কৃপা বসুর কথোপকথন

ফারহান স্বচ্ছতোয়া কথোপকথন

—আপনি স্লেট পেন্সিলে লিখতে এখনো ভালোবাসেন তাইনা?
—কেন?
—না, এই যে বারবার টাইপ করেন আর ডিলিট করেন তাই বললাম!
—হ্যাঁ, ভুল করে পাঠিয়ে ফেলেছিলাম তাই!
—সেই! সেই! আপনি ঘুমের ভেতর নিভে যাওয়া বেয়াদব স্বপ্ন চিনেছেন, আমি নিভে যাওয়া স্বপ্নের হাহাকারটাও শুনেছি, তীব্র আর্তনাদ! যে চিৎকারের কাছে মৃত্যুরাও ছোট হয়ে আসে।
তাই দয়া করে আমায় শেখাতে আসবেন না স্বচ্ছতোয়া, কোনটা আপনি ভুল করে টাইপ করেছেন আর কোনটা ইচ্ছে করেই ভুল করার অজুহাতে টাইপ করেছেন।
—হ্যাঁ ইচ্ছাকৃত টাইপ করেছিলাম! স্বীকার করলাম, জাস্ট জিগেস করেছিলাম “আপনি ঠিক আছেন”! ভেবে দেখলাম আপনার প্রতি কনসার্ন হওয়া মানে নিজেকেই নিজে অপমান করার সমান, তাই ডিলিট করেছি। আপনি সে যোগ্যই নন, যার প্রতি আমি আমার কনসার্ননেস দেখাবো।
—সেটাও ঠিক! কনসার্ননেস সেখানেই দেখাবেন যে তার সঠিক মূল্য দেবে, ঠিকঠাক দাম না পেলে অনুভূতি বিক্রি করতে যাবেন না, বেকার ঠকবেন।
—মানে!! আপনি আবার আমায় অপমান করছেন ফারহান।
—একদমই না! আপনাকে কথা শোনালে কি মনে হয় জানেন! নিজের পিঠে নিজেই খান কতেক চাবুক মারলাম। যা হোক আপনি বুঝবেন না, আপনার প্রবলেমটা কোথায় জানেন স্বচ্ছতোয়া!
—কি প্রবলেম! কোথায় প্রবলেম, জানতে চাইছি।
—আপনি বড্ড ইগোইস্টিক, দাম্ভিক, ঔদ্ধত্যবাজ একজন মহিলা! আপনার ভেতর না আছে ধৈর্য্য, না আছে অপেক্ষা, না আপনি কাউকে ভালোবাসতে পারেন, আর না আপনি আপনার নিজস্ব অনুভূতি গুলোকে ঠিকঠাক ভাবে চিনতে পারেন। আপনি মনে করেন সব পুরুষই আপনার পায়ের কাছে ঝুঁকে যাবে, যেভাবে ফুল ছাপ শাড়ি পরে মূর্তিরা ডুবে যায় গঙ্গার জলে।
আসলে এই সমস্যাটা স্রেফ আপনার নয়, আপনাদের জেনারেশনের, ছেলে মেয়ে প্রত্যেকের। কেউ ঈশ্বর হয়ে উঠতে চায়না আদতে, কিন্তু সবাই ঐশ্বরিক ক্ষমতা দখলের অধিকার দাবি করে। যে যার কাঙ্ক্ষিত মানুষের মাথার উপর ছাপ্পা মারার কাজ করে।
শুনুন আপনি স্রেফ সেটুকু নিয়েই কাব্যি করতে শিখেছেন যেটুকু দেখা যায় খালি চোখে, যেটুকু পড়লে মানুষ অস্থির হয়। যেটুকু পড়ার পর জানলার পাল্লা খুলে অর্ধেক আকাশ দেখতে চায়, কোনো বিমান উড়ে যেতে দেখলে নিদেনপক্ষে বিমান সেবিকার প্রেমে পড়তে চায়।
আপনি সেটুকুই লেখেন যেটুকু আংশিক সত্যি, যেটুকু পড়লে প্রাক্তনের চিবুকে লেগে থাকা চুমুর স্বাদ উপভোগ করা যায়। ধুলোর ঝড়ে পাক খেতে খেতে আকাশের দিকে উঠে যাওয়া মানুষের স্মৃতি মনে পড়ে, হয় মানুষ মাথা ঠুকে ঠুকে কাঁদে না হয় প্রচন্ড জোরে হাসে…
লিচু রঙের বিকেলগুলোয় শাক তুলতে যাওয়া সদ্য বিবাহিতার খোঁপায় বাঁধা বেল ফুলের গন্ধ চিনেছেন আপনি, বেশ ভালো মতো জানি। কিন্তু গতরাতে বিছানায় ধস্তাধস্তি করার সময় ফিনকি দিয়ে যে রক্ত বেরিয়েছিল, আপনি তা দেখতে পাননি। শুকিয়ে যাওয়া সেই রক্তের দাগ আমি দেখেছি খোঁপার কাঁটায় বিঁধে থাকতে, তা কি যন্ত্রণার বোঝার ক্ষমতাটুকু নেই আপনার কারণ আপনি প্রিভিলাইজড।
এসি ঘরে বসে গায়ে সুগন্ধি মেখে মায়ের হাতে চটকানো ভাত চিবোতে চিবোতে রাজনীতিপ্রেমসমাজ নিয়ে বাণী কপচান…
আমরা প্রিভিলাইজড নই ম্যাডাম, প্রচন্ড জ্বরে এক বাটি বিষ পর্যন্ত মুখের সামনে তুলে দেওয়ার কোনো লোক নেই আমাদের। জানেন জুতো ছিঁড়ে যাওয়ায় একটা ইন্টারভিউ মিস করলাম। রাস্তাধারের হোটেলে গরম ভাত ফুটছিলো, ভাতের গন্ধ শুঁকে মনে হলো কোনো রোদ গিলে খাওয়া নদীতে কেউ একটা ঢিল ছুঁড়ে মারলো।
পেটের ভেতর কেমন একটা মোচড় দিলো, সামান্য ব্যথা! পকেটে হাত ঢোকাতেই মুচকি হাসলাম, ঢোক গিলে পাশ কাটিয়ে চলে এলাম, আমাদের হাতে আপনাদের মত অপশন থাকেনা বেশি।
—আপনি সব বোঝেন, আর একটু বেশিই বোঝেন, এটাই আপনার প্রবলেম ফারহান। সমস্যা প্রতিটা মানুষের ভেতরে আছে, যেমন আমার ভেতরে, তেমন আপনার ভেতরেও। বন্দি খাঁচার ভেতর ছটফোটানো পাখিটা মুক্তির বাজনা শুনতে চায়, তার কাছে যেকোনো পিয়ানোর সুর ফিকে। আপনি আমায় বোঝেন না যেমন, তেমন আপনাকে বুঝে ওঠার কোনো সুযোগ আমায় কখনোই দেননি।
—আজকে একটু বেশি বলে ফেলেছি তাইনা স্বচ্ছতোয়া!
—নাহ, ঠিকাছে…
—আসুন, আপনাকে আদর করে দিই, আসলে ফসল উপড়ে নেওয়া প্রতিটা ধানজমির একটা ব্যক্তিগত অসুখ থাকে, যা কেউ সারাতে পারেনা, যার কোনো জীবনদায়ী ওষুধ তৈরি হয়নি। তাই আমিও মাঝেসাঝে ওই রোদে পোড়া মাঠের মতো একটু বেশিই খটখটে হয়ে যাই, সরি।
আসুন না প্লিজ, কাছে আসুন, ভেবে নিন এই পৃথিবীতে এই মুহূর্তে আপনি আর আমি ছাড়া কেউ নেই, নো ওয়ান ইজ দেয়ার। একটা কাঠের ঘর, যার ছাদে শীত ভেঙে পড়েছে, একটা কাচের খিল আটকানো দরজা, যার ওপারেই অমসৃণ ঝর্ণা পাহাড়ের বুক চিরে পড়ছে গভীর খাদে। আপনাকে আমার সত্যি প্রয়োজন স্বচ্ছতোয়া এইসময়টাতে স্পেশালি, আসবেন প্লিজ একবার…
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।