পুরাতনীঃ রূপক সামন্ত

পুরাতনী-৩

 ‘হরি ঘোষের গোয়াল’  

‘হুতোম প্যাঁচা’ ও তাঁর সহোদর ‘কালপেঁচা’র নানা ‘নক্সা’ থেকে পুরোনো দিনের কলকাতার নানা বিষয় জানা যায়। অত্যন্ত সরস এই নক্সাগুলি কলকাতা ও বঙ্গদেশের সেই সময়কার সামাজিক অবস্থার এক অমূল্য দলিল।
‘হরি ঘোষের গোয়াল’ এই বাগধারাটি তো হামেহাল ব্যবহার করি আমরা। একটু যেন নাক সিঁটকানো ভাব মিশে থাকে তাতে। পাঠক জানেন কি, কে এই হরি ঘোষ? হরি ঘোষের গোয়াল বস্তুটাই বা কী? জানলে নাক সিঁটকানো ভাবটা চলে যাবে একথা হলফনামায় লিখে দিতে পারি। চলুন দেখা যাক ‘কালপেঁচা’ কী নক্সা করে গেছেন।
তবে তার আগে একটু কথা আছে। ‘কালপেঁচার নকসা’, ‘কালপেঁচার দু’কলম’, ‘কালপেঁচার বৈঠক’ – এই তিনখানি বই নিয়ে ‘কালপেঁচার রম্য রচনা সংগ্রহ’ রচনাবলী ‘পাঠভবন’ কর্তৃপক্ষ প্রকাশ করলেন ১৯৬৮ সালের জুন মাসে। পরে, ১৯৯২ সালের এপ্রিল মাসে কলকাতার ‘বাক্-সাহিত্য প্রাইভেট লিমিটেড’ এই রচনাবলীর নতুন সংস্করণ প্রকাশ করেন। এই সংস্করণে, ‘পার্ক স্ট্রীটের আত্মকথা’ নক্সায় সাহেবী আভিজাত্যে, কালচারে, ফ্যাশানে গর্বিতা পার্ক স্ট্রীট তার দেমাক দেখিয়েছে। আর দূরছাই করেছে ছকুখানসামা লেন ও হরি ঘোষ স্ট্রীটকে। এর উত্তরে ফুঁসে উঠে হরি ঘোষ স্ট্রীট বেশ দু’চার চোপা শুনিয়ে দিয়েছে ‘হরি ঘোষ স্ট্রীটের উত্তর’ নক্সায়।
হরি ঘোষ স্ট্রীট বলেছে- “পার্ক স্ট্রীটের মতন জাতীয়তাবোধ উচ্ছন্নে দিয়ে আন্তর্জাতিকতার বড়াই করে না হরি ঘোষ স্ট্রীট। হরি ঘোষ নিজে বাঙালী, তাই বাঙালী জীবনের সমস্ত খুঁটিনাটি নিয়েই সে বেঁচে আছে। তাতেই তার আনন্দ’। নিজের আত্মপরিচয় দিয়ে সগর্বে বলেছে- আমি হরি ঘোষ, সাধাসিধে বনেদি বাঙালী।— বাংলার রাজধানী গৌড় থেকে কলকাতা পর্যন্ত আমার আত্মবিকাশের ইতিহাস বিস্তৃত। অর্থাৎ বাংলাদেশ ও বাঙালীর জীবনের বিচিত্র ইতিহাসের সঙ্গে আমার পারিবারিক ইতিহাস জড়িত।— গৌড়ের মকরন্দ ঘোষের কথা ছেড়েই দিলাম। আমার পিতৃপুরুষ মনোহর ঘোষ আকবর বাদশাহের আমলের প্রতিপত্তিশালী গোমস্তা। মানসিংহের সঙ্গে আফগানদের লড়াই বাধে তখন তিনি চিত্রপুরে অর্থাৎ কলকাতার চিৎপুর অঞ্চলে পালিয়ে আসেন। চিত্রেশ্বরীর মন্দির তাঁরই তৈরি, পার্কস্ট্রীটের ইংরেজরা যাকে চিৎপুরের কালী বলত।— মনোহরের ছেলে সন্তোষ ঘোষ রীতিমত পণ্ডিত ছিলেন এবং ইংরেজ ডাচ ফরাসীদের ফ্যাক্টরীতে সত্তর বছর পর্যন্ত কাজ করেছেন। তাঁর ছেলে বলরাম ঘোষ, সেকালের বিখ্যাত স্বাধীন ব্যবসায়ী ছিলেন- ফরাসী গবর্নররা পর্যন্ত চন্দননগর থেকে যাঁর ব্যবসায়ী বুদ্ধি দেখে ব্যোমকে গিয়েছিলেন। যে বছর অন্ধকূপ হত্যা হয়, সেই বছর তিনি মারা যান। উত্তর কলকাতার বলরাম ঘোষ স্ট্রীট তাঁরই স্মৃতি বহন করছে। এই বলরাম ঘোষেরই পুত্র আমি দেওয়ান শ্রীহরি ঘোষ। বাগবাজার কাঁটাপুকুরে এসে আমি বসবাস করতে আরম্ভ করি। কাঁটাপুকুরে প্রায় বিশ বিঘে জায়গার মধ্যে বাগান, পুকুর ইত্যাদি নিয়ে আমার রাজপ্রাসাদ ছিল, পার্ক স্ট্রীট অঞ্চলে কোন ইংরেজ বা ইঙ্গবঙ্গেরই যা ছিল না তখন।—-উত্তরে বোসপাড়া লেন, দক্ষিণে কাঁটাপুকুর লেন, পূর্বে গোপালচন্দ্র বোস লেন ও অন্যান্য ঘরবাড়ি নিয়ে যে বিরাট এলাকা- যে-সব জায়গায় আজ ‘যুগান্তর’  ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’র আফিস বাড়িঘর উঠেছে-তার প্রায় সবটা জুড়ে একদিন এই হরি ঘোষের বাড়ি ছিল।—-কলকাতার লোকের কাছে আমার সেই বাড়ির নাম ছিল ‘হরি ঘোষের গোয়াল’। কেন এই নাম তারা দিয়েছিল তাও বোধ হয় জানেন না। এমন কেউ ছিল না তখন, আত্মীয়-স্বজন বন্ধুবান্ধব পাড়াপ্রতিবেশী বা দেশের লোক, যে আমার বাড়িতে এসে জগন্নাথের মহাপ্রসাদ না পেত। বস্তা বস্তা টাকা মোহর যেমন ঘোড়ার পিঠে চাপিয়ে বাড়ি এনেছি, তেমনি মুঠো মুঠো করে তাকে বিলিয়েও দিয়েছি।— বাপের শ্রাদ্ধ, বিয়ে, লেখাপড়া, চাকরি খোঁজা ইত্যাদি যাবতীয় ব্যাপার দেশের লোকের, সব আমার বাড়িতে এসে থেকে না করলে যেন তারা স্বস্তি পেত না। আমার বাড়িটাকে তাই লোকে ‘হরি ঘোষের গোয়াল’ বলত।— পয়সাটাকে হাড়পাঁজরের মতন মনে করিনি কোনদিন, তাই বাড়িটাকে গোয়াল ত করেইছিলাম, যা কিছু অর্জিত ধনসম্পত্তি ছিল সব শেষ পর্যন্ত দান করে দিয়ে কাশীবাসী হয়েছিলাম।— আমার বংশে আজ কেউ বাতি দিতে থাকুক বা না থাকুক, বলরাম ঘোষ স্ট্রীট, হরি ঘোষ স্ট্রীট, বারাণসী ঘোষ স্ট্রীট আছে উত্তর কলকাতায় এবং সেখানকার বাসিন্দারা আছে। —

“সত্যি, থোঁতা মুখ ভোঁতা করে দেওয়া একেই বলে!! গলা ফাটিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে- এনকোর, এনকোর।

এই যে মনোহর ঘোষের চিত্রেশ্বরী মন্দিরের কথা এসেছে সেই চিত্রেশ্বরী বা চিত্তেশ্বরী মন্দির থেকেই এই অঞ্চলের নাম হয় চিৎপুর। এখানে দুটি চিত্তেশ্বরীর মন্দির আছে। ৯, খগেন চ্যাটার্জি রোডে আছে ‘আদি চিত্তেশ্বরী মন্দির’। আর ১৫/১, খগেন চ্যাটার্জি রোডে ‘চিত্তেশ্বরী সর্বমঙ্গলা মন্দির’। আদি চিত্তেশ্বরী মন্দিরের মার্বেল ফলকের প্রতিষ্ঠালিপিতে লেখা আছে –

               আদি চিত্তেশ্বরী মন্দির

চিত্রপুর
স্থাপিত ইং ১৬১০ সাল

মন্দিরের নাটমন্দিরের দক্ষিণে মার্বেল পাথরের লিপিতে আছে-

                শ্রীশ্রী ঁজয়চণ্ডী চিত্তেশ্বরী

চিৎপুরের আদি চিরপ্রসিদ্ধ
সর্ব্বজন বিদিত চিত্তেশ্বরী দুর্গাদেবী
স্থাপিত  ইং ১৬১০ সাল
নাটমন্দিরের দেওয়ালের বোর্ডের লিপিটি-
“৩৮৮ বৎসর পূর্ব্বে শ্রীচৈতন্যদেবের অন্তরঙ্গ পার্ষদ অগ্রদ্বীপের ও ঘোষপাড়ার বাসুদেব ঘোষের বংশধর বর্দ্ধমান ও মুর্শিদাবাদ জেলার সীমানায় কুলাই গ্রামের জমিদার মনোহর ঘোষ ও তাহার পত্নী সেওড়াফুলী রাজার কন্যা উভয়ে ইং ১৫৮৬ সালে এই চিত্তেশ্বরী দেবীর মন্দির স্থাপন করিয়া কিছু ভূসম্পত্তিসহ তদীয় সেবাইত মহন্ত নৃসিংহ ব্রহ্মচারিকে দান করেন। চিতুডাকাত এই দেবীকে পূজা করিতেন। কলিকাতা চিৎপুর রোড এই চিত্তেশ্বরী দেবীর নাম হইতে আখ্যাত। উপস্থিত সেবিকা–বিল্বমাতা ব্রহ্মচারিণী। ইং ১৯৭৪।”
প্রতিষ্ঠালিপিতে ১৬১০ খ্রি. এবং বোর্ডে ১৫৮৬ খ্রি. — এই দুই মতের মিল না হওয়ায় প্রশ্ন ওঠে মন্দিরটির প্রকৃত প্রতিষ্ঠাকাল সম্পর্কে। কলকাতা গবেষক দেবাশিষ বসু বলেছেন যে এই মন্দিরের ইতিহাস মাত্র সাত প্রজন্মের। সাত প্রজন্ম মানে খুব বেশি হলে ১৭৫-২০০ বছর। স্বনামধন্য তারাপদ সাঁতরা বলেছেন যে স্থাপত্যের বিচারেও এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠা চারশো বছর পূর্বের নয়। এসকল গরমিল সত্ত্বেও মনোহর ঘোষ যে এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা -সে তথ্যের বিরোধীতা কেউ করেন নি। উপরন্তু কালপেঁচার নক্সায় উল্লিখিত হরি ঘোষের পূর্বপুরুষ মনোহর ঘোষের কিছুটা পরিচয় বোর্ডের লিপি থেকে বেরিয়ে এসেছে।
হরি ঘোষ সম্পর্কে যা তথ্য পাওয়া যায় তাতেও অনেক অসঙ্গতি। আন্তর্জালের একটি সূত্র উইকিপিডিয়া লিখেছে-
“হরি ঘোষ (?–১৮০৬) ছিলেন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর মুঙ্গের দুর্গের দেওয়ান। বাংলা, ফার্সি আর ইংরেজি ভাষায় তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। অবসরজীবনে তিনি কলকাতায় বসবাস করতেন। জনহিতকারী কাজে তিনি অনেক টাকা দান করতেন। শহরে পড়াশুনা করতে আসা অনেক গরিব ছাত্রকে তিনি তাঁর উত্তর কলকাতার বাড়িতে আশ্রয় দিতেন আর তাদের বিনামূল্যে থাকাখাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। তাঁর বৈঠকখানায় গল্পগুজব করতে অনেক লোক আসত আর সেসব লোকের রাতের খাওয়াদাওয়ারও ব্যবস্থা থাকত সেখানে। এর থেকেই বাংলা প্রবচন “হরি ঘোষের গোয়াল”-এর উৎপত্তি”।

আরেকটি সূত্র জানাচ্ছে-

“কলকাতার চিৎপুরে আদি বাসিন্দাদের মধ্যে ছিলেন মনোহর সেন | একসময় তিনি চলে যান কলকাতার বাড়ি ছেড়ে | তাঁর বংশধর শ্রীহরি ঘোষ ফিরে আসেন কলকাতায় | একাধিক ভাষা জানার দরুন মুঘল দরবারে কাজ করে বহু অর্থ আয় করেন তিনি | অবসরের পরে বাড়ি করেন কলকাতার যে রাস্তায়‚ সেটি এখন পরিচিত হরি ঘোষ স্ট্রিট নামে | তাঁর বাড়ি হয়ে যায় হরি ঘোষের গোয়াল | যা অংশ হয়ে ওঠে বাংলা প্রবাদের | তবে শেষ জীবনে হরি প্রতারিত হন কাছের লোকের কাছে | তাঁর সম্পত্তি বাঁধা পড়ে | কলকাতার সব ছেড়ে হরি ঘোষ চলে যান কাশী | সেখানেই থাকেন আমৃত্যু | কাশীতে ১৮০৬ সালে তাঁর মৃত্যু হয় | শোনা যায়‚ মৃত্যুর আগে হরি ঘোষ বাড়ি বিক্রি করে দিয়েছিলেন গাঙ্গুলি পরিবারকে।”
অন্য একটি সূত্রে পৃথ্বী সেনগুপ্ত লিখেছেন যে হরি ঘোষের জন্ম ১৮০৬ সালে। তিনি ছিলেন ফার্সী ভাষায় সুপণ্ডিত। তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মুঙ্গের দুর্গের দেওয়ান ছিলেন।
জন্ম সময় নিয়ে বিভ্রান্তি থাকলেও তাঁর দান-ধ্যান, পরোপকারের কথা এবং প্রতারণার ফলে সব সম্পত্তি হারিয়ে কাশীবাসী হওয়ার তথ্যে কোনো ভুল নেই। আর এসকল তথ্য থেকে এই বাগধারাটির উৎপত্তিরও একটা স্পষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া যায়।
বাগধারাটির উৎস সন্ধানে আর এক হরি ঘোষের নাম পাওয়া যায়। ইনি নবদ্বীপের একজন গোয়ালা। তাঁর দান করা জায়গায় টোল খোলেন রঘুনাথ শিরোমণি। এই টোলে ন্যায়শাস্ত্র  পড়ানো হোতো। বহু ছাত্র পড়তো এখানে। তাদের সমবেত কোলাহল থেকেই ‘হরি ঘোষের গোয়াল’ বাগধারাটির উৎপত্তি।

তথ্যসূত্রঃ

১. কালপেঁচার রম্য রচনাসমগ্র ; বিনয় ঘোষ;
    বাক-সাহিত্য প্রাঃ লিমিটেড, ৩৩ কলেজ রো,
    কলিকাতা-৯; এপ্রিল ১৯৯২
২. মন্দিরলিপিতে বাংলার সমাজচিত্র; তারাপদ
    সাঁতরা; টেরাকোটা, বিষ্ণুপুর, বাঁকুড়া; প্রথম
    টেরাকোটা সংস্করণ; ১৪ জানুয়ারি ২০১৫
৩. আন্তর্জাল
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!