বিভা আজ পঁচিশ বছর পর নিউইয়র্ক থেকে কলকাতায় ফিরছে,ফ্লাইটের জানলা দিয়ে মেঘদের আনাগোনা দেখতে দেখতে সে হারিয়ে যাচ্ছে তার ছাব্বিশ বছর আগের পুরোনো জীবনে,বো ব্যারাকের গলিতে।।
বো ব্যারাক ,এই একটা নাম কারোর জীবন যে আমূল পাল্টে দিতে পারে, তার জীবন্ত উদাহরণ বিভাবরী।না,সে কোনো উল্লেখযোগ্য কাজ করেনি দেশের বা দশের জন্য ,কিন্তু তার ডায়েরি তার অন্য পরিচয় তৈরি করেছে সবার কাছে।বছর পঞ্চাশের বিভা একজন নামি লেখিকা,জন্মসূত্রে সে কলকাতার মেয়ে,বিবাহসূত্রে নিউইয়র্কের বাসিন্দা।উত্তর কলকাতার বাড়িতে রোজ সকালে-বিকালে মা-কাকিমা-জেঠিমারা যখন তার সাথে তার ভাই-বোনদের তুলনা করে, বিভাকে উচ্চাসনে বসায়, ভাই-বোনেরা মনে মনে হিংসা করে তাকে, তার ভাগ্যকে।পড়াশোনা-নাচ-গান সবেতেই এক নম্বর বিভা যখন নিউইয়র্কে গেল বিয়ে করে,স্বামী তার অনেক বড় বিজনেসম্যান।।কিন্তু অন্যদিকে একমাত্র বিভা-ই জানে সে কতটা অসুখী।রোজকার জীবনে বড়লোকের বউ সেজে থাকা ,সাধারণ মানুষের মতন না বাঁচা কতটা কস্টকর ,সেটা বিভাই শুধু জানে।
নতুন বউ হয়ে যখন অলোকের সাথে বিবাহিত জীবন কাটাতে গেল,তখন থেকেই বিভা শুধু শোপিস হয়ে প্রতিটা দিন কাটিয়েছে।রান্না,ঠাকুর পুজো,সংসারের কাজ কোনটাই সে করতে পারেনি,বিজনেসম্যান আলোক রায়ের ওয়াইফকে কাজ করতে নেই,সব কাজের জন্যই রয়েছে কাজের লোক।শুধু সবাইকে নির্দেশ দেওয়ার দায়িত্ব বিভার।বড় বাড়ি, বড় গাড়ি,দামি গহনার আড়ালে বিভার কোথাও যেন অস্তিত্বই নেই,নামি দামি পার্টিতে দামি শাড়ি-গহনার বিজ্ঞাপনের মডেল যেন বিভা।রাতের পর রাত মদ্যপ অবস্থায় অলোক যখন বিভাকে বাঁধতে চেয়েছে আলিঙ্গনে, বিভার মনে ঝড় উঠেছে ভালোবাসার জন্য, বিভা ফিরতে চেয়েছে তার পুরোনো জীবনে বো ব্যারাকের গলিতে।।
বিভার বাবা একজন সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।জামসেদপুরে বিভার জন্ম,পড়াশোনায় হাতেখড়ি,ক্লাস এইটে পড়ার সময় হঠাৎ তার বাবার বদলির অর্ডার কলকাতায়।দাদা,বিভা,মাকে সঙ্গে নিয়ে বাবা চলে আসেন কলকাতায় নিজের পৈতৃক ভিটায়।সে বাড়িতে বিভার ঠাকুমা,কাকা,জ্যেঠু তাদের বৌ-বাছা নিয়ে ভরা সংসার।নতুন স্কুলের এডমিশনের পর
সমস্যা হল প্রাইভেট টিউটর নিয়ে।নতুন স্কুলের বন্ধুরাও যেন কেমন।পড়াশোনা-টিফিন খাওয়া-গল্প করা কিছুতেই তার সাথ দেয় না,তাদের গ্রূপেই তারা ব্যস্ত।তবে আরেকজনকে বিভার খুব অন্যরকম মনে হয়েছে।কো-এড ইংলিশ মিশনারি স্কুলটা বিভাদের বাড়ির কাছেই,তাছাড়া খুব নাম করাও।সব সাবজেক্ট এ ভালো রেজাল্ট করলেও অঙ্কে বিভা একেবারে যাচ্ছেতাই।ওদের স্কুলের সবচাইতে ভালো স্টুডেন্ট পিটার স্যামুয়েল।অঙ্কে তুখোড়,খেলাধুলায় চ্যাম্পিয়ন হয়েও কেন কে জানে ক্লাসে এক থাকে,বিভার মতন ওর ও কোনো বন্ধু নেই।
চারদিন জ্বরের পর বিভা আজ স্কুলে জানতে পারলো আজ বি. কে.স্যারের ক্লাসে ম্যাথ টেস্ট আছে,কি যে হবে?তার মধ্যে সে জ্যামিতি বক্সটাও আনতে ভুলে গ্যাছে,ক্লাসে আর একটাও সিট খালি নেই আজকে সবাই এসেছে,শুধু লাস্ট বেঞ্চের ওই পিটার স্যামুয়েলের পাশের সিটে ছাড়া।বিভা মুখ কাঁচুমাচু করে পিটারের পাশে বসলো।ম্যাথ টেস্ট কপিতে যখন সে একটাও পেন্সিলের আঁচড় কাটতে অক্ষম,পিটার তখনমনের সুখে পটাপট সব অঙ্ক গুলো করে ফেললো চোখের নিমেষে।বিভার মুখের দিকে চেয়ে হঠাৎ হেসে ফেলে সে,বলে–“এনি প্রবলেম ফ্রেন্ড?”ওই হাসিতেই বিভা যেন ভরসা পায়।স্যারের কান-চোখ দুই বাঁচিয়ে পিটারকে কানে কানে সব কথা খুলে বলে।পিতার আবার মিষ্টি হেসে খাতা দুটো চোখের নিমেষে পাল্টে দেয়,বিভার অবাক হয়ে এখনো বাকি ছিল,স্যারের অলক্ষ্যে সব কত অঙ্ক করে ফেলে বিভার খাতায়।সেযাত্রা বিভা খুব ভালো মার্ক্স পায়।।
সেই থেকে দুজন মনের খুব কাছাকাছি চলে আসে।একসাথে হাসি-মজা-টিফিন শেয়ারের মাঝে মন দুটোও কখন যে শেয়ার হয়ে যায় ,দুজনের কেউ বোঝে না।পিটারের বাবা একজন ম্যাথস টিচার ছিলেন,ওরা ইংল্যান্ডের বাসিন্দা।প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ওর পূর্বপুরুষ স্যমুয়েলরা সেনাবাহিনীতে যোগ দেন,তাদের কিছু ভারত স্বাধীন হবার পর ফিরে যান,বাকিরা রয়ে যান এখানে। কলকাতার নিউমার্কেটের কাছে গড়ে তোলেন বো ব্যারাক নামে নিজস্ব কমিউনিটি।এখন সে জৌলুস ও নেই,তবে নামের ঐতিহ্য, বড়ুয়ার স্পেশাল খৃস্টমাস কেক, খৃস্টমাস ক্যারল,বিশাল সুসজ্জিত খৃস্টমাস ট্রি আর ব্রিটিশ আমলে তৈরি লাল সিমেন্টের মেঝের লাল দেয়ালের বাড়ি তাদের অভিজাত্যই আলাদা।ক্যান্সারের পেশেন্ট ভিক্টর স্যামুয়েল পিটারের বাবা আজকাল আর স্কুল যেতে পারেন না,সামান্য পেনসন আর কিছু টিউশনির জোরে টিকিয়ে রেখেছেন সংসার,পিটারের মা জুলি আন্টি টেলারিং এর কাজ করেন,স্বামীর সাহায্যার্থে।বিভার অঙ্কের এত খারাপ অবস্থা দেখে পিটার ই বিভাকে বলে ওর বাবার কাছে টিউশন নিতে।স্কুল আর পিটারের বাড়ি বিভার বাড়ির থেকে কাছে হওয়ার জন্য বাড়ির সবাই রাজি হয় বিভাকে ভিক্টর স্যারের কাছে পাঠাতে।ভিক্টর স্যারের অমায়িক ব্যবহার,জুলি আন্টির হোমমেড অরেঞ্জ কেক ধীরে ধীরে বিভাকে ওদের আপন করে তোলে,বিভাও অংককে আপন করতে শেখে।অবসর সময়ে বিভাও আন্টির কাছে সেলাই-কেক বানানো শিখতে চায়।আন্টি বলেন-“পাগলী মেয়ে,পড়াশোনায় মন দাও,কাজ তো সারাজীবন করবে।”বিয়ের পর বিভার মনে হয় সারাজীবন তো কিছুই করলাম না আন্টি; যেখানে সামান্য একটু চা বানালে অলক চিৎকার করে বিভার পরিশ্রমের কথা ভেবে,সেখানে আন্টি এক হাতে সংসার সামলে,আঙ্কেলের সেবা ,সেলাই, ছেলের দেখাশোনা সব করেও ক্লান্ত হননি,ভোলেননি ছেলের সাথে বিভার জন্যেও টিফিন বানানোর কথা।বিভা ভাবে ,মানুষ কিভাবে ক্লান্ত হয়?ভালোবেসে খাঁচায় বন্দি পাখি বেশি সুখী নাকি খাঁচার বাধন মুক্ত পাখি?
প্রায় সাত বছর যোগাযোগ ছিল পিটার আর বিভার।কলেজ পাস করে পিটার চলে যায় বাবার চিকিৎসার জন্য ভেলোরে।বিভার বিয়ে হয়ে যায় অলোকের সাথে,বিভা কখনো মুখ ফুটে বলতে পারেনি বাড়িতে নিজের ভালোবাসার কথা।পিটার বলেছিলো, তারা একদিন ঠিক দেখা করবেই।
আজ বিভার ছেলে প্রতিষ্ঠিত বিজনেসম্যান,আলোক রায়ের পর কোম্পানির সুযোগ্য উত্তরসূরি।বিভা কলকাতায় এসেছে তার লেখার সম্বর্ধনা নিতে।বাড়িতে উলুধ্বনি-শঙ্খ ,মালা দিয়ে বরণ করে সবাই বিভাকে।বিভা ভাইবোনদের নিয়ে যায় ট্রিট দিতে নিউমার্কেটে নামকরা রেস্টুরেন্টে,তখন খ্রিস্টমাসের সময়।ব ব্যারাকের দুটো চক্কর দিয়ে সে বুঝতে পারে, ব ব্যারাক সেখানেই আছে, যেখানে সে ছিল,তার গায়ে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে, কিন্তু তার ঐতিহ্য অমলিন।গুটি গুটি পায়ে সে পিটারের বাড়ির কাছে গিয়ে ইতস্তত করতে থাকে,কি ভেবে বেল দেয়।ঘর থেকে উঁকি দেয় একটা ছোট্ট মেয়ে,বলে–“হু আর ইউ ম্যাম?”বিভা কি বলবে ভেবে পায় না।বাড়ির ভেতরে থাকে এক ভদ্রলোক বেরিয়ে আসেন,মুখটা খুব চেনা মনে হয় তার।লোকটি বলেন–“এনি প্রবলেম?”বিভা জলভরা চোখে নিজের পরিচয় দেয়।পিটার দু হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে বিভাকে,কপালে চুমু দিয়ে ঘরে নিয়ে আসে,পরিচয় করে নিজের স্ত্রী-ছেলে-নাতনির সাথে।বিভা জানতে পারে, ভেলোরে চিকিৎসা করেও ব্যর্থ হয়েছে পিতার,ভিক্টর আঙ্কেল ফেরেননি,আন্টিকে নিয়ে যখন পিটার ফিরে আসে ,তখন বিভা বিবাহিত।
পিটার একসময় একটা প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করে,বিয়ে করে সংসার শুরু করে।বিভা দু চোখ ভরে দেখতে থাকে তার স্বপ্নের বাড়িটাকে,অন্দর সজ্জা পাল্টে গেছে,কিন্তু টানটা এক ই আছে।ফেরার পথে বিভার মনে পড়তে থাকে,সেই দুপুরের কথা,যেদিন বিভার আঠের বছরের জন্মদিনে দুপুরে আন্টির কেক বানানোর সময় পিটার তাকে আড়ালে ডেকে জড়িয়ে ধরে এভাবেই কপালে চুমু খেয়েছিল।।চোখের জলে ঝাপসা হয়ে আসে বো ব্যারাক,পিছনে বাজতে থাকে খৃস্টমাস ক্যারল।।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন