গল্পকথায় প্রভাত মণ্ডল

অচেনার পথে

          নক্ষত্রকবি

স্কুল থেকে বাড়ি ফিরেই সন্দীপনের চোখে পড়ল কয়েকটা ভাঙা কাঁচের গ্লাসের টুকরো , মেঝেতে ছড়ানো জামা-কাপড় । এমনটা সে প্রায়শই দেখে থাকে । বছর তেরোর অষ্টম শ্রেণিতে পড়া সন্দুর চোখ-মুখ লাল হয়ে যায় , বুঝতে অসুবিধা হয় না যে মা-বাবা আজও ঝগড়া করেছে , তারই ফল এসব । কি নিয়ে অশান্তি সে আজও কিছুই অনুধাবন করতে পারে না । বন্ধুদেরকে বাড়িতে নিয়ে আসতে পর্যন্ত ভয় পায় সে , পাছে ঝগড়ার মুহুর্তে এসে পড়ে আর সম্মানহানি ঘটে । একটা ভীতি সর্বদা ওকে কুরে কুরে খায় । ইদানিং তেমন কারো সাথে সে মেশেও না আর ঘোরেও না । শীর্ণ শরীরে ও প্রায়ই রাত জাগে আর আকাশ-পাতাল ভাবতে থাকে । আঁধো রাতের চাঁদ কিংবা তারাদের সৌন্দর্য ওর উপলব্ধিতে আসে না বরং তা আত্মদগ্ধতার ছায়া ফেলে যায় ।
          যে বয়সে একটি ছেলের জীবন গড়বার সময় , স্বচ্ছন্দে নিজেকে মেলে ধরবার সময় , বন্ধু-বান্ধবের ভীড়ে নিজেকে মিশিয়ে দিয়ে প্রক্ষোভগুলিকে জাগিয়ে তোলবার বয়স , সে সময়ে সমগ্ৰ পৃথিবীর দুঃখভার ও বুকে নিয়ে চলে , কারণ এ বয়সে যে কোনো কিশোর-কিশোরীর পৃথিবী তার মা-বাবা । কিন্তু ওর পৃথিবীতে ও একা ।
     পরদিন সকালে একটু বুকে বল নিয়ে সন্দু প্রচ্ছন্ন প্রতিবাদ করে বসে আবেগঘন হয়ে —-
       সেই ছোটো থেকেই দেখে আসছি তোমার আর বাবার এই গন্ডগোল , তোমরা কি কেউ একটু শান্ত থাকতে পারো না !
অমনি মায়ের ঝাঁঝালো কণ্ঠস্বর —
         তোর বাবাকে গিয়ে বল , সেই তো আগে শুরু করে ।
পিতা-মাতার উভয়ের প্রতি উভয়ের ঘৃণ্য বাক‍্যালাপ সন্দুর মনে বিষের বাঁশির মত মনে হয় । হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে কোনো দূর দেশে , অচেনা সব মুখের ভীড়ে , অচেনা রঙের পৃথিবীতে কুয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশে ।
       একটু বেলা হলেই সে রওনা দেয় স্কুলের উদ্দেশ্যে । চুপচাপ বসে থাকে বেঞ্চের এক কোণে । বাড়িতে হওয়া অশান্তির কথাই সর্বক্ষণ তার মাথায় ঘোরাফেরা করে , তাই পড়াশুনাও ঠিক ঠাক হয়ে ওঠেনা তার ।
       সেদিনের প্রথম ক্লাসেই স‍্যারের ধমক খেতে হয় —-
      তোর সব বন্ধুরা পড়া করে আসে আর তুই কি মুখ দেখাতে স্কুলে আসিস ? লজ্জা করে না ?
 সন্দু সবই বোঝে যে কেন সে পড়া করে আসতে পারেনি তবুও নিথর হয়ে থাকে । স‍্যার এমন নিশ্চুপ থাকতে দেখে আরো বেজায় গরম হয়ে ওঠে , মুখ লাল হয়ে ওঠে রাগে । গোটা দশ-বারো বেতের ঘা দেবার পর বলে —
          বেরিয়ে যা ক্লাস থেকে , তোদের মত ছাত্র স্কুলে পা না দেওয়ায় ভালো , শুধু শুধু স্কুলের বদনাম ।
চুপচাপ স্কুলের গন্ডি পরিত‍্যাগ করে সে । চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়তে থাকে নিঃশব্দে , বুক ভিজে যায় । অদৃষ্ট ছাড়া এ জল আর কারো চোখে পড়ে না ।  বাড়ির উল্টো পথ ধরে হাঁটতে থাকে সে , যেদিকে রেল লাইন সেই দিকটাতে।
চারিদিকে যেন অন্ধকার দেখে সে । স্কুলে স‍্যারের হাতের প্রহার যত না ওর শরীরে লাগে , তার থেকে শতগুন লাগে ওর বুকে । এ বয়সের আর পাঁচটা ছেলের মত সেও পড়াশুনা করতে চায় , মানুষের মত মানুষ হতে চায় । পরিবারের অশান্তি সবকিছু কেড়ে নেয় ওর কাছ থেকে । আত্মসম্মান আর গ্লানিতে অচেনা দেশের পথ খুঁজতে যায় তার মন । আজ সেই দেশের পথেই পা বাড়িয়েছে সে । অচেনা পথে , অজানার দেশে ।
সন্ধ‍্যার পরও ছেলের বাড়ি না ফেরাতে সন্দুর বাবা-মা খোঁজ নিতে থাকে চারিদিকে । কোথাও খোঁজ মেলে না । দুজন-দুজনকে জড়িয়ে কাঁদতে থাকে । নিখোঁজ সন্দু ভালোবাসার বন্ধনে বেঁধে দিয়ে যায় ওর মা-বাবাকে । অদৃষ্টের নিয়মে অচেনার পথে হেঁটে চলে এমন হাজারো প্রাণের স্পন্দন , ইচ্ছাগুলোকে ধ্বংসের চিতা ভষ্মে পরিণত করে ।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।