অতীন বেরোনোর আগে যে ছড়াটা পড়েছে তা রুমা লক্ষ্য করেছে। এতদিন চাইছিল ঐ লেখাটা বরের চোখে পড়ুক। বর কেন শ্বশুরবাড়ির অন্য অনেককেই একই কায়দায় পড়ানোর ইচ্ছা ছিল। কিন্তু অন্তুর মুখের অভিব্যক্তি দেখে নিজের সাফল্যে খুশি হওয়ার বদলে রীতিমতো চিন্তিত হয়ে পড়ল। সারাদিন মন মেজাজ ঠিক রেখে কাজ করতে পারবে তো? সন্ধ্যেবেলায় ঠিক সময় বাড়ি ফিরবে, না দিদির বাড়িতে গিয়ে বসে থাকবে? রুমা চিন্তা করে জেনেও কোনও খবর না দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে দেরি করবে, যেমন ঝগড়া করে ভাড়াবাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়ে করে থাকে। আগে যখন ওদের চলভাষ ছিল না, তখন রুমাকে জব্দ করার সব চেয়ে কার্যকরী উপায় ছিল এটা। গুবলু জন্মানোর পর এই ভাবটা একটু সংশোধিত হয়েছিল। তাছাড়া এখন দুটো মোবাইল, তাই পদ্ধতিটার কার্যকারিতা একটু কমে গেছে। কিন্তু অতীন কি আবার বিগড়ে যাবে?
ওফ্! রুমা যে কী করবে? ন্যায্য কথা বলা চলবে না, লেখাও চলবে না! ভেতরে গুমরে চলাও বারণ, কারণ তার প্রতিফলন মাঝেমধ্যে আচরণে পড়ে যায়। তাহলে? বিয়ের পর পর বাবাকে একবার বলেছিল রুমা, “এমন ছেলের সঙ্গে গাছতলায় থাকতেও কষ্ট নেই”। সেই ভাবের কথাই কি ভবিতব্য ধরে নিয়ে সুখীর ভূমিকায় মহড়া দিতে হবে? গুবলুর ভবিষ্যৎ বলে কিছু থাকবে না? গুবলুর ভবিষ্যৎ তো অনেক পরের কথা, আজকের সন্ধ্যেবেলার ভাগ্যে কী আছে সেই ভেবেই তো মাথা ভার লাগছে রুমার।
আজ আর সুডোকুতে মন বসছে না। বড় অস্থির অস্থির লাগছে। একটা ছড়া লিখেছে বলে এমন চোর হয়ে থাকতে হবে? সরাসরি কাউকে কিচ্ছু বলেনি, কারও সঙ্গে ঝগড়া করেনি, বাক-বিতণ্ডায় যায়নি। নিজের ডায়রির পাতাখানাও কি নিজস্ব নয়? হ্যাঁ, তবে নিজস্ব জিনিস নিজের হেপাজতেই রাখা উচিৎ, অন্যকে নাড়াচাড়া করতে দিলে আর নিজের থাকে না। কিন্তু রুমার এছাড়া তো উপায়ও ছিল না।
নিজের উপার্জন থাকলে কোন হতভাগা অতীনের রোজগারের দিকে চেয়ে থাকত? শাশুড়ির স্ত্রীধন কিংবা শ্বশুরের ভিটে কোনওটার দিকেই তাকানোর দরকার হোত না। কিন্তু সেগুড়েও বালি। শুধু ভাসুরকে সন্দেহ করে কী হবে, কেরিয়ার কেরিয়ার করে বিয়ের এত বছর পর বাচ্চা হল, কিন্তু কোনও সুরাহা হল কি? ডাব্লিউ.বি.সি.এস.-এর সাক্ষাৎকার দিয়ে আসার পর বহুদিন বুকে আশা নিয়ে ছিল। অতীনের অফিসের ঠিকানায় চিঠি এসেছে কিনা এই প্রশ্ন নিয়ে কতদিন অপেক্ষা করেছিল। শেষে মোদি আলি থেকে অতীন ফলাফলের তালিকা দেখে এসে অসাফল্যর সংবাদটা নিশ্চিত করল। নার্সিংহোমের বিছানায় শুয়ে যে সদ্যোজাত কন্যাকে সৌভাগ্যের দূত মনে হয়েছিল, তাকে সেদিন ভীষন অপয়া মনে হল। অথচ এই অপয়া মেয়েটার জন্যই তার মাকে এক জীবন হতাশা আর গ্লানি নিয়ে বেঁচে থাকতে হচ্ছে।
রুমার বিসিএস পরীক্ষার জন্য অতীন যা কষ্টস্বীকার করেছে, তা খুব কম মা-বাবার পক্ষেও করা সম্ভব। কেবল পছন্দের পদক্রম দাগানোয় পরামর্শটাই ভুল দিয়েছিল সম্ভবত। জীবনসঙ্গী কলকাতার উপকণ্ঠে পোস্টেড, নিজে সদ্য মা হয়েছে – এমন প্রার্থী কেন জয়েন্ট বিডিও-র মতো দুরূহ গ্রামীণ পোস্টিং চাইছে, তা বোধহয় সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী আধিকারিকরা বুঝতে পারেনি বা মানতে পারেনি, রুমা যতই সপ্রতিভ উত্তর দিয়ে থাকুক না কেন। পরের বারে গুবলু পেটে গা বমি আর শরীর আইঢাই নিয়ে আর পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়নি রুমা। কয়েকটা সামান্য নাম্বারিং, যার তাৎপর্য ইন্টারভিউয়ের আগে বুঝতেই পারেনি, ভেবেছিল পছন্দের পদক্রম যা হোক একটা ভরলেই চলে, তা জীবনটাকে তচনছ করে দিল! যার অধ্যাপিকা হয়ে শতশত ছাত্রছাত্রীর সমীহ অর্জনের কথা, অথবা প্রথম শ্রেণীর সরকারি আধিকারিক হওয়ার কথা, সে করণিকের গৃহিণী হয়ে অশিক্ষিত ননম্যাট্রিক শাশুড়ির পায়ের তলায় পিষ্ট হচ্ছে, তার সৃজনশীলতা ডায়রির পাতায় হতাশা লিপিবদ্ধ করতে নিয়োজিত থাকছে, আর সেই কথা লিখেও ভয়ে ভয়ে এত চিন্তাক্লিষ্ট থাকতে হচ্ছে! যদি আজ ও অধ্যাপনা বা উচ্চা সরকারি পদে নিযুক্ত থাকত, তাহলে লেখিকা হিসাবে অন্তত প্রাবন্ধিক হিসাবেও হয়তো একটা জায়গা তৈরি করতে অসুবিধা হোত না। কিন্তু ও কেউ নয়, কিচ্ছু নয়। রুমার মৃত্যুর চিন্তা কি খুব অসঙ্গত? মরার বাসনা যদি নেহাৎ অন্যায় হয়েও থাকে, তাহলে ঘুমিয়ে যন্ত্রণা থেকে সাময়িক পলায়নও কি খুব অসঙ্গত?
কালো পাড় লাল বাটিক ছাপ শাড়িটায় আগুন লেগে দাউ-দাউ করে জ্বলছে। হঠাৎ পেটে আঁচ লাগতে যন্ত্রণার চেয়ে বেশি যেন আঁতকে উঠল রুমা, “গুবলু!”
রান্নাঘরে কোথাও জল নেই। বেসিন দিয়ে জল পড়ছে না, রান্নার জলের বালতির ঢাকা খুলেও দেখল শূন্য। নিজের গা থেকে আঁচল খুলে মাটিতে ফেলে দিয়েছে রুমা। অতীন তো বসার খাবার দালানে বসেই টিভি দেখছে। ওর চোখে পড়েনি? রুমা দরজা দিয়ে উঁকি মারল। পাশের ঘর থেকে মা ছেলের কথা ভেসে আসছে। সারা ঘর ধঁয়োয় ভরে গেছে; কিন্তু ওদের ভ্রূক্ষেপ নেই। পাশের স্নান ঘরে কল খোলা। জল বয়ে যাচ্ছে। কিন্তু রুমার পা থেকে যেন মেঝেতে শেকড় চারিয়ে গেছে। আগুন সে নিজে নেভাবে না। অতীনেরই ছুটে আসার কথা। রুমা আর্তনাদ করতে গেল, “গুবলু পুড়ে যাচ্ছে…!” গলার দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এল, অতীন বা তার মা কেউ টের পেল না।
নিজের গলার অস্ফূট আওয়াজে নিজেই ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল বিছানায়। অতীন তো টের পেয়েছিল। পাওয়ামাত্র কালবিলম্ব না করে ছুটেও এসেছিল। রুমা বরং চুপচাপ শাড়িটার পুড়ে যাওয়া দেখছিল। পিঠে আঁচ লাগতে আঁচলটা মাটিতে খসিয়ে দেয়। অতীন টিভি দেখতে দেখতে আগুলের হলকা আর পোড়া গন্ধ টের পেয়েই ছুটে গিয়ে রুমার শাড়ির অক্ষত অংশ ধরে টান দিয়ে খুলে মাটিতে ফেলে চটি দিয়ে পিটিয়ে আগুন নেভায়। রুমা বাধাও দেয়নি। বিপদ হয়নি, শুধু কাঁধের কাছে পিঠের খানিকটা ঝলসে গিয়েছিল।
শোবার ঘরে রুমা শাড়ি বদলানোর পর অতীন জিজ্ঞাসু চোখে বলেছিল, “তুমি একটা টিকটিকি দেখলে পাড়া কাঁপিয়ে চিৎকার করো; আর গায়ে আগুন লাগল – টুঁ শব্দ করলে না?”
শাশুড়ীমাতা বলে চললেন, “এত বেখেয়ালে কেন? এত অন্যমনস্ক থেকে কি সংসার করা চলে? কী কেলেঙ্কারিটা বাঁধাতে যাচ্ছিলে বলো দেখি? ভাগ্যে অন্তুর আজ ছুটির দিন। আর ভাগ্যিস সূতীর শাড়ি। এঃ! এত শখের শাড়িটা গেল। সাবধানী না হলে তো প্রাণটাই চলে যাবে। তাও ভালো শাড়ির ওপর দিয়ে গেল।…..”
রুমা জবাব না দিয়ে ধপ করে শুয়ে পড়ল। শুয়েই “আঁক” শব্দে উঠে বসতে হল। বাঁ দিকের কাঁধের নীচটা হুহু করে জ্বলছে। তবে তার চেয়ে বেশি জ্বলছে মাথা। রুমা কেন এমন করল তা কি অতীনের অজানা? অনুমানও করতে পারছে না?
সাত সকালে উঠে চা দেওয়ার পর বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে টের পেল কাজের মাসি আসছে না। অগত্যা নিজেকেই বাসন মাজা শুরু করতে হল। অতীন হঠাৎ রান্নাঘরে ঢুকে বলে, “মায়ের খিদে পেয়ে গেছে। বেলা হয়ে যাচ্ছে, পিত্তি পড়বে। আগে মাকে কিছু বানিয়ে দাও।”
ও ঘর থেকে বৃদ্ধার তীক্ষ্ণ কণ্ঠ ভেসে এল, “অন্তু, ওকে আগে স্নান করে কাপড় ছাড়তে বল। একে বাসী কাপড়, তার ওপর এঁটো মাজছে, ঐ হাতে রান্না করলে আমার ঘেন্না করে। স্নান না করলে আমি ওর হাতে খেতে পারব না। আমার ঘেন্না করে।” ঘেন্না শব্দটা একটু বাড়তি জোর দিয়ে উচ্চারিত।
বাসনগুলো না মেজেই স্নান করে নেবে? অগত্যা রুমা তাড়াতাড়ি হাতের কটা ধুয়ে তড়িঘড়ি স্নানে গেল। ঝটপট স্নান সেরে নিল হার হাইনেসকে শুদ্ধ কাপড়ে জলখাবার করে দিতে হবে। স্নানঘরের দরজা খুলে দেখে অতীন এক হাতে একটা প্লেটে ম্যাগি আর অন্য হাতে দুটো রসগোল্লা নিয়ে মায়ের ঘরে যাচ্ছে।
অতীন বিরক্ত গলায় বলল, “মায়ের খিদে পেয়ে গেছে। কতক্ষণ অপেক্ষা করবে? তোমার দেরি হচ্ছিল, আমি করে দিলাম। কী হয়েছে?”
বৌয়ের হাতে খেতে ঘেন্না করে বলে স্নান করতে পাঠিয়ে ছেলের বাসী কাপড়ে করা রান্না খেয়ে নিলে ঐ বুড়ির কোনও কিছু হেরফের হয় না ঠিকই, কিন্তু বৌয়ের যে ভয়ানক অপমান হয়, সেটা কি তার জীবনসঙ্গীও বুঝবে না?
গায়ে কালো পাড় লাল বাটিকের শাড়িটা কোনওক্রমে আধভেজা গায়ে জড়ানো ছিল। চুপচাপ নিজের ঘরে গিয়ে শাড়িটা ঠিক করে পরে নিল রুমা। এই শাড়িটাও ঐ বুড়ি মিথ্যে কথা বলে জোর করে কিনিয়েছেন। অতীনের টাকাতেই পুজোর বাজার করতে গিয়ে রুমার জন্য একটা শস্তা সিন্থেটিক শাড়ি কিনলেন। রুমার একই দামের এই ছাপা শাড়িটা বরং তবু পছন্দ হয়েছিল। তিনশো টাকা দামে নকল সিল্কের চেয়ে আসল সূতীর শাড়ির ইজ্জত বেশি, পরেও আরাম। ননদের বাড়ি গিয়ে তার জ্ঞাতিগুষ্টি সবাইকে শুনিয়ে বার পঁচিশ বললেন, “রুমা অন্য একটা শাড়ি খুব পছন্দ হয়েছে। কিন্তু পুজোর সময় আমি বললাম, একটা সিল্কের শাড়িই নাও। আমি অন্তুকে টাকা দেব, ও পরে গিয়ে কিনে নিও। তখন আমার আরও অনেকের জিনিস কেনা বাকি ছিল, না হলে আমিই কিনে দিতাম। আহা, বেচারার খুব পছন্দ ছিল।”
রুমা বলল, “এমন কিছু নয়। একটা কেনা হয়েছে যখন আর দরকার নেই।”
“কেন দরকার নেই। টাকা তো আমি দেব। তুমি শুরু অন্তুর সঙ্গে গিয়ে নিজের পছন্দ করা শাড়িটা কিনে আনবে।”
অতীন সেদিন অফিস থেকে সোজা দিদির বাড়িতেই গিয়েছিল। মায়ের সঙ্গে দেখা করে বৌকে নিয়ে বাসায় ফিরবে। সে পৌঁছতেই শাশুড়ির এক কথা, “অন্তু রুমার একটা শাড়ি খুব পছন্দ ছিল। নেহাত অর্ডিনারি সূতী বলে পুজো উপলক্ষে আমি একটা সিল্ক কিনলাম। তোকে টাকা দিয়ে দেব। তুই কিন্তু অতি অবশ্যই রুমাকে সঙ্গে করে ওর পছন্দের শাড়িটা কিনে আনবি, বলে দিলুম।”
রুমা বাধা দিতে ‘কিপটে হিসাবী’ ইত্যাদি বিশেষণ শুনল। পরের দিন শনিবার বেলার দিকে অতীন মায়ের আদেশে রুমাকে দোকানে ধরে নিয়ে গেল। দোকানে শাড়িটা তখনও ঝুলছিল। অগত্যা কিনতে হল। শাশুড়ি পঞ্চাশবার সকলকে শুনিয়ে টাকা দিয়ে দেব বললেও কিনে দেখানোর পর আর উচ্চবাচ্য করেননি। উপরন্তু অন্যান্য দরকারে মায়ের হাতে অন্তুই টাকা গুঁজে দিয়ে এসেছে। সকালে বাসী কাপড়, জলখাবার আর ঘেন্নার নাটক অভিনীত হওয়ার পর অক্ষম আক্রোশে রুমার মনে হল এই শাড়িটারও শাস্তি প্রাপ্য। অনেক অনেক অপমান করে চলেছেন ভদ্রমহিলা। কোথাও তো থামানো দরকার।
সারা সকাল মুখ বুজে কাজ করে গেছে। সম্পাহের বাকি দিনগুলোতে রুমা খিদমদ খাটলেও অতীনের ছুটির দিনগুলোতে শাশুড়ি রুমাকে যেন দেখতেই পান না, নিজের যাবতীয় কাজ, এমনকী শাড়ি সায়া মেলাটাও ছেলে দিয়ে করান। মা ছেলের প্রাণের কথপোকথনে রুমা যে মৌনি নিয়েছে, শাশুড়ি তো দূর, তাঁর ছেলেও টের পায়নি। দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর দুজনে টিভি দেখছে দালানে। রুমা রান্নাঘরের কাজ সেরে গ্যাস জ্বেলে আঁচলটা আলতো করে ধরিয়ে একটু একটু করে পোড়া দেখছিল। পিঠে আঁচ লাগতেই আঁচল ফেলে দিয়েছে মাটিতে। তখন তো গুবলু পেটে আসেনি। তাহলে স্বপ্নে কেন গুবলু সমেত পেট পুড়ে যাওয়া দেখল?
তখন ভয় না দেখিয়ে সত্যিই কিছু করে ফেললে আজ মেয়ের জন্য বাঁচার দায় থাকত না। শাড়িটা নষ্ট করা আর পিঠে কিছুদিন ফোস্কার জ্বালা ভোগ ছাড়া কোনও লাভ হয়নি। অতীনের সাময়িক জিজ্ঞাসু দৃষ্টি ব্যতীত মা ছেলে মেয়ে ওদের গুষ্টিকে কোনও বার্তাই দেওয়া যায়নি। অতীনের মা বাচ্চা হওয়ার সময় রুমার মাথায় চড়ে নৃত্য করেছেন, হাজার খানেকবার “ঘেন্না করে” বলেছেন, আর বৌয়ের ওপর ঘৃণা বিদ্বেষ একটা দুধের শিশুর ওপর ফলিয়েও দিব্যি নিজের জায়গায় পূজ্য হয়ে আছেন, আর রুমা বেঁচে থাকার জন্য যেটাই অবলম্বন করে, সেটাই তার অসম্মান ও অশান্তির কারণ হয়ে যায়।