমার নাউ রেঁধেছে!’ যথার্থ কীর্তন আর খিচুড়ির লোভে ঋষভনিন্দিত স্বরে অষ্টপ্রহর হরিনামের যা তফাত, সেই তফাত সাহিত্য আর তথাকথিত গণসাহিত্যে। এর ফলে অনেক দুর্বল শিল্পী লেখকদের ধাক্কা সামলাতে হল পাঠকদের। আমি খুব ছোটবেলা থেকে নানাম রকম গানের পাশাপাশি গণসঙ্গীতও শুনে আসছি। ‘চাষনালা খনিতে মরদ আমার মরে গেল গো’ ‘ওরা আমাদের গান গাইতে দ্যায় না নিগ্রো ভাই আমার পল রবসন’ ‘আমরা করব জয় নিশ্চয়’, সলিল চৌধুরীর অসাধারণ গানগুলো। কিন্তু পথসভা শুরুর আগে আমরা কী গান শুনতাম? ‘সাথীদের খুনে রাঙা পথে দেখো হায়নার আনাগোনা’। একদল অপুষ্ট শীর্ণ চেহারার মেয়ে চরম বেসুরে গাইত সে গান, দেখলে মায়া হত মেয়েগুলোর জন্যে আর সারাজীবনের মতো এই গান আমাকে রাজনৈতিক সভা সমিতি থেকে দূরে নিয়ে গেল।
এইরকম একটি মেয়ে, যাদের বলা হত পার্টি করা মেয়ে, অত্যন্ত কালো, রোগা, কুরূপা, তার ওপর শিডিউলড কাস্ট, তাকে বিয়ে করে এনেছিল আমার পরিচিত একটি কমিউনিস্ট ব্রাহ্মণ পরিবারের সুদর্শন যুবক, সে যে প্রকৃত বামপন্থী তা প্রমাণ করতে।তারপর সেই অভিজাত পরিবারে সর্বহারার পার্টি করে আসা মেয়েটি ক্রমে নিজেই সর্বহারা হয়ে গেল। কেউ তার সঙ্গে মিশত না, কথা বললেও ঠেস দিয়ে কথা বলত, তাকে দিয়ে বাড়ির সবথেকে বেশি পরিশ্রমের ও নোংরা কাজগুলো করান হত। এমনকি তার স্বামীও তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করত। আসলে সারা ভারতবর্ষে যে উচ্চবর্ণ নিম্নবর্ণ আছে, বাংলায় তার থেকে একটা বেশি বর্ণাশ্রম আছে, তা হলে সংস্কৃতির বর্ণভেদ। জাতপাতের ভেদ ঘুচলেও এ ভেদ ঘোচার নয়।
মার্ক্সবাদের ক্ষেত্রে তত্ত্ব ও প্র্য়োগে একটা বিস্তর ফারাক ঘটেছে তার কারণ যেকোন আদর্শ শেষ পর্যন্ত রূপায়ণ করেন মানুষ। সেই মানুষগুলো মন থেকে কতটা আধুনিক ও মুক্ত সেটা ভেবে দেখতে হয়।একটা গল্প মনে পড়ে যাচ্ছে। গুরুর বাড়িতে যজ্ঞ দেখে শিষ্যরও খুব সাধ হয়েছে গুরুর মতো সেও বাড়িতে যজ্ঞ করবে। তো সব আয়োজন করে সে গুরুকে আমন্ত্রণ করেছে। গুরু এসে সব দেখেশুনে প্রীত হয়ে বললেন ‘সব তো ঠিকই আছে। এবার শুরু করে দাও। কীসের জন্যে দেরি করছ?’ শিষ্য হাত কচলাতে কচলাতে বলল ‘সবই প্রস্তুত, শুধু ঈশান কোণে বেড়ালটা বাঁধলেই শুরু করে দেওয়া যায়’
গুরু আকাশ থেকে পড়লেন ‘বেড়াল!’
‘হ্যাঁ গুরুদেব, আমি দেখছিলাম, আপনার গৃহে যজ্ঞের সময় আপনি ঈশান কোণে একটা বেড়াল বেঁধেছিলেন, আমি আপনার আচার অনুষ্ঠানের একটুও এদিক ওদিক করতে চাই না।‘
‘দূর মূর্খ, যজ্ঞের সময় বেড়ালটা বড় বিরক্ত করছিল বলে ওকে বেঁধে রেখেছিলাম, এর সঙ্গে আচারপ্রণালীর কোন সম্পর্ক নেই, এতদিন আমার সঙ্গে থেকে তুমি এই বুঝলে?’
আমাদের দেশের প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম আর প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতি, দুয়েরই কোন না কোন গুরুর কাছে টিকি বাঁধা আছে আর দুজনেই হন্যে হয়ে ঈশান কোণের বেড়ালটা খুঁজে বেড়াচ্ছে।