গল্পে জয়শ্রী গাঙ্গুলি

অথ মৎস্যকথা

রাশভারী মুখুজ্জেমশাই দুর্গামন্ডপে বসে অন্যান্য প্রবীণ দের সাথে জমিয়ে গল্প করছিলেন। গ্রামের প্রবীণ মাতব্বরেরা মুগ্ধ হয়ে তাঁর কথাসুধা পান করছিল। কারন, মুখুজ্জেমশাই অত্যন্ত পন্ডিত মানুষ, সম্পূর্ণ বিপরীত বিষয়েও তাঁর অগাধ জ্ঞান। আর গুরুগম্ভীর কোনও বিষয়কেও তিনি আড্ডাচ্ছলে এমন সুন্দরভাবে পরিবেশন করেন _ যা সাধারণ লোকের কাছেও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।সম্ভবত সেই কারনেই _ দোর্দন্ডপ্রতাপ এই প্রবীণ শিক্ষকমশাই ছাত্রদের কাছে সমান জনপ্রিয়।: গম্ভীর কন্ঠস্বর _ কথার মাঝে কথা বলে কার সাধ্যি। প্রায় আট, দশজন প্রবীণ, মুখুজ্জেমশাইকে ঘিরে বসে আছে। বিষয়টা সিন্ধুসভ্যতা থেকে শুরু করে হালের আইন্স্টাইনের থিওরি অফ রিলেটিভিটি ছুঁয়ে জরথ্রুস্টের মতবাদে গিয়ে পড়েছে। সপ্তসুরের মায়াজাল বিন্যাসে হঠাৎ তাল কেটে গেলে যে অবস্থা হয়_ হারুজেলে সামনে এসে দাঁড়ালে_ বাবু মাছ চাই _ ভালো পাকা রুই আছে, তা তিন সের তো হবেই।
বলে হাঁক পাড়লো।
অত্যন্ত খাদ্যরসিক মুখুজ্জেমশাই, অন্য কেউ হলে এক ধমক দিতেন, কিন্তু মাছটির নধর চেহারা দেখে- খানিকক্ষন তাকালেন _ জরথ্রুষ্টকে থামিয়ে, গলাটা একটু নামিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন_ তা কতোতে দিবি বল। হারুজেলে মাথা চুলকে _ হেঁ হেঁ তা বাবু _ আপনাকে দামের কথা কি বলব বাবু _ হেঁ হেঁ, আপনি যা বুঝবেন _ এই বলে মাছটি ওজন করতে লাগল। মুখুজ্জেমশাইয়ের বিশাল পরিবার। নিজের ছেলেপুলে, ভাইদের ছেলেমেয়েরা, খুড়তুতো ভাইদের ছেলেরা_ একান্নবর্তী পরিবার। বাড়ির কয়েকটি ছেলেমেয়ে অদূরেই খেলা করছিল। তাদের ডেকে মাছটি হস্তান্তর করে গুরুগম্ভীর কন্ঠে তিনি নির্দেশ দিলেন _ মা কে গিয়ে বলো এটি একটু ভালো করে রান্না করতে।
এই বলে পুনরায় জরথ্রুষ্টে মন দিলেন। এদিকে ওই সের তিনেক ওজনের নধর কলেবর মাছটিকে একজনের পক্ষে একা বাড়িতে বয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। ফলে, খোকা, আনু, বুঁচকি, নুপু, খুকি _ সবাই মাছটিকে পাঁজাকোলা করে চলল নিয়ে।
ককেউ ধরেছে মাথা, তো কেউ ধরেছে পেটের দিকটা তো কেউ ল্যাজার দিক। মাছটি তখনও বেঁচে, _ একটু একটু নড়েচড়ে সেকথা জানান দিচ্ছে। বর্ষাটা পেরিয়ে যাওয়ায়, এইসব গ্রামের রাস্তাগুলিতে, গলিতে গলিতে ক্যানেলের জল যেত। ছোটখাট নালাই বলা যায় _ বড়জোর পায়ের পাতা ডোবে। এই ছ’জন বালক বালিকা ছপ ছপ করতে করতে, মাছটিকে কোলেকরে নিয়ে চলেছে। হঠাৎ ছ’জনের মধ্যে একজনের মাথায় সৃষ্টিশীল প্রতিভার ঝিলিক খেলে গেল_ মাছটি জলে কিভাবে সাঁতার কেটে কেটে যায়, সেটি দেখার শখ হল_ দিলো ছেড়ে। অবলা প্রাণীটি তখন প্রায় ঝিমিয়ে এসেছে, জলে পড়ে নড়ে চড়ে উঠল। একটু করে করে জলের ওপর দিয়ে এগোচ্ছে। আর এই ছ’জন বালক বালিকা মাঝে মাঝে পাকড়াও করছে, আবার স্লিপ কেটে এগিয়ে যাচ্ছে মাছটি। কিছুতেই বাগে আনা যাচ্ছে না, ধরতে গেলেই স্লিপ কেটে এগিয়ে যাচ্ছে। গ্রামের একদম শেষপ্রান্তে এসে ছ’জনে জাপটে ধরলো মৎস্য বাবাকে। হুটোপুটি করে কোলে তুললে ছ’জনে। কিন্তু সে তখন জলের মধ্যে থেকে জীবনীশক্তি ফিরে পেয়েছে, দিলে মোক্ষম এক ঝাঁপ, জলে। এবার তার গতি বাড়লো। পেছন পেছন ছুটে চলেছে এই বালক বালিকার দল। আরো দু_ চারজন সমবয়স্ক জুটেছে দলে, তার সঙ্গে হৈ হৈ কলরব। গ্রামের একেবারে উপান্তে একটি বড় দীঘি।তাড়া খেয়ে মাছটি সেই দীঘিতে মুক্তির আনন্দে এক লাফ মারলো।
এদিকে এই বালক বালিকার দলের এতোক্ষণে খেয়াল হল জ্যেঠামশাইকে কি বলবে। ভয়ে এ ওর দিকে তাকাচ্ছে।
মুখুজ্জেবাড়ীতে একটি গোঁসাঘর আছে_ সেটিকে অন্ধকার ঘর বলা হয়। একটিও জানালা নেই তাতে। বাড়ির কারো রাগ বা দুঃখ হলে অথবা কান্না পেলে, ওইঘরে আশ্রয় নেয়। তা এই ক’জন ঘাপটি মেরে গোঁসাঘরে বসে রইল, জ্যেঠামশাই টেরটিও পাবেন না। যথারীতি মুখুজ্জেমশাই আড্ডাস্হল থেকে ফিরে স্নান করতে যাবার আগে পত্নীকে জিজ্ঞাসা করলেন _ মাছটা বেশ পাকামাছ আছে, বেশ কষিয়ে রান্না করেছো তো? মুখুজ্জেগিন্নী আকাশ থেকে পড়লেন_ মাছ কোথায় _ আমি তো ভোলা যাচ্ছিল রাস্তা দিয়ে, ওর থেকে কম ওজনের একটা রুই মাছ কিনলাম। মুখুজ্জেমশাই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন। একে তো কম ওজনের মাছ দু চক্ষে দেখতে পারেন না_ দুপুরের খাওয়াটা করলে মাটি, দ্বিতীয়ত, ছেলেপুলেগুলোর বেয়াদপি। এনিশ্চই ওদের কীর্তি। এক হুংকার ছাড়লেন কোথায় রে হতচ্ছাড়ার দল_ সন্দেহ করে ওই অন্ধকার ঘরটার সামনে দাঁড়ালেন, দুহাত আটকে। সবক’টা ছিল ভেতরেই। হুটোপুটি ক’রে এই পাঁচছটি বালক বালিকা, মুখুজ্জেমশাইয়ের হাতের তলা দিয়ে গলে পালালো। সর্বকনিষ্ঠ খুকি, সে পালাতে না পেরে শেষ অস্ত্র প্রয়োগ করল _ ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলল।
কর্তামশাই কড়া হুকুম জারি করলেন _ এই বজ্জাত ছেলেপুলেদের দ্বিপ্রাহরিক আহার বন্ধ। সারাদিন তাদের টিকিও দেখা গেল না। সন্ধ্যের আগে, বৈঠকখানায় রাগতমুখে বসে থাকা জ্যেঠামশাই-য়ের কাছে প্রত্যেকে একপ্রস্হ করে কানমলা খেয়ে সে যাত্রা নিস্তার পেলে সকলে।
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!