“পাঠগ্রহণের দিনগুলি” সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে অমিতাভ দাস (পর্ব – ৫)

পাঠ গ্রহণের দিনগুলি 

পর্ব – ৫

আড্ডা দিতাম এক বইয়ের দোকানে । তখন ২০০২|৩ সাল হবে । দেবাংশু চক্রবর্তী ছিলেন একজন আড্ডাবাজ মানুষ । তিনি কথায় কথায় একদিন হিমুর কথা বললেন । কে হিমু ?বাংলাদেশের বিখ্যাত কথাকার হুমায়ুন আহমেদ ,তাঁর রচিত একটি অসামান্য কাল্পনিক চরিত্র হিমু ।
শুরু হলো হিমুকে পড়া ।বাংলাদেশে যেই যায় ,তাকেই বলি একটা হিমু সিরিজের ব ই এনে দিতে ।হিমু ,হিমুমামা ,ময়ূরাক্ষী ,চলে যায় বসন্তের দিন ,সাদা হিমু কালো হিমু ,আজ হিমুর বিয়ে –এই উপন্যাস গুলো আমার কাছে আছে । এছাড়াও আরো কিছু বই এর-ওর থেকে নিয়ে পড়েছি ।মনে পড়ছে সুব্রত কিছু পড়িয়েছিল ।ওর কাছে ‘হিমু সমগ্র’ আছে । সুব্রত মানে সুব্রত বিশ্বাস । ‘ম্যালিফাউল ‘ বলে একটা পত্রিকা করত । ওই প্রথম আমার একটা বই নিখরচায় ভালোবেসে ছেপেছিল ২০০৮-এ ” রাধিকা অথবা কুসুম ” । এ যে কত বড় পাওয়া লিখতে এসে এই সামান্য জীবনে…এ কেবল আমিই জানি ।
‘তখন২০০৪ সাল ।মুগ্ধ বিস্ময়ে হিমু পড়ছি ।ভালো লাগছে ।মনে হলো আমিও হলুদ পাঞ্জাবি পড়বো ।বানিয়ে ফেললাম ।তবে পকেট ছিল ।পকেটহীন পাঞ্জাবী বানানোর সাহস ছিল না ।’
‘একটা সময়ে আমি হিমুর মত জগত্ সংসার সম্পর্কে নিরাসক্ত হয়েছিলাম ।…মনে হতো কাউকে কিছু না জানিয়ে চলে যাই ।উদাসীন প্রকৃতির ।তবে চুল-দাড়ি-গোঁফ আর ভুরু ছেঁটে কিম্ভূত কিমাকার সাজবার ইচ্ছে একদম হয়নি ।’
হিমুকে নিয়ে একটা গদ্য লিখেছিলাম । ‘চিঠির ভিতর হিমু’ । তার কিছু অংশ উপরে কোট করে দিয়েছি । ওই গদ্যটি অবগুন্ঠনে জানুয়ারি ২০১৩ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে । লেখকের মৃত্যুর পর তাঁকে আমার শ্রদ্ধা জানিয়ে ।এই চরিত্রটির কাছে আমি কৃতজ্ঞ । কেবল আমিই নই ,আমার মত আরো অনেক বাঙালি পাঠক কৃতজ্ঞ ।এমন চমৎকার আর মজার চরিত্র বাংলা সাহিত্যে দ্বিতীয়টি নেই । হিমুর তুলনা কেবল হিমুর সঙ্গেই ।
হিমুকে নিয়ে লেখা আমার একটা কবিতা–
কেউ কি হিমুর মতো হতে পারে ? হওয়া যায় ?
এসব ভাবতে ভাবতে হাতে এলো–আজ হিমুর বিয়ে
পড়তে পড়তে মনে হলো ,  হিমুর মধ্যে অনেকেই
আবার অনেকের মধ্যেই হিমু ।(হিমু)
হিমুকে নিয়ে আমার গদ্যে লিখেছিলাম ,” ভারতীয় ধর্মশাস্ত্রেও আছে , যে বা যাঁরা মহাপুরুষ হন তাঁরা কখনো কখনো পিশাচবৎ আচরণ করেন , কখনো বা বালকবৎ , কখনো বা উন্মাদবৎ আচরণ করেন । সেদিক থেকে হিমু চরিত্র সার্থক নির্মাণ । হিমু একজন মহাপুরুষ । সে মানুষকে ভালোবাসে , মানুষের উপকার করে , নিজের কথা না ভেবে অন্যের কথা ভাবে । সত্যের পথে চলে , ন্যায়ের কথা বলে –ভবঘুরে ।আপাত দৃষ্টিতে আমাদের এই মার্জিত সমাজ তাঁকে উন্মাদ বা পাগল আখ্যা দেয় , তাতে সে কিছুমাত্র চিন্তিত নয় । হিমু একটা সুপার ইগো , ভেতরের সেই বোধ যা মানুষকে চালিত করে । সত্যকে চিহ্নিত করে । হিমু যেন আমাদের সে কথাই বলে– ‘পরোপকারই ধর্ম , পরপীড়নই পাপ ।’ “
কোন দশকের কবি আমি , জানিনা ।নব্বই বা শূন্য কোনো দশকের সংকলনেই আমার স্থান হয়নি । কেন স্থান হয়নি জানি না । জানতেও চাই না । সময় শেষ কথা বলে , এইটুকুই জানি । ‘৯৪ তে লিখতে আসা ।’৯৭ থেকে ২০০১-এর মধ্যে চারটে বই । দুঃখিত , ভুল হল ,বই নয় ,কাব্যপুস্তিকা–এক ফর্মা বলে কথা । ২০০৩-এ ‘রাতের জার্নাল’ ‘বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থ ‘ পুরস্কার প্রাপ্ত । তবু কোনো দশকের সংকলনে আমার ঠাঁই হয়নি । তা নিয়ে অবিশ্যি আজ আর ভাবিনা । একটা সময় বেশ খারাপ লাগত ।
আমার সময়ের অনেক শক্তিশালী কবিই প্রদীপের অন্ধকারেই রয়ে গেলেন । যাঁদের আরো অনেক খ্যাতি ,অনেক পাঠক ও অনেক সম্মান পাওয়া উচিত ছিল । পাননি । আগামীতে নিশ্চয় পাবেন । অনিমেষ মন্ডল ,শ্যামল ভট্টাচার্য ,রাজীব মিত্র ,অর্ঘ মন্ডল ,সৌরভ চট্টোপাধ্যায় ,অরুণকুমার দাস ,বিপ্লব বড়াল ,নয়ন রায় ,সন্দীপ ঘোষ–এরা কেবল কবিবন্ধুই নন ,প্রিয় কবিও ।
শ্যামলের ‘হে পথ ,হে পতঙ্গ ‘ আজো বিস্ময়ে মুগ্ধচিত্তে পড়ি ।
‘বৃষ্টি পড়লেই মনে হয়
চলে যেতে হবে…
মাটি হয়ে ধুয়ে ধুয়ে
আমাকেও চলে যেতে হবে কোথাও… ‘
এই কবিতার কাছে আমি সমর্পিত পাঠক হিসাবে ।
সৌরভ চট্টোপাধ্যায়ের  ‘ কুরুক্ষেত্র ‘ মননধর্মী অথচ মরমী লেখা । সে শব্দ কুশল কবি । নির্মাণ করে চমৎকার দৃশ্যকল্পের ভুবন । অর্ঘ মন্ডলের ‘হলুদ ,তোমাকে ,’ অরুণ কুমার দাসের ‘লালবৃত্তের ক্যালেন্ডার–‘ এর অতি তীব্র পাঠক আমি । অনির্বাণ দাসের ‘ডাকাডাকি’ আর ‘এসো’ আমার খুব পছন্দের দুটো বই ।রাজীব মিত্রের ‘নদী মৃত্যু নীল’ আহা ,ব্যক্তিগত সংগ্রহে লালিত । বাঁকুড়ার কবি নয়ন রায় সুন্দর একটি বই পাঠিয়েছিল ডাকে–‘ঘোড়া প্রদেশের খুঁটি ‘ । বেশ ভালো ।অন্যরকম । অনিমেষ মন্ডলের  ‘ শীতকালীন একটি সফর ‘ দারুণ বই । হলুদ রঙের মলাট । বিপ্লব বড়ালের ‘জলপ্রপাতের শব্দে গাঁথা’  —খুব ভাল লাগা একটা বই। মারুফ হোসেনের ” বিষণ্ন বনগাঁ লোকাল ” , সোমা মুখোপাধ্যায়ের ” দেবীপক্ষ ” , কৌশিক চক্রবর্তীর ” মায়ের লেখা রান্নাঘর ” চমৎকার কিছু কবিতার বই । আমি এদের মগ্ন পাঠক ।

(চলবে)

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।