গল্পকথায় শাশ্বতী ভট্টাচার্য

জন্ম - ২৬শে জুন ১৯৮০ কলকাতার সেন্ট পলস মিশন স্কুলের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষিকা এবং কবি, সঞ্চলিকা, গায়িকা। আকাশবাণী ও দূরদর্শন শিল্পী

রি-ইউনিয়ন

সেদিন পোস্টার দেখে ধ্রুবা ইউনিয়ন রুমের চেয়ারে ধুপ করে বসে পড়েছিল। কলেজের রি-ইউনিয়নে গান গাইতে আসছেন বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী অরণ্য সেন। এই প্রথম সে অরণ্য সেনকে চোখের সামনে দেখবে। সেতো ভাবতেই পারছে না । ধ্রুবা তার গানের কত বড় ভক্ত সেটা আর কেউ না জানুক নন্দিনী জানতো। তাই সে ধ্রুবার অবস্থা দেখে বলে উঠলো – তাহলে ধ্রুবা তুই পোস্টারের দিকে তাকিয়ে বসে থাক, আমি ক্লাসে যাচ্ছি।

মঞ্চে অরণ্য সেন। জাদুমাখানো কন্ঠে তার বক্তব্য এবং গানে ভেসে যাচ্ছে শ্রোতারা। আর ধ্রুবা? সে তার প্রিয় শিল্পীর কোনো গানে হাততালি দেয়নি। চুপচাপ এককোণে দাঁড়িয়ে রয়েছে মন্ত্রমুগ্ধের মতো। গান শেষ হবার পর নন্দিনী এসে হাল্কা করে তাকে ধাক্কা মেরে বললো , – কিরে, যাবি? আলাপ করে কথা বলে আসবি, পারলে একটা গানও শুনিয়ে দিবি। গেস্ট রুমে বসেছেন। যাবি তো চল। ধ্রুবার যে ইচ্ছে হয়নি তা নয় কিন্তু সব ইচ্ছের লাগাম টেনে সে সুযোগটা হাতছাড়া করলো। গরীবের মেয়ে সে। পাহাড় দূর থেকে দেখাই ভালো। কাছে গিয়ে হাসির খোরাক সে হতে চায়না। এই বেশ ভালোলাগা, অচেনাকে শুধু তার সুর দিয়ে চেনারও একটা আনন্দ আছে। ওরা বিখ্যাত, সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে। চিনতে গিয়ে সেই আনন্দটা নষ্ট করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই তার।

আজ স্টুডিওতে প্রাণ হাতে বসে আছে সেই ধ্রুবা। পরনে সূর্যরঙা শাড়ি, কপালে পরিব্যাপ্ত সিঁদুরের টিপ। মনে মনে চাপা উত্তেজনা আর রিহার্সাল । আজ স্টুডিওতে চ্যানেলের মিউজিক ডট কম  অনুষ্ঠানের বিশেষ পর্বে অতিথি হয়ে আসছেন অরণ্য সেন। আর সঞ্চালনায় ধ্রুবা নিজে। সে নিজেও বুঝতে পারছে না ঠিক কী হতে চলেছে? মানুষটা কেমন বা কিভাবে রিঅ্যাক্ট করবে… যদিও আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ধ্রুবা মানুষের রিঅ্যাকশন নিয়ে বড় একটা চিন্তিত হয়না। গত বারো বছরে পারিপার্শ্বিক পরিবর্তনের যে টানাপোড়েন ধ্রুবা দেখেছে তাতে সে এখন অনেক বেশি ম্যাচিওর্ড । কলেজ পেরিয়ে , ইউনিভারসিটি পেরিয়ে সে এখন অঙ্কের শিক্ষিকা। বিয়ের আগে সংসারের তুমুল চাপে না পারলেও বিয়ের পর সে তার স্বপ্নকে কিছুটা হলেও সাজিয়ে নিয়েছে, বাঁচিয়ে রেখেছে। একটি টিভি চ্যানেলের গানের অনুষ্ঠানের সঞ্চালিকা হওয়ার সুবাদে গায়িকা হিসেবে পরিচিতিও পেয়েছে সে। যদিও সে এখনো রোজ অরণ্য সেন এর গান শোনে – মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে ঠিক আগের মতো।
আবোল-তাবোল ভাবতে ভাবতে হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়ালেন বিশ্ব বোস। ধ্রুবা, অরণ্য এসে গেছেন , চলো। রেস্ট রুমে বসানো হল ওনাকে । সহজ সরল একটা মানুষ, লম্বা, ফর্সা, ছিমছাম একটা পাঞ্জাবী পরে একগাল হেসে প্রতি নমস্কার জানালেন তিনি। এত বছরে তেমন একটা বদলে যাননি অরণ্য সেন। কথা শুরু হল। মিনিট পনেরো কথা বলার পর সব জড়তা কোথায় যেন উধাও হয়ে গেল। শুটিং চলা কালীন ধ্রুবার মনেই হলনা যে একজন সেলেব্রিটির সাথে বসে সঞ্চালনা করছে সে যার গানের সে বহুদিনের ভক্ত।
ফ্লোর থেকে বেরিয়ে ধ্রুবা তার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বললো – দাদা পাশে থাকবেন, আমি যোগাযোগ রাখবো। অকুন্ঠ স্নেহে মানুষটা সম্মতি দিয়ে দিলেন। তারপর বেশ কিছুটা সময় বিশ্ব বোস, ধ্রুবা আর অরণ্য সেন একসাথে কাটালো বাংলা গানের বিভিন্ন ধারা নিয়ে আলোচনা করে। ঐ একঘন্টায় ধ্রুবা কতকিছু শিখে নিল অরণ্য সেন এর থেকে। মানুষটাও অসীম ধৈর্য নিয়ে তাকে শিখিয়ে দিল যতটুকু শেখানো যায়। ফেরার পথে সারা পথ ধ্রুবা যেন স্বপ্নাচ্ছন্ন ছিল। যে মানুষটার সাথে গত বারোবছর আগে সুযোগ পেয়েও  আলাপ করতে যায়নি, ফটো তুলতে যায়নি আজ সেই মানুষটার পাশে বসে একসাথে অনুষ্ঠান করে এসেছে, কত কথা বলেছে সে। কিন্তু পরে কখনো ফোন করে কথা বলতে গেলে ফোন ধরবেন তিনি? আজ হঠাৎ প্রথম আলাপে যাকে বোন সম্বোধন করলেন সেটা সাময়িক হবার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ ওনারা সেলিব্রেটি। কিন্তু তারপরেও ধ্রুবার বারবার মনে হতে লাগলো যে এই মানুষটা আর পাঁচজনের মতো নয়। বড় ছিমছাম, কিছুটা অগোছালো , কিন্তু স্বচ্ছ । ভিতরের মানুষটা যেন বাইরের মানুষটার ছায়া। এক অদ্ভুত মায়া আছে তার চোখে মুখে। সেই এক ভালোলাগা । এই বেশ ভালো।

দিন পনেরো ধরে ফোন করবে কি করবে না ভাবতে ভাবতেই বিপুল অনিশ্চয়তা নিয়ে একদিন ফোনটা করেই ফেলে ধ্রুবা । ফোনের ওপার থেকে আকাংখিত সেই আওয়াজটা ঠিক মনে রেখেছে তাকে এটা দেখেই সে খুশিতে উচ্ছল হয়ে ওঠে। সেদিন একটা নতুন সম্পর্ক গড়ে ওঠে পৃথিবীতে সবার অলক্ষে। সেটা ভাই বোনের সম্পর্ক। এরপর থেকে গান বিষয়ক কোনো জিঙ্গাসা থাকলেই ধ্রুবা ফোন বা মেসেজ করে নিত অরণ্যকে। অরণ্য ব্যস্ত মানুষ। ফোন ধরতে না পারলে পরে সময়মতো ঠিক শিখিয়ে দিত ধ্রুবাকে। কতবার ধ্রুবা আর অরণ্য এক অনুষ্ঠানে গেছে , গল্প করেছে । কিন্তু ধ্রুবা কখনো তাদের এই সুন্দর সম্পর্ককে তার কেরিয়ার তৈরি করার হাতিয়ার বানায় নি। আজকাল তো সেটাই হয়ে থাকে। সেলেব্রিটির সাথে, পাশে বসে ফটো তুলে সোশাল মিডিয়ায় দিয়ে দিলেই যেন সারা পৃথিবী জয় করা যায়। না, ধ্রুবা এভাবে পৃথিবী জয় করতে চায়না। তার কাছে সম্পর্কটা একটা গাছের মতো আর তার ডাকনামটা একটা ফসল। রক্তের সম্পর্কের বাইরেও এমন অনেক সম্পর্ক গড়ে ওঠে যেখানে মনের দাবী অনেক বেশি থাকে। শুধু সম্পর্কের ধরনটা ভিন্ন হয়, নামটা ভিন্ন হয়। সেইতো সাতটাই সুর সা থেকে নি। তাদের পারমুটেশন কম্বিনেশন দিয়েই তো এত রাগ রাগিনী , যেন এক একটা অঙ্ক, সেখানেও ফর্মুলা আছে। শুধু আবেগ আর ভালোবাসা মিশিয়ে দিতে হয়। আর সম্পর্কটাও ঠিক একটা গানের মতো। নির্দিষ্ট নিয়মে, ব্যকরণ মেনে, পরিমিত আবেগ মিশিয়ে, ভালোবেসে , সততার সাথে গাইতে হয় সেটা । সবটাই অঙ্কের Set Theory র ইউনিয়ন-ইন্টারসেকশন এর হিসেব। আসলে ইউনিভার্সাল সেট থেকে সাব সেট তৈরি হওয়ার জন্য মেন্টাল বন্ডিংটাই আসল। আর অঙ্কে ধ্রুবা বরাবরই ভালো কারণ সে সৎ।

ভাইফোঁটার দিন সকালবেলা সোশাল মিডিয়ায় ওদের কলেজের রিইউনিয়নের পোস্ট দেখে পুরোনো দিনের কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ কলিংবেলের আওয়াজে ছুটে গিয়ে দরজা খোলে ধ্রুবা। একগাল হেসে গাড়ি থেকে নেমে আসে অরণ্য। –  দাদা তুমি? কবে ফিরলে বিদেশ থেকে? তুমি যে বলেছিলে এবছর ফোঁটা নিতে আসতে পারবে না…।
– বলেছিলাম, কিন্তু সকাল সকাল এয়ারপোর্টে নেমে খাসির মাংস আর ইলিশ ভাপার গন্ধ পেয়ে আর থাকতে পারলাম না। গন্ধ শুঁকে চলে এলাম।

কপালে চন্দনের ফোঁটা নিয়ে দুপুরে খেতে বসে কথায় কথায় অরণ্য জানায়, আগামী রবিবার আবার সে মৃন্ময়ী দেবী কলেজের রিইউনিয়নে আমন্ত্রিত হয়ে গান গাইতে যাচ্ছে। ধ্রুবা চমকে ওঠে, এটাতো তারই কলেজ, পোস্টটা সে সকালেই দেখেছে আর নিজেও সে ইনভাইটেড অনুষ্ঠানের সঞ্চালিকা হিসেবে । ধ্রুবা বলে ফেলে – হ্যাঁ , তেরো বছর আগেও একবার ঐ কলেজে গিয়েছিলে গান গাইতে , তখন তোমার কি ক্রেজ দাদা । মুচকি হেসে অরণ্য বলে – ঠিক বলেছো, তেরো বছরই হবে । কিন্তু তুমি জানলে কি করে বোনু?
খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে ধ্রুবা, ছোট্ট একটা উত্তর রোদের মতো ঝলমলিয়ে ওঠে, ” কেন, Set Theory “…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।